পাঁচটি এ. ডি. সি.  ভিলেজ এবং আমার স্কুল বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়া এস বি স্কুল 

গোবিন্দ ধর 

পঞ্চ পাহাড়ের ( ১. বড়মুড়া, ২. আঠারমুড়া, ৩. লংতরাই, ৪. শাখা়ংটাং এবং ৫. জম্পুইটাং )রাজ্য নামে পরিচিত আমাদের এই ত্রিপুরার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই অতি আকর্ষণীয়, অতুলনীয় আর অপূর্ব। এই পঞ্চ পাহাড় ছাড়াও মাঝারি এবং  ছোট আকারের পাহাড় ,টিলা অসংখ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই ত্রিপুরার বুকে । প্রতিটি বড়, মাঝারি ও ছোট পাহাড় বা মুড়া থেকে উৎপত্তি হয়েছে বড়, ছোট কিংবা দীর্ঘ  নদ, নদী, ছড়া হয়তোবা খালের রূপ নিয়ে   যা সৃষ্টির কাল থেকে রক্ত নালীর ধমনী ও শিরার ন্যায় বয়ে চলেছে আবার কোথাও স্থির হয়ে বিল জলাভূমির আকার ধারন করেছে-  প্রকৃতির কি অসাধারণ সৃষ্টি । 
          লংতরাই পাহাড়ের চতুর্দিকের ঢালু গাত্র থেকে অনেক ছোট ছোট জলধারা সৃষ্টি হয়ে কোথাও কোথাও সৌন্দর্যের বাহারি ঝর্ণার রূপ ধারণ করে ছড়ার আকারে বয়ে চলতে চলতে অন্য কোন ছড়ার সাথে মিলিত হয়েছে কিংবা নদীতে পতিত হয়েছে। লংতরাই বাবার উত্তর-পূর্ব গাত্রদেশ থেকে জামিরছড়া,  ধূমাছড়া, ডেমছড়া, কাঠালছড়া এই চারটি ছড়া উৎপত্তি হয়ে মনু নদীতে পতিত হয়েছে। মনু নদী সাকাং পাহাড়ের অংশ থেকে উৎপত্তি হয়েছে যেটা এই রাজ্যের দীর্ঘতম নদী  ।  মনু শহর  মনু নদীর তীরেই অবস্থিত । মনুর বুক দিয়ে রাজ্যের জীবনরেখা নামে পরিচিত ০৮ নং জাতীয় সড়ক আসাম-আগরতলা রোড, প্রধান সড়কপথ এমনকি রেলপথও চলে গেছে যা বহির্রাজ্যের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে।  এছাড়াও পাদদেশ সংলগ্ন ছোট ছোট টিলা থেকে অনেক জলধারা ছড়া সৃষ্টি হয়ে বিরামহীনভাবে প্রবাহিত হয়ে শেষে মনু নদীকে  ছুঁয়েছে করমছড়া, জারুলছড়া, করাতিছড়া,   চিচিংছড়া, নাইটংছড়া,কচুছড়া,গাগ্রাছড়া,কাঞ্চনছড়া ইত্যাদি । লংতরাই উপত্যকা  মহকুমা মানেই ছড়ার ছড়াছড়ি। এগুলো উপত্যকাবাসীদের আশির্বাদ স্বরূপ ।
         প্রকৃতিপ্রেমি হিসাবে এক অপূর্ব সৃষ্টি জলধারা ডেমছড়া  ( স্থানীয় রিয়াং ভাষায় এমডেক তয়সা ) এর নামে পরিচিত  একটি  এ. ডি.সি.  ভিলেজ ( মনু ব্লকাধীন )ডেমছড়াকে নিয়েই আজকের এই লেখা। প্রকৃতপক্ষে এই এলাকার অভিজ্ঞতা খুবই স্ংকীর্ন সময়ের এবং স্বল্প পরিসরের। কেবলমাত্র বছর ঢেড়েকের। পেশায় একজন শিক্ষক হিসেবে গত বছরের প্রাই মাঝামাঝি সময়ে রাজধানী আগরতলা শহরস্থিত রামপুর এস. বি. স্কুল থেকে বদলি হয়ে বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়া এস বি স্কুলে যোগদান করি। বলা চলে ডেমছড়া এ. ডি. সি.  