কবি শিউলী মজুমদার ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর
কবি শিউলী মজুমদার ও কবি গোবিন্দ ধর মুখোমুখি
গোবিন্দ ধর : শিউলী মজুমদার যখন বলেন "সিঁড়ির প্রতিটি ধাপই আমার পথচলার প্রতিচ্ছবি। আমি থামি, ভাবি আবার এগিয়ে যাই"। সুন্দর এই অভিব্যক্তি তখন সুরেলা অসুখ এসে লাগে মরমে। ভালো লাগে। পরিচিত হয়ে উঠি তার সাথে। সেই থেকে আলাপচারিতায় বললাম,কেমন আছেন?
শিউলী মজুমদার :ভালো। আপনি কেমন আছেন?
গোবিন্দ ধর:আমিও ভালো থাকার চেষ্টা করছি।
বাংলাদেশ কোথায় বাসা?
শিউলী মজুমদার :চাঁদপুর।
গোবিন্দ ধর :আহা চাঁদপুর।
আহা ইলিশ।
এক বার এসেছিলাম।তখন কি আর জানতাম
আমার একজন বন্ধু
চাঁদপুর?
শিউলী মজুমদার :হা হা হা। এখন জানলেন?
গোবিন্দ ধর :তাই তো বন্ধু।
শিউলী মজুমদার : হ্যাঁ, ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর শহরেই থাকি।
গোবিন্দ ধর :আহা আসল মিস।আপনাদের বাংলাদেশ কেমন আছে?
শিউলী মজুমদার :ভালো মন্দ মিলিয়ে।
গোবিন্দ ধর :এখন কি আর আমরা চাঁদপুর আসার কল্পনা করতে পারি?
শিউলী মজুমদার :আসলে দেশের অবস্থা তো ভালো নয়। তাই জোর দিয়ে বলতে পারছি না।
গোবিন্দ ধর :কখনো আগের জায়গায় যাবে দেশ?
শিউলী মজুমদার :তাও বলতে পারছি না।
গোবিন্দ ধর :সিঁড়ির প্রতিটি ধাপই যেন আমার পথচলার প্রতিচ্ছবি। আমি থামি, ভাবি, আবার এগিয়ে যাই-
এই ভাবনা অপূর্ব। অপূর্ব আপনার দর্শন।
তো কবি কবে থেকে চর্চা করেন?
শিউলী মজুমদার :বেশি না
১৫/১৬ বছর হবে।
গোবিন্দ ধর :লেখালেখির হাতেখড়ি কখন কেমন করে?
শিউলী মজুমদার :লিখব একসময় সময় করে।
গোবিন্দ ধর : দিলেন না?
শিউলী মজুমদার : ক্লাস নাইন থেকে ডায়েরি লিখতাম। ডায়েরি লিখতে পছন্দ করতাম। প্রতিদিনের সুখ, দুঃখ, অভিজ্ঞতা, ভালো লাগা, মন্দ লাগা সবটাই ডায়েরিতে লিখতাম। বলতে পারেন সেখান থেকেই আমার লেখার হাতেখড়ি।
গোবিন্দ ধর :পারিবারিকভাবে সাংস্কৃতিক পরিবেশ কেমন ছিলো?
শিউলী মজুমদার :পরিবারের সবাই ছিল সাংস্কৃতিমনা। ছোটবেলায় বাবাকে আমি যাত্রাপালা করতে দেখেছিলাম। কি অসাধারণ অভিনয় ছিল বাবার। গানের গলা ছিল খুবই সুন্দর। আর আমরা ভাই বোনেরা হয়েছি সাহিত্য অনুরাগী। আমরা তিন ভাই বোনই লেখালেখি করি।
গোবিন্দ ধর :উনাদের চর্চা ও নামগুলো জানতে পারি?ভাইবোনদের সাহিত্য চর্চার বিষয় বলুন?তাদের নামও জানতে চাইলাম?
শিউলী মজুমদার :আমরা দুই ভাই, এক বোন।
আমি সবার বড়। আমার দুই ভাইয়ের মধ্যে প্রথমজনের নাম হলো প্রণব কুমার রায় এবং দ্বিতীয়জন কনক কুমার রায়।
প্রণব এবং কনক দুজনেই গল্প কবিতা দুটোই লেখে। প্রণবের দুটো বই আছে। একটি কবিতার বই- ক্ষমা, আরেকটি গল্পের বই- শিহরণ।
কনকের এখনো বই হয়নি।
আমার একটি কবিতার বই হয়েছে - আড়ালে আবৃত।
গোবিন্দ ধর :শিক্ষকতা কেমন লাগে? পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তার প্রভাব আছে?
শিউলী মজুমদার :
শিক্ষকতা আমার কাছে ভালো লাগে।
শিক্ষকতা আমার কাছে শুধু পেশা নয়, বরং ভালোবাসা ও দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের শেখানো, গড়ে তোলা সত্যিই আনন্দের।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অবশ্যই প্রভাব আছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতি, বিশেষ করে প্রযুক্তির ব্যবহার ও অনলাইন শিক্ষার কারণে পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। তবে এতে যোগাযোগের সহজ মাধ্যমে নতুন কিছু শেখার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
গোবিন্দ ধর :কেন লিখতে এলেন?শিক্ষকতা তো করছেনই? তাহলে আবার লেখালেখি প্রয়োজন হয়ে পড়লো কেন?
