মরমীয়া সাধক ভবানন্দ || গোবিন্দ ধর
মরমীয়া সাধক ভবানন্দ
গোবিন্দ ধর
কথাপৃষ্ঠারঘ্রাণ:
পূণ্যশীলা সুরমা বিধৌত এই বৃহত্তর শ্রীহট্ট ভূমিতে যুগে যুগে জন্ম নিয়েছেন অসংখ্য গুনী-সাধক, বাউল ,মনীষী, যাদের সমৃদ্ধ সাধনার দানে ধন্য সিলেট মাতা।বৃহত্তর সিলেটের সমৃদ্ধ লোকসাহিত্যের বিশাল একটি অংশ আলোকিত করে আছে মরমী গান। যে সকল মরমী সাধক সিলেট মাতার ভান্ডার কে মরমী গানে ভরিয়ে তুলেছেন তার মধ্যে অন্যতম হলেন শাহ দীন ভবানন্দ।
পরিচয় :
ভবানন্দ সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় নি। তাই তাঁর সঠিক জন্ম সন জানা না গেলেও ধারণা করা হয় তিনি দ্বাদশ শতাব্দীর লোক এবং প্রায় সোয়া ‘শ বছর বেঁচে ছিলেন। তিনি বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার লংলা পরগণার নর্তন গ্রামে এক কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন।তার জন্মগত নাম ছিল ভবানন্দ ভট্টাচার্য্য। কারো করো মতে, ভবানন্দ ঠাকুর। তিনি একজন পন্ডিত এবং বিভিন্ন শাস্ত্রে তাঁর বিশেষ জ্ঞান ছিল। তাঁর এই দীর্ঘ জীবন ছিল বৈচিত্রময়। প্রথম জীবনে তিনি অন্য দশজনের মত সংসারী হলেও বিবাহিত জীবনের একটি ঘটনা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। লোকশ্রুতি আছে যে-ভবানন্দ ৪০ বছর বয়সে বরমচাল পরগণায় বিয়ে করেন। তিনি স্বভাবত খুবই স্ত্রৈণ ছিলেন। অর্থাৎ কখনই স্ত্রীকে চোখের আড়াল করতেন না , এমনকি স্ত্রীকে একা শ্বশুরবাড়িও যেতে দিতেন না। কোন একদিন তাঁর মা তাঁর অজান্তে বৌকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে বৌকে না পেয়ে তিনি অস্থির হয়ে উঠেন এবং গভীর রাত্রে জুড়ী নদী সাঁতরিয়ে ভেজা কাপড়ে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে উপস্থিত হন। স্বামীর এই অবস্থা দেখে তাঁর স্ত্রী বাপের বাড়ির সকলের সামনে লজ্জিত বোধ করে বলেন- ‘আপনি আমার মত নগন্য দাসীর প্রতি যেভাবে আসক্ত হয়েছেন,যদি স্রষ্টার প্রতি এরূপ আসক্ত হতেন তাহলে পরকালের জন্য কোন চিন্তা করতে হতো না ‘।
স্ত্রীর মুখে এ কথা শুনে তিনি বললেন- ‘মাগো কি বললেন, আবার বলুন’- স্ত্রী সহজভাবে পুনরায় এ কথা বলতেই তিনি ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেলেন। কয়েকদিন পর তাকে কদলী গাছের আশ্রয়ে(কলা গাছের ভেলায়) জুড়ী নদীতে ভেসে ভেসে গান গাইতে দেখা যায়, তার গানে কদলী গাছ (কলা গাছের ভেলা) উজানে বয়ে চলেছিল। সেই থেকে তিনি পুরোদমে নিখোঁজ হয়ে যান।
একজন ঘোর সংসারী স্ত্রৈণ পুরুষ মুহুর্তেই বদলে গেলেন। সংসার ছেড়ে তিনি স্রষ্টা প্রেমে উন্মুখ হয়ে উঠলেন। এক পলকে বদলে গেল এক ব্রাহ্মণের জীবনযাত্রা। হয়ে গেলেন সাগ্নিক সাধুপুরুষ।
এর প্রায় ৪০/৫০ বছর পরে তিনি সিলেটের গোলাপগঞ্জ বাজারে উপস্থিত হন এবং একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন।ভবানন্দ বৈরাগ্য ভাব নিয়ে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, বৈষ্ণব মতে তাঁর গুরু প্রদত্ত নাম ছিল ‘রাজীবংশ দাস’। তিনি যখন চোখ মুজে গান গাইতের তখন হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেতেন। লোকমুখে ভবানন্দের আত্মপ্রকাশের খবর পেয়ে তাঁর পাগলিনী স্ত্রী সেখানে উপিস্থিত হন এবং মা সন্তানের মত কিছুদিন সেখানে বসবাস শুরু করেন।