সহজ সরলতার মূর্ত প্রতীক,-স্রোত কর্ণধার কবি গোবিন্দ ধর // সবিতা দেবনাথ
স্রোত কর্ণধার,প্রকাশক,লেখক,সম্পাদক-ভাতৃপ্রতীম গোবিন্দ ধরকে আমি প্রায় দুই দশক ধরে জানি লেখার সূত্র ধরেই।প্রায় সময় দূরাভাষে কথোপকথন ও হয়।উত্তর-পূর্বান্চল ছোট পত্রিকা সম্মেলনে বেশ কয়েকবার দেখাও হয়।এই বার ও মার্চ মাসের এগারো তারিখও স্রোত প্রকাশনার বেশ কিছু বই আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশিত হয় সে অনুষ্ঠানেও আমি আমন্ত্রিত ছিলাম আমারও একটি প্রবন্ধের বই প্রকাশ হয়েছিল আগরতলার প্রেস ক্লাবে। খুব সুন্দর অনুষ্ঠান আয়োজন। আয়োজকের মধ্যমণি অবশ্যই গোবিন্দ দা। সবাইকে আপন ভাবে স্বাগত জানানো,বিনয়ী,মৃদুভাষি গোবিন্দ ধর যেন সহজ সরলতার মূর্ত প্রতীক।তাই সভাপতির ভাষনে ত্রিপুরার প্রাক্তন মূখ্যমন্ত্রী যখন কবি গোবিন্দ ধরের প্রশংষায় পন্চমুখ হয়ে উঠেন তাতে আশ্চর্যের তো কিছু নেই। সত্যিই তো উনি যথার্থ প্রশংষার পাত্র। সেই সঙ্গে উত্তর-পূর্বান্চলের লেখক-লেখিকাদের বক্তব্যে ও সেই কথায় প্রমানিত হয়।
কবি অশোক দেব যথার্থই লিখেছেন,-কবি গোবিন্দ ধর,নিম্ন স্বরে বলেন,অনেক চিৎকারের কথা সত্যিই স্মিত হাস্যে গোবিন্দ ধরের ভাষায় প্রতিফলিত হয় অপূর্ব সব ভাষ্য!সে ভাষ্য দশ-দেশ-সমাজ-মাটি-মানুষদের।
আমার জন্মভূমি ত্রিপুরার লেখা-লেখির পরিচয় সূত্রে এই কবির সৃজনশীল কর্মকান্ডেরবিশেষ করে বিভিন্ন আঙ্গিকে বই প্রকাশের খবর রাখি- - - ।অসীম ধৈর্য্য একনিষ্ঠ নিরলস কর্ম প্রচেষ্টা ও বিভিন্ন কর্ম কান্ডের জন্য সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজে এত প্রিয়! চলনে-বলনে সাধারণ,-ভিতরে কি অসাধারণ সব গুণাবলী! আর রয়েছে আশ্চর্য ধারণ ক্ষমতা। কবি যেন বিশেষ কোন এক আদর্শ তাড়িত হয়ে সামাজিক,সাংগঠনিক,সৃষ্টিশীল কাজকর্মের প্রতি প্রবল আকর্ষন অনুভব করেন। লক্ষ করেছি, কবির কবিতায় গভীর জিজ্ঞাসা ওজীবন বোধ। বামপন্থায় বিশ্বাসী কবিতায় কবি গোবিন্দ ধরের স্বীকারোক্তি-এইসব মন্দির মসজিদ থেকে/কবেই সরিয়ে নিয়েছি নিজেকে/আমি বামপন্থি/বামদর্শণ আমার মুক্তির পথ।
গোপেশ চক্রবর্তী যথার্থই লিখেছেন,-কারোর ব্যক্তিগত পরিচয় বড় নয়। বড় হল তিনি কতটুকু সময় ব্যয় করেছেন সমাজের উন্নতিকল্পে,কতটুকু বড় মন নিয়ে সকলকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা গ্রহন করেছেন। কেননা,ব্যক্তি বড় কিছুতেই হতে পারেনা। এই সময়ে একা কোনও কাজ সফল হতে পারেনা- - -।
প্রমথনাথ বিশির লেখায় পাই,-কে কত সন্চয় করে তা নিয়ে জীবনের বিশালতা ও বিস্তৃতি হয় না। কে কী চিন্তা করে,কে কী আদর্শ নিয়ে চলে তা নিয়েই জীবনের বিস্তার- - ।
ইং ১৯৯৫ সনে মাত্র দু' পাতার ফোল্ডার দিয়ে "স্রোত", প্রথম আত্ম প্রকাশ করেছিল।বর্তমানে সমগ্র উত্তর-পূর্ব-ভারতে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে স্রৌত প্রকাশনা যে অবদান রেখে চলেছে তা বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের লেখায় প্রকাশিত হচ্ছে। স্রোত প্রকাশনার একটি অসাধারণ প্রতিষ্ঠান হল 'উদ্দীপ্ত সংগ্রহ শালা'। উত্তর ত্রিপুরার রাতাছড়াতে ইং ১৯৮৫সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর সংগ্রহশালাটির প্রকাশ ঘটে আর ২০০৩ সালে এই সংগ্রহশালটি কুমারঘাটের হালাইমুড়াতে স্থানান্তরিত করা হয়। "উদ্দীপ্ত সংগ্রহশালা" আসলে পুরনো ওনূতন বই,পান্ডুলিপি,সংবাদপত্র,ম্যাগাজিন সংগ্রহের এক অনন্য প্রয়াস।
