আমার দেখা গোবিন্দ ধর || সুচিত্রা দাস।
আমার দেখা গোবিন্দ ধর || সুচিত্রা দাস।
২৩/৭/২০২৫
' পঞ্চান্নে গোবিন্দ ধর' এই বিষয়ে কিছু লেখার জন্য সম্পাদক সুমিতা দেব সেদিন হঠাৎই আমাকে টেলিফোন করে অনুরোধ জানায়।স্বাভাবিক কারণেই আমি প্রথমটা চুপ করে থাকি। হাতে খুবই অল্প সময়। কি উত্তর দেব সুমিতাকে খানিক সময় ধরে ভাবছিলাম। নিজেকে প্রচারের আড়াল রাখা কীর্তিমান পুরুষকে নিয়ে কিছু লেখা বা বলা একটু কঠিন কাজ বলেই মনে হলো। যাইহোক, শেষ পর্যন্ত হ্যাঁ বলেই দিলাম সুমিতাকে।
সেদিন সারাটাদিন শুধুই চিন্তা করে গেছি কি লেখা যায়। গোবিন্দ ধরের কোন দিক নিয়ে এই লেখার অবতারণা করা যায়। আমি খুব অল্প সময় সাহিত্যিক গোবিন্দ ধরকে চিনলেও তার খুটিনাটি বিষয়ে অবগত নই।
তবুও কিছু তো চেষ্টা করতে হবে।
'পঞ্চান্নে গোবিন্দ ধর' এ বিষয়ে লিখতে গিয়ে প্রথমেই যা চোখে পড়লো গোবিন্দ ধর চাপা স্বভাবের অত্যন্ত বিনয়ি সর্বদা হাসিমুখের এক সুহৃদ মানুষের কথা।
যে মানুষ সৃষ্টি করতে জানে বা করে, যে মানুষ সাহিত্যকে সাধনা করে জগত সংসারকে সেই স্রোত সম্ভারে পূর্ণ করতে চায়।আর সেটাই সাহিত্য সাধনা বলে আমার মনে হয়।
এই পথ সহজ সরল মোটেও না। কতটা পিচ্ছিল, পঙ্কিল, কন্টকময় এবং কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয় সেকথা একমাত্র সেই মানুষই জানেন। কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধরের বেলাতেও তার কোন ব্যতিক্রম হয় নি।
তার কিছুটা আমি স্বচক্ষে দেখেছি। সেসব কথা বলার জন্য এই বিচরণ ক্ষেত্র নয়।
উত্তর ত্রিপুরার ধর্মনগরের অফিসটিলা তার জন্মস্থান। ১৯৭১ সনের ৩০শে জুলাই এই কথাশ্রমিকের জন্ম হয় ।
সেখানকার রাতাছড়ার দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয়ে ( বর্তমান হাজিবাড়ি) পড়াশোনা করেন এবং কর্মজীবনে শিক্ষকতাকে বেছে নেন। পূর্ব-পুরুষের সূত্র ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে এক নিবিড় আত্মীয়তার সংযোগ আছে। যতদূর জানতে পেরেছি ছাত্রাবস্থাতেই সাহিত্যের অঙ্গনে পা রাখেন এবং ১৯৯৫ সালে রাতাছড়া থাকাকালীন তার হাত ধরে স্রোতস্বিনী লিটল ম্যাগাজিন ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন পুঁথি-পত্র সংরক্ষণ এবং গবেষণার কাজ শুরু হয়।
তারপর দীর্ঘ সময় বয়ে চলছে সে নদী স্রোত, সে সাহিত্য বর্ণাঢ্য নদী স্রোতে আমরাও গা ভাসিয়েছি।
ত্রিপুরার বুকে সমাজের বিভিন্নস্তরে সাহিত্যকে পৌঁছে দেবার নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছেন গোবিন্দ ধর।
তিনি কোথাও " চৈতন্য ফকির "। ত্রিপুরার লেখক সমাজে বহুকাল আগে থেকেই অনেক সমৃদ্ধশালী লেখক গবেষক ছিলেন। কিন্তু সমাজের সাধারণ স্তরে সাহিত্যকে পৌঁছে দেওয়া এক দুঃসাহসিক কাজ।
২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে লিটল ম্যাগাজিনের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিস্থাপন করেন যা বর্তমানে প্রকাশনা মঞ্চের হাত ধরে সাড়ম্বরে এগিয়ে চলেছে।
গোবিন্দ ধর একজন প্রকাশক, সম্পাদক।
একজন কবি লেখক কিভাবে সামনের দুর্গম পথ অতিক্রম করবেন একমাত্র গোবিন্দ ধরই দেখিয়েছেন সেই জ্যোৎস্নালোকিত পথ। তিনি নিজের মধ্য সীমাবদ্ধ না থেকে সবসময় চেয়েছেন মানুষের সাথে মানুষের মিলন ঘটাতে। আর সে কারণেই বাংলাদেশ, ঝাড়খন্ড, পশ্চিমবঙ্গ, সিলেট এই সকল অঞ্চল থেকে নানা গুণীজনের সমাবেশ ঘটেছে প্রকাশনা মঞ্চের অনুষ্ঠানে। এই একই কারণে আমার সঙ্গে একবার বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক সেলিনা হুসেন দিদির সাক্ষাৎ ঘটেছে। কি অমায়িক তিনি।
বাস্তব জীবনে আপন স্বার্থের চেয়েও সাহিত্যকে বেশি ভেবে চলেছেন তিনি এবং গভীর অন্তরে যে জ্ঞানভাণ্ডার সঞ্চিত রয়েছে মাঝেমধ্যে মানুষের মধ্যে অকপটে উগরে দিতে চান। এত সবের পরেও সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় ; নিজেকে প্রচার বিমুখ রেখে চলতে ভালোবাসেন।
অতি সাধারণ বেশভূষা , চালচলন কিন্তু সর্বজনপ্রিয় এক শব্দ শ্রমিক।
তার সম্পাদনায় রয়েছে বহু কাব্যসংকলন, অগণিত গদ্য সাহিত্য, বহু লিটল ম্যাগাজিন।
এষফের পাশাপাশি বহু সংস্থা থেকে সম্মানিত হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করেছেন। ত্রিপুরার সাহিত্য ক্ষেত্রে তার বিশাল কর্ম যজ্ঞ ধারা এখানে এই ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরা মোটেও সম্ভব নয়।
প্রকাশনা মঞ্চ আয়োজিত যেসব লিটল ম্যাগাজিন, কবি, লেখক,প্রকাশক, ঔপন্যাসিকের মিলন ঘটে তা এককথায় অনবদ্য। ত্রিপুরার সাহিত্য সমাজে গোবিন্দ ধর এক বৈপ্লবিক নাম। এক শব্দ শ্রমিকের নাম। তাই ঈশ্বরের কাছে ' পঞ্চান্নে গোবিন্দ ধর' পা দেওয়া শুরু হলেও তাঁর দীর্ঘায়ু, সামাজিক , সাংসারিক সুখ শান্তি সু- স্বাস্থ সমৃদ্ধ কামনা করি।
0 Comments