ত্রিপুরার ছড়ায় অন্যমাত্রা এনেছে অমলকান্তি চন্দ 

গোবিন্দ ধর

কবি ও ছড়াকার অমলকান্তি চন্দ
মুখে মুখে লেগে থাকে তার কত ছন্দ।
"অদ্বৈত স্মৃতি স্মারক সম্মান ২০১৭"  
পাচ্ছেন রসমালাই সম্পাদক তরুণ ছড়াকার 
অমলকান্তি চন্দ।তার "ছড়ায় ছন্দে বিজ্ঞান "বইটির জন্য এই সন্মান পান তিনি। তার ছড়ায় বিজ্ঞান থেকে ভুত,শিশুদের ছড়া থেকে বড়দের ছড়াও পরিলক্ষিত হয়।ঠিক এখানেই অমল হয়ে উঠন অমলকান্তি চন্দ। ছড়ায় ছন্দ   মাত্রা তাল লয়ের দারুণ মিশেল যা তাকে দিয়েছে বিশেষমাত্রা।
স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত,"আয়না উড়ি" ছড়া সংকলনও ত্রিপুরার ছড়ার জগতে একটি উল্লেখযোগ্য সংকলন।আমাদের স্রোত পরিবারের শুভেচ্ছা তার আরো সমৃদ্ধি হোক।
তার কাছে কয়েকটি প্রশ্ন ছুঁড়ে ছিলাম। সেও আমার কৌতুহল নিবারণের চেষ্টা করেছে।এগুলো ছড়াপ্রিয়দের জন্য সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করা হলো।

গোবিন্দ :
কবে থেকে লেখালেখি শুরু?

অমলকান্তি :নব্বইয়ের দশক থেকেই আমার লেখালেখি শুরু। আমার খুব মনে পড়ে, তখন আমি ক্লাস নাইনের ছাত্র। ত্রিপুরার দৈনিক পত্রিকারগুলোতে প্রচুর ছোটদের গল্প এবং ছড়া বেরিয়েছিল। 

গোবিন্দ :২
লেখতে গিয়ে কেন মনে হলো ছড়া তোমার লেখা দরকার?

অমলকান্তি :আপনি যে ভাবে বলেছেন, ছড়া নিয়ে আমি ঠিক সেভাবে ভাবিনি। কিন্তু এটাও ঠিক যে, লেখার শুরু থেকেই আমি ছড়াকে  ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি। আমি মনে করি সরল শিশুরা মায়ের মুখে শুনা ছন্দের পাঠ দারুণ ভাবে উপভোগ করে ।আর শিশু মনকে আনন্দ দেওয়াই আমার লক্ষ্য ছিল। 

গোবিন্দ:৩
ছড়ার ছন্দ কিরকম আয়ত্বে আনলে?

অমলকান্তি :আমি মনে করি, ছন্দটা সকলের সহজাত প্রবৃত্তি। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে রাত ঘুমানো পর্যন্ত আমার সকলে ছন্দেই চলি। এইভাবে চলতে চলতে সময় কেমন তালে তালে ছুটে যায় অক্ষরের ভেতর, শব্দের ভেতর, তিলে তিলে শুরু হয় আমার ছন্দ শিক্ষা। স্বরবৃত্তে দোলনা দোলা। 

গোবিন্দ :৪
ছড়ায় কি শুধু আবোলতাবোল লিখো?

অমলকান্তি :আমি আপনার কথায় একমত নই। ছড়ায় যেমন গাছ ,পাখী,ফুল, প্রজাপতিরা হাসতে থাকে, খেলতে থাকে, ঠিক তেমনি রোমাঞ্চকর কোন দৃশ্যপটও শিশুরা ভালবাসে। নিজকে নায়ক ভাবে তারা। ছড়ায় শিশুদের উপযোগী সরল ছবি আঁকা হয় কল্পনার সাগর পাড়ি দিতে দিতে। আপনি যে বললেন, তার মাঝেও দৃশ্যমান হাস্যরস থাকতে হবে। 

গোবিন্দ :৫
ত্রিপুরার ছড়ার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লিখো?

