জ্যামিতি বক্স ও গণিতের শূন্য 

গোবিন্দ ধর 

উৎসর্গ
বিনয় মজুমদার 
প্রকৃতপক্ষে তিনিই গণিতের শূন্য। 

সূচীপত্র 
একটি গদ্যপদ্য
গভীর ক্রান্তিলগ্ন
গতিপথ :এক
গতিপথ :দুই
গতিপথ :তিন
একা
যাদুমুদ্রা
শ্রীহট্টীয়পুরাণ
কালখণ্ড 
বাঁক 
জরুরি উচ্চারণ 
চৈতন্যপুরাণ
কবির ভূখণ্ড 
হৃদয়ের ভেতর কবিতা আকুপাকু করে
জ্যামিতি বক্স ও গণিতের শূন্য


একটি পদ্যগদ্য

কবিতা লিখি না আর কবিতা আমাকে লিখে। 
কক্ষপথ টপকে ঘুরি ভিন্ন গ্যালাস্কিতে।
ভোরের আচরণগুলো পাললিক পাথরের মতো
অন্তহীন ঘুরতে ঘুরতে  আমিই কক্ষচ্যুত। 

কবিতা আমাকে বিহুনৃত্যের হায়ের ভেতর 
ডুবিয়ে চুবিয়ে সরবত বানানো বাকি
তথাপি কবিতা লিখি না আমি,লিখি
ভাত শিকারের দৌড়। 

গভীর ক্রান্তিলগ্ন

নিজেকে নীরব রাখবো না সরব থাকবো এই ক্রান্তিলগ্নে আমি।হয় পরাজয় নয় জয় এই দুইয়ের মধ্যবর্তী শূন্যকালে দাঁড়িয়ে থাকলে সকল প্রাণীকেই হতবাক হতে হয়।এতদিনের পরিচিত মূল্যবোধ মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস, স্নেহ,প্রেম, ভালোবাসা সব কেমন ফিকে হয়ে গেলো।আত্মপ্রত্যয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে খড়কুটোকেও বিশ্বাস করে অনন্তজলরাশি অতিক্রম করেও মানুষকে জীবনের গান গাইতে দেখে বিশ্বাসের পুনর্জন্মে ওম দিই।কিন্তু সকল বিশ্বাসকে চুরমার করে মানুষের অমানসিক লিপ্সার নিকট।কক্ষনো এমন এক নিরুপায় সংকটের আবর্তে পড়ে এ জীবন গতি হারাবে,সংকট তত গভীর হবে ভাবিনি।
আর কোন আশ্বাস নেই। বিশ্বাস নেই। সব ফিকে।দেখানেপনা।এই অপরিনামদর্শীতার নিকট হেরে গেলাম।এ জীবন হেরে গেলো।

গতিপথ:এক

স্মৃতিচিহ্ন মুছে যাক।
সিঁথি মোড় থেকে মুছে যাক
জীবনের ভুলগুলো।
হারিয়ে যাক মহাশূন্যে স্মৃতিরেখা।

কোনো বিষাদ গাথা নয়।
কোনো উপর চালাকিও না।
ভণ্ডামি না।
লেখো বিচ্ছেদ। লেখো দূরত্ব। 
পরস্পর থেকে বিপ্রতীপ ঘূর্ণনে ছুটে যাক
অবশিষ্ট অতিক্রম। 

গতিপথ:দুই

জীবনের গতিপথে
অসংখ্য ভুলের পাহাড় বহন করে
ক্লান্ত পরিশ্রান্ত  গোলক
ভুলের পালক খসে গেলে
ঘূর্ণনরত পরিক্রমা। 

গতিপথ :তিন

ভুল এক ভ্যাম্পায়ার,রক্তখেকো জীব।
যাপিতজীবনকে ভুল বন্দরে লঙ্গর করে।
তচনচ করে পরিক্রমা। 
সহজ পাঠ থেকে সহজ বর্ণ পরিচয়ের বাইরে 
ভুল এক আত্মহনন সংক্রমণ। 

