পং ছড়া:এক দুপুরের ইতিকথা গোবিন্দ ধর
পং ছড়া:এক দুপুরের ইতিকথা
গোবিন্দ ধর
তখনও বিকেল নামেনি।কুমারঘাট ব্লক থেকে তিন চার কি মি দূরত্বে একটি প্রত্যন্ত জন জাতি গ্রাম।পং ছড়া দুই টিলার মধ্যে গড়ে ওঠা লুঙগায় এক শিক্ষা স্বাস্থ্যে সমানতালে বেড়ে উঠা পাহাড়ী এলাকা।দেও উপত্যকার সিদং ছড়া থেকে খুব কাছেই এই পং ছড়া।জন জাতির জীবিকা শূকর পালন।কলা আর টেঁকিশাক বাঁশ কড়ুল।আর নিশ্চয়ই চুলাই।সব মিলে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে এই গ্রামে রাত নামে। রাত আটটার মধ্যে রাতের খাওয়া শেষ করেন সবাই।
দক্ষিণ ঊনকোটি এ ডি সী ভিলেজের অন্তর্গত এই গ্রাম শান্ত নীরব।সকলের চোখেই জিজ্ঞাসা আমরা হঠাৎ কেন।আমরা আশ্বস্ত করে বলি নিতান্ত অবসর বিনোদন।গ্রামীণ সুন্দর্য উপভোগ করাতেই আমাদের আগমন।
স্থানীয় উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিচালিত পুতুল নাচ ছিলো বিকেলে।তা আগে থেকে আমরা জানতাম না।চলো স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যাই ছিলো পুতুল নাচের বিষয়।জন চেতনা মুখ্য বিষয়।ভালো লাগলো প্রায় ছোটবেলায় চলে যাই। চল্লিশ বছর আগে রাতাছড়ায় চব্বিশ পয়সার বিনিময়ে পুতুল নাচ দেখে যে আনন্দ পেয়েছিলাম আজও আবার সেরকমই লাগলো।স্মৃতিগুলো পরপর আসছিলো।নির্মল আনন্দ লাভ ঘটলো।পং ছড়ার ঝুলন্ত লোহার ব্রীজ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো হাওড়া ব্রীজ ওভার কাম করছি।সন্ধ্যার মায়াবী আলো মুখে এসে পড়ছে সবারই।কাছের পরিচিতজনও যেন খুব অপরিচিত সুন্দর দেখাচ্ছে।
প্রসঙ্গত বলি দিল্লি বইমেলায় গিয়ে অসুস্থ ছিলাম বেশ কদিন।মনটা কুঁকড়ে আছে।আর্সেনিন ইনফেকশন হয়ে আমি প্রায় মরে মরে এখনো জীবিত।অভীক ছিলো দিল্লি মেলায় আমার সহযাত্রী। ও না থাকলে শেষমেশ বডি দিল্লিতেই রাখতে হতো।অভীকের পাশাপাশি সৈয়দ হাসমত জালালদা,চৈতালী দাস মহোদয়া অঞ্জলিদি রীতা বিশ্বাস সবাই বারবার খবর নেওয়ায় মনে সাহস নিয়ে বাড়ি এলাম।
শান্ত পংছড়ার ঝুলন্ত ব্রীজ পেরিয়েই প্রাথমিক স্কুল।একটু দূরেই গাছের সাঁকো।বহুদিন পর পায়ে হেঁটে পার হলাম।পদ্মশ্রী তো পংছড়ার জল পেরিয়ে আসতে আতঙ্কিত।বারবার সাহস দিয়ে পাহাড়ী রমণীর সহযোগিতায় পেরিয়েছে।তারপরেও পদ্মশ্রীরর বুক ধড়পড় করছে।সাঁকো পেরিয়ে পেলাম ডাংগুলি খেলছে আদিবাসী শিশু কিশোররা।মনটা নেচে উঠলো।কতদিন খেলি না ডাংগুলি।
