একজন গোবিন্দ ধর এবং একটি সুন্দর শহর আগরতলার কিছু কথা...||সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ


কোথায় থাকবো আগে থেকে সেটা ঠিক করা ছিল না। হোটেল রাজ প্যালেসে বুকিং দেইনি, ফোন করে বলে রেখেছিলাম। ট্যাক্সি ড্রাইভার প্রথমে হোটেল রাজ প্যালেসে নিয়ে গেল। কিন্তু কোনো সিঙ্গেল বা ডবল রুম খালি নেই। ড্রাইভারআমাকে আরো অনেক হোটেলে নিয়ে গেল। বইমেলা বলেই কোথাও সিট খালি নেই। অবশেষে বটতলায় রামজি নামে একটা হিন্দু হোটেলে সিট পাওয়া গেল।  অগত্যা কী আর করা। রাতটা তো কাটাতে হবে। সকাল হলে দেখা যাবে কী করা যায়! শেষমেষ সেখানেই উঠলাম। 
আগরতলায় ‘রাম’ নামের খুব আধিক্য। রামজি হোটেল, জয়রাম হোটেল, রাম রাম হোটেল ছাড়াও রাম নামে আরো অনেক হোটেল এবং প্রতিষ্ঠান আছে। বলতে গেলে আগরতলা শহরটায় রামময়। রামজি হোটেলটা খুব একটা খারাপ না হলেও ধূপের গন্ধের কারণে রাতেই হোটেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। পরদিন ২৬ মার্চ ভোর হতে না হতেই আগরতলার স্বনামধন্য প্রকাশক এবং আগরতলা প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাখাল মজুমদার (যিনি একাধারে একজন কবি, লেখক এবং এডভোকেট), বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যিক ও প্রকাশক হুমায়ুন কবীর ঢালী এবং ত্রয়ী প্রকাশনীর মাধবচন্দ্র দাস আমার রুমে এলেন। তারা আমাকে তাদের হোটেলে নিয়ে যাবার জন্য জোর দাবি জানালেন। কিন্তু আমি রাজি হলাম না। আমি বটতলার আশেপাশেই থাকতে চাইলাম।
সকাল দশটার দিকে কবি গোবিন্দ ধর আমার রুমে এলেন। হোটেল ছেড়ে দিয়ে তাকে নিয়ে নতুন আবাসনের খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম।
প্রথমে গেলাম মওলানা আবুল কালাম আজাদ পান্থ নিবাসে। বটতলার কাছেই। হাঁটা পথ। তারপরও আমরা এটা অটো নিলাম। এটা একটা সরকারি হোটেল (পান্থ নিবাস)। এখানে রুম পেয়ে গেলাম। রুমে লাগেজ রেখে কবি গোবিন্দ ধরসহ বটতলার মোড়েই একটা হোটেলে হায়দ্রাবাদী চিকেন বিরিয়ানি খেলাম। এখানে একটা কথা বলে রাখি, ত্রিপুরায় কোন  চিকেনটাই অন্যতম প্রধান খাবার। আমরা খুব তৃপ্তির সাথে হায়দ্রাবাদী চিকেন বিরিয়ানী খেলাম। খেলাম। খাওয়ার পর কবি গোবিন্দ ধর বইমেলায় চলে গেলেন। আমি রুমে ফিরে এসে বিশ্রাম নিলাম। বিকেলে বইমেলায় গেলাম। 
এখানে আগরতলা আন্তর্জাতিক বইমেলা নিয়ে কিছু কথা বলা নেহায়েত অপ্রাসঙ্গিক হবে বলে আমার মনে হয় না। ১৯৮১ সালে আগরতলা বইমেলা সরকারিভাবে শুরু হলেও অনেকের মতে তারও অনেক আগে ১৯৬১ সালে বিলোনীয়া বিদ্যাপীঠ স্কুল মাঠে  আগরতলায় প্রথম বইমেলার আয়োজন করা হয়েছিল। এরপর ১৯৬৪ সালে সোনামুড়া এন সি ইন্সটিটিউশনে বইমেলার আয়োজন করা হয়। এ বছর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বই বিক্রয়ের জন্য একটি স্টল ছিল। ১৯৭৮ সালে বিশ্ব যুব উৎসব উপলক্ষে কয়েকটি স্টল নিয়ে আগরতলায় একটি ছোট্ট বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। সেই বইমেলার হাত ধরে  কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা শুরুর ৫ বছর পরে ১৯৮১ সালের ৩০ মার্চ ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী  নৃপেন চক্রবর্তীর উদ্যোগে রবীন্দ্রশতবার্ষিকী ভবনে সরকারিভাবে এই আগরতলা আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজন করা হয়। দিল্লী আন্তর্জাতিক বইমেলা ও কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলা'র মতই আগরতলা বইমেলাটিও ভারতের খুবই জনপ্রিয় একটি বইমেলা।
ত্রিপুরা ছাড়াও দিল্লী, কলকাতা, আসামসহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ এবং বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ এই মেলায় অংশগ্রহণ করে। ১২ দিনের এই মেলাটি প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে অথবা মার্চ মাসে শুরু হয়ে থাকে। ২০২০ সালের পূর্ব পর্যন্ত এই ১৯ বছর বইমেলাটি আগরতলা শিশু-উদ্যান বা উমাকান্ত একাডেমিতে (আবুল কালাম আযাদ পান্থ নিবাসের পাশেই) অনুষ্ঠিত হলেও ২০২০ সাল থেকে বইমেলাটি আগরতলা শহর থেকে খানিকটা দূরে হাপানিয়া আন্তর্জাতিক মেলা মাঠে স্থানান্তরিত করা হয়। ত্রিপুরা সরকারের তথ্য ও পর্যটন দপ্তর এই মেলায় প্রতিদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে।
