কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর || সুমিতা দেব
কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর || সুমিতা দেব
বাবাকে সহযোগিতা করতে কায়িকশ্রমের দায়ভারও নিজ কাঁধে তুলে নিতে কার্পন্য ছিলো না তাঁর।সংবাদপত্রের হকার থেকে অবৈতনিক সাংবাদিকতা, হাটবারে গ্রামের বাজারে বাবার দেওয়া বাজার খরচা থেকে প্রথমে আনাজপাতি ক্রয় করে পুনরায় বিক্রি করে সামান্য লাভ পেতেন। তা জমিয়েও তিনি তাঁর বাবাকে আর্থিক সহযোগিতা করতেন। ছোটবেলা থেকে কঠোর পরিশ্রমের জীবন ছিলো তাঁর।বাবার সাথে সেই দ্বিতীয় শ্রেণির বালক বয়সে তিনি আমতলী বাজারে যেতেন।একথাগুলো তাঁর আত্মক্ষর নামক অপ্রকাশিত আত্মজীবনীতে লেখা আছে।
‘‘... আলোয় আলোকময় করে হে
এলে আলোয় আলো
আমার নয়ণ হতে আঁধার
মিলালো মিলালো৷
সকল আকাশ সকল ধরা
আনন্দে হাসিতে ভরা,
যেদিক পানে নয়ণ মেলি
ভালো সবই ভালো...’’
যাকে নিয়ে এই লেখা তাঁর চোখেও আমি সবসময় সবকিছু ভালো সবই ভালোই দেখেছি৷ তিনি হলেন কবি গোবিন্দ ধর৷ যেকোন মানুষের সৃজনশীলতা ও রুচিবোধের উপর সংস্কৃতির বিকাশ সম্ভব হয়৷ মূলত কর্মসূত্রে এবং পারিবারিক সূত্রে আমার সাথে পরিচয়৷ সেই সুবাদে তাঁকে খুুব কাছ থেকে দেখার এবং জানার সুযোগ আমার হয়েছে৷ নিতান্তই একজন সাদামাটা, সহজ জীবনযাপনে অভ্যস্ত কিন্তু প্রচন্ড তীব্র সাহিত্য ক্ষুধায় যাপন করেন তিনি৷ একজন কবি হয়েও শুধুমাত্র কবিতাকেন্দ্রিক না থেকে, প্রকাশনা, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিষয়ক কাজকর্ম নিয়ে নিত্যনতুন ও ব্যতিক্রমী চিন্তা ভাবনা নিয়েই সবসময় ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসেন তিনি৷ যেমন পরিপাটি তিনি নিজে থাকেন তেমনি তাঁর প্রতিটা কাজ, তা প্রকাশনা ক্ষেত্রে হোক, কবিতা, সাহিত্য সৃষ্টি হোক বা সামাজিক অনুষ্ঠানমূলক কাজই হোক৷ প্রত্যেক ক্ষেত্রে নিখুঁত নজরদারি থাকে৷ এতটুকু খামতি লক্ষ্য করা যায় না৷
প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও নানা কর্মব্যস্ততার মধ্যেও তিনি যেভাবে সাহিত্যের নানা রূপ, রস পাঠকের সামনে তুলে ধরেন, তেমনি তাঁর উদ্দীপ্ত সংগ্রহশালাকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন এবং করছেন তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য৷ যে কোনও কাজকে সুনিপুণ দক্ষতা, নিষ্ঠা এবং সততার সাথে পালন করেন এটা আমাদের সবার শেখার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি৷ যাঁরা তাঁর সাথে নানাভাবে যুক্ত তাঁরা সবাই তা স্বীকার করবেন৷ তাঁর কাজ সম্পর্কে কোন কিছু বলার ধৃষ্টতা আমার নেই৷ তবে প্রতিটা প্রচ্ছদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে এরকম সৃষ্টিশীল ভাবনা খুব কম দেখা যায়৷ শুধুমাত্র নিজের রচনা বা বই প্রকাশ নয়, নতুন প্রজন্মের কবি, লেখকদের সর্বতোভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে তিনি সর্বদা হাসিমুখে প্রস্তুত৷ এখন যাঁরা সুপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্য জগতে তাঁদের অনেকের মুখেই শোনা কথা এটা৷ তাই তিনি সবার কাছে অতি প্রিয় একজন মানুষ৷