ভুল থেকেই পুনরায় দাঁড়াতে শেখা
পথে নামা।পথই শেখায় শুদ্ধিকরণ। 

একা

দেওপাড়া থেকে কতদূর বেহাড়া
কতদূর একজন কবির থেকে অন্য
আরো একজন কবিহৃদয়?
ছাইপাশ ভাবি।ভাবনা কাহারে কয়?
সেকি ভাবনা গো আমারই মন
সারাবেলা কুহক গায় বন্ধু বিনে
একাকী এ জীবন।
বন্ধু কি নেই?অনেক ভীড়েও
 ভেতরে টের পাই একটি পিপিলিকা।


যাদুমুদ্রা

যাদুবিশ্বাস থেকে কল্কেয় ধুঁয়া উঠবে না।
নিজস্ব কালখণ্ডে লিখে যাও আত্মলিপি।

হাওয়া খেয়ে খেয়ে বেঁচে থাকা গডআল্লা
তিনিও তিরোধান লিখে রাখেন পঞ্জিকায়।

সকল কব্যাদের হাতেখড়ির স্লেটে লেখা
আত্মক্ষর সারা জীবন ফেল ফেল কাঁদে।

যাদুবিশ্বাস থেকে তিনি সেসব ডকুমেন্ট অনুবাদ 
না করেই হনুম্যান সেজে লাফ দেন লঙ্কা। 

তারপর হাতেখড়ির আমন্ত্রণে তিনি চেটেপুটে
জলজ স্তর বাড়িয়ে বেসিনেই ঢেলে বাড়ি যান।

তারপর তর্জনি তুলেন আমরা নয়ছয়।
আর সব নস্যিলোক তেনারা হনুম্যান।

এই নকল মানুষ থেকে আমাদের কবিতারা
একদিন দুদিন করে কবিদেরে লিখিয়ে নেয়। 

শ্রীহট্টীয়পুরাণ

শেকড় উপড়ানো গাছ আমি।
নাগরীলিপি ভুলে গেছি কবেই
শব্দকোষ যৎসামন্য মনে থাকলেও
পুরায় বুঝি না হেরে বুঝি।

শ্রীমঙ্গল আগুন লাগলে এখনো দেখি।
বাবার পদধূলিমাখা চালতাপুর বর্ডার হয়ে
যেদিন আমিও ভারতে এলাম
শরীরের লোমকূপ কাঁটা দিয়ে উঠলো।

আমিও শ্রীহট্টীয় আমার রক্তেও আছে
সিলেটের লবণ ও মাটি
জেতাগাছ হয়তো মনের গভীরে
বাকীটা শেকড় উপড়ানো মৃতকাঠ।

কালখন্ড

টেনে নামাতে যারা চায়,তারা ইতিহাস লেখে না।
যাদের নামানোর চেষ্টা করেন,ইতিহাস লেখেন কৃষক
মজুর শ্রমিক আর পিছিয়ে পড়া মানুষ।

সময়ের কালখন্ডে চিরদিন মার খাওয়া মানুষই
মিছিলের মুখ, পিছিয়ে পড়ার আওয়াজ।

আওয়াজ সবাই শুনতে পায় না,ইহাই ভবিতব্য। 
সময় চিরকাল প্রবাহমান শিক্ষক। 

বাঁক

বাঁক নেওয়া নদীর প্রকৃতি।
কবিও নদীর মতো বাঁকধার্মিক।
তুমি বাঁক নিয়ে নিয়ে হয়ে ওঠো স্রোতস্বিনী।

জরুরি উচ্চারণ

পুননির্মাণ জরুরি জেনেই আলটপকা ঢুকে পড়েছি 
চৌকাঠ মাড়িয়েই ভেতর ঘরে।
ভেতরে যে পুষে রেখেছো পুষ না মানা বিড়াল
ছন্দপতনের আগে তা উচ্চারিত হয়নি।

তোমার নাভিদেশের একটু বাম দিকে একটি লাল তিল
নিতম্বের সর্বত্রই লাল তিলগুলো ডাকেনি কি
গোপন কুমন্ত্রণায়?

