ইতিহাসের আলোকে সিলেটি সন্তান ||চৈতন্য ফকির
ইতিহাসের আলোকে সিলেটি সন্তান
চৈতন্য ফকির
ভূমিকা :
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বাঙ্গালীদের ডি এন এ পরীক্ষা করে আমেরিকার আধুনিক একটি গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে বাঙ্গালিরা শ্রীলঙ্কার সমতল দ্বীপের "ভেদা" উপজাতির বংশধর। যারা দেখতেও হুবহু বাঙ্গালীদের মত। ভালো খাদ্য এবং বাসস্থানের খোঁজে ভেদারা বঙ্গে এসেছিল। তাছাড়া পরবর্তীতে বাঙ্গালীদের সাথে বিভিন্ন জাতির মিশ্রণ ঘটেছিল। যেমন: সাঁওতাল, মুন্ডা, কনকানি, তামিল ইত্যাদি।
পাল যুগে যখন দ্রাবিড় কালো পাল রাজারা বঙ্গে রাজত্ব করতো তখন বাঙ্গালীদের সাথে দক্ষিণ ভারতীয় দ্রাবিড়দের বিশাল বড় মিশ্রণ ঘটেছিল।
সিলটীয়া জাতির পূর্ব পুরুষ এবং বাঙ্গালী জাতির পূর্ব পুরুষ সম্পূর্ণ আলাদা জাতির মানুষ ছিলেন। সিলটীয়া জাতির সাথে বাঙ্গালী জাতির কোন সম্পর্ক নেই।
আজ পর্যন্ত কোথাও কেও কোন ইতিহাস থেকে প্রমাণ করতে পারেনি যে সিলট অঞ্চলে কখনো বাঙালিরা বসবাস করতো। সিলট অঞ্চল প্রাচীণকাল থেকে কামরূপা রাজ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। মোঘলরা কামরূপা রাজ্যের যে যে জায়গা দখল করতে পেরেছিল সেই সব জায়গায় মোঘলদের সাথে থাকা বাঙালি সৈন্যদেরকে থাকার জন্য ঘর বাড়ি বানিয়ে দিয়েছিল। যে বাঙালিরা মোগলদের কাছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল শুরুমাত্র সেই সব বাঙালিদেরকে মোঘলরা তাদের সৈন্য হিসেবে ব্যবহার করতো।
সিলেটীয়াদের আগমন :
সিলট অঞ্চলে কখনো বাঙালিরা বসবাস করতো না। সিলটীয়ারা হলেন সিলট অঞ্চলের আদিবাসী জাতি। এমনকি ময়মনসিংহ, গাজীপুর, টাঙ্গাইলের আদিবাসী জাতি হলো গারো।
ব্রিটিশদের হাত ধরে সর্ব প্রথম বাঙালিরা সিলট, আসাম, চট্টগ্রাম, ভূটান এবং ত্রিপুরার চা বাগানে কাজ করার জন্য স্থায়ী ভাবে বসবাস করার সুযোগ পায়।
সিলট অঞ্চলে আসা কায়স্তরা মিথিলা অঞ্চল থেকে এসেছিলেন। যাদের শরীরে বাঙালিদের রক্তের কোন ছিটেফোঁটাও ছিল না। মিথিলা অঞ্চলে কখনো বাঙালিরা বসবাস করতো না।
কুমিল্লার প্রাচীণ নাম হলো ত্রিপুরা। মোঘলরা ত্রিপুরা রাজ্যের যে সকল জায়গা দখল করেছিল সেই সকল জায়গার নাম পরিবর্তন করে সেসব জায়গায় বাঙালি মুসলিম সৈন্যদেরকে বসবাস করার জন্য বাসস্থান তৈরী করে দিয়েছিল। এতেই তো বুঝা যায় নোয়াখালী, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, ময়মনসিংহতে কিভাবে বাঙালিদের বসবাস শুরু হয়েছিল।
১)না সিলট অঞ্চলে ব্রিটিশদের আগমনের পূর্বে কোন বাঙালিরা বসবাস করতেন না।
