গোবিন্দ ধরের কবিতা—- “মৌলভীবাজার”- আত্মবীক্ষণে দেখা এক ঝলক|| হারাধন বৈরাগী
গোবিন্দ ধরের কবিতা—-
“মৌলভীবাজার”- আত্মবীক্ষণে দেখা এক ঝলক|| হারাধন বৈরাগী
বাবার বাবা তাঁর বাবার হাত ধরে শ্রীমঙ্গল রোড়ে হাঁটতে হাঁটতে সারা শহর দেখতেন বৃটিশ পিরিউড।
তখনও নেতাজী রেঙ্গুন যাননি।
গান্ধীজীর টুপিও তখন জনপ্রিয় নয়।
বঙ্গবন্ধুর জয় বাংলা তেমন টেউ হয়ে আসেনি মনুর মুখ অব্দি।
তখনও শ্রীলেট সিলেট হয়নি কিংবা নাগরীলিপিও ধ্বংস হয়নি।
সুতরাং বাবাও জানতেন না ধীরেন দত্ত সংসদে দাঁড়িয়ে বাংলাভাষার জন্য আইন পাশ করাতে হবে।
চা গাছের দুপাতায় লেগে থাকা সোনার বাংলা
ধানের সবুজ পাতায় সোনার বাংলা
জলের স্রোতে মাছের সাঁতার সোনার বাংলা।
এমন কী ঘটলো
আমার বাবা তাঁর বাবার হাত ধরে সোনার বাংলা ফেলে
চাতলাপুর বর্ডার ক্রস করে হাঁটতে হাঁটতে
ছিঁড়া মানচিত্র বুকে জড়িয়ে চলে গেলেন রাতাছড়ায়?
পায়ের ছাপ আর ধুলো ঘাম বিন্দু বিন্দু গায়ে শুকালে
সারাদিন আনন্দাশ্রু টুপটাপ পড়বেই তো
প্রিয়ভূমি শ্রীভূমি সিলেটও দুজেলায় ভাগ হয়ে
মৌলভীবাজার শ্রীমঙ্গল।পুরো শহর শ্রীমঙ্গল মনে হলেও
বাবার ঘাম
তাঁর বাবার ঘাম
তাঁর বাবার বাবার ঘাম
আমার ঘাম হয়ে ঝরলো এই একই পথের ধুলোয়।
ঘাম আর ধুলো মেখে শীতলপাটির মতো শুয়ে থাকবো
সদর হাসপাতালের পেছনের দুতলায় একরাত।
ত্রিপুরায় বাংলা কবিতার অনন্য এক স্বর কবি গোবিন্দ ধর।তার কবিতা খুব সহজ সরল জুমিয়ার মতো।জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কবিতা করে তুলতে পারেন যে সকল কবি,তাদের অবশ্যই অন্যতম কবি গোবিন্দ ধর,তাই তো তিনি বলতে পারেন,জীবন তৃপ্তি হোটেল নয়।
তার কবিতায় প্রকৃতি, নদী, মাঠ, গাছ, লতাপাতা পাখি—এইসব গ্রাম্য উপাদান গভীরভাবে উপস্থিত।গাঁয়ের মাটি মানুষ ও প্রকৃতির আনন্দ সৌন্দর্য ও বেদনার এক আন্তরিক দ্রোহের চিত্র নির্মাণ করেন তিনি।তার কবিতার মানবিক ও সমাজচেতনার মুখ অসম্ভব রকম উজ্জ্বল। সাধারণ মানুষ তাঁর কবিতার নায়ক নায়িকা। তাদের সুখ দূঃখ ও বেদনার ধারাপাত তার কবিতা। তিনি কবি নন।শব্দ শ্রমিক।এই আত্ম কথাই তার কবিতার প্রাণ।সমাজের নিপিড়িত মানুষই তার ভালোবাসা।
