কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনমুখোমুখি গোবিন্দ ধর
কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন
মুখোমুখি
গোবিন্দ ধর
কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের জন্ম ১৪জুন ১৯৪৭।রাজশাহী শহরে।পৈতৃক নিবাস বর্তমান লক্ষীপুর জেলার গাজীরপাড়া গ্রাম।পিতা এ কে মোশাররফ হোসেন রাজশাহী রেশমশিল্প কর্পোরেশন -এর পরুচালক ছিলেন।
সেলিনা হোসেনের লেখার জগৎ বাংলাদেশের মানুষ, তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। বেশ কয়েকটি উপন্যাসে বাংলার লোক-পূরাণের উজ্জ্বল চরিত্রসমুহকে নতুনভাবে তুলে আনেন।তাঁর উপন্যাসে প্রতিফলিত হয় সমকালের সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব -সংকটের সামগ্রিকতা।বাঙালির অহঙ্কার ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযোদ্ধের প্রসঙ্গ তাঁর লেখায় নতুন মাত্রা অর্জন করে।জীবনের গভীর উপলব্ধির প্রকাশকে তিনি শুধু কঢথাসাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন না, শানিত ও শক্তিশালী গদ্যের নির্মানে প্রবন্ধের আকারেও উপস্থাপন করেন।নির্ভীক তাঁর কন্ঠ-কথাসাহিত্য,প্রবন্ধ এবং ছোট গল্পও।
১৯৬৪ সালে রাজশাহীতে উচ্চামাধ্যমিক পড়ার সময় বিভাগীয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়নশিপ স্বর্গপদক পান।১৯৬৯ সালে প্রবন্ধের জন্য পান ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক স্বর্ণপদক।১৯৮০ সালে উপন্যাসের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার,১৯৮১সালে "মগ্নচৈতন্যে শিস"উপন্যাসের জন্য আলাওল পুরস্কার, ১৯৮২ সালে অগ্রনী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮৭ সালে "পোকামাকড়পর ঘরবসতি"উপন্যাসের জন্য কমর মশতরী পুরস্কার, ১৯৯৪ সালে "অনন্য " ও "অলক্ত"পুরস্কার, ১৯৯৮ সালে জেবুড্রেসা ও মহবুবুল্লাহ ইন্সটিটিউট প্রদত্ত সাহিত্য পুরস্কার ও স্বর্ণ পদক সাহিত্য সাধনায় স্বীকৃতি।এছাড়া ১৯৯৪-৯৫ সালে তিনি ত্রয়ী উপন্যাস "গায়ত্রী সন্ধ্যা "রচনার জন্য ফোর্ড ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ পেয়েছিলেন।২০০৬ সালে লাভ করেন দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যে রামকৃষ্ণ জয়দয়াল হারমোনি অ্যাওয়ার্ডস, দিল্লি।
২০০৯ সালে পেয়েছেন একুশে পদক এবং ২০১০ সালে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা থেকে ডক্টর অব্ লিটারেচার (Honoris Causa)ডিগ্রি লাভ করেন।একই বছর গায়ত্রী সন্ধ্যা উপন্যাসের জন্য ইনৃডিয়ান ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানিং এ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট প্রবর্তিত রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার লাভ করেন।সাহিত্য অকাদেমী, দিল্লি থেকে ২০১১সালে প্রেমচাঁদ ফেলোশিপ লাভ করেন।
ইংরেজি, হিন্দি, মারাঠি, কন্নড়, রুশ,ফরাসি, ফিনিস,াপানিেরিয়ান,উর্দু,মালায়লাম,আরবি প্রভৃতি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর গল্প,উপন্যাস।
পশ্চিম বঙ্গের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর "যাপিত জীবন"এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে "নিরুত্তর ঘন্টাধ্বনি"উপন্যাসব পাঠ্যসূচীভুক্ত।
প্রশ্ন :১
আপনাকে নিয়ে ত্রিপুরায় অনেক স্বপ্ন আমাদের।সারা উত্তর পূর্বাঞ্চলের গবেষকরা আপনার সাহিত্য কর্ম নিয়ে নিরলস গবেষণা করে ডিগ্রি লাভ করছেন।হয়তো আপনি সব জানেনও না।আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ গবেষকরা অনেকেই উৎসাহি।হাতের নাগালে আপনার সব সাহিত্য কর্ম তুলে দেওয়া এক দুরুহ বিষয়।মাঝ খানের কাঁটাতার দুদেশের সাহিত্যকে পাঠকের কাছে নিয়ে যেতে বিরাট বাঁধার সৃষ্টি করে।চাইলেও আমরা একুশে বইমেলায় আমাদের সৃজন কর্ম নিয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে পারি না।দুদেশের সরকার এ বিষয়ে কী কোন সৎ উদ্যোগ নিতে পারেন না?আপনি এ বিষয়ে কিছু আলোকপাত করুণ?
