গোবিন্দ ধর :শরীরবৃত্তীয়, সক্রেটিস ও নিরাময় তিনটি কবিতার ব্যবচ্ছেদ||হারাধন বৈরাগী
গোবিন্দ ধর :শরীরবৃত্তীয়, সক্রেটিস ও নিরাময় তিনটি কবিতার ব্যবচ্ছেদ||হারাধন বৈরাগী
শরীরবৃত্তীয়
গোবিন্দ ধর
শরীর মহাবিশ্ব মহাকাশ
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত রহস্য এতেই।
তাকে জাগালে সে ভোরের পাখি।
কলতানে মুখরিত চারদিক
গাছে গাছে ফুলেফলে ভরে ওঠে বাগান।
শরীর এক ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসও
তারও আছে ৪৬০ আলোকবর্ষ দূরত্ব
তারও আছে বিগব্যাং থিওরি।
এক একটি মহাপ্রলয় থেকে
কোটি কোটি নক্ষত্রের ছায়াপথ
আলোকবর্ষ অতিক্রম করে
ক্রমশই আরো ছড়িয়ে পড়ে।
শরীর প্রকৃতপক্ষে মহাবিশ্ব
তারও কৃষ্ণগহ্বর হা করে
অসংখ্য নক্ষত্র গিলে খায়।
অসংখ্য নক্ষত্র থেকে ছড়িয়ে পড়ে
আলোকবৃষ্টি।
২০:০৭:২০২২
সকাল:০৬টা১৫মও
কুমারঘাট।
"শরীরবৃত্তীয়" কবিতাটি মূলত মানবশরীর ও মহাবিশ্বের মধ্যে এক গভীর সাদৃশ্য ও দার্শনিক সম্পর্ক প্রতিস্থাপন করে। এখানে কবি মানব শরীরকে শুধুই একটি জীববৈজ্ঞানিক কাঠামো হিসেবে দেখেননি, বরং একে একটি মহাবিশ্বের রূপকে তুলনা করেছেন—যার মধ্যে লুকিয়ে আছে সৃষ্টির, ধ্বংসের, ও প্রসারণের সমস্ত রহস্য।
কবি বলছেন শরীর নিজেই একটি মহাকাশ, যার মধ্যে আছে বিগব্যাং, কৃষ্ণগহ্বর, আলোকবর্ষের বিস্তার, এবং মহাপ্রলয়ের মতো কসমিক ধারণা।
যখন শরীর জাগে, তা ভোরের পাখির মতো আশাবাদী, সৃষ্টিশীল — বাগানভর্তি ফুল-ফলের মতো।
শরীর আবার ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো বিধ্বংসীও হতে পারে; তার মধ্যে আছে কৃষ্ণগহ্বর, যা গ্রাস করে, আবার আলোকবৃষ্টি ছড়ায় — যা সৃষ্টি ও শক্তির রূপক।
সার কথা হল—মানবশরীরকে একটি বিস্তৃত, রহস্যময় মহাবিশ্বের সঙ্গে তুলনা করে কবি দেখাতে চেয়েছেন যে, শরীরের মধ্যেই নিহিত আছে সৃষ্টির মূল রহস্য, বিস্তার ও ধ্বংসের শক্তি — একে অবহেলা নয়, বরং গভীর দার্শনিক দৃষ্টিতে উপলব্ধি করতে হয়।
সক্রেটিস:২৪১৫
গোবিন্দ ধর
সময় অনেক চলে যায় সত্য
সত্য একদিন সত্যই হয় ,সক্রেটিস।
ভোর :৫_৩০#২০/০৭/১৬#দেওপাড়#
"সক্রেটিস: ২৪১৫"
কবি: গোবিন্দ ধর
"সময় অনেক চলে যায় সত্য"
এই পংক্তিতে সময় এবং সত্যের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। সময় দীর্ঘদিন ধরে প্রবাহিত হয়, কিন্তু তৎক্ষণাৎ সত্য উদ্ভাসিত হয় না। অনেক সময় পরে, যখন ধুলো-ধোঁয়া কেটে যায়, তখন সত্য তার স্বরূপে প্রকাশিত হয়।
"সত্য একদিন সত্যই হয় ,সক্রেটিস।"
এখানে "সক্রেটিস" নামটি প্রতীকী। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসকে তাঁর সত্য ভাষণের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে, সত্য শেষ পর্যন্ত তার স্থান করে নিয়েছে—যদিও তাৎক্ষণিকভাবে তা চাপা পড়ে গিয়েছিল। কবি এখানে বোঝাতে চেয়েছেন , অন্যায়ভাবে দমন করা হলেও সত্য একদিন প্রমাণিত হবেই—যেমন সক্রেটিসের সত্য একদিন "সত্যই" হয়ে উঠেছিল।
"ভোর :৫_৩০#২০/০৭/১৬#দেওপাড়#"
এই অংশটি কবিতার রচনার সময় ও স্থান উল্লেখ করছে। এটি কবিতার একটি ডকুমেন্টেশন হলেও এর একটি প্রতীকী তাৎপর্যও থাকতে পারে।
ভোর—যা নতুন সূর্যের আগমন—এখানে সত্যের উদয়ের ইঙ্গিত হতে পারে।
"দেওপাড়"—যেখানে কবি অবস্থান করছেন—সেটি এক প্রতীকী মাটি বা ভূখণ্ড, যেখানে সত্যের চিন্তা বীজ রোপণ হচ্ছে।