অমিলকান্তি:ত্রিপুরার শিশু সাহিত্যের আঙ্গিনায় পা রাখলে দেখা যায় অবিভক্ত ত্রিপুরা এবং আজকের ত্রিপুরায় অনেক শিশু সাহিত্যিক শিশুদের মনোজগতে বিচরণ করছেন। বিভিন্ন রসাত্মক কাহিনী এমনকি লোক মুখে প্রচলিত কাহিনী গুলো গল্পের আকারে কিংবা ছড়া কমিকসের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়ে আসছিল। ত্রিপুরার শিশু সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে সত্তরের দশক থেকে শিশুদের সঙ্গে বড়োদের ছেলে খেলা বেশ জমে উঠেছিল। চুনী দাশ, বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী, অপরাজিতা রায়, অনিল সরকার, অনিল কুমার নাথ থেকে শুরু করে গোবিন্দ ধর,  অপাংশু দেবনাথ, পদ্মশ্রী মজুমদার, অমলকান্তি চন্দ, জোর্তিময় দাস,গৈরিকা ধর সহ আরো অনেক শিশু সাহিত্যিক ত্রিপুরার শিশু সাহিত্যকে এক উচ্চতার শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন।

গোবিন্দ :৬
তোমার ছড়ায় কারো প্রভাব আছে মনে করো?

অমলকান্তি :আমি বরাবরই তা মানি না। আমি মনে করি সকলের নিজস্বতা থাকা দরকার। আর তা না হলে অমলকান্তির ছড়া আলাদা করে পড়বে কেন পাঠক। 

গোবিন্দ :৭
ছন্দ শেখার সহজপাঠ কি হতে পারে?

অমলকান্তি:আমি মনে করি অনুশীলনই একমাত্র ছন্দ শিক্ষার সহজ পাঠ হতে পারে। 

গোবিন্দ :৮
শিশুতোষ ছড়া বলতে ঠিক কি বুঝায়?

অমলকান্তি :ছোটদের উপযোগী করে লিখা ছড়া বলতেই আমরা শিশুতোষ ছড়া বুঝি। সরল শব্দ দ্যোতনায় স্বর বৃও ছন্দের দারুণ চলন ভঙ্গিমা। যা গাছ, পাখীদের কথা বলবে। রসাত্মক আমেজের মধ্যে দিয়ে শিশুদের কল্পনার জগতে বিচরণ করতে উৎসাহী করবে। 

গোবিন্দ :৯
আমাদের রাজ্যে শিশুদের বয়স অনুসারে ছড়া কিংবা অন্য কিছু লেখা হয়?না হলে কেন?

অমলকান্তি :মোটেই হয় না। আমরা বুড়োরা যারা শিশুদের সঙ্গে ছেলে খেলা খেলতে আসি, আমাদের মধ্যেই এই অক্ষমতা প্রকাশ পায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের মত আমাদের রাজ্যে বয়স অনুসারে শিশু সাহিত্য রচনা মোটেই হয়ে উঠে না। 

গোবিন্দ :১০
শিশুদের পাঠ্য তালিকায় কি ত্রিপুরার সাহিত্য ছড়া কবিতা নাটক রাখা দরকার?

অমলকান্তি :নিশ্চয়ই রাখা দরকার। হাতে গুণা দু একজনের ছড়া পাঠ্য তালিকায় আছে। আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছি। 

গোবিন্দ :১১
তুমি তো কবিতাও লেখো?কবিতা বলতে কি বুঝো?

অমলকান্তি :
কবিতা আমার সংসার। সংসারের প্রতিটি মানুষের সাথে যেমন মায়া মায়া খেলা চলে কবিতার সাথে ঠিক তেমনি। রোজ সকালে রান্নার পসরা সাজিয়ে বসেন আমার স্ত্রী। কটু কথায় মাঝে মাঝে আমার কবিতার শরীরে  আগুনের আঁচ লাগে ।আরেকটু দূরে সরে বসি। সংসারী হওয়ার চেষ্টা করি। আগুনের তাপে তাপে সংযমী হওয়ার চেষ্টা করি। কবিতাকে ভালোবাসি বলে আমিও রান্নার পসরা সাজাই। শব্দেরা কখনো হলুদের রং-এ, কখনো রাঙ্গা মরিচের রং-এ পুরণ দিলেই সুস্বাদু গন্ধ ছড়ায়। ভবঘুরে আমি, আমার মাঝে তিলে তিলে জেগে উঠে মোহ। এক সমুদ্র ঘোরের মাঝে পাল তোলা জীবন ডিঙ্গিটা টলতে টলতে ছুটতে থাকে নিলাচলে। আমি আমার মাঝে বাঁচতে শিখি, আমি কবিতাকে ভালোবেসে বাঁচতে শিখি। জীবনের পাঁচমিশালী রং-এ সাজতে থাকে আমার কবিতা। 

