দোলনা
১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা 
সম্পাদক, প্রকাশকঃ গৈরিকা ধর 
প্রচ্ছদঃ গৌরব ধর 
হালাইমুড়া, কুমারঘাট, ঊনকোটি থেকে প্রকাশিত
মূল্য -৩০ টাকা।

আলোচনা :শ্যামল বৈদ্য
সম্পাদক, প্রকাশক গৈরিকা ধর আমার কাছে সত্যি বিস্ময়! ফুটফুটে প্রাণচঞ্চল মিষ্টি বছর দশকের মেয়েটি শিশুদের একটি কাগজ সম্পাদনা করছে! বলতেই হয় ‘ধন্যি মেয়ে’। যদিও প্রথম পাতায় এটা স্বীকার করা হয়েছে যে, বিশেষ সহযোগিতায় রয়েছেন গোবিন্দ ধর এবং পদ্মশ্রী মজুমদার। এটাই তো স্বাভাবিক বছর দশ-এগারোর একটা বাচ্চা ছোটোদের একটা কাগজ সম্পাদনা করা কি চাট্টিখানি কথা? তবে শুধু সম্পাদনাই করুক গৈরিকা, প্রকাশক হবার দরকার নেই। এই কাজটা তার পিতৃদেবের হেফাজতে থাকলেই আমরা নিশ্চিন্ত বোধ করি। (যদিও মতামত একান্তই আমার ব্যক্তিগত।) 
সুন্দর প্রচ্ছদ এঁকেছে গৌরব, মনে হয় বোন গৈরিকাকেই এঁকেছে সে মন দিয়ে। দোলনায় যে বালিকাকে দেখছি তা অবিকল গৈরিকার মতোই। গৌরবের প্রচ্ছদ করার হাতটা বেশ ভাল। শুরুতেই সম্পাদকের সাম্প্রতিক সাহিত্য প্রসঙ্গে ভাবনা আমরা জানলাম। দক্ষিণ ত্রিপুরায় গিয়ে সে কী কী কাণ্ড করেছে/দেখেছে তারই রোজনামচা।  
এ ছাড়া যারা লিখেছেন –
ত্রিপুরার ছড়াঃ বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী, রণজিৎ রায়, জ্যোতির্ময় রায়, শচী চৌধুরী, অপাংশু দেবনাথ, গোবিন্দ ধর, পদ্মশ্রী মজুমদার, অমলকান্তি চন্দ, অভীককুমার দে, গোপালচন্দ্র দাস, সুমিতা পালধর এবং দীপেন চক্রবর্তী। 
শিশুমহলঃ গৈরিকা ধর, দ্বৈপায়ন নাথ, অমিশা দাস এবং দিগঙ্গনা কর।  
উজ্জ্বল উদ্ধারঃ সেলিম মুস্তাফা। 
আসামের ছড়াঃ মৃদুলা ভট্টচার্য।  
বাংলার ছড়াঃ সুশান্ত নন্দী।  
বাংলাদেশের ছড়াঃ জয়দুল হোসেন, দেবব্রত সেন।  
শিশুদের সাহিত্য নিয়ে আমার জীবনে দুটো মজার ঘটনা আছে সেগুলি একটু বলে নেই। আমাদের গর্ব প্রবাদপ্রতিম শিশু সাহিত্যিক বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী আমার কাছে ‘ঝিনুক’-এর জন্য একবার গল্প চাইলেন। এই কম্মটি আমি তার আগে করিনি (যদিও তার পরও করিনি)। খুশিখুশি গল্প লিখে দিলাম। ক-দিন পর দেখা হলে বিমলদা বললেন, তুমি এ কী করেছ! শিশুদের গল্পে বিড়ি খাওয়া – একদম চলবে না। আক্কেলগুড়ুম হবার জোগাড়। অনেকদিন ভেবেছিলাম শিশুদের জন্য কী করে লিখতে হয় তবে? সম্পাদক লেখক সমীর ধর(দা) শিশুদের জন্য একবার একটা ছোট নাটক চাইলেন। ওনাদের চাওয়া মানে তো আদেশ, দিয়ে দিলাম। কিন্তু সেই ফোন করে বিরক্তি, ‘এ সব কী লিখেছ ভাই! শিশুরা লাফিয়ে লাফিয়ে বলবে, আমি হলাম পাখি, আমি হলাম চাঁদমামা --। তারা তোমার চোর পুলিশের কী বুঝবে?’ সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম শিশুসাহিত্য সম্বন্ধে আমার জ্ঞান বলতে কিছু নেই। সেই গণ্ডমূর্খ লোকটি অন্যের লেখা নিয়ে বলবে তা যেন একটু বাড়াবাড়ি। 