২)সিলট-বরাকের কোন বারুজীবী বাঙালি জাতির লোক নন। ব্রিটিশরা মাদ্রাজ, বিহার, উরিশা থেকে কনকানী, মুন্ডা, সাঁওতাল বারুজীবীদেরকে সিলট-বরাক অঞ্চলে নিয়ে এসেছিল।
৩)বাঙালিরা সিলট-বরাকে ব্রিটিশদের দ্বারা চা বাগান এবং পাথর, কয়লা উত্তোলনের সময় কাজের জন্য প্রবেশ করে স্থায়ী ভাবে বসবাস করা শুরু করেছিলেন। এখনো বাঙালিদের সাথে সিলটীয়াদের বিয়ে হয় না। সিলট অঞ্চলে আবাদি বেংগলি বলা হয়। যার অর্থ হলো অবৈধ বাঙ্গালী শরনার্থী।
বাঙালিদের পূর্বপুরুষদের দুই ভাগে ভাগ করা হয় ৷ নেগ্রিটো,অস্ট্রিক,দ্রাবিড়,মঙ্গোলয়েড ৷ এরা হলো অনার্য বা প্রাক আর্য বা আর্যপূর্ব জাতি ৷ এর পর আগমণ আর্যদের ৷ এখন বাংলাদেশে এই আর্যপূর্ব জাতিরাই উপজাতি।
যে ব্রাহ্মণরা বিভিন্ন রাজ্যের হিসাব নিকাশ করতো তাদেরকে কায়স্ত ব্রাহ্মণ বলা হতো। বাঙালি ব্রাহ্মণদের মধ্যেও কায়স্ত ছিল কিন্তু তারা বঙ্গের হিসাব নিকাশ করতো। বাঙালি কায়স্তরা কখনো সিলট রাজ্যে আসেনি। সিলট রাজ্যে এসেছিলেন মিথিলা অঞ্চলের মৈথিলী কায়স্ত ব্রাহ্মণ। যাদেরকে সিলটীয়া রাজারা সিলট রাজ্যের হিসাব নিকাশের জন্য নিমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছিলেন। রাজা গৌড় গোবিন্দের শাসনের আগে সিলট রাজ্যের সব সিলটীয়ারা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন কারণ তখনো কামরূপা রাজ্যে হিন্দু ধর্ম এসে পৌঁছায়নি।
এখানে হোজাই জেলা ছাড়া বাকি সব প্রাচীণ সিলট রাজ্যের অংশ ছিল। ভাটেরা তাম্রলিপিতে লিখা আছে খাসিয়া এবং জৈন্তা পাহাড় থেকে শুরু করে ত্রিপুরার পর্বতমালা পর্যন্ত সিলট রাজ্যের সীমানা ছিল। খাসিয়া পাহাড়কে সিলটীয়া ভাষায় "লাউর" পাহাড় বলা হয় কারণ সিলটীয়া রাজার লাউর রাজ্য খাসিয়া এবং গারো পাহাড়ের মধ্য ভাগে উপরে অবস্থিত ছিল।
সিলট, রংপুর এবং চট্টগ্রাম বিভাগ প্রাচীণ কাল থেকে কখনো বঙ্গের অংশ ছিল না। এগুলো ৩ আলাদা স্বাধীন রাজ্য ছিল। সিলটীয়া, বাঙ্গালি, রংপুরীয়া এবং চাটগাঁইয়া হলো ৪ টি আলাদা জাতি। তাদের মাতৃভাষা ও পুরোপুরি আলাদা।
সিলটীয়ারা প্রাচীণ কাল থেকে অসমীয়াদের সাথে বসবাস করে আসছে। আজ পর্যন্ত সিলটীয়া জাতির সাথে অসমীয়া জাতির কোন লড়াই হয়নি। মোগলরা যখন পুরো বঙ্গ শাসন করতো। তখন আসাম এবং সিলট রাজ্য ছিল পুরো ভারত উপমহাদেশের মধ্যে দুটি স্বাধীন রাজ্য। মোগলরা আসাম এবং সিলট রাজ্যের উপর (১৭ বার) আক্রমণ করেও পরাজিত হয়েছিল। বঙ্গের রাজভাষা যখন ছিল আরবি এবং ফার্সি তখন স্বাধীন সিলট রাজ্যের রাজভাষা ছিল সিলটীয়া। সেই সময় সিলটীয়ারা দিব্বি সিলটীয়া ভাষা চর্চা করে যাচ্ছিল। এতেই প্রমাণ হয় সিলটীয়া এবং অসমীয়া রাজারা কতটা সাম্প্রদায়িক ছিলেন। তাদের মধ্যে আপন ভাইয়ের মতো মিল ছিল।
