কবি গোবিন্দ ধরের বাস্তবতার যাপনচিত্র ১০০০ কবিতার বীন্দ্র গুহ
কবি গোবিন্দ ধরের বাস্তবতার যাপনচিত্র ১০০০ কবিতা
রবীন্দ্র গুহ
বর্তমান কালখণ্ডের ধস্ত জীবনের চলনপথে যারাই যথার্থ অর্থ খোঁজার স্বপক্ষে, মোহ থেকে, আত্মধ্বংস থেকে নিস্কৃতি চায়, কবি গোবিন্দ ধর তাদের মধ্যে অন্যতম।স্বমহিমায় বিরাজমান থাকার তার কোন ফোকাস্ পয়েন্ট নেই। তিনি স্থা-শক্তি বিরোধী দ্রোহপুরুষ।বর্ণবিভেদ মানেন না।নির্মাণের মোহে তার হেঁটে চলা--নন্ স্টপ হেঁটে হেঁটে চলা।তার অভিধান থেকে মোহঘোর উধাও, লুপ্ত হয়ে গেছে আদার--আদারিং --ভ্যানিটি ইত্যাদি শব্দগুলো।কবি বিশ্বাস করেন না এমন কোন তত্ত্ব যা কালোকে সাদা করে দেখায়--অন্তরে পোষণ করেন না এমন কোন ভাবনা যা নীতিধর্মে আছে,দুর্নীতিতেও আছে। সময়তাড়িত দুঃশীল চিন্তাতন্ত্রে আদৌ তিনি বিশ্বাসবান নন।বাঁক -বদলের মোড়ে এসে হাত উঁচু করেন, খুব তাড়াতাড়ি স্বরান্তরের অভিনব প্রয়াস নিয়ে ভালোমানুষরা তাকে ঘিরে সুন্দর মিলনক্ষেত্র তৈরি করে যাকে বলা যায় নতুন দশকের রণাঙ্গন। অবশ্যই বাংলা ভাষাসাহিত্যের -- দ্য রেজিম অফ-ট্রুথ্-এর।বহুবর্ণিল জীবনযাপনের সূত্র যা সযত্নে লালিত।
কবির অন্যনাম চৈতন্য ফকির -সে নামে তার অনবদ্য কাব্যগ্রন্থ 'দেওনদীসমগ্র'।বুকের কম্পাস--কত যাদু--'খলবল খলবল সারাক্ষণ '।আর 'ঢেউ খেলে ছলাৎ ছলাৎ'। শব্দ ছড়ায় মনে, চোখের চারাপাশে 'ডহরলাগা ঘোর'।তখন সূর্য নামে পাহাড়ের গায়ে ঝাঁকি দিয়ে দিয়ে। 'আবার লঙ্গাই -- আবার ধলাই... আবার বিজয় গোমতীর জল'।আরণ্যক টিলা,সমতলে উঁচুনীচু বাড়িঘর। ঝোপঝাড়। উড়াল দেয় পাখি,খোলস ছাড়ে সাপ।নদীর সাথে সবার সখ্যতা। ডহরলাগা ঘোর।কি অসাধারণ শব্দযাপন। ধ্বনি নির্বাচন।নতুন শব্দ সৃষ্টি। জীবনানন্দ শব্দ নিয়ে উৎসব করেছিলেন। কবি গোবিন্দ ধর জানেন শব্দের ওজন বাড়াতে - কমাতে। মাইকেলের মত প্রয়োজনে দাপুটে দাম্ভিক করে তুলতে।হ্যাঁ ইহাকেই বলা যেতে পারে পাওয়ার পয়েট্রি।
জীবনক্ষেত্রে কত যে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা,দ্রুতঘটিত ভাষা কবির অতীতকে /প্রিয় সম্পদ অতীতকে টেনে আনে,গড়ে ওঠে মিথ,শব্দের উৎসব শুরু হয়। লেখা হয়ে যায়,'বেঁচে থাকার কবিতা'।'এসো বেঁচে থাকতে যা যা লাগে লিখি কবিতায়।এসো জয়ের কথা বলি।