উত্তর:১
কবি গোবিন্দ ধর, আমার সাহিত্য নিয়ে উত্তর পূর্বাঞ্চলের গবেষকদের গবেষণা করার যে উল্লেখ করছে সেটা জানতে পারা আমার সৌভাগ্যের ব্যাপার। এই গৌরবের জায়গা লাভ করা গভীর সাধনার বিষয় বলে মনে করি।
তবে একুশের বইমেলায় ভিন্ন দেশের প্রকাশকদের অংশগ্রহণ নীতিগতভাবে গ্রহণ করা হয় না।কারণ এই বইমেলার আয়োজক মাতৃভাষার জন্য জীবনদানকারী ঘটনা। সচেতনভাবে বাংলাদেশের সাহিত্য -সৃজনশীলতা পরিচড়যার মেলা এটা।সেজন্য ভিন্ন দেশের প্রকাশক অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয় না।
এজন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মেলার আয়োজন করা।বিভিন্ন দেশের উদ্যোগে একটি বড় বইমেলা আয়োজিত হলে পাঠকের বই কেনার সুযোগ বাড়বে।এটা সম্ভব না হলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশের সহযোগে সার্ক বইমেলা আয়োজিত হতে পারে।এটা ভাবতে পারে সবাই। ত্রিপুরা তথা ভারত ও বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারও এ দায়িত্বশীল আয়োজন করতে অসুবিধা নেই বলেই মনে করি।
প্রশ্ন :২
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশের সাহিত্য ধারা মূলত।এত উপন্যাস গল্প প্রবন্ধ স্মৃতিকথা। তারপরেও বাংলাদেশের আলোচনা সাহিত্যে একটি বই খোঁজে আমি হরান।মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস নিয়ে আলোচনার বই খোঁজে আমি বাতিঘর,পাঠক সমাবেশ, একুশে বইমেলার স্টলগুলো হন্যে হয়ে ঘুরলাম।পাইনি।আপনার গায়ত্রী সন্ধ্যারও কোন একক আলোচনার বই পাইনি।হয়তো আছে।আমারই ব্যর্থতা। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস নিয়ে কোন আলোচনার বই আদৌ আছে কিনা আমারও দ্বন্দ্ব। এ বিষয়ে আমরা কী বাংলাদেশের আলোচনা সাহিত্যের দূর্বলতা আছে ধরে নেবো।যদিও ত্রিপুরায়ও আমরা আলোচনা সাহিত্যের প্রাথমিক পর্যায়েই পড়ে আছি।
উত্তর :২
সাতচল্লিশ পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশের সাহিত্য একটি ভিন্ন ধারা সৃষ্টি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত সাহিত্য এই ধারার ভিন্নতর সংযোজন।কারণ উপমহাদেশের আর কোনো অঞ্চলে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ সে অঞ্চলের মানুষের হয়নি।এদিক থেকে বাংলাদেশের সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি রচিত সাহিত্য এক বড় সংযোজন।
এই সাহিত্য নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, বিভিন্ন প্রবন্ধ রচিত হয়েছে।যা, বাংলাদেশের সাহিত্যে এ বিষয়ে দূর্বলতা নেই। ভবিষ্যতে আরোও হবে এই প্রত্যাশা আছে আমাদের।
প্রশ্ন :৩
বাচিক শিল্পী প্রবীর পাল ও আমি ১০ ই এপ্রিল ২০১৭ শ্যামলি ১৬/এ তে দেখা করি বাংলাদেশে।ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক ১০টা সকাল।পূর্ব কথা মতো আপনি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।প্রথমবার বাংলাদেশ গিয়েই যে দুজন সাহিত্যিকদের সান্নিধ্য না পেয়ে আসলে বাংলাদেশ যাওয়া অসম্পূর্ণ থাকতো তার মধ্যে আপনি ও কবি নির্মলেন্দু গুন।আমার সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছিলো।আপনার সাথে দেখা করতে পেরে জীবন সার্থক মনে হয়েছে।সেদিন নানা কথা আলোচনায় আসে।ত্রিপুরার কবিদের নিয়ে কবিতা সংকলনের পরিবর্তিত সংস্করণ ছাপা হলে অসম্পূর্ণ কাজটি সম্পূর্ণ করার বিষয়েও আলোচনা হয়।ত্রিপুরায় স্রোত আয়োজিত উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় কথাসাহিত্য উৎসব:২০১৭ এ আপনি অতিথি হয়ে আসবেন কথা দিয়েছিলেন।১০-১১ জুন আপনি ত্রিপুরায় এলেনও।আমরা আপনাকে সেরকম আতিথিয়েতা করতে না পারার ব্যর্থতা সারা জীবনেও ভুলি কি করে।আপনার সহজ সুন্দর ব্যবহারে আমাদের সকল ব্যর্থতাকে ঢেকে আমাদেরে কৃতজ্ঞতা পাশে জড়িয়ে দিলেন।আপনি ও শ্রদ্ধেয় দাদা(নামটি বলবেন)খুব কষ্ট করে থাকতে হলো।তারপর আপনি ও দাদা এক প্রকার অসুস্থ হয়ে বাংলাদেশ গেলেন।দীর্ঘদিন চিকেন গুনিয়ায় ভোগলেন।নিজেকে অপরাধী লাগছিলো সে সময়।আপনি কথাসাহিত্য উৎসব নিয়ে আপনার ভালো লাগা মন্দ লাগাগুলো আমাদের শুনালে আমরা আগামী দিনে নিজেদেরে সংশোধন করতে সহযেগিতা পাবো।প্লীজ,বলুন।
উত্তর :৩
জুন মাসের ১০ তারিখ আমি আনোয়ার এবং কথাসাহিত্যিক নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর একসঙ্গে ট্রেনে করে আগরতলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করি।লেখক জাহাঙ্গীরের সঙ্গে আমার প্রথমে দেখা হয় টেকনাফে।সেই সময়ে টেকনাফে আমার,"পোকা মাকড়ের ঘরবসতি"উপন্যাসের "সিনেমা সুটিং" হচ্ছিল।চলচ্চিত্র পরিচালক আখতারুজ্জামান সরকারি অনুদানে সিনেমা বানাচ্ছিলেনন।শিল্পী ছিলেন কবিতা,আলমগীর,খালেদ খানসহ অনেকে।তাঁরা আমাকে সুটিং দেখার জন্য টেকনাফে নিয়ে গেছিলেন। লেখক জাহাঙ্গীর তখন সরকারি চাকুরি সূত্রে টেকনাফে দায়িত্ব পালন করছিলেন।তিনি ছিলেন সহকারী কমিশনার,ভূমি।সময় তখন ১৯৯৬সালের মাঝামাঝি। তিনি তখন টেকনাফের রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্প নয়াপাড়া দেখাশোনা করতেন।রোহিঙ্গাদের উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশে আসার খবর তখন ঢাকায় বসে দৈনিক পত্রিকায় পড়তাম।ইচ্ছা ছিল রোহিঙ্গাদের শরনার্থী জীবন নিয়ে একটি উপন্যাস লিখব।সিনেমার সুটিং দেখার অবসরে সময়ে রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পে দেংতে যাই।