সিলেটীয়া জাতি:
সিলটীয়ারা মঙ্গোলয়েড জাতি ধারার মানুষ। মঙ্গোলয়েড জাতির সাথে অস্ট্রোএসিয়াটিক জাতির মিশ্রণের ফলে আধুনিক সিলটীয়া জাতির জন্ম হয়েছিল। তাছাড়াও পরবর্তীতে আরব, তুর্কিস, চীনা, ইরানি, পর্তুগিজদের মতো বিভিন্ন জাতির মানুষের সাথে সিলটীয়াদের মিশ্রণ ঘটে আজ সিলটীয়ারা এক বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্য এবং চেহারা পেয়েছে।
চীনা পরিব্রাজক জুয়াংজাং:
চীনা পরিব্রাজক জুয়াংজাং সিলট রাজ্যে ভ্রমণ করতে এসে তার গ্রন্থে লিখেছিলেন এই উত্তর পূর্ব (কামরূপা) অঞ্চলের সবাই বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। তখনও এই কামরূপা অঞ্চলে আর্য ব্রাহ্মণদের দ্বারা সনাতনী ধর্মের আগমন ঘটেনি। তিনি আরো লিখেছেন সিলটের জৈন্তা রাজ্যের [রাজা গুহাক] তখন শুধুমাত্র রাজসিংহাসন আরোহন করে কামরূপা রাজ্যের এক রাজকন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। রাজা গুহাকের সনাতনী ধর্মের প্রতি অনেক আকর্ষণ ছিল।
তখনকার সব চাটগাঁইয়া এবং সিলটীয়াদের চেহারাও গারো, মারমা, খাসিয়াদের মতো ছিল কারণ তখনো তাদের ব্রাহ্মণদের সাথে মিশ্রণ ঘটে সংকর জাত তৈরী হয়নি। রাজা গুহাকের বিবরণ শুনলেই বুঝা যায় সিলট, আসাম, মিজোরাম, চট্টগ্রাম, আরাকানের সব মানুষ তখন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিল। তখন চট্টগ্রাম থেকে আরাকান রাজ্য পর্যন্ত কামরূপা দেশ বিসৃত ছিল। বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করার তারও আগে উত্তর পূর্ব ভারতীয় সবাই পাহাড়, পর্বতের পূঁজো করতো।
সিলেটীয় গৌরবগাঁথা:
সিলেটীয়াদের সর্বকালেই ভয় পেতেন বিভিন্ন অঞ্চলের রাজা মহারাজা এবং সাধারণ লোকজন।সেই ভয় থেকেই বিচ্ছিন্ন করার মানসিকতা। সে মোগল আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত একই ধারা সমান্তরাল। কারণ একটাই সিলেটীরা শিল্প সাহিত্যে এমন কী রাজ্য শাসন কিংবা গনতান্ত্রিক সরকারের শাসন ব্যবস্থায়ও একজন সিলেটি সন্তান যা ভাবেন অন্যরা তা বহু পর বুঝেন।যে জন্য এতো হিংস্র হয়ে ওঠেন অনেকেই। এমন কি সিলেটের সন্তানদের মধ্যে যারা অগ্রসরমান চিন্তায় চেতনায় তাদের কার্যক্রমকে পরবর্তী সময় গ্রহণ করতে হয় অনেকেরই। কিন্তু সিলেটের অগ্রসরমান চিন্তায় যুক্ত সন্তানকে সিলেটের সন্তানরাও ভয় পেয়ে দূরে থাকেন।কার্যক্রমে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে মূল স্রোত থেকে তাদের সরিয়ে দিতে অপচেষ্টা করা হচ্ছে। আগেও হতো।