ত্রিপুরার অণুগল্পকার 

            চৈতন্য ফকিরের দশটি অণুগল্প                                          ------------------

                    মান্টি অধিকারী দত্ত 

                  -------------------------------


সভ্যতার আদি লগ্ন থেকে গল্প শোনার বা গল্প বলার রীতি প্রবাহমান।আদিম মানুষ লিপি আবিষ্কারের আগেই গুহাতে চিত্রের দ্বারা নিজেদের জীবন যাত্রা গল্পের আকারে সাজিয়ে রাখতেন।

বর্তমানে টেকনোলজির দাপট , গোটা পৃথিবী মানুষের হাতের মুঠোয় ,নিউক্লিয়ার মধ্যবিত্তের চিলেকোঠায় ঠাকুমা দিদিমা দের পুরাণের গল্প , রূপকথার গল্প আর ভেসে আসে না এখন সময়ের দাবী মেটাতে বড় গল্প থেকে  ছোটগল্প এবং ছোটগল্প থেকে  আধুনিক চলমানতায় অণুগল্পের জন্ম।

যাইহোক গল্প সম্পর্কিত তেমন বলিষ্ঠ ধারণা আমার কোন কালেই ছিলো না তবে আমি এক ক্ষুধার্ত পাঠিকা।

সম্প্রতি উপহার হিসেবে  'দৌড়' পত্রিকাটি আমার হাতে আসে এবং  অণুগল্প ও অণুগল্পের নানা বিধ আলোচনায় নানা কৌতূহল  অণুগল্পের প্রতি আমাকে আগ্রহী করে তোলে।

এমতাবস্থায় পত্রিকার মাননীয় সম্পাদক মহাশয় শ্রী মধুমঙ্গল বিশ্বাস ত্রিপুরার এক বিখ্যাত অণুগল্পকার শ্রী চৈতন্য ফকিরের অণুগল্প আমার হাতে তুলে দেন ।

চৈতন্য ফকির,

   জন্ম হয় ১৯৭১ সালে, তাঁর দশটি অণুগল্প পড়তে আমার বড় জোর আধঘন্টার বেশি সময় লেগেনি তবে সেই গল্পের রেশ আমি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

যেমন তাঁর প্রথম গল্পটির নাম  'সূত্র',

এই গল্পে  'স্বপ্না' নামাক চরিত্রটি সংকীর্ণ সময়ে গতিময়তায় উন্নত প্রযুক্তির মায়াজালে একাকীত্বতা নারীর স্বপ্ন বুননের ছবি দেখানো হয়েছে, 

মোবাইল ফোনে কারণে অকারণে  নানা মিসকল কিন্তু তার অপেক্ষা সেই মিস কলটির যা শুধু মাত্র তার জন্য। গল্পকার অপ্রয়োজনীয় একটা শব্দ ব্যবহার না করে সময়ের বাহ্যিক উন্নতির সাথে মানুষের অভ্যন্তরীণ শূন্যতা কথা প্রকাশ করেছেন এই গল্পে।

দ্বিতীয় গল্পটি  'সেই পাড়াতো বোন ও রক্তকরবী ',

 এই অণুগল্পটিতে গল্পকার কৈশোরের সারল্যের কথা প্রকাশের সাথে সাথে কৈশোর থেকে যৌবনের এগিয়ে যাওয়া নানান জটিল অভিজ্ঞতা কথাও প্রকাশ করেছেন। মানুষের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে এই যান্ত্রিক সভ্যতা তাকে গ্রাস করছে তার অন্তরের স্বতঃস্ফূর্ততা শেষ হয়ে যাচ্ছে যার কথাই রবি ঠাকুর তার রক্তকরবী নাটকে প্রকাশ করেছেন গল্পকার চৈতন্য ফকিরও তাঁর এই গল্পটিতে ছোট ছোট বাক্যের মাধ্যমে এমন অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেছেন।

তৃতীয় গল্পটি 'চল্লিশ বছর আগের একদিন',

 এই অণুগল্পটিতে গল্পকার খুব স্বল্প বাক্যে অনেক বড় অনুভূতি কে তুলে ধরেছেন। ছেলেবেলার নিষ্পাপ বন্ধুত্বের নিঃস্বার্থ  ভালোবাসার কথা ব্যক্ত করেছেন এবং তা অভিমানের উপমা দ্বারা।তিনি এমন এক সরল স্মৃতির মায়াজালে আটকে পড়েছেন যা তাঁর চল্লিশ বছর বয়সেকেও সেই ছেলেবেলার অভিমান আঁকড়ে ধরে।



চতুর্থ ও পঞ্চম গল্পটি'চন্দ্রপ্রভা' ও 'লাইকারম্যান', 

এই অণুগল্প দুটিতে  গল্পকার উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে নিয়ে  মানুষের কুকর্ম  যেমন দেখিয়েছেন তেমনি দেখিয়েছেন এই উন্নত  সভ্যতায় নিজেকে টিকে রাখতে হলে একমাত্র উপায় নিজের কাজের প্রতি দৃঢ় মনোনিবেশ।  'চন্দ্রপ্রভা' চরিত্রটির মধ্যে দিয়ে অতি অল্প পরিসরে তিনি প্রকাশ করেছেন সমাজের নানা বাঁধা বিপত্তির মধ্যেও নিজেকে টিকিয়ে রাখার মূখ্য উপায়।


