আমি বধির হয়ে আছি || গোবিন্দ ধর
একটি লাইন লিখতে পারছি না
বিশ্বাস করেন এক পঙতিও লিখতে পারছি না।
চারপাশের দুনিয়ায় ইতিমধ্যে পালাবদল হলো একটি রাস্ট্র ক্ষমতার।
দেশের পিতার মূর্ত্তিগুলো ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছেন সংস্কারপন্থী জনগণ।
অতি উৎসাহী জনতা তাঁর কণ্ঠে পাদুকামালা পরিয়ে উল্লাসে মত্ত।
এতো ঘৃণা তবে কোথায় লুকানো ছিলো?
বিকৃত আর বিক্রিত মানুষের মগজ থেকে
৫২ মুছে গেলো?
৭১ ভুলে বসে আছে!
৭৫ এর শোকেও কেউ নতজানু হতে লজ্জিত!
ইতিহাস মাড়িয়ে আবার ইতিহাস হতে পারে ক্ষতি নেই
পরম্পরা ভুলে গেলে জাতির পরিচয় প্রশ্নবিদ্ধ হয়
একথা তর্জনী তুলে বলে দিতে পারেন
এমন একজনও উপমহাদেশে নেই এই লজ্জায়
আমি বহুদিন ঘুমাতে পারছি না।
কিচ্ছু পারছি না।আমি মরে গেছি।আমি জড় হয়ে গেছি।
আমার আমি দুন্দুবুড়ির মতো গুটিয়ে গেছি বহুদিন।
তারপর উপমহাদেশের মানচিত্রে অনেক নদীজল গড়িয়ে গেছে।
মানচিত্রে রক্তের দাগ শুকায়নি কদিনেও।
আমাদের অঙ্গরাজ্য বাংলায় ঘটে গেলো ন্যাক্কারজনক ঘটনা।
আর জি কর হাসপাতালে কর্তব্যরত ডাক্তারকে গণধর্ষণ শেষে খুন করে দিলো নরপিশাচেরা!
আজ স্বাধীনতা দিবস।
আজ ১৫ ই আগষ্ট।
৪৭ এ দীর্ঘ দাসত্ব থেকে মুক্তির মাস।
আজ আমাদের উৎসব।
আজ স্বাধীনতা দিবস।
আজ স্বাধীনতার আটাত্তর বছর
ডামাডোলে উদযাপন হলো ভারতজুড়ে।
হরঘর তেরঙ্গা পতাকা উড়লো তিনদিন ধরে।
অথচ স্বাধীনতা মানে শুধু লেবেন চুষ নয়।
স্বাধীনতা মানে শুধু হরঘর তিরঙা ফতফৎ উড়ানোই নয়।
স্বাধীনতা মানে সকলের অন্ন বস্ত্র বাসস্থান
স্বাস্থ্য পরিসেবা অন্তীম ব্যক্তি অব্দি পৌঁছে দেওয়া
মা মেয়ে রাতের পৃথিবীতে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসা
আমার কন্যার মুখে সারে জাহা সে আচ্ছার প্রতিচ্ছবি ফুটে থাকা।
স্বাধীনতা মানে মোটা চাল আর মোটা কাপড়।
স্বাধীনতা মানে সকলের হাসিমুখ।
স্বাধীনতা মানে ভোরের কিচিরমিচির কলকাকলীতে চারপাশ মুখরিত বন্দেমাতরম।
বিশ্বাস করেন আমি একটি লাইন লিখতে পারছি না।
আমি খাচ্ছি দাচ্ছি অফিস যাচ্ছি।
আমি পতাকা উত্তোলন করে চকলেট বিলি করছি
কোমলমতি শিশুদের মধ্যে।
আমি বাজার করছি।স্নান নাওয়া খাওয়া সব করছি।
অথচ আমি আমার বোনের ইজ্জত রক্ষা করতে পারিনি।
আমার মায়ের শরীরে মোটা কাপড় নেই।
আমার প্রতিবেশীর ঘরে উনুন চড়ে না হররোজ।
আমার বাক স্বাধীনতা এখনো প্রকৃতপক্ষে নেই।
আমাদের ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছেনি।