তাঁর ধর্মমাতা (পূর্বেকার স্ত্রী) মারা যাবার পর তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং সাধক ভবানন্দ নামে পরিচিত হন। উদাস হয়ে তিনি স্থান পরিভ্রমণ করতেন। একাগ্রচিত্তে তিনি বিধাতার আরাধনায় ব্রতী হয়ে একজন কামেল দরবেশ হিসাবে লোকমুখে পরিচিত হতে থাকেন। শেষ বয়সে তিনি ত্রিপুরা স্টেটের ধর্মনগর মহকুমার কছিমনগর পরগণায় (অবিভক্ত ভারত) একটি বাড়ি নির্মাণ ও দিঘী খনন করে সেখানেই বসত শুরু করেন। আনুমানিক সোয়া’শ বছর বয়সে সেখানেই তিনি দেহত্যাগ
করেন। কাছিম নগরেই তাঁর সমাধি রয়েছে । তিনি তাঁর গানে আকুতি জানিয়েছেন-
‘দ্বীন ভবানন্দে বলে জাতে ছিলাম হীন
বন্দে কি করিবা দআ কিআমতের দিন।”
ভবানন্দের দীঘি :
বর্তমানে ভবানন্দের নামাঙ্কিত একটি দীঘি আছে উত্তর ত্রিপুরার ধর্মনগর মহকুমার নতুন বাজার এলাকায়।লোকশ্রুতি ও বর্তমানেও একটি বিশাল দীঘি এখানে দেখা যায়। কথিত আছে এই বিশাল দীঘির উত্তর পাড়ে ভবানন্দ এক ভাঙা কুটিরে বাস করতেন।বর্তমানে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী প্রতাপচন্দ্র দাসের দখলীকৃত এই দীঘি। কয়েক শতবর্ষ পুরোনো এই দীঘিকে তিনি সংস্কার করে রেখেছেন সুন্দরভাবে। তাঁর বাড়ির সঞ্জয় পুরকায়স্থ ও ভ্রমর শর্মার বাড়ি। ভবানন্দের জীবনের নানা গল্প জানেন ঐ নতুব বাজার, প্রত্যেকরায় অঞ্চলের লোকজন। ভবানন্দ জীবনের শেষ বয়সে পুনরায় পিতৃভিটেতে চলে এসেছিলেন। অনেকের ধারণা, এই দীঘি ভবানন্দ খনন করে বাড়ি বেঁধেছিলেন পরে। যা ভবানন্দ দীঘি নামে পরিচিত।
কিন্তু ভবানন্দ দীঘির মতো আরও কয়েকটি দিঘি আছে ঐ এলাকায়; যেগুলোর সাযুজ্য আছে, কৈলাশহরে স্থাপিত বেশ কিছু পুরাকালের দিঘির সঙ্গে। এগুলো কবে বা কে খনন করেছিলেন, তার কোনো লিখিত ইতিহাস নেই। তবে লোকশ্রুতি আছে , খ্রিস্টপূর্ব যুগে, ইহুদীগণ কোনো এক যুদ্ধে জয়লাভ করে ফিরেছিলেন এই পথে। আনন্দ উল্লাসে স্থানে স্থানে দীর্ঘ বিশ্রাম করে ফিরছিলেন সৈন্যরা। কোথাও দু'মাস, ছ'মাস এমনকি বছরও কাটিয়েছেন এক-একটি স্থানে। বিশাল সৈন্যবাহিনীর জল সঙ্কটের কারণে, তারা নাকি চলার পথে, একই আকারের দিঘি খনন করেছিলেন একাধিক স্থানসমুহে। নতুন বাজার সংলগ্ন দিঘিটির পারে পঞ্চদশ শতকে হরিবংশ'র লেখক সাধক ভবানন্দ বাস করতেন। এখানে বসে তিনি হরিবংশীয় ও পদ্মাপুরান লিখেছিলেন। তাঁর পিতা ছিলেন শিবানন্দ ভট্টাচার্য। সুদূর অতীতে পরিবার সমেত বসবাস করতেন প্রত্যেকরায় বর্তমানে কাছিমপুর পরগনায়, অভিব্যক্ত ভারত।
বর্তমানে ত্রিপুরা রাজ্যের ধর্মনগর জেলার একটি স্থান। কালাছড়া ব্লকের অন্তর্গত প্রত্যেকরায় অঞ্চলের নতুন বাজার। জেলা শহর থেকে চার পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত স্থানটি। ইতিহাসের প্রত্নতাত্ত্বিক বহু চিহ্ন নিয়ে আজও সাক্ষী হয়ে আছে কালাছড়া। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েসাঙ পদব্রজে ভারত ভ্রমনের সময় স্থানটিতে এসেছিলেন। প্রত্যেকরায় অঞ্চলের আশপাশ জুড়ে লুকায়িত আছে বহু ঐতিহাসিক আঁকর। ১৯৮৬ সালে পুকুর খনন করতে গিয়ে একটি প্রাচীন শিবলিঙ্গ ও নাড়ুগোপালের পাথরে খোদাই করা মূর্তি পাওয়া যায় মাটির তলায়। এছাড়াও প্রাচীনকালের বহু ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে এলাকা জুড়ে (কিছু আবিস্কৃত কিছু অনাবিষ্কৃত রয়েছে)। হারিয়ে যাওয়া এই সভ্যতার অট্টালিকাগুলিতে ব্যবহার করা হয়েছিল পোড়া ইট। ইটগুলোর আকার দেখে ধারনা করা হয়েছে, হাজার-পনেরোশ বছরের পুরানো হবে। যা মৌর্য বংশের স্থাপত্যের ইটের সঙ্গে সাযুজ্য রাখে।