এসো ভাত শিকার লিখি.... এসো বন্ধু কলম নাও লিখো, রুটির গল্প'এভাবেই মুখোমুখি মিলনক্ষেত্রের বৈঠক শুরু। আঁধিঝড় শুরু। মনে পড়ে যায় কবি রফিক আজাদের কথা --'শুকনো রুটির নিরুবিলি ভোজ'-এর কথা।কাকতালীয় ব্যাপার নয়--ইহা ঘটনা। অনুভব দ্রোহচেতনার, ক্ষুব্ধ ভাবনার।কবি গোবিন্দ ধর ভাতের কথা, রুটির বললেন, বন্ধ দরজা খুলে দিতে বললেন।ক্ষুধার জ্বালা সইতে পারেন না রফিক আজাদ,পেট পুড়ে যায়।তিনি বলেনঃ'ভাত দে হারামজাদা, তা-না হলে মানচিত্র খাবো।'
দু-জনেই নদী-নালা, ফুলফলের দেশের।দু-জনেরই সমাজ মুখিন ধারণা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।কবিতার একটি প্রধান প্রেরণা প্রেম। পরিস্থিতির জন্য লালিত হলেও হৃদয়জুড়ে আকণ্ঠ মানব প্রেম। যা বলেন,স্পষ্ট এবং নির্ভুল।দু-জনেরই ভাষা ভঙ্গীতে বেপরোয়া --উচ্চকণ্ঠী।অঙ্কহীন জীবন।সবকিছু যেন গণনার বাইরে। উত্তরে যেতে দক্ষিণে চলে যায়। তাই কবি লেখেন --'মানুষকে চেনার কোন যন্ত্র নেই। কাছের জন পর হয়। দূরের জন নিকট।'অথবা এবং, 'সামনে হাঁটে পরিব্রাজক/পেছনে দু'একটি কুকুর ঘেউ ঘেউ করবে।/এতে ভয় নেই। /তুমি মানুষ সে কুকুরও।'[পরিব্রাজক কুকুর ঘেউ ঘেউ সাকুল্যে তিনজন]আরো আছে --'কবি -লেখক, 'পদ্যাণু', 'একশ বছর','বিষকেতু নাথ',একটি ত্রিপুরী কবিতা',ইত্যাদি। হ্যাঁ, 'সুকুমার কর',এবং 'বত্রিশ নম্বর বাড়ি',কে অবশ্যই বাদ দেয়া যায় না।কবির চারপাশে কতরকম মানুষ। জপতপ করা মানুষ, একরৈখিক মানুষ, প্লুরাল মানুষ, মেঠোমানুষ, নবাঞ্চলের মানুষ। তাদের কতরকম জীবনসূত্রের অবস্থান। পূর্ণতার বোধ, অবিচ্ছিন্ন চেতনা। অহং।
এছাড়াও গোবিন্দ ধরের কবিতায় আঞ্চলিকতার ধারালব্ধ ইচ্ছাদ্বন্দ্ব, ক্রিয়াদ্বন্দ্ব,অতিরিক্ত দৃষ্টিদ্বন্দ্ব--এইসব শব্দের মধ্যেই নিহিত বঞ্চনা, ঘৃণা, অবজ্ঞা, যন্ত্রণা, এবং পথ চলা।তৎসহ স্বপ্ন, ক্রমাগত চমক।বলাবাহুল্য, এইসব নিয়ে গোবিন্দ ধরের 'নির্বাচিত ১০০০ কবিতা'সিংহভাগ। প্রসঙ্গত, কিছু উদাহরণ দেয়া যাক--'আপনার কবিতার নির্বাচন প্রক্রিয়া একান্তই অভিজ্ঞতাপ্রসূত।শব্দপ্রয়োগ,ভাষার গড়নশিল্প,অর্থাৎ গঠন[shacture],তথা কবিতার আত্মা য় পৌঁছনোর অভিধান বহির্ভূত-প্রক্রিয়া এবং দুষ্প্রবেশ্য উপাদান অনুভবের রিখটারে শিহরণ তোলে।........[আপনি শিক্ষক আপনি কবি।বৈজ্ঞানিক মৌলবাদীদের মত একঠেরে নন।আপনার কাছ থেকে এইরূপ শ্রেণী-সচেতন সরলীকরণ ভাবকল্প প্রত্যাশিত।]আমাদের ব্যক্তি -অস্তিত্ব, এখন,এই সময়, এই আছে এই নেই --- এই আছে এই নেই। উক্তপর্বের কবিতাগুলির অংশবিশেষ অগোছালোভাবে তুলে দিচ্ছি ---