আলাপ হয় লেখক নূরুদ্দিন জসহাঙ্গীরের সঙ্গে।রোহিঙ্গা বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে পারি।তাদের প্রতিদিনের ক্যাম্প জীবনযাপনের অনেককিছু দেখার সুযোগ হয়।একজন লেখকের দৃষ্টি দিয়ে ক্যাম্পে দিনযাপন তিনি সেভাবে দেখছিলেন তা আমার কাছে যন্যরকম দেখা মনে হয়েছিল।ট্রেনে এই বিষয়ে অনেক কথা হয়।তিনি আমাকে তাঁর উপন্যাস "উদ্বাস্তু "দেন।এটাই হলো সাহিত্য সম্মেলনের ভিন্ন মাত্রা।লেখকের সঙ্গে লেখকের আন্তরিক যোগাযোগ যেভাবে কবি গোবিন্দ ধরকেও এই সূত্রে দেখতে পাই অন্তরঙ্গ আলোকে।
আগরতলায় গিয়ে অনেক লেখকের সঙ্গে দেখা হয়।যোগাযোগ হয়।ভালোবাসার জায়গা তৈরী হয়।কলকাতা থেকে এসেছিলেন কথাসাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল কলকাতায়। কলকাতার সাহিত্য আকাদেমীর মুখ্য প্রধান থাকার সময় তাঁর আমন্ত্রণে একটি সেমিনারে গিয়েছিলাম।দিল্লির পাঞ্জাবি ভাষার কথাসাহিত্যিক অজিত কৌরের আয়েজিত সার্ক লেখক সম্মেলনে দেখা হয়েছিল রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।তিনি ঢাকাতেও এসেছিলেন। এভাবে সাহিত্য সম্মেলন পরিচয়ের সূত্রটি ধরে রাখে। সাহিত্যই মুখ্য বিষয় হয়ে জেগে থাকে হৃদয় মাঝারে। পাশে থাকেন পাঠক সমাজ।
আর একজন প্রিয় কবির সঙ্গে দেখা হয়।তিনি চন্দ্রকান্ত মুড়াসিং।ককবরক ভাষার কবি।আমি তাঁর কবিতা বাংলা অনুবাদে পড়েছি।তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই তাঁর কবিতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল।দেখা হওয়ার পরে ভাবলাম ধন্য"উত্তর পূর্ব কথাসাহিত্য উৎসব-১৭"।এভাবেই সাহিত্য সম্মেলন বা উৎসব যাই বলি না কেন সব লেখকেরই প্রাণের টান থাকে এখানে।এভাবে আগরতলা সাহিত্য উৎসব মিলন মেলা হয়ে উঠেছিল। গভীর আনন্দে ডুবে গিয়েছিলাম গভীর স্রোতে।
নির্ধারিত দিনের নির্ধারিত সময়ে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনের ২নং মিলনায়তনে উৎসবের উদ্বোধন করেন গৌতম বসু,উপাচার্য মহারাজা বীরবিক্রম বিশ্ববিদ্যালয়। সম্মানিত অতিথি ছিকেন মেঘালয়ের কবি ও সাহিত্যিক স্ট্রীমলেট ডখার।ছিলেন বাংলাদেশের লেখক নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর। ছিলপন কলকাতার কথাসাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায় এবং কবি চন্দ্রকান্ত মুড়াসিং।নেপালসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা লেখকদের এই মিলনমেলা ছিল আমাদের প্রাণের উৎসব।
উৎসবে বাংলাদেশের জনপ্রিয় আবৃত্তি শিল্পী প্রবীর পাল তিনটি সিডিতে আবৃত্তি করেছে কবি গোবিন্দ ধর ও কবি পদ্মশ্রী মজুমদারের কবিতা।এই তিনটি সিডির মোড়ক উন্মোচন করা হয়।এটিও ছিল অনুষ্ঠানের আর একটি দিক।আগের দিন কবিতা পাঠের আসর বসেছিল ভগৎ সিং যুব আবাসের অডিটোরিয়াম হলে।সেই অনুষ্ঠানে ত্রিপুরার দিলীপ দাস, কল্যাণ গুপ্ত,কৃত্তিবাস চক্রবর্তী,কাকলী গঙ্গোপাধ্যায়, পদ্মশ্রী মজুমদার,অপাংশু দেবনাথ, অভীককুমার দে,শঙ্খ সেনগুপ্ত,রতন আচার্য, রিয়া দেবী,সরু কাবিয়া,ফাল্গুনী চক্রবর্তী,স্ট্রীমলেট ডখার মৃণালকান্তি দেবনাথ,মণীষা পাল চৌধিরী থেকে শুরু করে অনেকেই ছিলেন।
সেদিনের অনুষ্ঠান পরবর্তী অধ্যায়ের শিরোনাম ছিল"কথাসাহিত্যের কথকতা ও আজকের সময়"।বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বিশিষ্ট জনেরা।শিরোনামগুলো বিস্তৃত পরিসরের ছিল।খুব ভাল লেগেছে এই আলোচনা অনুষ্ঠানটি।অনেককিছু জানার সুযোগ হয়েছে।এখানে শিরোনামগুলো উল্লেখ করছি-নেপালের কথাসাহিত্য, মেঘালয়ের কথাসাহিত্য আসামের কথাসাহিত্য, ত্রিপুরার কথাসাহিত্য, অনুগল্প পাঠ,আর ছিল আন্তর্জালে সাহিত্য। সব মিলে এই"উত্তর পূর্ব কথাসাহিত্য উৎসব-১৭"আমার জানার পরিধি বাড়িয়েছে।বন্ধনের আবেগ সঞ্চারিত করেছে। সাহিত্য মানবজীবনের পাটাতনে আলোর তৃষ্ণা দেখিয়েছে।আগরতলার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার।প্রতিবারই আন্তরিক ছোঁয়ায় স্নাত হয়ে ফিরেছি। এমন অনুভবের পাশাপাশি এবার গোবিন্দ ধর আমাকে ত্রিপুরার পাঠকের সামনে পৌঁছে দেখার জন্য আমার একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশের আগ্রহ দেখিয়েছে। এ আমার লেখকের পাঠকের কাছে যাওয়ার আনন্দ।
প্রশ্ন :৪
আপনি ত্রিপুরায় আরো এসছেন।হয়তো মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্রিপুরার অবদান অবগত তাই।এখানের বিলোনীয়ার চৌত্তাখলা,সাব্রুম,কৈলাসহর অঞ্চলে রীতিমত সেক্টর ছিলো।এসব অঞ্চলের কিছু কিছু ইতিহাস তুলে ধরছেন অশোকানন্দ রায়বর্ধন,সঞ্জীব দে,মোহিত পাল ও আমিও।আপনি আবার আসবেন যখন একটা মিট করা দরকার। এরকম ব্যবস্থাও আমরা করবো।আপনি মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ত্রিপুরার ভূমিকা নিয়ে যে উপন্যাসের স্বপ্ন দেখেন তার দলিল আপনি এখানে পাবেনই।আমি চাই আপনার সাম্প্রতিক মুক্তিযুদ্ধের উপর উপন্যাসের প্রেক্ষাপট হোক ত্রিপুরা।আপনি এই বিষয়ে আলোকপাত করুণ।

শিল্পী:আইয়ুব আল আমিন
উত্তর:৪
আমি 'শরনার্থী 'নামে একটি উপন্যাস লেখার চিন্তা করছি। আমাদের এক কোটি মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সময় নয় মাস ভারতের বিভিন্ন এলাকায় শরনার্থী শিবিরে দিন যাপন করিতেছে।যুদ্ধের পটভূমিতে তাদের জীবনযাপন নিয়ে এই উপন্যাস লেখা হবে।ত্রিপুরার প্রেক্ষাপটও উপন্যাসে আসবে।এ বিষয়ে তোমার সহযোগিতা লাগবে।তৎকালীন সময়ে ত্রিপুরায় শরনার্থী শিবিরের বিষয়ে আমায় সময় সময়ে তথ্য পাঠিয়ে সহযোগিতা লাগবে গোবিন্দ।
প্রশ্ন:৫.