বর্তমানে ভবানন্দ নামাঙ্কিত, এই দিঘির পারে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছিলেন হরিবংশ'র লেখক সাধক ভবানন্দ। এই দিঘির পারেই তাঁর সমাধি রয়েছে, বলে অনেকে মনে করেন।
সঙ্গীত সাধনা :
ভবানন্দ স্রষ্টা প্রেমে আকুল হয়ে প্রায় ২৫০ টির মত আধ্যাত্মিক তথ্যপূর্ণ রূপক গানে দুইখন্ডে ‘মুজমা-রাগ-হরিবংশ’ নামে একটি গ্রন্থ রচন করেন। তৎকালীন সময়ে এই অঞ্চলে বাংলার প্রচলন ছিল কম এবং নাগরি ছিল সর্বাধিক প্রচলিত। যেহেতু ভবানন্দ পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন এবং নিরুদ্দেশ অবস্থায় বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেন তাই স্বাভাবিক ভাবেই বাংলায় গান রচনা তাঁর জন্য কঠিন কিছু ছিল না । সিলেট তথা বাংলা সাহিত্যে এই গ্রন্থটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ছিল সুদূপ্রসারী। এককালে ভবানন্তের ‘হরিবংশ’ পুঁথি এই অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে ফিরত। ১৯০৬ সালে এই গ্রন্থটি সিলেটী নাগরি লিপিতে লিপ্যান্তর করে প্রকাশ করেন প্রকাশত মহম্মদ আফজল। এ প্রসঙ্গে প্রকাশক মহম্মদ আঢজল বলেছেন –
“এগারশ ছাপ্পান্ন আটাইশ পৌষেতে
লেখেছিল এক হিন্তু পুঁথি বাংলাতে ।
অনেক মেহনতে আমি সে পুঁথি পাইনু
লেখেছিল যে মতে সে মতে উঠাইনু ।
আর এক দুশতমর মহম্মদ জকি নাম ,
তিনির নাগরি এক পুঁথি পাইলাম।
আর আর পুঁথি শব একাত্তর করিয়া
লেখিলাম ভাল মতে দুরশত করিয়া।’
এরকম আরো দুটো গান
(১)
ওরে দয়াল
তোমার লীলা বোঝা বড় দায়
তুমি দীনবন্ধু করুণার সিন্ধু
বাঁকা শ্যামরায়।।
তুমি ব্রজের রাখাল রাজা
যশোদার কানাই
বিষ্ণুপ্রিয়ার বুকেরই ধন,
নদীয়ার নিমাই।
তুমিতো সেই দুঃখের দুঃখী,
চিরসাথী সুখে
তোমার পরশ-আমার হরষ
সদায় জাগো বুকে।
আমার জীবন-যৌবন সব সঁপিলাম
তোমার দুটি রাঙ্গা পায়।।
তুমিতো সেই ধ্রুবতারা,
তুমি রবি দিনে
তোমার প্রেমে পাগল যারা
তারাই তোমাই চেনে।
পাগল ভবানন্দ'র তোমা বিনে-
আর তো উপায় নাই।।
তুমি দীনবন্ধু,করুণার সিন্ধু
বাঁকা শ্যামরায়।
(২)
দুই নয়নে বহে ধারা গো
ও আমি মুছবো কত অঞ্চলে।
সেকি আর আসবে গো
কলঙ্কিনী না মরিলে।(২)
আমি অতি সাধে বানাইয়াছি
ফুলেরই বাসর করে কত মনোহর(২)
হায় হায় সে বিনে মোর শূন্য বাসর গো
সে বিনে মোর শূন্য বাসর
অসময়ে নিশি যায় চলে।
সে কি আর আসিবে গো
কলঙ্কিনী না মরিলে(২)
লোকসাহিত্য আমাদের গৌরব :
সাধক ভবানন্দের অনেক গানই অপ্রচলিত রয়ে গেছে। সিলেটের লোক সাহিত্যের এই অমূ্ল্য সম্পদের প্রচার অত্যন্ত জরুরী। অন্যান্য মহাজনদের চাইতে শাহ ভবানন্দের গানের প্রচার অনেক কমই বলা যায়। ‘আমি ভাবছিলাম কি এই রঙ্গে দিন যাবেরে সুজনও নাইয়া,
নাইয়া হায়রে পার কর সকাল রাধারে।’- ভবানন্দের এই গানের মত অসংখ্য হৃদয় ছোঁয়া ভাব গাম্ভীর্য পূর্ণ গান ছড়িয়ে পড়ুক নবীন প্রজন্মের মধ্যে। আমাদের লোকসাহিত্য,আমাদের গৌরব।
তথ্যসূত্র : মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য,রব্বানী চৌধুরী।
0 Comments