স্বাস্থ্য পরিসেবা অন্তীম ব্যক্তি অব্দি দেওয়া সম্ভব হয়নি।
আমার প্রিয় পেশার মানুষেরা না খেয়ে অভুক্ত
রক্ত চোখের শাসন আর শোষণে শোষিত
হাড়গোড় ভেঙ্গে দেওয়ার নিদান আসে।
কেউ কেউ অপঘাতে মৃত্যুর কাছে পরাজিত।
১০৩২৩ আজ শুধু একটি সংখ্যা
মৃত্যু মিছিলে সংখ্যাটি ছোট হচ্ছে।
অথচ আমার ভেতর থেকে সিংহের গর্জন নেই।
আমি টু শব্দ করছি না।
আমি নিজেকে এরকমই বাঁচিয়ে রাখি
কারো সাতেপাঁচে নেই।
কিচ্ছুতে নেই। শুধু খাই দাই অফিস যাই।
চুপ থাকি।যেন কিচ্ছু হয়নি কোথাও।
সবই করছি।আমি কি তাহলে বেঁচে আছি?
বেঁচে থাকার কৌশল অবলম্বন করে
কতদিন বেঁচে থাকা যায়?
সাবলীল হাঁটতে পারছি কই?
আমি কি তাহলে মরে গেছি?
আমি কি চারপাশের দুনিয়া দেখছি?
নিজেই নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করি।নিরুত্তর আমি।
গতকাল মধ্যরাত শাসন করতে যাওয়া মেয়েদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্য পুরণ হোক
কায়মনোবাক্যে চাইছি।
বিশ্বাস করেন তথাপি আমি একটি লাইন লিখতে পারছি না।
নিজের প্রতি ঘৃণা ছুড়ে দিই।
লাশের গন্ধে আমার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।
আমি কি তাহলে মরে গেছি?
আমার মনের ভেতর কে যেন অসংখ্য প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে।
যার প্রকৃতপক্ষে কোনো সমাধান এই সময়ের নিকট নেই।
বারুদের ধুঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশ অন্ধকার করে আছে।
অথচ কালখণ্ড লিখে দেবে সকল ঘটনার প্রকৃত ইতিহাস।
আমি বধির হয়ে আছি।
আমি মানসিক অসুস্থ বোধ করছি।
আমি অসুস্থ অনুভব করছি।
একটি কবিতাও লিখতে পারছি না।
আমি প্রতিবাদ করতে পারছি না।
আমি কিচ্ছু পারছি না।
আমি এই সময়কে ঠিকঠাক চিনতে পারছি না।
আমি আমার সাথে বড় অচেনা মানুষের মতো ব্যবহার করছি।
আমি একটি লাইন লিখতে পারছি না।
আমি জড় হয়ে গেছি।
অথচ আমি গর্জে ওঠার কথা ছিলো।
আমি প্রতিবাদ করার কথা ছিলো।
আমি কিচ্ছু পারছি না।
আমার হাত পা শেকলে বাঁধা।
আমি হিটলারের ছায়ার নিকট অদৃশ্য ছায়ামানব।
সাতেপাঁচে নেই এরকম এক কঠিন সময়ে
আমি কোনো প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছি না।
অন্ধকার আমাকে গিলে ফেলতে চায়।
আমি গভীর অন্ধকারে পড়ে খাবি খাচ্ছি।
আমি বধির হয়ে আছি
অথচ কালখণ্ড লিখে দেবে একদিন
আলোকিত হবে কৃষ্ণগহ্বরে ঢাকা
এই সব বুলেট খুন ধর্ষণ আর যত অবিচারের ইতিহাস।
১৫:০৮:২০২৪
রাত:৯টা
কুমারঘাট।
0 Comments