তার কবিতা ভেজা নয়,প্রেম ও অনুভূতির সূক্ষ্মতা অসম্ভব রকম লক্ষণীয়।প্রেম তাঁর কবিতায় কখনো ব্যক্তিগত, কখনো প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম। অনুভূতির সূক্ষ্মতা ও আবেগের স্বচ্ছতা তাঁর কবিতার এক বড় গুণ।তার কবিতায় আধ্যাত্মিকতার অনন্ত যাত্রাও লক্ষ্যনীয়।
গোবিন্দ ধরের কবিতা যেন এক জুমিয়ার জুমের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া—যেখানে বাতাসে ভেসে আসে মানুষের কান্না, পাখির গান, আর মাটির গন্ধ। তাঁর কবিতামুখ সাধারণত মানবিক আধ্যাত্মিক ও সামাজিক টানাপোড়েনের মেলবন্ধন যেন।
কবির “মৌলভীবাজার”কবিতাটি পাঠ করে মনে হল কবি যেন আমাকে শেকলে বেঁধে টেনে টেনে মনুমুখের রাতাছড়া থেকে মৌলভীবাজারের মিয়াপাড়া অবধি ঘুরিয়ে নিয়ে এসেছেন। শুধু তাই নয়,পরাধীন ভারতের গর্ভে তার পূর্বপুরুষদের ভিটে মাটি ও পুকুরের জলে চুবিয়ে দিয়েছেন, যেখানে লেগে ধানগাছ, লতাপাতা মাটি জল চাপাতা মানুষ সবকিছুই যেন খাদহীন সোনা দিয়ে লেপা।নদী পথে পলিজল সোনা হয়ে বয়ে যায়।তারপর এমন সোনাঝড়া স্বপ্নের ভেতর দিয়ে সহসা দেখি তার পিতার সাথে আমিও যেন অতর্কিত কোনো ইন্দ্রজালে জড়িয়ে রাতাছড়ায় ধুলোমাটিঘাম লেপা।যেন মৌলভীবাজারের কোনো সন্দেহের বোমা ফাটলো,আর টুকরো টুকরা হয়ে গেল কবির পূর্বজদের শেকড়,সাথে কবিও হলেন শেকড় ছেড়া।আর কবির সাথে ভেমতালা লাগলো আমারও, আর দেখলাম সাদা চিত্রছায়ার মতো,কবিকে তার পিতাকে,তার পিতাকে বা তার পুরুষের উপর পূরুষের শরীরের ধূলো ঘাম ঝড়ে পড়ছে মাটিতে,আর আমিও ভিজছি।তারপর আর তার জন্মভিটার হৃদয়ের কাছে থাকা হাসপাতালের পেছনের দোতলায় শুয়ে আছি চিরনিদ্রায় ।
কবিতাটি এক বংশছোঁয়া স্মৃতিচারণ ও ইতিহাসচেতনার পলিমাখা গঙ্গা জল ,ব্যক্তিগত ও জাতিগত বেদনার অনুপম সংমিশ্রণ,সময় ও মানচিত্র আঁকা,আত্মার ভাঙনকে নির্মাণ ও বিনির্মাণ করে লেখা এক বেদনার ধারাপাত যেন। । দেখি তার কবিতার লাইন,
"বাবার বাবা তাঁর বাবার হাত ধরে শ্রীমঙ্গল রোড়ে হাঁটতে হাঁটতে সারা শহর দেখতেন বৃটিশ পিরিউড।"