স্রোত সাহিত্য পত্রিকা ও প্রকাশনার স্রষ্টা তিনি৷ তাঁর স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ হল স্রোত প্রকাশনা৷ যেরকম প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে আজ স্রোত প্রকাশনা সারা ভারতবর্ষের সুখ্যাতি অর্জন করেছে এটা একবাক্যে সবাই স্বীকার করবেন৷ তাঁর প্রতিটা সৃষ্টি, প্রতিটা লেখা অনেক কিছু নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে মানুষকে৷ চোখে আঙুল দিয়ে সমাজের নানা দিক তুলে ধরার চেষ্টা করতে প্রচন্ড মনের জোর ও ইতিবাচক ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন হয়৷ যেটা গোবিন্দ ধরের মধ্যে প্রত্যক্ষ করা যায়৷ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন শিক্ষক, তেমনি প্রকাশনার ক্ষেত্রেও শিক্ষকের ভূমিকা তিনি পালন করে থাকেন খুঁটিনাটি বিষয় হাতে-কলমে শিখিয়ে দিয়ে৷ শেখার, জানার আগ্রহ আমি লক্ষ্য করেছি তাঁর মধ্যে৷ তা হাতে লেখা হোক কিংবা সামাজিক মাধ্যমে কোন লেখাই হোক৷ সবক্ষেত্রেই সাবলীল তিনি৷ লেখালেখি বিষয়কে যারা ভালোবাসেন তাদের কাজের উৎসাহদাতা হিসেবেও তিনি সুপরিচিত৷ একজন দক্ষ এবং ব্যতিক্রমী সংগঠকের ভূমিকায় তাঁকে আমরা পাই লিটল ম্যাগাজিন বা বই প্রকাশমূলক অনুষ্ঠানে৷ ছোট-বড় প্রতিটা সূক্ষ্ম কাজে তাঁর সহযোগিতার হাত তিনি বাড়িয়ে দেন৷ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড, সমাজসেবামূলক কাজকর্মে তিনি নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন কিছু প্রকাশ্যে, কিছু নামের আড়ালে৷ স্রোত প্রকাশনায় আমরা অনেক গুণী কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, লেখকদের লেখায় সমৃদ্ধ বই পেয়েছি, তা শুধুমাত্র সম্ভব হয়েছে স্রোত স্রষ্টার সৃষ্টিকর্মের কারণে৷
আজ গোবিন্দ ধরের পঞ্চান্ন বছর।জন্মদিবস উদযাপনে আমরা সবাই সামিল হওয়ার সুযোগ পেয়েছি এটা আমাদের প্রত্যেকের কাছে অনেক বড় একটা প্রাপ্তি৷ আমরা সবাই তাঁর স্রোতের ভেলায় চড়ে তাঁর নিত্যনতুন কবিতা, সাহিত্য জীবনের আরো নানা দিক পড়ার, জানার অধীর আগ্রহে থাকব৷
কবির ভাষায়---
‘‘বই-ই মুক্তি আনে বন্ধু ও বন্ধু শোনো
যখন সব বন্ধু এক এক করে কেটে পড়ে
একটি বই-ই হাজার বন্ধু তখন৷
বইয়ের বিকল্প বই বই আর বই,
এসো বই ধরি এসো বই পড়ি
ঘরে ঘরে করি বিলি বই৷
বই আনে মুক্তি মুক্তি মুক্তি
যত অন্ধকারেই থাকি বা রই...৷’’
তাঁর ছোটবেলা আসলে দিনমজুরের কঠিন জীবনযাপন যেমন করতে হয়েছে তেমনি সাহিত্যযাত্রায়ও তাঁকে আমরা পেয়েছি কঠিন পথ অতিক্রমের মজুর হিসেবে। যা তাঁকে গড়েপিঠে তুলেছে বলেই আমার মনে হয়েছে।
0 Comments