ভেতর ঘরে বিড়াল বের করে দিয়েছে নখ।যেখানে 
আর কোনো সন্ধিপাঠ নেই। আছে কিছু জরুরি উচ্চারণ। 

উচ্চারণ :১
হ্যান্ডআপ বললেই তুমি হাত তুলে দিতে হবে? 
উচ্চারণ :২
যখন ইমোশনাল ভাবে পরস্পর পরস্পরের সহযোগী হয়ে যায় 
তখন কেউ অতর্কিতে গুলি চালায়?
উচ্চারণ :৩
প্রতিটি নিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব? 
উচ্চারণ :৪
সময়ের পদাবলী থেকে উষ্ণতা কুড়িয়ে এইসব রাজনৈতিক আলাপ হুমকি নয়?
উচ্চারণ :৫
বিপ্রতীপ সময় থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়েছে 
কুশল বিনিময় নয় কৌশলই ধূর্তদের প্রকৃত ম্যানোফেস্টো।

চৈতন্যপুরাণ

প্রেমিকা আনবাড়ি যাবে ইহাই প্রকৃতি।
মদতি শুঁড়িবাড়ি যাবে ইহাই নিয়তি।

রতনে রতন চিনে কথাটা মিথ্যে 
মানিকে মানিক চিনে কথাটা মিথ্যে। 

সকল প্রেমিকাই লম্পটের সূতোয় বাঁধা
ইহাই আশ্চর্য সুন্দর জীবনের ধাঁধা। 

কানাইয়ার বাঁশি বাজে ঘরে ঘরে টুংটাং 
ভরাকলসীর জল রেখে রাধা যমুনায়।

ঘরে ঘরে অচেনা অদেখা শত্রু বাজায় ডাং ডিং 
কলি যুগে মরেছে প্রেম অচল মায়ায়।

ইহাই নিয়তি যেন সত্য উড়ে কর্পূর।
মিছেমিছি ভুল প্রেম বাজায় নূপুর। 

কবির ভূখণ্ড

উৎসর্গপৃষ্টায় লিখি,তোমাকে। 
এই একটি মাত্র পৃষ্ঠায় 
কবির পূর্ণ স্বাধীনতা। 

বাকী সবই কথাপৃষ্ঠা। 
উন্মুক্ত পাঠকের জন্য। 

হৃদয়ের ভেতর কবিতা আকুপাকু করে 

হৃদয়ের উষ্ণতা হারিয়ে ফেললে 
কবিতা পাখির মতো উড়ে যায়।
হৃদয় এক অবাধ্য শালিক -প্রতি মুহূর্তে 
উড়ালই তার ঠিকানা। 

দূষণ এসে চুপসে ফেলে হৃদপিণ্ড। 
সবুজে মিশে থাকি বুক ভরে বাতাস এসে
অনুভূতি জাগিয়ে তুলুক কবিতার জন্য। 

বুকের হৃদপিণ্ড আকুপাকু করে স্পর্শ এসে 
নাড়িয়ে দিক স্বরবর্ণ।

জ্যামিতি বাক্স ও গণিতের শূন্য 

তৃতীয় শ্রেণির আগে জ্যামিতিবাক্স  দেখিনি।

বাক্স খুলে তাতে কাঁটা কম্পাস 
চাঁদা স্কেল ত্রিভুজ তখনো নাম জানা নেই। 
অবিরত নাড়াছাড়া নাড়াঘাঁটা করতেই থাকি।
অবশেষে খেলনা হয় গণিতের জ্যামিতি।

কাঠপেন্সিলে আঁকা শূন্য মুছতে মুছতে 
এখন পুরোপুরি মনে হয় শূন্যজীবন।

জ্যামিতিবাক্সের রাবার মুছতে পারে না জীবনের শূন্য।