করৈছড়া:প্রচুর করই বৃক্ষ ছিলো

গোবিন্দ ধর 

আমাদের গ্রামের নাম রাতাছড়া।রাতাছড়া আবার পূর্ব রাতাছড়া পশ্চিম রাতাছড়া দুটো গ্রাম।পশ্চিম রাতাছড়াকে আমাদের ছোটবেলা এমড়াপাশা গ্রাম বলতে শুনেছি। কেউ কেউ করৈটিলা গ্রামও বলতেন।করৈটিলা থেকে একটি ছড়ার উৎপত্তি হয়ে পশ্চিম রাতাছড়ায় মিশে গেছে। খুব স্বপ্লদৈর্ঘ্যের ছড়াটি।করৈটিলায় মুসলিম জাতির মকবরা অর্থাৎ মৃতদের কবর দেওয়া হতো।কিছুদিন পূর্বেও কবরস্থানটি ছিলো।মানুষের স্বার্থপরতায় তা গিলে খেয়েছেন একজন।তারপর পাশ ঘেষে ছড়াটির দুই পাড়ে প্রচুর জালিবেত হতো।ছড়াটির উপরের আকাশ ঢেকে রাখতো বেতগাছ। এখানে দিনের বেলা বাঘের হালুম শুনে কোনোক্রমে লোকজন যাতায়াত করতে পারলেও রাতের বেলা এই জায়গা পেরিয়ে যাওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার। তার উপর ছিলো ঠগি বাহিনীর উপদ্রপ অসহনীয়। চোরেরা অবলীলায় সব লুটপাট চালাতো এখানে।ডাকাত দলের লুকোনোর মোক্ষম জায়গা ছিলো করৈটিলায়।পাশেই করৈছড়া।কেউ কেউ করৈছড়ার ভয়ঙ্কর ফাঁদে পড়ে সর্বশান্ত হতেন।এমন সুরু জায়গা ছিলো এখানে এলে চুর ঠগি বা ডাকাত আক্রমণ করতে সুবিধা। এতোটাই সুরু এই করৈছড়া।তার উপর ঢাকা থাকতো বেতগাছের ঝোপঝাড়ে।এ জন্য লোকমুখে এই করৈছড়াকে কেউ কেউ গলাচিপা ছড়াও বলতেন।
প্রকৃতির নির্মম পরিহাস আজকাল আর বেতগাছ তেমন নেই। নেই করই বৃক্ষ। বর্ষায় করৈ গাছ থেকে ঝরে পড়তো করৈবীজ। তা জলের তোড়ে ভেসে আসতো করৈছড়া হয়ে পশ্চিম রাতাছড়া হয়ে মনুনদীর জলধারায়।
এখন করৈছড়ায় একটি ব্রীজ আছে। নিচে প্রবাহিত করৈ ছড়ায় জল নেই। নেই বেতগাছ। নেই ঠগি বাহিনীর সন্ত্রাস। নেই চোরের আনাগোনা। নেই বাঘের হালুম। ব্রীজ আছে জল নেই। 
করৈটিলা আছে করই বৃক্ষ নেই। জলের স্রোত নেই। নেই সে পরিমাণ বৃষ্টিপাত।করৈ ছড়ায় বৃষ্টির জল আর আগের মতো নেচে নেচে পশ্চিম রাতাছড়ায় মিশতে আসে না।নেই মাছের প্রথম বৃষ্টির শব্দে ঝাঁক বেঁধে সারিসারি নেমে যাওয়া চালচিত্র। 
এখন করৈছড়া নামও নবীন প্রজন্মের নিকট অচেনা একটি ছড়া মাত্র। 
গাঁ ছমছম নেই এখন আর।এখন গাড়ি চলাচল রাতদিন  করৈটিলা পশ্চিম রাতাছড়ার মানুষের নিকট আশীর্বাদ। কিন্তু করৈছড়ার অনালোকিত অধ্যায় চাপা পড়ে আছে পিচ রাস্তায় টায়ারের ঘর্ষণে।
আধুনিক বিশ্বের যন্ত্র সভ্যতা আমাদের জীবন মানকে এগিয়ে দিলেও প্রকৃতির খেয়ালিপনা না থাকায় আমরা বড় অসুখের মধ্যে জীবনযাপন করছি তা অনস্বীকার্য। 

২১:০৩:২০২৪