গোবিন্দ ধর-কে।লেখা চিঠিপত্র || প্রিয় গোবিন্দ || মলয় রায়চৌধুরী
গোবিন্দ ধর-কে।লেখা চিঠিপত্র
প্রিয় গোবিন্দ || মলয় রায়চৌধুরী
প্রিয় গোবিন্দ
তোমার সঙ্গে আগে কেন পরিচয় হয়নি ? তোমার মতন পাঠক আর সম্পাদকের সঙ্গে পরিচয় হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার । তোমার সঙ্গে পরিচয়ের পর আমি গুগল করে খুঁজে দেখলুম কুমারঘাট জায়গাটা কোথায় ? ত্রিপুরার সীমান্তে ! ত্রিপুরায় যাইনি কখনও । চাকুরিসূত্রে ভারতের প্রায় সমস্ত রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে ট্যুর করেছি কিন্তু ত্রিপুরায় যাওয়া হয়নি । কুমারঘাট জায়গাটা প্রাকৃতিক দিক থেকেও মনোরম মনে হলো ।
প্রদীপ চৌধুরীর বাড়ি ছিল ত্রিপুরায়, সম্ভবত জায়গাটার নাম কুলাই, ওর বাবা শিক্ষকতা করতেন আর স্ত্রী সরকারী চাকরি করতেন । ও বলেছিল যেতে, কিন্তু যাওয়া হয়নি ; সেসময়ে যাওয়া হয়নি । ওরা ছাড়া পেয়ে যাবার পর হাংরি আন্দোলনের মামলায় তখন আমার একার এমন অবস্হা যে কলকাতায় রাতের বেলায় মাথা গোঁজার ঠাই নেই, দুবেলা খাবার মতন রেস্ত নেই । মামলায় মুচলেকা দিয়ে বন্ধুরাও পালিয়েছে। তখন একাই মামলা লড়তে আদালতে গিয়ে বসে থাকতুম, কখন আমার কেসটা উঠবে । ত্রিদিব মিত্র জানিয়েছিল যে শৈলেশ্বর, সুভাষ, বাসুদেব আর প্রদীপ মিলে দল গড়েছে, ওদের বাদ দিয়ে দিয়েছে ; আমার থেকে ভয়ে আগেই শত হাত দূরে করে নিয়েছিল নিজেদের । প্রদীপ ওদের থেকে কিছুটা ভিন্ন মেজাজের ছিল । তাই মনে হয়, ত্রিপুরার মনোরম প্রভাব চরিত্রে ক্রিয়া করে । কাছেই শিলচরে গিয়েছিলুম একবার, কিন্তু শক্তিপদ ব্রহ্মচারী তখন মারা গেছেন । দেখা করার ইচ্ছে ছিল, হলো না, আগেই বিদায় নিলেন ।
শৈলেশ্বর ঘোষ তো মুচলেকা লিখে রাজসাক্ষী হয়ে আমার বিরুদ্ধে সেই যে বিষোদ্গার আরম্ভ করলো, যতোদিন বেঁচে ছিল, অবিরাম গালমন্দ করে গেছে । এমনকী নিজের মেয়ে আর শিষ্যদেরও তৈরি করে গিয়েছিল আমার বিরোধিতা করার জন্য । বাসুদেব দাশগুপ্ত গ্রেপ্তার হয়নি, তবু আমার বিরুদ্ধে লেখালিখি করে গেছে। শুনলুম ওকে নিয়ে একটা বই গাঙচিল থেকে বেরিয়েছে, তাতে আমার দিকে প্রচুর থুতু ছিটিয়েছে । যখন নাকতলায় থাকতুম তখন হঠাৎ একবার আমার বাসায় এসেছিল, মাতাল অবস্হায়, টাকা চাইতে। আমি জিগ্যেস করলুম, টাকার এমন কী দরকার যে আমার বাসায় হানা দিতে হলো ? ওর জবাব শুনে অবাক হলুম। বলল, ভায়াগ্রা ট্যাবলেট কিনবে । শরীরের অমন অবস্হা হয়েছে নাকি যে ভায়াগ্রা খেতে