এটী একটি প্রজন্মান্তর বিছিয়েদেওয়া শেকড়ের দৃশ্যপট। ‘বৃটিশ পিরিউড’ শব্দটি পাঠককে ঠেলে নিয়ে যায় ইতিহাসের সেই পরাধীনতার শৃঙ্খলের ভিতরের সময়ে,যখন শ্রীমঙ্গল রোড হয়ে হাঁটার মধ্যে রয়েছে পূর্বপুরুষদের স্থানিক স্মৃতির পুনরাবৃত্তি।আর"তখনও নেতাজী রেঙ্গুন যাননি। / গান্ধীজীর টুপিও তখন জনপ্রিয় নয়।" এটি পাঠককে নিয়ে যায়,সময়চিহ্নিত ইতিহাসের ভাঙনের ঘোরলাগা মুহূর্তে।কবি আঙ্গুল দিয়ে দেখান, তখনকার এক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়মুখ।তখনও "বঙ্গবন্ধুর জয় বাংলা তেমন টেউ হয়ে আসেনি মনুর মুখ অব্দি।" ‘টেউ হয়ে আসা’—একটি চমকে দেওয়া রূপক।যেন মনু নদী ও মুখের সংযোগে রয়েছে ইতিহাস ভূগোল ও অনুভবের এক অনুপম মিলন।
"তখনও শ্রীলেট সিলেট হয়নি কিংবা নাগরীলিপিও ধ্বংস হয়নি।"
‘শ্রীলেট’ শব্দটি অবশ্যই সিলেট নামের আদিরূপ।শ্রীলেট থেকে পরে হয়েছে সিলেট,মনে হয় এরকমই।
“নাগরীলিপির ধ্বংস’—সিলেটী ভাষার নিজস্ব ও ব্যাতিক্রমী এই লিপির কথা বলা হয়েছে।হয়তো এ লিপি পড়ে বিলুপ্তির পথে গেছে।সিলেটী মানুষের নিজস্ব ভাষালিপির বিলুপ্তির বেদনার দিকে কবি ইঙ্গিত করেন।পাঠককে টেনে নিয়ে যান,সময়ের চুম্বকে।"সুতরাং বাবাও জানতেন না ধীরেন দত্ত সংসদে দাঁড়িয়ে বাংলাভাষার জন্য আইন পাশ করাতে হবে।"বর্তমান পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলনের পূর্বকালকে কবি ইঙ্গিত করেছেন।আর ধীরেন দত্ত অবশ্যই ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা।কবি এখানে ইঙ্গিত করেন ভাষার রাজনৈতিক সংগ্রামের কথা।
"চা গাছের দুপাতায় লেগে থাকা সোনার বাংলা / ধানের সবুজ পাতায় সোনার বাংলা / জলের স্রোতে মাছের সাঁতার সোনার বাংলা।"
- এই চিত্রকল্পে কবি ‘সোনার বাংলা’র বাংলার প্রকৃতির সুজলাসুফলা রূপের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
"এমন কী ঘটলো / আমার বাবা তাঁর বাবার হাত ধরে সোনার বাংলা ফেলে / চাতলাপুর বর্ডার ক্রস করে হাঁটতে হাঁটতে / ছিঁড়া মানচিত্র বুকে জড়িয়ে চলে গেলেন রাতাছড়ায়?" এখানে প্রশ্ন, কবিতার আবেগকে অসম্ভব তীরের তীব্র ফলায় যেন করাঘাত করে।‘ছিঁড়া মানচিত্র’—ভূখণ্ড বিভাজনের প্রতীক।
‘রাতাছড়া’—নতুন বাস্তবতার রূঢ় প্রতীক,স্মৃতিভারাক্লান্ত এক রূপ। যেখানে
"পায়ের ছাপ আর ধুলো ঘাম বিন্দু বিন্দু গায়ে শুকালে / সারাদিন আনন্দাশ্রু টুপটাপ পড়বেই তো"।এই থেকে ঘাম ও ধুলো—শ্রম ও যন্ত্রণা এবং এরপরও আশাবাদের ক্ষীণ আলো যেন,কবির কলম পাঠকের আতে গিয়ে মোচড় দেয় ‘ —সারাদিন আনন্দাশ্রু’!!!