ষষ্ঠ গল্পটি 'দিরং'

এই দিরং শব্দের অর্থ দেরী বা বিলম্ব ।সময় কারুর অপেক্ষা করেনা এবং সে তার সাথে ভালো বা খারাপ কিছুকে নিয়েও চলে না, সে তার নিজের গতিতে চলে । রাত যেমন মুখ বেজার করে সকালের অপেক্ষা করে তেমনই সকালও দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে রাতে নেমে আসে। দেরিদা চরিত্রের মাধ্যমে গল্পকার নানা উপমা দ্বারা এমনটাই প্রকাশ করতে চেয়েছেন।

সপ্তম গল্পটি 'বরাক:সন্ধ্যা নামার মুহূর্ত',

 এই গল্পে বরাক একটি নদী, এই "বরাক" শব্দটি  'ব্রা' ও 'ক্রো' শব্দদুটি থেকে এসেছে। 'ব্রা' অর্থ বিভক্ত হওয়া এবং 'ক্রো' অর্থ উপরের অংশ/শাখা।

বরাক নদীটি করিমগঞ্জ জেলার হরিতিকরের কাছে সুরমা নদী এবং কুশিয়ারা নদীতে বিভক্ত হয়েছে। এই অণুগল্পে  নদীর সাথে নারীর অপূর্ব মেলবন্ধন আমরা লক্ষ্য করবো,গল্পকার নদীর কথা উল্লেখ করে কোন এক অশুভ ইঙ্গিত দিয়েছেন গল্পের শেষ লাইনে 

         "রাইত রাইত লাগের সারা বরাক।"


অষ্টম গল্পটি 'একটি জ্যামাটকের গল্প ' ,

এই অণুগল্পে গল্পকার আপন বন্ধুর সংকটজনক পরিস্থিতি দেখিয়ে গোটা বাংলাদেশের কর্মরত মানুষের পথ ঘাটের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার চিত্র অঙ্কন করেছন। বাংলাদেশের মানুষের নিত্যনতুন গাড়ি, কতরকম কায়দার দামী গাড়ি কিন্তু উৎসবের মূহুর্তে বা অন্য যে কোন ব্যস্ততার সময় পথে অসম্ভব জ্যাম এতে পরিবেশের দূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে বৃদ্ধ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন এ ব্যাপারে কারুর কোনো চিন্তা না থাকলেও গল্পকার চিন্তিত ।


নবম গল্পটি 'দৌড়', 

এই অণুগল্পে গল্পকার বর্তমানের প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার জীবনদর্শনের যান্ত্রিকতাকে ও মনুষ্যত্বের অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়কে এক দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।এক স্বামী ও স্ত্রী একই ছাদের তলে থেকে একে অপরের থেকে সুখ না খুঁজে  নিজেদের নেশার পেছনে অন্ধের মতো সুখের মোহে দৌড়াচ্ছে। মেদহীন বাক্যে ব্যবহারে সামাজিকতার নগ্ন রূপটি তুলে ধরেছেন গল্পকার এই গল্পে। 



দশম গল্পটি 'নোট',

 এই অণুগল্পে গল্পকার একটি সুইসাইড নোটের কথা উল্লেখ করেছেন। একটি মেয়ে,যে একজন  ভালো ছাত্রী শুধু তাই নয় নম্রতা ভদ্রতা তার মধ্যে উজ্জ্বল ভাবে বর্তমান তবে এই সমাজ নিজে নিজেই আপন নগ্ন রূপটি তার সম্মুখে  তুলে ধরলো, সমাজের  গতানুগতিক স্বৈরাচারী  নিয়মের কারণে শেষ মেষ তাকে আত্মবলিদান দিতে হলো ,গল্পকার অপূর্ব ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে  এমন কঠিন বাস্তবতা কে তুলে ধরেছেন যে  অণুগল্পটি একটা সার্থক অণুগল্প হয়ে উঠেছে ।

অণুগল্পের সংজ্ঞা দিতে গেলে 'যথার্থ অণুগল্প' বলে স্থির কোনো ধারণার তুল্য মূল্য হয় না স্বল্প বাক্যে নিয়ে গঠিত হলেই তা কখনোই অণুগল্প নয়,এই ধরণের গল্পে এক অন্য ধরনের ম্যাজিক থাকে গল্পকার গল্পের মধ্যে একটা কেন্দ্রকে অবলম্বন করে ছুটে চলে বহু উপকেন্দ্রের দিকে।

  বাংলা সাহিত্যে এর আবির্ভাব  খুব যে নতুন তা নয়  আসলে আধুনিক জটিল মননশীল মানুষের জীবনে চব্বিশ ঘণ্টা সময়ও ভীষণ কম সুতরাং  এমতাবস্থায় স্বল্প পরিসরে বিস্তারিত উচ্চ  মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লষণে দ্বারা কিছু গল্পকারের হাতে ধরে এই  অণুগল্পের সৃষ্টি তেমনই এক অণুগল্পকার শ্রী চৈতন্য ফকির, যার গল্প গুলি ভাষা, শৈলী, রীতি সর্বদিক থেকে আমার কাছে সার্থক অণুগল্প ।


Manti Adhikary Dutta 

C/o Somenath  Dutta 

Bowbazar, Baganpara 

Arabindu Road

 Krishnagar

 Nadia 

Pin-741101 

Phone-7908054942 

0 Comments