ভিলেজের একেবারে কেন্দ্রস্থলে বৃক্ষরাম পাড়ায় অবস্থিত এই বিদ্যালয়টি। বর্তমানে এটিই আমার কর্মস্থল। পাড়ার নাম অনুসারে পরিচিতি নিয়ে বিদ্যালয়টি পথ চলা শুরু করে ১৯৮১ সাল থেকে। পাড়ার এই নামের ইতিহাস জানতে গিয়ে জনাকয়েক প্রবীণদের কাছ থেকে অবগত হলাম যে  রাজ্যের বিগত কংগ্রেস আমলে  এই পাড়ায় বৃক্ষরাম চৌধুরী নামের এক  বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ  তখনকার সময়ে গ্রামপ্রধান ছিলেন পরবর্তীতে তার নাম অনুসারেই  স্বীকৃতি পাওয়া। আজও সেই স্মরনীয় ব্যাক্তির উত্তরসূরীদের কচিকাঁচারা  পূর্বসূরীর নামাঙ্কিত বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারাটা তাঁদের কাছে বিরাট প্রাপ্তি। লংতরাই মহকুমধীন মনু ব্লকের অন্তর্গত ডেমছড়া  এ. ডি. সি.  ভিলেজে বৃক্ষরাম পাড়াসহ মোট সাতটি পাড়া রয়েছে। পাড়া গুলির নাম হল চান্দি পাড়া, মাইচাহা পাড়া, বৃক্ষরাম পাড়া, দিলেন্দ্র রিয়াং পাড়া, গুরুদয়াল পাড়া, ফরেষ্ট কলোনি, ওয়াখারাই পাড়া। বিদ্যালয়ের সংখ্যাও সাতটি। ডেমছড়া এস বি স্কুল, ওয়াখারাই পাড়া জে বি স্কুল,  ফরেষ্ট কলোনি জে বি স্কুল, বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়া এস বি স্কুল, ফুলকুমার পাড়া জে বি স্কুল, নর্থ রতন এস বি স্কুল।
         মনু সেতু ও মনু ইকো পার্কের মাঝখানে অবস্থিত ফরেষ্ট  রেঞ্জ অফিসের ঘা ঘেসে ডেমছড়া যাওয়ার পথটি এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে। মনু থেকে ডেমছড়ার দুরত্ব প্রায় বিশ  কিলোমিটার। 
         মনু থেকে ডেমছড়া যেতে তিনটি ছড়া অতিক্রম  করতে হয় স্টিল ব্রিজ এর উপর দিয়ে । প্রথমে জামিরছড়া, মধ্যে ধূমাছড়া এরপর ডেমছড়া।
এই অঞ্চলে ছড়ার নাম অনুসারেই গ্রামের নামও পরিচিত।  এমনকি লংতরাই ভ্যালী মহকুমার  অধিকাংশ গ্রামের নাম স্থানীয় ছড়ার নামে স্বীকৃত। ডেমছড়া পেরিয়ে আর একটি ছড়া কাঁঠালছড়া নামে সারা বছর ধরেই প্রবাহিত হয়ে মনু নদীকে পবিত্র  করে চলেছে।
          ডেমছড়া এ. ডি. সি.  ভিলেজ থেকে বিশ কিলোমিটার দূরবর্তী  লংতরাই পাহাড়ের উত্তর-পূর্ব গাত্রের গভীর  জঙ্গলে ডেমছড়ার  উৎপত্তি স্থল ।  বামদিক  থেকে  তয়সা কতর  ঝর্ণার রূপে এবং ডানদিক থেকে তয়সা কলক ও তয়সা বারা নামের তিনটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলস্রোত মিলিত হয়ে ডেমছড়া পরিচিতি নিয়ে দিনরাত বয়ে চলেছে সংখ্যায় রিয়াং গরিষ্ঠ ত্রিপুরী, ডার্লং ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মিশ্র  জনজাতির গ্রাম ডেমছড়ার বুক চিরে।
           এই ছড়াই এখানকার মানুষের জীবন যাপনের  স্বপ্ন নিয়ে কর্মস্থল জুমে আসাযাওয়ার একমাত্র পথ। ছড়ার জলের মধ্য দিয়ে খালিপায়ে চলাচল করা খুবই দুঃসহ। 
          কোথাও  শুুধু পাথর, কোথাও  বালুপাথর, আবার কোথাওবা কাঁদামিশ্রিত পাথর অকল্পনীয় পিচ্ছিল।  তবুও ফসল ও সহজলভ্য কচিবাঁশ(করুল) আহরণের জন্য অদ্বিতীয় পথ। কাঁকড়া, চিংরি মাছ, লাটি মাছ আরও  কত জাতের মাছ যেন  প্রকৃতি চাষ করে দান করেছে।
          জলের  গভীরতা বছরের বেশীরভাগ সময় হেঁটে চলাচল করার উপযোগী থাকলেও  বৃষ্টির মরসুমে  কিন্তু ভয়ঙ্কররূপী হয়ে ওঠে । তবে এই  ছড়া যে এই  এলাকার মানুষের জন্য প্রকৃতির আশির্বাদ তা নিঃসন্দেহে বলা যেতেই পারে।


১০:১২:২০২২

0 Comments