হবে ? বলল যে বেবি নামের যে যৌনকর্মীর সঙ্গে ও আর শৈলেশ্বর দুপুরবেলায় প্রেম করতে যায়, সেইই নাকি বলেছে যে বাসুদেবের যৌনতার ক্ষমতা ফুরিয়ে গেছে । ওর অনুরোধে এক হাজার টাকা দিয়ে টাটা করলুম । পরে দাদা সমীর রায়চৌধুরীর কাছে শুনলুম যে দাদার বাড়িতেও গিয়েছিল একদিন দুপুরে ভায়াগ্রার খরচ চাইতে ; দাদা দু-হাজার টাকা দিয়ে, ভাত আর ভেটকি মাছের ঝোল খাইয়ে রিকশায় তুলে দিয়েছিল ।
মামলার পরে হয়তো ত্রিপুরা যেতে পারতুম কিন্তু পঁয়ত্রিশ মাস মামলা লড়ে এমন ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলুম যে পাটনায় ফিরে গেলুম । উকিলদের বকেয়া মেটানো জরুরি ছিল । চাকরিতে জয়েন করে বাকি টাকা পেয়ে ওনাদের দিই । জানোই কলকাতা হাইকোর্টের উকিলদের ফিস কতো । আর আমার ছিলেন চারজন উকিল। তোমাকে তো বলেছি যে প্রথম চাকরিটা করতুম রিজার্ভ ব্যাঙ্কে, ব্যাঙ্ক নোট নষ্ট করিয়ে পোড়ানোর চাকরি। নোট পোড়ালে যে শ্মশানের গন্ধ পাওয়া যায় সেই তখন জানলুম । পচা স্যাঁতসেতে ছাতাপড়া নোটের পাহাড় ভল্ট থেকে চটের বস্তায় ভরে এনে স্যাম্পল চেক করিয়ে পোড়াতে হতো । এখন আর পোড়াতে হয় না । শ্রেডিঙ মেশিনে টুকরো করে পাল্প তৈরি করতে পাঠানো হয় । চটের বস্তার দিনও নেই । প্লাস্টিকের মোটা চাদরের বস্তা ব্যবহার হয় ।
পচা নোটের আবহাওয়ায় আমার শরীর খারাপ হয়ে গিয়েছিল । প্রথম সুযোগ পেতেই অমন ভালো মাইনের চাকরি ছেড়ে গ্রামোন্নয়নের চাকরিতে ঢুকলুম আর পাটনা থেকে চলে গেলুম লখনউ । লখনউ থেকে মুম্বাই । শুরু হলো সারা ভারতবর্ষের গ্রামগঞ্জ ঘোরা – কতো যে ঘুরেছি কী বলব তোমায় । পায়ে হেঁটে, গোরুর গাড়িতে, এক্কা গাড়িতে, ট্রাকে, জিপে, মোটর গাড়িতে, অটোতে, নৌকোয়, দক্ষিণ ভারতে পাতার তৈরি নৌকোয়, মোটর সাইকেল ট্যাক্সিতে, উটের পিঠে, হাতির পিঠে । কিন্তু রাতের বেলায় এমন সব জায়গায় থাকতে হতো যে মশার কামড়ে ঘুমোতে পারতুম না, গায়ে ওডোমস মাখা সত্ত্বেও । থাকার জন্য অনেক সময়ে হোটেল বা গেস্ট হাউস জুটতো না । কোথাও মেঝেতে, কোথাও বেঞ্চে, কোথাও চারপাইতে শুয়ে রাত কাটাতুম । অপরিষ্কার জল খেয়ে পেট খারাপ হয়ে যেতো । যেখানে কিনতে পেতুম সেখানে জলের বদলে লেমোনেড বা কোল্ড ড্রিংক খেতুম ; তখনও মিনারাল ওয়াটার আসেনি বাজারে । হাগবার জন্য সব জায়গায় পায়খানা থাকতো না । খেতে, মাঠে, খালের ধারে, গাছের আড়ালে কাজটা সেরে ফেলতে হতো । শুনে বাবা বলেছিলেন, একটা ফোলডিঙ ছাতা রাখ । কতো কিছু বইব, বলো ! তাছাড়া কলেজে পড়ার সময়ে ন্যাশানাল ক্যাডেট কোরের ক্যাম্পে সবাই দল বেঁধে হাগতে যেতুম বলে লজ্জাবোধ হতো না । যখন গ্রেপ্তার হয়ে লকাপে ছিলুম, তখন হাগবার জন্য কোমরে দড়ি বেঁধে কন্সটেবল বলেছিল, যাও হেগে এসো । কন্সটেবল দড়ির এক প্রান্ত ধরে বসে রইলো আর আমি অন্য প্রান্তে বাঁধা, হাগতে গেলুম । তাও পায়খানায় নয়, পুলিশ স্টেশনের পেছনের মাঠে, যেখানে আসামীরা চারিদিকে হেগে রেখেছিল । ছোঁচাবার জন্য অবিরাম পড়তে থাকা জলের কল, সেই দিকে পেছন করে ছুঁচিয়ে নিতে হলো ।
তুমি যেখানে থাকো, চারিদিকে প্রকৃতির সবুজ ঘেরাটোপ পাও নিশ্চয়ই । আমি নতুন চাকরিতে ওই ঘেরাটোপের আকর্ষণে বাঁধা পড়ে গিয়েছিলুম । তার আগে জানতুম না অড়র ডালের অমন গাছ হয় ; বাজরা আর জোয়ার গাছ কেমন দেখতে, কখন কার্পাস তুলো গাছ থেকে পাড়া হয়, অতো শুকনো লঙ্কা ছড়ানো মাঠে বউরা কেমন করে বসে বাছাই করে অথচ চোখ জ্বালা করে না হাঁচি পায় না ! সেচের ব্যাপারেও কিছুই জানতুম না, এমনকি খাল আর নালার তফাত জানতুম না, পারশিয়ান হুইলের কথা জানতুম না, বউরা মাইলের পর মাইল হেঁটে প্লাসটিকের ঘড়ায় জল ভরতে যায় তা জানতুম না, কয়েকটা বাচ্চা হবার পর বউরা সারামাস খেতে খাটার জন্য ইউরেটাস কাটিয়ে ফ্যালে তা জানতুম না । অদ্ভুত এক ভারতবর্ষের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল । তাছাড়া আরেকটা ব্যাপার, তোমাকে সাক্ষাৎকারে বলেছি সম্ভবত, দেশভাগের ফলে যে বাঙালিদের ভারতের নানা জায়গায় বসবাসের জন্য সরকার ব্যবস্হা করেছিল, সেখানে তারা বাংলা ভাষা প্রায় ভুলে গেছে । তাদের ছেলেমেয়েরা স্হানীয় স্কুলে পড়ে, ক্রমে সেই অঞ্চলের ভাষা রপ্ত করে ফেলেছে । হিমালয়ের তরাইতে খাঁটি ভারতীয় গোরু আর আছে কিনা স্টাডি করতে গিয়েছিলুম, দেখলুম পাঞ্জাবিরা তাদের জমিজমায় তাদেরই বেগার খাটাচ্ছে, কেননা জমিজমা দেবার সময় সরকার ভেবে দেখেনি যে জেলে, তাঁতি, ছুতোর, কামার, কুমোররা চাষবাস তেমন জানে না । তারা তো দেশভাগের আগে চাষি ছিল না।
অনেক আবোল-তাবোল কথা লিখে ফেললুম । কলকাতায় যাচ্ছো, সেখানের সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে পরিচয় হবে । আবার পরে চিঠি লিখব তোমাকে । মনে অনেক কথা জমে আছে । আসলে সময়ের অভাব । আমাদের বুড়ো-বুড়িকে সবকিছু করতে হয় । দুজনে যেটুকু পারি করি ।
সপরিবারে ভালো থেকো ।
শুভেচ্ছাসহ
মলয় রায়চৌধুরী
মুম্বাই
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২২
0 Comments