মাঝে মাঝে গরু গুলো নিয়ে ঘরে যাচ্ছেন কেউ কেউ। রাস্তাজুড়ে কুকুরের দাপট।কুকুরের ঘেউ ঘেউ পদ্মশ্রীকে দেখলাম আনন্দিত।প্রণবদার এটা ওটা বলে দিয়ে গাইডের ভূৃমিকা অভিভাবকের মতো লাগলো।
মধুমিতাদির নির্মল হাসি বেশ চনমনে লাগলো।এক সময় মধুমিতাদি পদ্মশ্রী টংঘর দোখতে একটু দূরে চলে গেলো।সাথে তখন ভাগ্নি তানিয়া ছিলো।একটানা জীবন থেকে বেরিয়ে মিশে গেলাম অদূরেই প্রকৃতির কোলে চাকমা জনজাতি বেষ্টিত পংছড়ার লতাপাতায় ঘেরা গ্রাম দক্ষিণ ঊনকোটি।
মনের বিষাক্ত ভাব দূর করে আজ একটু রোদ এলো।সন্ধ্যায় পংছড়ার টিলায় কাস্তে চাঁদ উঁকি দিতেই মনে হলো অপূর্ব।
ঠিক তখন গোধূলীর আলোয় মাদূর বিছিয়ে আমরা সবাই সাথের টিপিন নিয়ে বসি।মধুমিতাদি পদ্মশ্রী পুকুলি গৈরিকা প্রণবদা স্বপন আমি সবাই এক রাউন্ডে বসলাম।বাসায় রান্না করা বয়লার আর পুরি মিষ্টি বাসার জল সবই সাথে করে নিয়ে যাওয়ায় শক্ত টিপিন হলো।টুনি নিঁখুত পরিবেশন করে ও নিজেও খেলো।
রাত তখন বেড়ে যাচ্ছে।অন্ধকারে ঝিঁঝি ডাক ব্যস্ত শহর থেকে একটু দূরেই।মজাটাই আলাদা।পুরো ট্রিপের আজকের ক্যাপ্টিন প্রণবদা।প্রণবদার প্রকৃতি প্রেম আমাদের কাছে তেমন জানা ছিলো না।আজ আবিষ্কার করতে পেরে মধুমিতাদিও নায়কীর মতো হাসলেন।
টুনির যত্নআত্তি মুগ্ধ করার মতো।
পংছড়ার উৎস পংছড়াতেই।আর মোহনা দেও নদীর সিদং এলাকায়।পংছড়া অববাহিকা আসলে ঊনকোটির ঢালু উতঙ্গ অঞ্চল।দুদিকে খাড়া টিলা।মাঝ বরাবর দুই কিমি জায়গা নিয়ে বেড়ে উঠা এক পাহাড়ী জনপদ।মানুষগুলোর সরলতা মুগ্ধ করার মতো।সদ্য নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি জনিত কোন সমস্যা নেই।এখনো ভোট চলা কালীন গড়ে ওঠা বোথ অফিশ আছে।পতাকা বসন্ত বাতাসে উড়ো উড়ো।নেই কোন হিংসে।ওদের সরলতার কাছে মানবিকতার কাছে পাঠ নিয়ে যখন ঘরে আসবো তখন রাত সাতটা তিরিশ।তারপর আবার টুনী চা না খাইয়ে ছাড়বে না।অগত্যা কী আর করা চা পানের বিরতি আর আড্ডায় আরো একটু সময় চলে গেলো।
এই সময় জানলাম আমার আত্মজ গৌরব আর্ট কলেজের ফাস্ট সেমিস্টার প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ। মনটা আরো আনন্দে নেচে উঠলো।মনে হলো সার্থক একটি বিকেলে গর্বিত এক পিতা আমি।
২০:০৩:২০১৮
রাত:০৮:৩৫মি
কুমারঘাট।
0 Comments