'চারদিকে আকার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে /ভালবাসা
বিশ্বাস প্রেম/কেমন মাংস পুড়া ছাই'
-[নিখোঁজ সংবাদ / ১৮.৩.২০১০]
'পথ পথ দেখায় /তারপর একসময়
অরণ্যে গিলে খায় রাস্তা '----
[পূ্দ্যাণু/২০.৩.২০১১]
'রাস্তাঘাটে বাজারহাটে
হাজার রকম মানুষ
মানুষ হলেও মানুষ তো নয়
চৌদ্দ বাতির ফানুস। '
[মানুষ /১৫.৪.২০২০]
'ভাতগাছ চাষ করতে আমি এখন জমিনে নামি না এখন।
ভাতশিকার করতে রোজ প্যান্ট শার্ট চশমা পরি
একটি কলম রাখি বুক পকেটে
নাম রেখেছি ভাতশিকার'
[ভাতগাছ/৩.২.২০১৮]
স্থানিকতায় মানুষ বিবিধ সংস্কার, আস্থা, বিশ্বাস, নিয়মের মধ্যে ডুবে থাকে। রক্ষাকবচ নিয়ে। অবস্থান থেকে সরে আসতে পারে না। যিনি পারেন তিনি কবি,তিনি শিল্পী। তার ভাষা আছে। সেই ভাষাশব্দ নিয়ে তিনি নবাঞ্চলের পথে হাঁটেন।তসট মধ্যে চলতে থাকে অনবরত বিনির্মানের কাজ।এইরকম একজন মানুষই গোবিন্দ ধর।তার কবিতায় এমন অনেক শব্দ থাকে যা অস্ফুষ্ট সম্ভাবনা মাত্র নয়,অসাধারণ রহস্যময় তায় ঘিরে রাখে কবিতসটিকে।হতে পারে তা আনন্দের ---হতে পারে দারুণ যন্ত্রণার--উচ্চ মাত্রার অথবা ধীরলয়ের শব্দ। যেমন,'ভাতগাছ'কবিতায়, ভাতশিকার।'মানুষ 'কবিতাশ 'চৌদ্দ বাতির'।'মধ্যরাতের পদ্যে'মানবভাইরাস।আত্মসম্পূর্ণতার কবিতাচর্চার অহং পর্বে কে গোবিন্দের অলিখিত অভিভাবক? তর্কাতীতভাবে বলা যায়, গোবিন্দ সদর্পে নিজেই নিজের অভিভাবক।নিজ অস্থিত্ব নির্ভর তার জেদী-- শব্দ-ভাণ্ডারের দিকে নজর দেয়া যাক---
[এফুড় ওফুড়.ক্রান্তিকাল.ম্যাজিকবাক্স.বৈরীবাতাস.আড়মোড়া. হাঁটুভাঙ্গা দ.পাঠদান.টোলপড়া. শরীরচূর্ণ.টিলাকুচযুগল.মায়ারথ. বনজমুকুট.জুড়াতালি.খুমপই.স্তনপুড়া গন্ধ.অঙ্কজীবন.হটস্পট জোন.ছবিমানুষ](ছোট করে লিখতে হবে এই অংশ)
গোবিন্দ ধরের কবিতা বিষয়হীন নয়।নিরাকার নয়।সত্যের মিশ্রণে শব্দের সপলিব্রাশন্ অন্য আরো উজ্জ্বল শব্দ গড়ে তোলে।যা অসম্ভবকে গ্রহণ করতে অসুবিধা হয় না।ভারসাম্যের খুঁটিনাটি তিনি শক্ত মুঠোয় ধরে ভাষা নিয়ন্ত্রণ করেন।যা যা দৃশ্যমান, যা যা অদৃশ্য সব ব্রহ্ম।
শব্দ ব্রহ্ম। শব্দ উৎসব।
শব্দ সত্য।