গোবিন্দ :১২
তোমার কবিতা ভাবনা বিস্তৃত বলো?নতুন আসা কবিদের কাজে আসবে।

অমল:কবিতা ভাবনা এমন বলছি :

কবিতার হাত ধরে সেদিন বাজারে গিয়েছিলাম। বিশাল বই বাজার। খারাং ভর্তি জুম কাকলুর ছবি। ঝলমলে প্রচ্ছদের আড়ালে লিখা ছিল মেয়েটির কথা। মেয়েটি স্টেশনের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। আরো কাছে… .।আমি মেয়েটির কোলে মাথা রেখে ডুব দেই স্বপ্নের  সায়রে ।

কবিতার সাথে অবৈধ প্রেম যেন কত কালের। তিলে তিলে বেড়ে উঠা আক্ষেপগুলো সারারাত দাঁড়িয়ে থাকে চৌমাথার মোড়ে। সটান শরীরের চওড়া ঠোঁট দুটো নিরিবিলি লেপ্টে দেয় আমার ঠোঁটে। আমি চোখ দুটো বড় বড় করে ধমক দেই। শাসন করি। ঝুঁটি ধরে টানতে থাকি দাড়ির ভেতর। আমি তাও বুঝি কবিতাকে শাসন করার অধিকার এখনও আমি অর্জন করতে পারিনি। 

আমি কবিতাকে দুভাবে দেখি।  মেধা দ্বারা শাসিত কবিতা আর ডুগডুগির তারে বেজে উঠা কবিতা। কবিতাকে শাসন করার জাদু কাটি একেক কবির হাতে একেক মাপের হয়। ছোঁয়াতে  অন্তর আত্নার প্রেষণ ক্রিয়ার উদয় হয় সন্তপর্ণে। কেমন ঘোরের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত সময়কে পায়ে শেকল পড়িয়ে দিতে দিতে কোন একটা দৃশ্যপটকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করি মাত্র। স্বতন্ত্রতা আমার কাছে কেবলই পৃথক পৃথক ঘরাণার পরকীয়া মুহূর্ত। 

অনেক কবিরা অন্য কবির লেখায় নিজের লেখার ছাপ বুঝতে পারেন।ভালোবাসার সুরে বলতে শুনা যায় আমার লেখা থেকে একটু দূরে থাক বাপু। মোদ্দা কথা হল যে পাতিলে দই ও রাখা যায় আর সিঁদলও রাখা যায়। টক দই যেমন সুস্বাদু তেমনি সিঁদলের গোদক ও সুস্বাদু। দুই পর্যায়ে আলাদা আলাদা উপকরণের প্রয়োজন হয়। পচন ধরার জন্য যে শারীরিক ভঙ্গিমা প্রযোজন তা মোটামুটি একই ধরনের। 

সময়ের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠা খুব প্রয়োজন কবিদের। আমার দ্বারা প্রবাহিত সময়কে আন্দোলিত করার প্রয়াস নিত্যকাল বহতা নদীর মত । কবিতায় প্রতিচিত্রগুলো নিজেদের সাবলীলতা বজায় রাখার মধ্যে দিয়ে এক একটি কবিতার জন্ম হয়। কবিতাগুলো ভালোবাসার আঁতুড়ঘরে লালিত হয় চিরকাল। কবিতাকে ভালোবেসে সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়ার যে পরম অনুভূতি তা আমি প্রতি মুহূর্ত অনুভব করি। ভালোবাসার মায়াজালে কেবলই আটকা পরে সময়।কবিরা ছুটতে থাকেন মায়াজাল ভেদ করে। 

এবার আসা যাক আমার কথায়। দুচোখের ছিটকিনি খুলে দিলেই এক মুখ হাসি  নিয়ে রোদেরা আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। আমার তর্জনীকে কষে ধরে নিয়ে যায় আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথে। আমিও মহা আনন্দে হাঁটতে থাকি। বুকের বাঁ দিকের ছিপি খুলে দিলে উত্তরের বাতাসেরা হো হো করে ঢুকে যায় আমার ভেতর। নাচতে থাকে বাতাসেরা ।সৃষ্টির মহা উল্লাস… ….।শব্দেরা গুটি গুটি পায় ভীড় করে আমার উঠোনে। 
তাদের নিয়ে যাই পাহাড়ের ঢালে। টাক্কলের খোঁচায় খোঁচায় জুমে বেটি, রাঙা দিলং আর কতকি ধানের বীজ বপন করি। একদিন গর্ভবতী হয়ে উঠে আমার কবিতা, রাতের নিঃশব্দে গর্ভবতী হয় জুম। 