স্রোত আয়োজিত উত্তর পূর্বাঞ্চলের কথাসাহিত্য উৎসব আপনার কেমন লাগলো?
উত্তর:৫
স্রোত আয়োজিত উত্তর পূর্বাঞ্চলের কথাসাহিত্য উৎসবের নির্ধারিত দিনের নির্ধারিত সময়ে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনের ২নং মিলনায়তনে উৎসবের উদ্বোধন করেন গৌতম বসু,উপাচার্য মহারাজা বীরবিক্রম বিশ্ববিদ্যালয়। সম্মানিত অতিথি ছিকেন মেঘালয়ের কবি ও সাহিত্যিক স্ট্রীমলেট ডখার।ছিলেন বাংলাদেশের লেখক নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর। ছিলপন কলকাতার কথাসাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায় এবং কবি চন্দ্রকান্ত মুড়াসিং।নেপালসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা লেখকদের এই মিলনমেলা ছিল আমাদের প্রাণের উৎসব।
উৎসবে বাংলাদেশের জনপ্রিয় আবৃত্তি শিল্পী প্রবীর পাল তিনটি সিডিতে আবৃত্তি করেছে কবি গোবিন্দ ধর ও কবি পদ্মশ্রী মজুমদারের কবিতা।এই তিনটি সিডির মোড়ক উন্মোচন করা হয়।এটিও ছিল অনুষ্ঠানের আর একটি দিক।আগের দিন কবিতা পাঠের আসর বসেছিল ভগৎ সিং যুব আবাসের অডিটোরিয়াম হলে।সেই অনুষ্ঠানে ত্রিপুরার দিলীপ দাস, কল্যাণ গুপ্ত,কৃত্তিবাস চক্রবর্তী,কাকলী গঙ্গোপাধ্যায়, পদ্মশ্রী মজুমদার,অপাংশু দেবনাথ, অভীককুমার দে,শঙ্খ সেনগুপ্ত,রতন আচার্য, রিয়া দেবী,সরু কাবিয়া,ফাল্গুনী চক্রবর্তী,স্ট্রীমলেট ডখার মৃণালকান্তি দেবনাথ,মণীষা পাল চৌধিরী থেকে শুরু করে অনেকেই ছিলেন।
সেদিনের অনুষ্ঠান পরবর্তী অধ্যায়ের শিরোনাম ছিল"কথাসাহিত্যের কথকতা ও আজকের সময়"।বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বিশিষ্ট জনেরা।শিরোনামগুলো বিস্তৃত পরিসরের ছিল।খুব ভাল লেগেছে এই আলোচনা অনুষ্ঠানটি।অনেককিছু জানার সুযোগ হয়েছে।এখানে শিরোনামগুলো উল্লেখ করছি-নেপালের কথাসাহিত্য, মেঘালয়ের কথাসাহিত্য আসামের কথাসাহিত্য, ত্রিপুরার কথাসাহিত্য, অনুগল্প পাঠ,আর ছিল আন্তর্জালে সাহিত্য। সব মিলে এই"উত্তর পূর্ব কথাসাহিত্য উৎসব-১৭"আমার জানার পরিধি বাড়িয়েছে।বন্ধনের আবেগ সঞ্চারিত করেছে। সাহিত্য মানবজীবনের পাটাতনে আলোর তৃষ্ণা দেখিয়েছে।আগরতলার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার।প্রতিবারই আন্তরিক ছোঁয়ায় স্নাত হয়ে ফিরেছি। এমন অনুভবের পাশাপাশি এবার গোবিন্দ ধর আমাকে ত্রিপুরার পাঠকের সামনে পৌঁছে দেখার জন্য আমার একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশের আগ্রহ দেখিয়েছে। এ আমার লেখকের পাঠকের কাছে যাওয়ার আনন্দ।
প্রশ্ন :৬
আমরা জানি উপমহাদেশের কথাসাহিত্যে আপনি আমাদের অহংকার। উপন্যাস গল্প প্রবন্ধ গবেষণা সম্পাদনাসহ একশতের উপর আপনার রচিত বিভিন্নরকমের বই প্রকাশিত।আমাদের সৌভাগ্য স্রোত প্রকাশনা থেকেেও আপনার নির্বাচিত পঁচিশটি শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে। আপা আপনি যদি পাঠকের জন্য আপনার গ্রন্থতালিকাটি বলেন?