মোগল ইংরেজ আমল এমন কী দেশিয় রাজা থেকে বর্তমান রাজনীতিও সিলেটিদের দমিয়ে রাখার কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন অনেকেই। কিন্তু সিলেটের অগ্রসরমান চিন্তা পৃথিবীতে সুখ শান্তি সাহিত্য সংস্কৃতির পরিপূরক। আপাত দৃষ্টিতে তাদেরকে চক্রান্ত করে পরাস্ত করতে চাইলেও পরবর্তী সময় কালখন্ডে বিনয় বাদল দিনেশই প্রকৃতপক্ষে স্বরাজ চেয়েছিলেন ইংরেজদের নিকট থেকে। সিলেট অঞ্চলের আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন যেখানে বৃহত্তর স্বার্থ পরিপন্থী কোনো কাজ চোখে পড়বে সেখানে সর্ব প্রথম সিলেটি সন্তান ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্ম উৎসর্গ করেছেন।ভারতবর্ষের স্বরাজ কায়েমে স্বরাজ আমাদের জন্মগত অধিকার প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন সিলেটের সন্তান।যখন যেখানে কোন আন্দোলন হয়েছে দেখেন সে সিলেটের সন্তানদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে। শ্রীচৈতন্যের ধর্মীয় আন্দোলন থেকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন সব জায়গায় সিলেটিরা অবদান রেখেছেন।
পূর্বে সিলেটে আজ যা ভাবা হতো পরবর্তী সময় সারা ভারত তা ভাবতেন।
সিলেটিদের মানচিত্র টুকরো টুকরো করে উপহাসের সম্মুখীন করছেন যারা তাদের নিকট গৌরব গাঁথার কোনো রকম ইতিহাস নেই।তবুও অন্যের গৌরবে শ্রীহট্টীয় সন্তান গৌরবান্বিত মনে করেন।আর সিলেটের সন্তানেরা সব সময় অন্য অঞ্চলের লোকজনকেও সম্মানিত করতে ভালোবাসেন।অন্য অঞ্চলের মানুষজন সে ইতিহাস না জেনেই ধেড়ে গলায় সুর চড়িয়ে বিচিত্রভঙ্গিতে কাশছেন।
আজকের বাংলা সাহিত্যও শ্রীহট্টীয় নাগরী লিপি পরবর্তী সময় নাগরী লিপি থেকে ক্রমবিকাশ। অর্থাৎ শ্রীহট্টীয় নাগরী লিপি বাংলা হরফেরও আগে থেকে সিলেট অঞ্চলে তাদের ভাষায় চর্চা করতেন।শ্রীলেট বা সিলেটকে টুকরো টুকরো করে পরবর্তী সময় সিলেটের নাগরী লিপি ও প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন করে সিলেটের নাগরী ভাষাকে আটকে দেওয়া হয়। একটাই কারণ সময়ে সময়ে যখন যেখানে যারা নেতৃত্ব দিতে সক্ষম তাদেরকে রুখে দিতে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করা হতো পূর্বেও।বর্তমানেও তা করা হয়।শুধু ষড়যন্ত্রকারীদের আচরণে এতো মধু মিশ্রিত উচ্চারণ থাকে।
উপসংহার :
ষড়যন্ত্রকারীদের সহযোগী সদস্য হোন তাদের মাথায় এতো দূর অভিসন্ধি না থাকায় ষড়যন্ত্রকারীদের ভাষাকোড বুঝতে পারেন না।এ জন্য ষড়যন্ত্রকারী যুগে যুগে নিজেদের স্বার্থের আসল রূপ লুকিয়ে ধুমপান করতেই পছন্দ করেন।
কিন্তু ইতিহাসের কালচক্র বড় সচেতন।সেই কালচক্র একদিন সত্যি সত্যি উদঘাটিত হয়।তখন যদিও বড্ড দেরি হয় তবুও ইতিহাস তো ইতিহাসই।তাকে অস্বীকার করার শক্তি কালচক্রেরও নেই।
১৯:১০:২০২৩
0 Comments