কবিতাকে ভালোবাসি বলে কত রাত জাগি। দীর্ঘ রাত।ঘুমন্ত সাপিনীর মত শ্বাস ফেলে যায় উলঙ্গ আঁধার মানবী। তাল টুকে টুকে গাইতে থাকি। শব্দগুলো উড়তে থাকে নিশাচর পাখীর ডানায়। চাঁদ উঁকি দেয় মিটমিট করে জ্বলে থাকা তারাদের মুখমণ্ডল ঘেষে। স্বপ্নের শায়রে সাঁতার কাটতে কাটতে আমিও ছুটে যাই পাঠকের দরবারে। আলতো করে চুমু খেলে, বুকে জড়িয়ে ধরলে সেকি মহা আনন্দ। শব্দের সাথে পাঠকের ভাব তৈরী করে দিতে পারলে তবেই পাঠক ও কবিদের মধ্যে ভাব বিনিময়ের পর্বটা দারুণ ভাবে জমে উঠে। 

শূন্য মাটির ঘড়ার বুকে ফোঁটা ফোঁটা শিশিরে ছল চাতুরীতে ভরে উঠে নিশাচরীর পূর্ণ অবয়ব। কবিতাকে ভাঙতে থাকি কেবল শব্দছকে। শব্দগুলো ভন ভন করতে করতে কানের কাছে উড়তে থাকে। চারিদিকে কেমন ক্ষুধার্ত মানুষের সুর। শূন্য থালার ঝন্ ঝন্ আওয়াজ। আধুলির ঠোকাতে জেগে থাকে রাত। আমার আড়াল করা কঠিন বিস্মিত রাত। ফুটপাত থেকে সোজা রাজ পথ ধরে ছুটে চলে কালো অবয়বদের মিছিল। আমি সামনে চলি। কবিতায় গর্জে উঠে উড়াল মুষ্টি। 

 প্রকৃতি সাথে আমি নিত্য দিন খেলা করি ।কবিতার রূপ, গন্ধ, মাধুর্য কেমন যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে প্রকৃতির সাথে। বকটা অনেক ক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে ঝর্ণার ধারে। যেন ধ্যানরত ঈশ্বর। বোবা ঈশ্বর। এক লহমায় উড়াল ভঙ্গি। আবার ঘোর নীরবতা। আমি চুপি চুপি পা ফেলে হাঁটতে থাকি। ঝরণার গর্জন
মুখর চঞ্চল স্রোত, স্বর বৃত্তের তালে তালে ছুটতে থাকে সমতলের দিকে। আমার শরীরের লোমকুপে ঘর বাঁধে পাহাড়ের উলঙ্গ বাতাস। শীতল হয়ে উঠে কবিতার শরীর। শাল পাতায় জড়িয়ে দেই সযত্নে।  ঘুম ভেঙ্গে ভোরের আকাশে উড়তে থাকে কবিতা। সাদা বকেদের মত আমার ঈশ্বর। কেবল অসীমে একাকার হয়ে গেলে গাইরিঙ-এ শুয়ে থাকে দিগম্বর বাউলের একা একতারা। 

আমার উঠোনে পৌষ পার্বনের কীর্তন। খোল, করতাল, কাসা, হারমোনিয়ামের বিভিন্ন মেজাজের সুরগুলো একাকার। যেন কোন মিশ্র অনুভূতির মধ্যে দিয়ে গান জানা পাখীটা উঠোন পরিক্রমা করে গেয়ে যাচ্ছে। আর আমার কলমের ডগায় কথাগুলো ধিতাং ধিতাং তালে বার বার নেচে উঠছে। লুটের সময় উঠোন ভর্তি মানুষ যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে নাচে ঠিক যেন সেভাবেই। আমি আমার লেখাগুলো আপনমনে আওড়াতে থাকি। ফুল, পাখী, গাছ, মাঠ নদীরা আপন মনে ছুটে আসে আপনভোলা কিশোরের কাছে। আমি ছুটে যাই আমার শৈশবে। মনে পড়ে লক্ষী পূর্ণিমার রাতের কথা। বন্ধুরা মিলে নারিকেল চুরি করার কথা। নদী চরে বালুর চাদরে লুটোপুটি খেয়ে সেই আজব কুস্তিগিরির কথা।শিশুমনকে কলমের আঁচড়ে কেমন নিয়ে যাই কল্পনার যাদুঘরে। 