উত্তর :৬
আমারও সৌভাগ্য গোবিন্দ। স্রোত প্রকাশনা খুব আন্তরিক আমন্ত্রণ জানিয়ে ঐ পাণ্ডুলিপি নিয়ে সুন্দর বাঁধাই প্রচ্ছদসহ একটি সুদৃশ্য গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন।পাঠকেরও ভালো লাগবে।
আমার ক্রমান্বয়ে গ্রন্থ তালিকা দিলাম।
উপন্যাস
উত্তর সারথি (১৯৭১)
জলোচ্ছ্বাস (১৯৭৩)১ম উপন্যাস
জ্যোস্নায় সূর্যজ্বালা'(১৯৭৩)
হাঙর নদী গ্রেনেড'(১৯৭৬)
মগ্ন চৈতন্যে শিস (১৯৭৯)
যাপিত জীবন (১৯৮১)
নীল ময়ূরের যৌবন (১৯৮২)
পদশব্দ(১৯৮২)
চাঁদবেনে(১৯৮৪)
পোকা মাকড়ের ঘরবসতি(১৯৮৬)
নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি(১৯৮৭)
ক্ষরণ(১৯৮৮)
কাঁটাতারে প্রজাপতি(১৯৮৯)
খুন ও ভালোবাসা(১৯৯০)
কালকেতু ও ফুল্লরা(১৯৯২)
ভালোবাসা প্রীতিলতা(১৯৯২)
টানাপোড়েন(১৯৯৪)
গায়ত্রী সন্ধ্যা-১ম খণ্ড(১৯৯৪)
গায়ত্রী সন্ধ্যা-২য় খণ্ড(১৯৯৫)
গায়ত্রী সন্ধ্যা-৩য় খণ্ড(১৯৯৬)
দীপাম্বিতা(১৯৯৭)
যুদ্ধ(১৯৯৮)
লারা(২০০০)
কাঠ কয়লার ছবি(২০০১)
মোহিনীর বিয়ে(২০০১)
আণবিক আঁধার(২০০৩)
ঘুমকাতুরে ঈশ্বর(২০০৪)
মর্গের নীল পাখি(২০০৫)
অপেক্ষা(২০০৭)
দিনের রশিতে গিটঠু(২০০৭)
মাটি ও শস্যের বুনন(২০০৭)
পূর্ণছবির মগ্নতা(২০০৮)
ভূমি ও কুসুম(২০১০)
যমুনা নদীর মুশায়রা(২০১১)
আগস্টের একরাত(২০১৩)[৭]
গেরিলা ও বীরাঙ্গনা (২০১৪)
দিনকালের কাঠখড়(২০১৫)
গল্প
উৎস থেকে নিরন্তর(১৯৬৯)
জলবতী মেঘের বাতাস(১৯৭৫)
খোল করতাল(১৯৮২)
পরজন্ম(১৯৮৬)
মানুষটি(১৯৯৩)
মতিজানের মেয়েরা(১৯৯৫)
অনূঢ়া পূরণিমা(২০০৮)
সখিনার চন্দ্রকলা(২০০৮)
একালের পান্তাবুড়ি(২০০২)
অবেলার দিনক্ষণ(২০০৯)
নারীর রূপকথা(২০০৯)
নুনপান্তার গড়াগড়ি(২০১৪)
মৃত্যুর নীলপদ্ম(২০১৫)
নির্বাচিত পঁচিশটি শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প(২০১৯)
কবিতা
বর্ণমালার গল্প
শিশু-কিশোর সাহিত্য
সাগর(১৯৯১)
বাংলা একাডেমী গল্পে বর্ণমালা(১৯৯৪)
কাকতাড়ুয়া(১৯৯৬)
বর্ণমালার গল্প(১৯৯৭)
আকাশ পরী(২০০১)
অন্যরকম যাওা(২০০১)
যখন বৃষ্টি নামে(২০০২)
জ্যোৎস্নার রঙে আঁকা ছবি(২০০২)
মেয়রের গাড়ি(২০০৩)
মিহিরুনের বন্ধুরা(২০০৪)
রংধনু (সম্পাদনা) (২০০৪)
এক রুপোলি নদী(২০০৫)
গল্পটা শেষ হয় না(২০০৬)
বায়ান্নো থেকে একাত্তর(২০০৬)
চাঁদের বুড়ির পান্তা ইলিশ(২০০৮)
মুক্তিযোদ্ধারা(২০০৯)
সোনারতরীর ছোটমণিরা(২০০৯)
পুটুসপুটুসের জন্মদিন(২০১০)
নীলটুনির বন্ধু(২০১০)
কুড়কুড়ির মুক্তিযুদ্ধ(২০১১)
ফুলকলি প্রধানমন্ত্রী হবে(২০১১)
হরতালের ভূতবাবা(২০১৪)
প্রবন্ধ
স্বদেশে পরবাসী(১৯৮৫)
ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন(১৯৮৫)
একাত্তরের ঢাকা(১৯৮৯)
নির্ভয় করো হে(১৯৯৮)
মুক্ত করো ভয়(২০০০)
ঘরগেরস্থির রাজনীতি(২০০৮)
নিজেরে করো জয়(২০০৮)
প্রিয় মুখের রেখা(২০১০)
শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ(২০১০)
পথ চলাতেই আনন্দ(২০১৪)
সম্পাদনা
নারীর ক্ষমতায়নঃ রাজনীতি ও আন্দোলন (যৌথ) (২০০৩)
ইবসেনের নারী(২০০৬)
ইবসেনের নাটক ও কবিতা(২০০৬)
জেন্ডার বিশ্বকোষ (যৌথ) (২০০৬)
বাংলাদেশ নারী ও সমাজ (যৌথ) (২০০৭)
জেন্ডার ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন (যৌথ) (২০০৭)
সাহিত্যে নারীর জীবন ও পরিসর (যৌথ) (২০০৭)
জেন্ডার আলোকে সংস্কৃতি (যৌথ) (২০০৭)
পুরুষতন্ত্র নারী ও শিক্ষা (যৌথ) (২০০৭)
দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদী গল্প(যৌথ) (২০০৮)
জেন্ডার ও উন্নয়ন কোষ(২০০৯)
ধান শালিকের দেশ (বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত শিশু-কিশোর পত্রিকা, ২২ বছর)
ছোটদের অভিধান (বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত) (অন্যতম সম্পাদক)
ইংরেজিতে অনূদিত উপন্যাসন
Selected Short Stories of Selina Hossain (2007). Published by Bangla Academy.