এই ক্ষুদ্র কবিতাটি এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধির বাহক। সত্য কখনো কখনো অবদমিত হয়, অস্বীকৃত হয়, এমনকি মিথ্যার হাতেও পরাজিত হয়—কিন্তু সময়ের প্রবাহে একদিন সে নিজেই তার সত্যতাকে প্রতিষ্ঠা করে। সক্রেটিস তার জীবদ্দশায় সমাজের চোখে অপরাধী ছিলেন, কিন্তু সময় প্রমাণ করেছে, তিনিই ছিলেন জ্ঞান ও নৈতিকতার এক প্রকৃত পথপ্রদর্শক।
"সক্রেটিস: ২৪১৫" মূলত একটি সময়চিহ্নিত চেতনার কবিতা—যেখানে ইতিহাস, দার্শনিকতা, এবং সত্যের অনিবার্য জয়গাথা একত্রে গ্রন্থিত। এটি বার্তা দেয়—সত্য চাপা পড়তে পারে, কিন্তু হারিয়ে যায় না।
নিরাময়
গোবিন্দ ধর
সম্পর্ক এক বৃক্ষ।
তার ফুল তার ফল
নিরাময় করে অসুখ।
২০:০৭:২০২২
ভোর:৪টা
কুমারঘাট।
কবি গোবিন্দ ধরের নিরাময় কবিতাটি
ছোট্ট হলেও অর্থের দিক থেকে গভীর এবং দার্শনিক।এটি সম্পর্ক, জীবন ও নিরাময়ের এক আন্তঃসম্পর্কিত রূপকচিত্র তুলে ধরে।
“সম্পর্ক এক বৃক্ষ”এই পংক্তিতে সম্পর্ককে একটি জীবন্ত, শেকড়-বিস্তৃত, বহমান সত্তা হিসেবে ভাবা হয়েছে। যেমন গাছ মাটি, জল, আলো নিয়ে বেড়ে ওঠে, তেমনি সম্পর্কও সময়, আস্থা, অনুভব ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপর গড়ে ওঠে। বৃক্ষের যেমন শাখা-প্রশাখা হয়, তেমনি সম্পর্কও নানা রূপ নেয়—বন্ধুত্ব, প্রেম, পরিবার, সহানুভূতি।
এখানে "বৃক্ষ" একটি অস্তিত্বের প্রতীক—যে টিকে থাকে, ছায়া দেয়, ফল দেয়, আবার ঝরে যেতেও জানে।
“তার ফুল তার ফল”
ফুল প্রতীকী ,সৌন্দর্য ও আবেগের, আর ফল প্রতীকী,পূর্ণতার ও তৃপ্তির।সম্পর্ক যখন প্রকৃত অর্থে পুষ্ট, তখন তাতে জন্ম নেয় মমতা, স্নেহ, প্রেম, ক্ষমা, নির্ভরতা—যা জীবনকে সৌন্দর্যময় করে তোলে (ফুল), এবং পরিণতিও এনে দেয় (ফল)।
এই ফুল ও ফল মানসিক সম্বল হয়ে ওঠে, যা জীবনের ক্ষয়-অসুখ-শূন্যতা দূর করে।
“নিরাময় করে অসুখ”
এখানে 'অসুখ' শুধুমাত্র শারীরিক ব্যাধি নয়—বরং আত্মিক অসুখ, মনস্তাত্ত্বিক ব্যথা, মানসিক ক্লান্তি, অন্তর্গত একাকীত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে মনে হল।
কবি বলছেন, সম্পর্ক যখন সুস্থ ও মানবিক হয়, তখন তা মানসিক যন্ত্রণার ওষুধ হয়ে দাঁড়ায়। ভালোবাসা, সংলাপ, সহানুভূতি—এইসবই এক ধরনের নিরাময়।
সময় ও স্থানচিহ্ন: “ভোর ৪টা, কুমারঘাট”
ভোর হলো নতুন আলোর সময়, জাগরণের মুহূর্ত।
এই সময়ের উল্লেখ ইঙ্গিত করে, কবি হয়তো কোনো নির্জন, আত্ম-উপলব্ধির মুহূর্তে সম্পর্কের এই রূপ ও নিরাময়মূলক শক্তি উপলব্ধি করেছেন।
"কুমারঘাট" স্থান-নির্দেশের মধ্যেও রয়েছে একটি ব্যক্তিগত পরিসর—যেখানে সম্পর্ক, যন্ত্রণার নিরাময় বা বোধ আসতে পারে একান্তভাবে।
এই কবিতাটি এক গূঢ় জীবনদর্শন তুলে ধরে:
মানুষের হৃদয়-অসুখের সবচেয়ে প্রকৃত ওষুধ সম্পর্ক—যদি তা হয় সহানুভূতিমূলক, হৃদয়গ্রাহী ও সত্য।সম্পর্ক কেবল অনুভূতির বিষয় নয়, তা এক গভীর অস্তিত্ব—যা গড়ে ওঠে সময়, পরিচর্যা ও শেকড়ের বিস্তারে ।এই সম্পর্কই আমাদের ভাঙা ভেতরটাকে জোড়া লাগাতে পারে, নিরাময় দিতে পারে জীবনের ক্ষয়ে যাওয়া ।
এই কবিতার নিগূঢ় সৌন্দর্য হল, সম্পর্ককে শুধুই আবেগ নয়, বরং এক ধ্যান, এক ওষুধ, এক জীবনরক্ষা বৃক্ষ হিসেবে ভাবতে শেখায়।
0 Comments