জম্পুই আমার কবিতা শরীর। নব বধুর রূপে কেবলই আড়াল করা গোমটার ভেতর কি অপরূপ লাগে তোমাকে। আমি সারা জীবন তোমাকে ঘোমটায় আড়ালে দেখতে চাই আমার প্রিয় কবিতা। তোমার প্রেয়সী রূপ বার বার আমাকে কাছে টানে। বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করে। কিন্তু তোমার অন্য রূপেও আমি আকৃষ্ট হই। মিজো তরণীর শরীরে কবিতার অবগাহণ এক উড়াল চাতক পিপাসা। আমি পিপাসা কাতর রাতের নাভী কুণ্ডে নীরবে ঝাপ দেই, আমার কবিতার কাছে। মেঘ, কুয়াশার খেলায় তোমার কমলা স্তন যুগল সবুজ পাতার ফাঁকে আমাকে কেবল ইশারায় ডাকে। আমি পাগলের ছুটি জিন্স, টপ পরা আমার ভালোবাসার মিজো কিশোরীর কাছে। খোঁপায় গুঁজে দেই অলীক খুমপুই আকাশ। চোখে মেঘেরদের ঘোর। দিগন্তে কালো কাঁজল রেখা… ...।সারি সারি কুপি বাতিগুলোর ভীড়ে জেগে থাকে উড়াল প্রহর। 

কবিতা আমার সংসার। সংসারের প্রতিটি মানুষের সাথে যেমন মায়া মায়া খেলা চলে কবিতার সাথে ঠিক তেমনি। রোজ সকালে রান্নার পসরা সাজিয়ে বসেন আমার স্ত্রী। কটু কথায় মাঝে মাঝে আমার কবিতার শরীরে  আগুনের আঁচ লাগে ।আরেকটু দূরে সরে বসি। সংসারী হওয়ার চেষ্টা করি। আগুনের তাপে তাপে সংযমী হওয়ার চেষ্টা করি। কবিতাকে ভালোবাসি বলে আমিও রান্নার পসরা সাজাই। শব্দেরা কখনো হলুদের রং-এ, কখনো রাঙ্গা মরিচের রং-এ পুরণ দিলেই সুস্বাদু গন্ধ ছড়ায়। ভবঘুরে আমি, আমার মাঝে তিলে তিলে জেগে উঠে মোহ। এক সমুদ্র ঘোরের মাঝে পাল তোলা জীবন ডিঙ্গিটা টলতে টলতে ছুটতে থাকে নিলাচলে। আমি আমার মাঝে বাঁচতে শিখি, আমি কবিতাকে ভালোবেসে বাঁচতে শিখি। জীবনের পাঁচমিশালী রং-এ সাজতে থাকে আমার কবিতা। 

মৃত্যুই চিরন্তন সত্য। আমরা যারা বেঁচে আছি তা নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্চর্যজনক ঘটনা। জীবনকে টানতে টানতে নিয়ে যাই  কৃষ্ণগহ্বরে ভেতর। কঠিন সময় বার বার আন্দোলিত হয়।জেগে উঠে অন্তর আত্না। কালো কালো অক্ষরগুলো নিরিবিলি ভীড় করে কলমের ডগায়। আমি লিখে যাই জীবনের কথা, আমি রচনা করি সাদা বরফের চাদর ঘেরা সটান মৃত্যু উপত্যকা। কঠিন সত্যকে যারা এক দিন সাদরে বরণ করেছিল আমার পূর্বজদের কাছে দেওয়া কথা আমিও রাখতে চাই বিভব। মৃত্যুর স্বপ্নিল আলিঙ্গনে আবদ্ধ হওয়ার খুব ইচ্ছে হয় আমার যেমনটি কবিতার কাছে নীরবে জীবনটি সঁপে দেওয়ার মত।কেবল ঘূর্ণি হয়ে ঘুরতে চাই এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভেতর। আমার লোভ, লালসা, আমার ঐশ্বর্য সব সঁপে দেই কবিতা তোমাকে। 