শিশুদের কাগজে প্রথমেই সব বুড়োরা। বিমলেন্দ্র চক্রবর্তীর ‘ঘুম’ অনবদ্য। ‘একটা পুকুর নাচছে দুপুর/একটা গাঁয়ের ছবি/একটা আকাশ বুকে রেখেই/ঘুমিয়ে পড়েন কবি’। ছন্দের কী জোর! রণজিৎ রায়ের ছড়াটা যেন বড়দের জন্য। জ্যোতির্ময় রায়-এর ছড়া ভাল লেগেছে। শচী চৌধুরী’র ছড়া মন কাড়ে। ‘মামার বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে আঁটা বেড়া/সেই বেড়াটা মিটিয়ে দিলে গন্ধরাজের চারা’। অমলকান্তি চন্দ লিখছেন, ‘খুকুমণি নাচে রোজ পায়ে মেখে আলতা/দূর থেকে উঁকি মারে এক ঝাঁক চালতা’। অভীককুমার দে’র ছড়াতেও মায়া ছড়ায়, ‘তুলতুলে তুলি সই/তুলোভরা গা/রংচঙে চুলের ঐ/রঙভরা ঘা’। ছোটদের জগতে বড়রাও বেশ মানানসই মনে হল।
শিশুমহলে গৈরিকা ধর লিখছে, ‘এখন আমি দোলনা রানি/আমি বসে দুলি/আমার কাছে সব আছে/রঙ বেরঙের তুলি’। দ্বৈপায়ন নাথ লিখছে, ‘নদীর তীরে বসত ঘর/বানায় কষ্ট করে/পুষ্ট জলের বন্যা এলে/ভাসায় একেবারে’। কুমারঘাটের ভয়ানক বন্যার স্মৃতি যেন শিশুমনে। অমিশা দাস লিখছে, ‘অতিরিক্ত গাছ কেটো না/পলিথিন করো বন্ধ’ বা দিগঙ্গনা কর-এর, ‘চারপাশেতে ফুলের মেলা/কতরকম ফুল/শাপলা, শালুক, শেফালি আর/ফুটছে পদ্মফুল’। প্রতিটি ছড়ায় একটা স্বর্গীয় অনুভূতি ছুঁয়ে যায়। শিশুদের জগৎ যেন আমাদের জগৎ থেকে অনেক সজীব ও নির্মল। সম্পাদককে বলব, বুড়োদের কমিয়ে এই শিশুদের আগামীতে আরও বেশি করে জায়গা দেবে। সেলিম মুস্তাফা’র ছড়াটিও দারুণ। ‘ঘোড়ায় চড়ে এলে যদি/ঘোড়ায় চড়েই পালিয়ে যাও/থাকতে পার/গাধায় চড়ে শহর যদি দেখতে চাও’। আসাম, বাংলা ও বাংলাদেশের ছড়াগুলিও ভাল। তবে জয়দুল হোসেনের ছড়াটি চমৎকার, ‘এক দেশের এক রাজা তার/খেয়াল-খুশি চমৎকার/জরুরি সব কাজের মাঝে/যেমন খুশি তেমন সাজে’। দেবব্রত সেনের ছড়া, ‘মেঘবালিকা দাপিয়ে বেড়ায়/মন কেমনের শ্রাবণ রাতে’। সব মিলিয়ে দারূণ একটি শিশুদের কাগজ উপহার দিল গৈরিকা ধর। তার পিতা মাতা এবং শুভানুধ্যায়ীদের আমার শুভেচ্ছা। একটা সুসম্পাদিত কাগজ মানতেই হবে। এগিয়ে যাও গৈরিকা, নেক্সট দেখা হলে আরও অনেক মারপিট, হইচই আমরা করব। একটা কথা কানে কানে গৈরিকাকে বলে রাখি, এ সব করতে গিয়ে পড়াশোনায় ঢিলে দিলে চলবে না কিন্তু। 

রসমালাই  
৯ম বর্ষ, পূজা সংখ্যা  
সম্পাদকঃ অমলকান্তি চন্দ
প্রচ্ছদঃ গৌরব ধর
সুভাষনগর কোয়ার্টার কমপ্লেক্স, কাঞ্চনপুর থেকে প্রকাশিত
বিনিময় – ৩০ টাকা। 
যারা লিখেছেন – 
ছড়াঃ চুনী দাশ, অশোক দেববর্মা, অমল চক্রবর্তী, বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী, গৌরী দেববর্মন মল্লিক, কিশোররঞ্জন দে, আনসার উল হক, হাননান আহসান, নিয়তি রায়বর্মন, জ্যোতির্ময় রায়, রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, অনিলকুমার নাথ, গোবিন্দ ধর, রতন আচার্য, অপাংশু দেবনাথ, রীতা শিব, দিব্যেন্দু নাথ, আব্দুল হালিম, পদ্মশ্রী মজুমদার, এম রিয়াজুল আজহার লস্কর, অনুরাগ ভৌমিক, মিলু কাশেম, গোপেশ সূত্রধর, অমিত শীল, কৃষ্ণকান্ত দেবনাথ, মিঠুন রায়, প্রসেনজিৎ রায়, অমলকান্তি চন্দ, অভীক কুমার দে এবং গৈরিকা ধর।