The Shark The River & The Grenade(1987) Published by Bangla Academy. Translated by Abedin Kader.
Warp and Woof (1999). 'টানাপোড়েন' উপন্যাসের অনুবাদ। Published by Bangla Academy.
Plumed Peacock (1st Published -1983. 2nd published -2009).'নীল ময়ূরের যৌবন'উপন্যাসের অনুবাদ। Translated By Kabir Chowdhury.
প্রশ্ন :৬
আপনার উপন্যাস"পোকামাকড়ের ঘরবসতি"র উৎস্বর্গ পৃষ্টার পংক্তি এরকম,"যে দুঃখী, যার দুঃখ মোচন মানুষের ব্রত"এ বিষয়ে আপনি কিছু বলুন।আপনি এই উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন 'কমর মুশতারী পুরস্কার'।তখনকার স্মৃতিগুলো আমাদের জন্য যদি বলেন?
উত্তর:৬
যে কথায় উৎসর্গটি লিখেছি তা আমার জীবনসত্য।যে কোনো মানুষই একজন মানুষের দুঃখমোচনে এগিয়ে আসতে পারে।এটা যদি তার জীবনের ব্রত হয় তবে সমাজের মূল্যবোধের জায়গা নষ্ট হবে না।মানুষ অন্যায় আচরণ করবে না।সমাজ মানবিক বোধে স্থিত থাকবে। এই বিশ্বাস থেকে এমন একটি উৎসর্গ করেছি।কারণ উপন্যাসের পটভূমি জেলেদের গ্রাম।যেখানে মানুষের জীবনধারণের লড়াই কঠিনভাবে বেঁচে থাকার পরিসর। সহযোগিতার হাত এই পরিসরকে স্বস্তির করতে পারে। এটি শুধু লেখকের ইচ্ছা নয় পাঠকও যেন সম্পৃক্ত হয় সে ইচ্ছাও এখানে প্রতিফলিত।
প্রশ্ন :৭
জলের দাসত্ব নয়,জলের অধিপতি হিসেবেই বেঁচে থাকবে মানুষ।তাদের কুশলী শ্রমে রুপোলি মাছ আটকে যাবে জলের সুতোয়,স্বপ্নের মধ্যে জলের গুটি টুং-টাং বেজে উঠবে যেন এক আলোকিতমিছিল পুরোভাগের সাহসী মানুষটির চোখে ভর করবে স্বপ্নঘেরা এক ভূখন্ডের মানচিত্র।হাঙরদের পরাভূত করে উঠে আসবে জলমগ্ল মানুষের দল।
পদ্মানদীর মাঝির মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও আপনার উপন্যাসের মুল পার্থক্যগুলো বললে পাঠক হিসেবে আমরা উপকৃত হই।
উত্তর :৭
লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মানদীর মাঝি' ক্লাসিক উপন্যাস। তিনি জেলেদের মাছ ধরার স্বযত্ন দেখার পাশাপাশি নতুন মাটির স্বপ্ন দেখান।জীবনের নতুন বিন্যাস এই উপন্যাসের দিক।জলের অধিপতি হওয়ার বাসনাই এই উপন্যাসের দড়শনগত দিক। আমার উপন্যাস আমি পুরো জেলেপল্লির জীবন সংগ্রাম দেখিয়েছি।নারীর শ্রম-প্রেম-কল্পনার জায়গাও সাজিয়েছি এখানে।শুধু হাঙর মেরে জীবিকা অর্জন নয়, হাঙর এই উপন্যাসের আর্থিক সঙ্গতির দিক হিসেবে উঠে এসেছে।
আমার আদর্শের লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে অনুপ্রাণিত করেন নিরন্ন মানুষের জীবন চিত্রায়ণে। তবে একই ধরনের পটভূমির লেখা হলেও গল্পের ভিন্নতা তো থাকতেই হবে দুজনের লেখায়।দুটি উপন্যাসের মূল পার্থক্য এই যে 'পদ্মানদীর মাঝি' উপন্যাসের নায়কের সামনে ছিল এক তোমার ভাষায় "স্বপ্নঘেরা এক ভূখণ্ডের "। অন্যদিকে আমার উপন্যাসের নায়কের আকাঙ্খা হাঙরকে করায়ত্ত করে জীবনসংগ্রামের বড় জায়গা তৈরি করা।যে জায়গাতে কেউ কখনো বলতে পারবেনা " পোকামাকড়ের ঘরবসতি'।পোকামাকড়ের অবস্থা থেকে মানুষের অবস্থায় বসতি চাই।
প্রশ্ন :৮
এই সময় সারা পৃথিবী এক অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণা শেকড়ের টান,ভূমির প্রতি মায়া সন্তানের মতো।সব নিয়ে আপনার ভাবনার জগৎ বিস্তর। আপনি উত্তর পূর্বাঞ্চল কথাসাহিত্য উৎসবে এসে রোহিঙ্গাদের উপর নেমে আসা কালো অন্ধকার নিপিড়নের যন্ত্রণা তুলেও ধরেছেন।যন্ত্রণাপিড়ীত রোহিঙ্গা জাতির কাছে স্বদেশ বলতে আজ শুধু হতাশা আর দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছুই নেই।এই অবস্থায় মায়ানমার থেকে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা এসে আশ্রয় নিচ্ছেন বাংলাদেশের মতো পিছিয়ে পড়া এক রাষ্ট্রে।নিশ্চয়ই এই আর্থিক চাপ বাংলাদেশ নয় কোন রাষ্ট্রীয় কাঠামোতেই অগ্রীম থাকে না।তথাপিও বাংলাদেশের মানুষ মানবিক ভাবে রোহিঙ্গা জাতির পাশে থেকে এই কঠিন সময়ে তাদের চোখে স্বপ্ন তুলে দেন।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ত্রিপুরায় চলে আসা শরনার্থী তথা সারা পৃথিবীর শরনার্থী, শেকড় ছেঁড়া মানুষের জীবনের গল্প নিয়ে আপনি কী ভাবছেন?
উত্তর: ৮.