২০২০ সালে আমি যখন আগরতলার হাপানিয়ায় বইমেলায় গিয়েছিলাম তখনই বিষয়টি আমার নজর কাড়ে। বটতলা থেকে অটোতে ২০ রুপি ভাড়া। ২০২০ সালে ছিল ১০ রুপি। সে কারণে, মেলা কর্তৃপক্ষ আগরতলা থেকে মেলা পর্যন্ত ফ্রি বাসের ব্যবস্থা করেছে। যাতে করে অনেক মানুষ মেলায় যেতে উদবুদ্ধ হয়। মেলার স্টল ও ব্যানারগুলো একই রকমের হওয়ায় সহজেই নজর কাড়ে। অঙ্কনচিত্র ও ফুল দিয়ে সাজানোয় মেলার আরো শ্রীবৃদ্ধি সকলকে আকৃষ্ট করে।
বিকেলে বইমেলায় গেলাম। গোবিন্দ ধর আগেই চলে গিয়েছিলাম। জম্পেস আড্ডা চললো। একটা কফি শপে গোবিন্দ ধরসহ মাটির ভাড়ে কফি খেলাম। স্রোত প্রকাশনীতে জম্পেস আড্ডা জমলো। 
এখানে একটা কথা বলে রাখি, আগরতলা শহরটা খুব একটা বড় নয়। ছোট হলেও খুব সুন্দর এবং ছিমছাম একটা শহর।  এই শহরে রবীন্দ্র ভবন, রাজবাড়ি, জগন্নাথ মন্দির, হাওড়া নদীসহ অনেক সুন্দর সুন্দর দেখার মতো জায়গা আছে। আগরতলা শহর ছাড়াও মনোরম নদী আর পাহাড়ঘেরা এই রাগ্যে মেলাঘর নীর মহল, ছবিমুড়া লেক, বিলোনিয়া পার্ক, বিশালগড় চা বাগান, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরো অনেক দেখার মতো জায়গা রয়েছে। যা কিনা সকলের ভালো লাগবে।
পরদিন সকালে মেলাঘর গেলাম। ত্রিপুরার রাস্তাগুলো অসম্ভব সুন্দর। পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে। ছায়া ঢাকা সবুজ বন আর বিশাল গড়ের চা বাগানের পাশ দিয়ে পাহাড়ী রাস্তায় মুগ্ধতা ছড়াতে ছড়াতে মেলাঘরটা দেখে এলাম।
২৮ মার্চ বিকেলে স্রোতের ৫টি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান এবং আমাকে ও শিশুসাহিত্যিক হুমায়ুন কবীর ঢালীকে স্রোত  সম্মাননা প্রদান করা হয়। একটি চমৎকার অনুষ্ঠান ছিল। কবি গোবিন্দ ধরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও ভারতের কবি-লেখকদের এই সম্মাননা প্রদানের কর্মকাণ্ডটা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। নতুন বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের পর স্রোত প্রকাশনীর সামনে শুরু হয় কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান। রাত ন’টা অবধি চলে সে অনুষ্ঠান। একটি আনন্দময় সন্ধ্যা কাটিয়ে রুমে ফিরতে রাত দশটার বেশি বেজে যায়।
এরপর ফেরার পালা। মেয়েদের জন্য কিছু কেনাকাটা করলাম। কিনবো কী! বইয়ের ভারেই তো অস্থির। বিদেশ থেকে বই টেনে আনা যে কতোটা কষ্ট সেটা যারা আনেন তারাই জানেন। তারপরও আমি আমার জীবনে কারো গিফট করা বই বা অন্য কোন জিনিস রেখে আসিনি। যে যা দিয়েছেন তাদের সে ভালোবাসার উপহার নিয়ে এসেছি এবং সযত্নে রেখে দিয়েছি। কবি গোবিন্দ ধর তার প্রকাশনীর রবীন্দ্র গুহ’র নির্বাচিত উপাখ্যান’, গোবিন্দ ধর সম্পাদিত নির্বাচিত অসমীয়া ছোটগল্প’, ‘মুখোমুখি বিকাশ সরকার’ এবং ‘ধর্ষণ বিরোধী কবিতা’ উপহার দিলেন। রাখাল মজুমদার দিলেন ‘ত্রিপুরার নির্বাচিত কবিতার পান্ডুলিপি’ বইটি। কবি দেবযানী দত্ত দিলেন তার ‘তুমি অভিমণ্যু’ এবং ‘ভেনাস ক্যাফে’ দু’খানা কবিতার বই। প্রদ্বীপ কুমার ভৌমিক দিলেন ‘আলন্তি পালনে ত্রিপুরার কপালী সমাজ বইটি। আরো অনেকে তাদের বই, লিটল ম্যাগাজিন ও পত্রিকা দিলেন। আমি সবার ভালোবাসার উপহার সযত্নে বয়ে নিয়ে এলাম।
ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় আমার যাওয়া হচ্ছে না। তৃতীয় আগরতলা লিটিল ম্যাগাজিন মেলার আয়োজক, অতিথি, অংশগ্রহণকারীসহ সকলের জন্য শুভ কামনা রইলো। মেলা সফলভাবে শেষ হবে এটাই প্রত্যাশা।



সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ
কবি, কথাসাহিত্যিক, বহুমাত্রিক লেখক ও সাহিত্য সংগঠক,বাংলাদেশ ও ভারত থেকে প্রকাশিত চার শতাধিক বইয়ের লেখক,সভাপতি, বাংলাদেশ লেখক পরিষদ,সম্পাদক, পঙক্তি