শব্দ শুধু অর্থের জন্য ভাষাকাঠামোর জন্য নয়,প্রিয় -প্রিয় শব্দ তৈরী হয় অনিশ্চিতকে নিশ্চিত করার জন্য। কবিতার পথ ---ভাবকল্প --অন্তর্বয়ন বাস্তবের সমান্তরাল বহুধা বাস্তব করে তোলে। ইহাই জীবনের প্রকৃত সত্য।উত্তর অধুনান্তিকতা --- কবিতায় বহুধাবিস্তৃত দ্য রেজিম্ অফ্ ট্রুথ। জীবনের সঙ্গে কবিতাকে স্পষ্ট কটতে কবি গোবিন্দ ধর বলেন---
পরিণতি ছাড়া বিক্রমও হার্ড ল্যাণ্ডিং করলো চন্দ্রপিঠে
পরিনতি ছাড়া কত স্বপ্ন এরকম ভেঙে যায় চন্দ্রযানের মতো।
মানুষের চন্দ্রবিজয় সফল মিশন তাও চন্দ্রযান
বিক্রমসহ চাঁদের পিঠে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সফটল্যাণ্ডিং হয়নি
#
আসলে সকল কাজেই সফটল্যাণ্ডিং একটি বিষয়।
করো বুকেই কেউ হার্ড ল্যাণ্ডিং করতে পারে না।
না চাঁদে না মাটিতে কিংবা প্রিয় কোন ফুলে।
সকল সংকল্পের চাই বাস্তব ল্যাণ্ডিং।
[সফট ল্যাণ্ডিং/১০.৯.২০১৯]
অধুনানিক চত্বরে এক একজন কবি এক একরকম আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত। কবি গোবিন্দ ধর শুধু স্থানিকতা তথা আঞ্চলিকতার মধ্যেই বোধিসত্ত্বাকে দরোজাবন্ধ রাখেননি।জীবনের সর্বত্র সর্বস্তরের বৈপরীত্যে কবি বর্তমান।তার কবিতা মানেই :A passion for truth নজিট হিসাবে আবার তুলে ধরতে হয় গ্লোবাল-- জীবনে সমস্যা, স্বপ্ন, ও জটিলতার কথা।যেমন,'হননইচ্ছুকবেলা'/'পথে পথে হেঁটে যায় একজন রাধারমণ '/'শান্তিবিড়ি'/',ডিজিটাল ইণ্ডিয়া '/'কোয়ারান্টাইন শেষে -দুই',চার,ছয়,নয়,দশ'/'একশবছর'/'মৌলভীবাজার '/'খাহামলাই ক্লাব'/'লকডাউন'/'হোমোস্যাপিয়েন্স স্থির বিশ্বাসভূমি আঁকড়ে না থাকলে এরকম লেখা অসম্ভব। গোবিন্দর কবিতার বিষয় এবং আব্যন্তরীণ কৌশলগুলি এবং সাহসী বিন্যাস লক্ষণীয়। কবির সামাজিক বিবেকের উচ্ছ্রিত প্রকাশ কবিতাপ্রেমীর হৃদয় আলোড়িত করে। তিনি যত্নে পূর্ণ দক্ষতার সঙ্গে প্রবহমান প্রাত্যহিক সুখদুঃখ,দ্বন্দ্ব -অস্থিরতা তথা অমর্যাদাকে মিলিয়ে নিতে পেরেছেন কবিতার জীবন্ত তরঙ্গলীলায়।বর্তমান কালখণ্ডের ঈশ্বর, ধর্ম, অনিয়ন্ত্রিত যৌনলিপ্সা -- তাও বাদ যায়নি 'নির্বাচিত ১০০০ কবিতা' থেকে--- শব্দভঙ্গি থেকে --- সত্যের শ্বাসজল থেকে। ধরা পড়েছে অতীত ও ভবিষ্যতের দ্বন্দ্ব। কবির কখনো আত্মবিশ্বাসের অভাব ঘটেনি। পাঠক পেয়ে যাবেন আপাত সত্যের সঙ্গে কল্পনা 'চার পাশের ঘটে যাওয়া ঘটনা, তদুপরি বর্তমানের সাথে স্বপ্ন এবং অনন্যসাধারঙ সংমিশ্রণ।
0 Comments