আমি একবার ভেবেছিলাম রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটি উপন্যাস লিখব।বেশ তথ্যও জোগাড় করেছিলাম। ১৯৯৬ সালে টেকনাফের উখিয়ায় শরনার্থী শিবির দেখতে যাই।অনেকের সঙ্গে কথা বলি।নানা কারণে লেখা শুরু করতে পারিনি।এখন আবার এ বিষয়টি নিয়ে ভাবছি। কারণ পরিস্থিতি অনেক জটিল হয়ে গেছে।তবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে শরনার্থীদের নিয়ে লিখব।
প্রশ্ন :৯
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়।উপমহাদেশের এই দুটো স্বাধীন রাষ্ট্র জন্মের পর পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান দুটো অংশের মধ্যে মনুষ্যত্বের অবমাননা দেখা দেয়।ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তান শত্রু -সম্পত্তি বলে ঘোষণা করে।এতে মনুষ্যত্বের চূড়ান্ত অবমাননা সম্পন্ন হয়।
"সোনালি ডুমুর"এরকমই প্রেক্ষাপটে লেখা।নানা ঘটনায় তোলপাড় হয়ে যাওয়া মানুষের জীবনের ছবি সোনালি ডুমুর।
উপন্যাসটি নিয়ে আপনার সংবেদনশীল স্বত্বা কতটুকু আত্মশ্লাঘা অনুভব করে?
উত্তর :৯
১৯৪৬ সালে নোয়াখালিতে দাঙ্গা বাঁধলে মহাত্মা গান্ধী এসেছিলেন।চার মাস ছিলেন।দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকায় পায়ে হেঁটে ঘুরতেন। মানুষকে বলছেন,তোমার ধর্ম তোমার আছে। তুমি যেভাবে পালন করতে সেভাবে করো। ধর্ম কেউ কেড়ে নিতে পারে না। এই উপন্যাসের নায়িকা দুই বছরের শিশুটি বাবা মা সহ সবাইকে মেরে ফেললে ঘরে যে রক্ত জমে গিয়েছিল সেখানে ডুবে থেকে বেঁচে গিয়েছিল। আমার উপন্যাস এভাবে বয়ন করি।ঢাকা শহরে একজন ডাক্তার ছিলেন মন্মথনাথ নন্দী। তিনি বিনা টাকায় গরীব মানুষের চিকিৎসা দিতেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকারের বিরোধিতার প্রতিবাদে রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তাঁর বাড়িতে এসবের সভা, রিহার্সাল হতো।পাকিস্তান সরকার সেই বাড়িটি শত্রু সম্পত্তি আইনের অধীনে বাজেয়াপ্ত করেছিল।গরীব মানুষেরা চিৎকার করে কেঁদেছিল-ডাক্তারবাবু আপনি ফিরে আসুন।মহাত্মা গান্ধী এসে দাঁড়িয়েছিলেন দাঙ্গা -পীড়িত মানুষের সামনে। যাঁদেরকে জোর করে মুসলমান বানানো হচ্ছিল -আর একদিকে শত্রু সম্পত্তি আইন। মনুষ্যত্বের বিপরীতে এমন কিছু আর যেন সংঘটিত না হয় এমন চিন্তা কাজ করেছিল লেখার সময়।
প্রশ্ন :১০
ছিটমহল সকল দেশেরই জলন্ত সমস্যা।ছিটমহলে বসবাসকারী নাগরিকের জীবন মানের কষ্ট যন্ত্রণা একজন নাগরিকের মনে কেমন হয় তাও যদি কথাশিল্পী সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে তার চিত্ররূপ উঠে আসে?আমরা আপনার ‘ভূমি ও কুসুম’ উপন্যাসটি ছিটমহল নিয়ে লেখা জানি। বাংলা ভাষায় এটিই ছিটমহল নিয়ে এখন পর্যন্ত একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। এই উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে কি কি বিষয় আপনার সামনে এসেছে একটু বিস্তৃত বলুন?
উত্তর :১০
ছিটমহল নিয়ে একটি উপন্যাস লেখার চিন্তা করেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়।সে সময়ে রংপুরে বেড়াতে গিয়ে ছিটমহলের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ হয়েছিল। জেনেছিলাম এক দেশের মানুষ ভিন্ন জায়গায় থাকার কারণে অধিকারহীন জীবন নিয়ে বন্দিজীবন যাপন করছে।তারপর থেকে দীর্ঘ সময় গড়িয়েছে। তথ্য সংগ্রহ করেছি।অনেক পরেও ২০০৩ সালে লালমনিরহাট জেলা পেরিয়ে দহগ্রাম -আঙ্গরপোতা দেখতে গিয়েছিলাম।দেখলাম পুরো এলাকার সীমান্ত ভারতের মানুষ। বি এস এফ ঘিরে রেখেছে এলাকা।এলাকাবাসীকে যোগাযোগ করতে হয় ভারতের বাজারে। সেখানে ছিটমহলবাসীরা ধান বিক্রির টাকা নিয়ে বাড়ি আসতে পারে না।তাদেরকে অন্য জিনিসপত্র কিনে আনতে হয়।এভাবে অধিকারহীন জীবনের গল্প "ভূমি ও কুসুম "। বেশ বড় আকারে কাহিনী সাজিয়েছি।" ৪৭'থেকে "৭১' পর্যন্ত বিস্তৃত। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিটবাসীদের জন্য কোনো সীমান্ত ছিল না।তারা অনায়াসে যাতায়াত করতে পারত।কিন্তু দেশ স্বাধীন হলে আর পারেনি।প্রশ্ন উঠেছে পাসপোর্ট ভিসার।
এখানে ঘুরতে গিয়ে অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। পুরো এলাকা ঘুরেছি।নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবার চলে আসতে হয়েছে। বি এস এফ থেকে ৩ ঘন্টার অনুমতি পেয়েছিলাম। একটি পাজেরো জিপের ব্যবস্থা করেছিল পার্বতীপুরের সাংস্কৃতিক কর্মী আমজাদ হোসেন। তার এই সহযোগিতা ছাড়া দহগ্রাম -আঙ্গারপোতা যেতে পারতাম না।পরে লেখকের ইন্টারভিউ করার জন্য গিয়েছিলাম দামিয়ারছড়া ও পঞ্চগড় এলাকার বেশ কয়েকটি ছিটমহলে।দেশের নাগরিক হয়ে দেশের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কষ্ট দেখেছি তাদের মাঝে। নারীদের কেউ কেউ বি এস এফ সৈনিক দ্বারা ধষিত হয়েছেন এমন ঘটনাও জেনেছি।ছেলেমেয়েরা বলেছে আমরা ভারতী ছিটমহলের বাসিন্দা। রংপুর কলেজে পড়ি।কিন্তু এই কলেজের সাটিফিকেট নিয়ে ভারতের কোথাও চাকরি পাব না।এমন অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছিল।
প্রশ্ন:১১
মির্জা গালিব উপমহাদেশের একজন উর্দু ভাষার কবি।তিনি ভারতের দিল্লিতে বাস করতেন।তাঁর জন্ম আগ্রায়।তাঁকে নিয়ে আপনার উপন্যাস,"যমুনা নদীর মুশায়েরা"।কিছু বলুন?