অনুগল্পঃ সন্তোষ রায়, হারাধন বৈরাগী এবং বিল্লাল হোসেন। 
অমলকান্তি চন্দ একজন চেনা ছড়াকার। তাই তিনি তাঁর শিশুদের কাগজটি সাজিয়েছেন শিশুদের জন্য প্রচুর ছড়া এবং তিনটি অনুগল্প দিয়ে। গৌরব ধরের প্রচ্ছদটি মন্দ নয়। রসগোল্লা ছবিতে দেখেও মুখে জল আসে। প্রতীকী এই প্রচ্ছদে ময়রা বাচ্চাদের পাতিল থেকে রসমালাই দিচ্ছে। ‘রসমালাই’-এর ভেতরে এমন সাদা গোল্লা যে রয়েছে যা আমাদের পরিবেশন করবেন অমলকান্তি এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ভাবতে অবাক লাগে এই কাগজটি নবম বর্ষে পড়ল, তার পর আমি হাতে পেলাম। দু-দু’টি শিশুদের কাগজ আগরতলার বাইরে বের হচ্ছে এটা কম কথা নয়। তা ছাড়া এই কাগজগুলিতে লিখছেন রাজ্যের এবং বহিঃরাজ্যের এবং বিদেশি লেখক কবিরাও। এই পাঠ নিশ্চয় আমাদের সমৃদ্ধ করবে। 
সম্পাদক ছড়া দিয়েই লিখেছেন তাঁর সম্পাদকীয়। ‘কাশফুল নেচে উঠে, নাচে কচি কলিরা, মালাই রস খেয়ে যা পাখি আর অলিরা’। 
চুনী দাশ লিখছেন, ‘পেঁজাতুলো মেঘগুলো/ভোরের আকাশে/পাল তুলে ডিঙা বায়/খুশির বাতাসে’। অশোক দেববর্মা’র ছড়া, ‘সূর্যি পাটে যেই না গেল/নিভল দিনের আলো/সারা ভুবন ঢাকল তখন/ সন্ধ্যাবেলার কালো’। কিশোররঞ্জন দে’র ছড়াটি বেশ মজার, ‘সোনামুড়ায় সোনা নেই সাব্রুমে broom/ধর্মনগর সিলেইট্টার শব্দ কল্পদ্রূম’। রবিঠাকুরের কবিতার লাইন ধরে ধরে ছড়া লিখেছেন আনসার উল হক, মন্দ লাগেনি আমার। হাননান আহসান, নিয়তি রায়বর্মন, জ্যোতির্ময় রায়, রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, অনিলকুমার নাথ-এর ছড়া ভালো লাগে। রাজেশকে ইদানীং খুব ব্যস্ত? প্রতিটি লেখাতেই মনে হচ্ছে শেষ করার সময় পায়নি। গোবিন্দ ধর-এর ছড়াটি বেশ মজার, ‘তিড়িং/বিড়িং/নৃত্য করে/গাঙ ফড়িং।/ইটিং/চিটিং/গীত্য করে/আর মিটিং’। রতন আচার্য’র ছড়াও ভাল। অপাংশু দেবনাথ শব্দ নিয়ে বেশ মজার খেলা করেছেন।  রীতা শিব, দিব্যেন্দু নাথ, আব্দুল হালিম-এর ছড়াও ভাল লেগেছে। পদ্মশ্রী মজুমদার-এর ছড়াটি বেশ মজার, ‘বলল টিয়ে/সবাই মিলে/দাও না আমার বিয়ে’। এম রিয়াজুল আজহার লস্কর, অনুরাগ ভৌমিক, মিলু কাশেম, গোপেশ সূত্রধর, অমিত শীল, কৃষ্ণকান্ত দেবনাথ, মিঠুন রায়, প্রসেনজিৎ রায়, অমলকান্তি চন্দ, অভীক কুমার দে এবং গৈরিকা ধর সবার ছড়াই ভাল লেগেছে। সবার লাইন তোলে বলা মুশকিল তাই দেওয়া গেল না। 
অনুগল্প লিখেছেন সন্তোষ রায়, হারাধন বৈরাগী এবং বিল্লাল হোসেন। সন্তোষদা’র ‘সবুজস্বপ্ন’ গল্পটি ভাল। হারাধন বৈরাগী’র ‘রিংটোন’ গল্পও আমাদের ভাবতে শেখাবে। ‘মা, মায়ের পূজো এবং বাপুয়ার গোলক ধাঁধাঁ’ গল্পে বিল্লাল হোসেন একটি শিশুর কথা এঁকেছেন। তার প্রতি অমানবিক সমাজের চেহারাও দেখিয়েছেন। সব মিলিয়ে ভাল লেগেছে অমলকান্তি চন্দ-এর ‘রসমালাই’। গৈরিকা ছাড়া আর কোনও শিশু আছে কি না বোঝার উপায় নেই। আরও শিশুদের যুক্ত করলে ভাল লাগবে। তা ছাড়া চিঠিপত্রের একটা বিভাগ থাকলেও মন্দ নয়। রসে টইটম্বুর হয়ে উঠুক ‘রসমালাই’।

0 Comments