গভীর টানাপোড়েনের মাঝে আমি বাঁচতে শিখি। কবিতার আঙুল ধরে হাঁটতে হাঁটতে ছুটে যাই দেও মোহনা থেকে জামারাই পাড়া ছেড়ে মায়াবী জম্পুই-এর কোলে। ছুটে যাই আনন্দ বাজার থেকে সদাইহাম পাড়া হয়ে মনচুয়াং -এ। আমার ভালোবাসার 
কিশোরী জম্পুইকে যেন কত কাল জড়িয়ে ধরে আছি। ঠোঁটে চুমু খেলে কেমন হলুদ হয়ে উঠে কাকচাংটি, তেইদের কমলা গাল। কেবল কবিতা হয়ে উঠে প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে,আমার বুকের কাছে নিঃশ্বাস ফেলে যায় আজনা আদিমা মানবী।

গোবিন্দ:১৩
তোমার কবিতা বইয়ের নাম বলো?কেমন হয়েছে বলে মনে হয়?পাঠক কিরকম নিয়েছে বইটি?

অমলকান্তি :আমার দুটো কবিতার বই এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে। প্রত্নমুহূর্ত আর ভালোবাসা পাথর কুচি। 

সব সৃষ্টিতো সন্তানের মত। সন্তানকে যারা ভালোবাসেন তারা ঠিকই বুকে টেনে নিয়েছেন। 

গোবিন্দ :১৪
ইদানিং ত্রিপুরায় অনুগল্প চর্চা চলছে।তুমিও লিখছো।তা কেমন লাগছে?

অমলকান্তি :ছড়ার মত অণুগল্প লিখতে আমার খুব ভালো লাগে। আমি মনে করি অণুগল্পের শারীরিক গঠন ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও জীবনের কথা বলে। 

গোবিন্দ :১৫
ছড়া কবিতা অনুগল্প কোনটিতে তুমি সাবলীল? 

অমলকান্তি :যেহেতু আমার ছড়া লেখা দিয়ে লেখালেখি শুরু, তাই ছড়াতে আমি সাবলীল। 

গোবিন্দ :১৬
ভবিষ্যত পরিকল্পনা বলো?

অমলকান্তি :শিশুদের নিয়ে কাজ করতে চাই। 

গোবিন্দ :১৭
তুমি লিটল ম্যাগাজিন "রসমালাই" সম্পাদনাও করছো।কেমন লাগে।উল্লেখযোগ্য সংখ্যা কি রসমালাইয়ের?সামনে কি কোন পরিকল্পনা আছে?

অমলকান্তি :.আমি রসমালাইয়ের প্রতিটি সংখ্যাকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যা মনে করি কারণ রসমালাই বরাবর নবীনদের জায়গা করে দিচ্ছে। আর এভাবে কাজ করতে ভীষণ ভালো লাগে। ত্রিপুরার ছড়াকারদের নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে আছে। 

গোবিন্দ :তোমার বইগুলোর নাম বলো?

অমলকান্তি :.১)আয়না উড়ি (ছড়া) ২)হাসির ছড়া পোস্ত বড়া (ছড়া) ৩)ছন্দ ছড়ায় বিঞ্জান ৪)চচ্চড়ি (ছড়াযৌথ) ৫)প্রত্নমুহুর্ত (কবিতা) ৬)ভালোবাসার পাথরকুচি (কবিতা)।। 

গোবিন্দ :১৮
সম্মান ও পুরস্কার বলো?

অমলকান্তি :অদ্বৈত মল্ল বর্মন পুরস্কার, ও স্রোত পুরস্কার। 
স্রোত সাহিত্য পুরস্কার। 

গোবিন্দ :২০
ত্রিপুরার সাহিত্যের ভবিষ্যত কি হবে বলে মনে করো?

অমলকান্তি :আমি মনে করি ভালো। উত্তর পূর্বাঞ্চলে ত্রিপুরার লেখালেখি আলাদা ভাবে সনাক্ত করা যায়। লেখালেখিতে নবীন প্রবীনদের সমন্বয় সাধন ঘটছে। এটা সবচেয়ে ভালো দিক। 

গোবিন্দ :২১
ত্রিপুরার ছড়া কি আলাদা করা যায়?

অমলকান্তি :বর্তমানে ত্রিপুরার ছড়াকে আলাদা করা যায়। 

গোবিন্দ :২২
এখন অব্দি তোমার উল্লেখযোগ্য কাজ কি?

অমলকান্তি :রসমালাইয়ের সম্পাদনা। 

গোবিন্দ :২৩

কিসে আনন্দ পাও?
অমলকান্তি:ছড়া ও কবিতা লিখতে। 

গোবিন্দ :তোমার সাহিত্য জীবনে সাফল্য আসুক।শুভেচ্ছা। 

০৪:০৪:২০১৯