উত্তর :১১
আবু সয়ীদ আইয়ুবের'গালিবের হল্প থেকে :চয়ন ও পরিচিতি 'বইটি পড়ি ১৯৮৩ সালে।বইয়ের শেষদিকে গৌরী আইয়ুব গালিবের বৈচিত্র্যময় জীবনের নানা দিক তুলে ধরেছেন।বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছিল এই জীবন উপন্যাসের উপাদান। এমন একটি ভাবনা মাথায় রেখে বিভিন্ন বই খোঁজ করে আরও নানা কিছু জানার চেষ্টা করি।তিনবার আগ্রায় যাই গালিবের জন্মস্থান দেখতে। দিল্লিতে গেলে পুরণো দিল্লির বিভিন্ন স্থান ঘুরে গালিবের বাসস্থান এবং আশেপাশের জায়গা দেখি।একসময় উপন্যাস লেখার চিন্তা করি।একজন কবি আমার উপন্যাসের নায়ক হবেন।তারসঙ্গে থাকবে এক বিশেষ সময়,যে সময় ভারত উপমহাদেশের এক কান্তিকাল।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় গালিবের বয়স ছিল প্রায় ষাট বছর। একজন অসাধারণ কবির জীব-বৈচিত্র -মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ অবস্থা এবং রাস্ট্রক্ষমতায় ইংরেজদের উত্থান ছিল ইতিহাসের এক ব্যাস্ত সময়।
একজন কবিকে নায়ক রেখে এই সময়কে ধরতে চেয়েছি এই উপন্যাসে।
প্রশ্ন :১২
প্রীতিলতাকে নিয়ে আপনার উপন্যাস নারী স্বত্বাকে দিয়েছে এক ভিন্নমাত্রা।উপন্যাসের প্রেক্ষাপট নিয়ে জানতে চাই।প্রীতিলতা সেই ইংরেজ নাইট ক্লাবে ঝাঁপিয়ে পড়া চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক বিরল সংগ্রামগাঁথা।উপমহাদেশ খন্ডিত না হলে প্রীতিলতা যে বীরাঙ্গনার মর্যাদা পেতেন তা কী প্রীতিলতা পেয়েছেন?
উত্তর:১২
প্রীতিলতা শুধু একজন নারী নয়।তিনি বিপ্লবী। স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন।চট্টগ্রামের ইয়োরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করে ঝড় তুলেছিলেন। সেই ক্লাবের গেটের সামনে লেখা ছিল 'কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ '।বিপ্লবী সূর্যসেনের নেতৃত্বে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তার অন্যতম একজন ছিলেন বীর নারী প্রীতিলতা।তাঁর সাহস এবং দেশপ্রেমের অঙ্গীকারে কোনো কাঁটা ছিল না।
যে মর্যদা প্রীতিলতার প্রাপ্য ছিল দেশবাসীর কাছে তা তিনি পেয়েছেন।এখন পর্যন্ত তাঁর আত্মাহুতির দিন গভীর মর্যাদায় উদযাপিত হয়।প্রীতিলতাকে নিয়ে আছে আমাদের স্মরণের বালুকাবেলা।
প্রশ্ন :১৩
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপনার উপন্যাস, "গায়ত্রী সন্ধ্যা"র হয়ে ওঠার গল্প বলুন।মুক্তিযুদ্ধের যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখতেন তা স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণ কতটুকু পেলেন কতটুকু পাননি বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর :১৩
"গায়ত্রী সন্ধ্যা"'৪৭'থেকে '৭৫' পর্যন্ত আর্থ-সামাজিক -রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পটভূমিতে লেখা। পুরোটা সময় ধরে বাঙালি কীভাবে প্রতিটি ঘটনায় নিজেদেরকে যুক্ত রেখে প্রতিরোধের জায়গায় আপোষহীন ছিল এই উপন্যাসে সেসব গল্পের চরিত্রের মাধ্যমে চিত্রিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর দিন মুক্তিযোদ্ধা প্রদীপ্ত মা আর স্ত্রীকে বলে আজ থেকে আমাদের ছেলে অজয়ের নাম নতুন করে রাখছি।ওর নাম হবে অজেয় মৃত্যুঞ্জয় মুজিব।
এখানেই উপন্যাসের শেষ। বলতে চেয়েছি মুজিবই সেই মানুষ যিনি মৃত্যুঞ্জয়া হাজার বছরের বাংলাদেশে তিনি প্রদীপ্ত থাকবেন প্রজন্মের কাছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের গৌরবময় অর্জন স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবয়নের দায়দায়িত্ব জনগণের। স্বপ্ন রাতারাতি পূর্ণ হয় না। সময়ের পরিধি স্বপ্নের পূর্ণতা আসবে।যা অর্জন করা হয়নি তা অর্জিত হবে আগামী দিনে।
প্রশ্ন:১৪
আপনাকে ধন্যবাদ।সময়ের ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়েও আপনার সময় থেকে একটু সময় আমায় দিলেন। যা আমার নিকট মহার্ঘ হয়ে রইলো কালখণ্ডের নিকট।
উত্তর:১৪
গোবিন্দ তোমাকে আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে হার্দিক শুভেচ্ছা। তোমার জন্য নিরন্তর শুভকামনা আমার।কাজ করছো এটা আমাদের সমবেত প্রাপ্তি।
২০১৯
0 Comments