গত দুই দশকের এই নিরলস সংগ্রামে এখন পর্যন্ত স্রোত প্রকাশনা থেকে কবিতা সংকলন,গল্প সংকলন,প্রবন্ধ,উপন্যাস,ছড়া,ইতিহাস ওঅভিধান ইত্যাদি মিলিয়ে একশো পঁচাত্তরের বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে।
স্রোত থেকে প্রকাশিত শ্যামল ভট্টাচার্যের "লোভদ্রার কাছাকাছি"উপন্যাসের জন্য ২০১০ সালে পশ্চিম বঙ্গ সরকার অকাদেমি সম্মান প্রদান করে যা সমগ্র উত্তর-পূর্বান্চলের নিরিখে ত্রিপুরায় প্রথমবার।
বিগত শতাব্দীর শেষ দশকের শুরুতে কবিতা সৃজনের মধ্য দিয়ে আত্ম প্রকাশ ঘটে এই কবির। এরপর কবিতা থেকে সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় বিস্তার লাভ।একের পর এক কাব্যগ্রন্থ গুলি হল জলঘর,সূর্যসেন লেন,মুনসুন মাছি,দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি,এছাড়াও লিখেছেন সময়ের গোল্লাছুট,মেঘ বৃষ্টি রোদ,গোপন জোছনা,শেকড়ের ধ্বনি,কখনো মেঘ,কখনো পাহাড়,একের ভিতর একশ তিন,কাব্যনীড়,কবিতা-এক,কবিতা-দুই,এপার-ওপার,এই শতাব্দীর ছড়া,থই থই ছড়া,তোমার উনিশ আমার একুশ,শ্রীচরণেষু বাবা,দেওনদী সমগ্র,আষাঢ়ের দিনলিপি ইত্যাদি।
ইতিহাসও সংস্কৃতি বিষয়ক গ্রন্থ 'শ্রীহট্টীয় লৌকিক সংস্কৃতি ও শব্দকোষ,-এক শ্রমসাধ্য গবষনা গ্রন্থের ও স্রষ্ঠা কবির কর্মকান্ডের বিস্তৃতি বড়ো মাত্রা পায় পঁচিশ আগষ্ট-দুই সেপ্টেম্বর,কুমার ঘাট উৎসব ২০১২। কবির আর ও একটি মননশীল প্রয়াস হলো 'বাংলাভাষা'নামে ওয়েব ও পত্র-পত্রিকার প্রকাশ।
কুমার ঘাট উৎসব-২০১২ র পর সারা কুমার ঘাট জুড়ে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড,ছোট পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে এক জোয়ার আসে। ২০১৮,২০১৯এবং ২০২০সন কবির পন্চাশতম জন্মদিন ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত হল স্রোত প্রকাশনা উৎসব।
নিরলস একনিষ্ঠ সাহিত্য সাধক হিসেবে যে নামটা আমার খুবই প্রিয় নাম-"চৈতন্য ফকির"ওরফে গোবিন্দ ধর। প্রকৃত অর্থেই চেতনার দ্যোতক তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। এই চৈতন্যের ঝুলিতে রয়েছে বেশ কিছু সম্মান ও পুরুষ্কার।আর রয়েছে স্মারক সম্মাননা সংখ্যা।
এই ভয়াবহ করোনা কালেও স্রোত প্রকাশনা থেমে থাকে নি,-স্রোত তার নিজস্ব প্রবহমানতায় অনবরত বয়ে চলেছে,-এতে করে ত্রিপুরার সাথে সাথে উত্তর-পূর্বান্চলকেওস্রোতের কল্লোল ধারায় প্লাবিত করে চলেছে আর ভবিষ্যতেও স্রোত নির বচ্ছিন্ন উচ্ছ্বলিত ধারায় বইবে এই আশা রাখি। অশেষ অশেষ আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল। "দিদি"।
পরিচিতি:সবিতা দেবনাথ কবি ছড়াকার ও প্রাবন্ধিক। তিনসুকিয়া,আসাম।
0 Comments