আত্মখনন আত্মহননেরই অপরপাঠ

চৈতন্য ফকির 

একবার ভালোবেসে – যদি ভালোবাসিতে চাহিতে তুমি সেই ভালবাসা!

       ~জীবনানন্দ দাশ

মানুষ এমন প্রজাতি সুসময়ে হুমড়ি খেয়ে পা চাটবে।আর দুঃসময়ে ছায়াও মাড়াবে না।আস্তে করে কেটে পড়বে।এই রকমের কিছু অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের সাথে দীর্ঘ ১০-১২ বছরের বন্ধুত্ব ছিলো শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিলো যাদের সাথে তাদের কেউ কেউ এমন আচরণ করছেন যেন ইহ জনমে পরিচিতই ছিলেন না। না চেনার মতো এই গম্ভীর সাতেপাঁচে নেই জীবন থেকে কারো উপকার এরা করেছেন বলে একটিও দৃষ্টান্ত নেই। তাও হাবভাব এমন যেন তারাই সকলের জন্য অবতারপুরুষ।
নিজেদের আত্মপরিচয়ের ভর কেন্দ্র যার নিকট পাঠিয়ে পরিচিত করালাম তিনিই আমাদের পরিচয় বাদ দিয়ে তেনাদেরকে গ্রন্থভুক্ত করে একখানা বই রাজ্যে পাঠিয়ে দিলেন আর উনারাও তা বগলে নিয়ে নিয়ে বেশ পণ্ডিত পণ্ডিত সাহিত্যিকমুখে সকলের নিকট নিজেদেরকে তুলে ধরার আগে একবারও মনে হয়নি এটা অন্যায়?
তাদের একবারও মনে হয়নি যার জন্য এই পরিচয় তাকেই যখন গ্রন্থ সম্পাদক নিচ্ছেন না তালিকায় তো তেনারাও এই গ্রন্থে না থাকাই সৌজন্যের হয়?
এসব কি আর সেই সকল বন্ধুদের মুণ্ডিতমস্তকে ঢুকবে বোকারাম?এই হল ফ্যাশন।
জীবনের প্রান্তিকবেলায় এত পরিচয় আত্মসম্মান পেয়েও মনে রইলো না কি করে কেমন করে কার জন্য এসব জুটলো?রাজ্যে বহিঃরাজ্যে এই যে আত্মপরিচয়ের বাজার হঠাৎ রমরমিয়ে গেলো তা কেন কেমন করে কার জন্য এসব সিঁড়ি কেউ মনে রাখে নারে পাগলা।শহীদবেদিতে ফুল দেবার সময় মনে রাখতে হয় শহীদদের ফুল দরকার নয় দরকার শহীদের ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা জানানো।
যদিও মানুষের মানবিক এই মূল্যবোধ পারিপার্শ্বিকের চাপে পড়ে হারিয়ে যায়।তাও কেউ কেউ তো মনে রাখা জরুরী। সকলের কথা নয়।সকল থেকে আশাও করা ঠিক নয়।কিন্তু মৃত্যুর মুখ থেকে হাসপাতালে পৌঁছে যে লোকটা আপনার পাশে থাকে সে যতই অন্যের দৃষ্টিতে কু হোক আপনিও সেরকমই বিচার করবেন!আপনিও চিঠি লিখে তুলে দেবেন শত্রুর শিবিরে আমারই বিরুদ্ধে?  
এতটা নীচ একজন দীর্ঘসময়ের শিক্ষক দীর্ঘ সময়ের কবি দীর্ঘ সময়ের সাহিত্যিক দীর্ঘ সময়ের বন্ধুরা হবেন ভাবতেও লজ্জা লাগে।ঘেন্না হয় এই মানুষগুলো ছিলো আমার বন্ধু। আমার কবি।আমার উপদেশক।আমার জীবনচক্রের চালিকাশক্তি! 
তারুণ্যের জয় হোক চাই। যারা আজীবন দিয়ে গেলেন,পাননি কিছুই  তাঁদের পরিচিতিকে আরো পরিচিত করতেই জীবনের ধারাপাত রচনা করেছি তিরিশবছর।অথচ একবারও মনে আসেনি তাঁদের না পাওয়ার মৌলিক কারণ হলো সে সকল পণ্ডিতেরা যে পাতায় খান সে পাতায় পটিও করেন সে জন্যেই দীর্ঘ জীবন তাদের হতাশার।
এই হতাশা দীর্ঘশ্বাস আমি পাঠ করতে পারিনি।এই ব্যর্থতা আক্ষেপ হিসেবে নিইনি জীবনকে আরো পরিশীলিতভাবে এগিয়ে নিতে কাজে লাগানোই জীবন থেকে পাঠ।
কাজ করতে ভুল হয়।ভুল বন্ধু নির্বাচন করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আজীবনেও গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না।আমি তা হাড়ে হাড়ে বুঝেছি। 
মানুষ কতটা স্বার্থপর হয় কি করে আগে থেকে জানা সহজ?কোনভাবেই সম্ভব নয়।
জীবনের সাথে জীবনকে চালাতে গিয়ে বন্ধু থেকে শত্রু থেকে বেইমান থেকে স্বার্থপর থেকে ধর্ষক থেকে যারা সিঁড়ি টপকাতে চায় তাদের থেকে প্রতিদিন পাঠ নিই জীবন এক নেশা।
জীবনের নেশার নিকট মাতাল যারা তাদের মদ দরকার নেই। তারা নিজেকে শহীদের মাথায় পা রেখেও প্রতিষ্ঠা করতে চায়-এই লজ্জাজনক ঐতিহ্যের ধারাবাহিক মানব প্রজাতিদের মনে রাখতে হয়।রাখি।
আমার আত্মশ্লাঘা হয় সে সকল বন্ধু সে সকল নকল উপদেশক সে সকল স্বার্থান্বেষনীদের মুখোমুখি হবার অলৌকিক শক্তি প্রকৃতি আমার জীবনের পরতে ঢেলে দিয়েছেন। আমি কৃতজ্ঞ আমার প্রকৃতির সাথে পিতার সেই শক্তি সঞ্চারিত।
আমি প্রতিমুহূর্তে পথ চিনতে পারি।সাময়িক বিচ্যুতিঠেকাতে কষ্ট হয়।তাও জীবন তো লড়াইয়ের অপরপাঠ সে পাঠ নিতে নিতে প্রকৃত অন্বেষার দিকে একদিন ঠিক পৌঁছে যাবে নিশ্চিত বিশ্বাস রাখি। 
আত্মহননের পর আত্মখননই আমার জীবনের শিক্ষা। জীবন এক নদী।জমাজলের নীচে পলি জমে।মাঝে মাঝে পলি সংস্কারকাজ করাও লাগে।জীবন থেকে ভুলগুলো সংশোধন করতে হবে।বহুমাত্রিক ত্রুটিগুলো কমাতে হবে।বন্ধু নির্বাচনে আরো একশতাধিক নির্ভুল হতে হবে।
পঞ্চাশের জীবনে এই শিক্ষা হোক আমার আত্মক্ষর। 

৩১:০৫:২০২১
সকাল:০৭টা
কুমারঘাট।