"প্রিয়ভূমি শ্রীভূমি সিলেটও দুজেলায় ভাগ হয়ে / মৌলভীবাজার শ্রীমঙ্গল।পুরো শহর শ্রীমঙ্গল মনে হলেও" ভূখণ্ড বিভাজনের বেদনা প্রকট হয়ে ওঠে।
- ‘পুরো শহর শ্রীমঙ্গল মনে হলেও’—স্মৃতির আকসিতে ধরা পড়ে ভেতরে জেগে ওঠে এক অন্তঃলীন বেদনা।তারপর "বাবার ঘাম / তাঁর বাবার ঘাম / তাঁর বাবার বাবার ঘাম / আমার ঘাম হয়ে ঝরলো এই একই পথের ধুলোয়।"
যেন প্রজন্মান্তরের শ্রম,ধুলো ও স্মৃতির বেদনা পাঠককে নিয়ে যায় একই সিঁড়ির ধারায়, ‘একই পথের ধুলোয়’—অতীতকে টেনে টেনে নামিয়ে আনে বর্তমানের ছায়ায়!আর দেখা যায় কবির শেকড়ছোঁয়ার বেদনা যেন আশা রাখে জীবনের অন্তিম বিছানায়,শেকড়ের মাটিতে শুয়ে চোখ লুকাতে আরেক জীবনের সুরালোকে।তাই কবি বলেন "ঘাম আর ধুলো মেখে শীতলপাটির মতো শুয়ে থাকবো / সদর হাসপাতালের পেছনের দুতলায় একরাত।" আর পাঠক কবির মৃত্যু চেতনার অভিমুখ অনুভব করে ত্বরিতাহত হয়।
পাঠকের হৃদয় হাহাকার করে।
কবিতাটি সহজ-সরল, সংবেদনশীল গোবিন্দগঞ্জের চেতনায় মুক্তছন্দে লেখা।
এটি এক প্রজন্মান্তরের স্মৃতি-অন্বেষণ—পিতামহের শ্রীমঙ্গলে হাঁটা, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক রূপান্তর—সব মিলিয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে জাতির ভাষাগত ইতিহাসের আশ্চর্য সমমেলের দিকেই পাঠককে টেনে নিয়ে যায়।
বৃটিশ শাসন, নেতাজী, গান্ধী, বঙ্গবন্ধু, ধীরেন দত্ত—এই নামগুলি সময়ের প্রতীক হয়ে উঠে আসে, যদিও সেই সময়ের মানুষরা জানতেন না সামনে কী আন্দোলনের ঢেউ অপেক্ষা করছে।
এই কবিতায় ভাষা ও সংস্কৃতি এবং মানচিত্র ও ইতিহাসের কঙ্কন বাজে মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল, সিলেট, চাতলাপুর হয়ে মনুমখের রাতাছড়ার পার অবধি অভিবাসনের বেদনায়।
‘সোনার বাংলা’—এই শব্দটি কবিতায় বারঃবার ঘুরেফিরে আসে, প্রকৃতি, শ্রম, এবং স্মৃতির প্রতীক হয়ে।সেই সোনার বাংলাকে পেছনে ফেলে কবির পিতা ছিঁড়া মানচিত্র বুকে নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে চলে যান রাতাছড়ায়—একটি নতুন রূঢ় জীবনের পরিমণ্ডলে।।
পরিশেষে কবি তাঁর পিতার, পিতামহের, এবং নিজের ঘাম ও ধুলোকে একত্রে যেন পুঁটলি বাধেন, যেন এই পথের ধুলোয় প্রজন্মের ইতিহাস বেঁধে রাখেন। আর সদর হাসপাতালের পেছনের একটি ঘরে শুয়ে থাকার কথা,এই পৃথিবীতে কবির অন্তিম বিশ্রামের প্রতীক বলেই মনে হয়।সহজ সরল ভাষার আড়ালে যেন কবি তার শেকড় গাঁথা মৌলভীবাজারের মাটিতেই আত্মাহুতির আশা ব্যাক্ত করেন,জুমের চেতুয়াংবৃক্ষের মতো।।
—- হারাধন বৈরাগী
0 Comments