শিউলী মজুমদার :আচ্ছা একটা প্রশ্ন ছিল।
আমার এই উত্তরগুলো কি কোনো কাজে লাগবে?
গোবিন্দ ধর :হ্যাঁ, কোথায় সুযোগ পেলে আপনিও ছাপতে পারেন।
গোবিন্দ ধর :কেন লিখতে এলেন?
শিউলী মজুমদার :শিক্ষকতা তো জাতিকে গড়া বা মন গড়ার কাজ, আর লেখালেখি মন ছোঁয়ার। নিজের ভাবনা, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি প্রকাশের একটা মাধ্যম হলো লেখালেখি। যা মনকে শুধু প্রশান্তিই নয় দূরদর্শিতায় মনের ভাবনাকে গভীর করে তোলে। আর এই লেখালেখি মনের খোরাক জোগায়।
গোবিন্দ ধর :আচ্ছা বেশ।তো আপনি কবিতায়ই স্বাচ্ছন্দ?
শিউলী মজুমদার :আমি গল্প, কবিতা দুটোই লিখি।
গোবিন্দ ধর :সংসার চলছে বেশ নিশ্চয়ই। কজন ছেলেমেয়ে? বর কি করেন?
শিউলী মজুমদার :হুম,সৃষ্টিকর্তা চালাচ্ছেন।
এক ছেলে, এক মেয়ে।
বর চাকরি করেন।
গোবিন্দ ধর :জীবনে প্রেম তো বারবার আসে।যখন এক গুয়েমিতে ভরে যায় জীবনযাপন তখনই কি পরিবারে আস্তা রাখেন? নাকি কোথাও একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচার তীব্রতা জাগে না?বলুন?
শিউলী মজুমদার :জীবনে প্রেম সত্যিই বারবার আসতে পারে—নতুন রঙে, নতুন মুখে, কখনো বা পুরোনো কোনো অনুভূতির নতুন ব্যাখ্যায়। কিন্তু যখন জীবনের ছকে ফেঁসে যাই, একঘেয়েমি, দায়িত্ব আর নিয়মের ভারে, তখন পরিবারে আশ্রয় খুঁজি। কারণ পরিবার মানেই নিরাপত্তা, স্থিরতা, দায়িত্ববোধের জায়গা।
তবে সব সময় কি তা যথেষ্ট হয়? না, অনেক সময়ই হয় না। ভেতরে তখন একটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। একটুখানি নিজের মতো করে বাঁচা, নিজের ভেতরের মানুষটাকে খুঁজে পাওয়া, ভালোবাসা বা উন্মাদনা নয়, শুধু একটু মুক্ত বাতাস।
আসলে এই টানাপোড়েনটাই তো জীবন। আস্থা আর আকাঙ্ক্ষার, দায়িত্ব আর মুক্তির, ভালোবাসা আর নিজেকে খোঁজে চলার মধ্যে এক দোলাচল।
গোবিন্দ ধর :দোলাচলই জীবন?নাকি দায়িত্ববোধই জীবন?
শিউলী মজুমদার :আসলে আমার কাছে দুটো মিলিয়েই জীবন।
গোবিন্দ ধর :তাহলে সংসারে আপনি সুখী মানুষ। দায়িত্বশীল মা।
এরকম সুন্দর জীবনই তো শিল্প-সাহিত্যের জন্য সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন।
আপনার বিয়ের পূর্বে প্রেম ছিলো? কিংবা সামাজিক বিয়ে না প্রেমের বিয়ে?
শিউলী মজুমদার :সামাজিক বিয়ে।
গোবিন্দ ধর :কবিতা কি মূহুর্তের বিস্ফোরণ? আপনার ভাবনা বলুন?
শিউলী মজুমদার :আমার কাছে কবিতা মুহূর্তের বিস্ফোরণ। কারণ, চাইলেও সবসময় কবিতা লেখা যায় না।
গোবিন্দ ধর :একজন কবি কি সব সময় লেখতে পারেন?
শিউলী মজুমদার : আমি পারি না
গোবিন্দ ধর :লেখালেখি কেন করেন?
শিউলী মজুমদার :হা হা হা...
এই উত্তরটা আগের একটা প্রশ্নের উত্তরে ছিল।
গোবিন্দ ধর :ও,তাই।আজকাল বুড়ো হয়েছি তো।মনেও থাকে না। কি আর করি।তো সামনে কি প্লেন?
শিউলী মজুমদার :কিসের?
গোবিন্দ ধর :সাহিত্য জীবনের।
শিউলী মজুমদার :
কোন প্লেন নেই। জীবন যেখানে নিয়ে যায়।
গোবিন্দ ধর :কখনও ত্রিপুরা এসছেন?
শিউলী মজুমদার :না, তবে আত্মীয় আছে।
গোবিন্দ ধর :কোথায়। কি রকম আত্মীয়?
শিউলী মজুমদার :আমার শ্বশুর পাঁচ ভাই ছিলেন।
শুধু শ্বশুর এদেশে থেকে গেছেন, বাকিসব ইন্ডিয়া। পিশি শ্বাশুড়িও।
গোবিন্দ ধর :কোন কোন জায়গায়?
শিউলী মজুমদার :আগরতলা চাম্পামুড়া আছেন দুই কাকু
বড় কাকা আসাম শিব সাগর।
ছোট কাকু আসাম শিলচর।
পিসিমনি আছেন আগরতলা ভাটি অভয়নগর।
বড় কাকুর ছোট মেয়ে দিল্লী।
বড় মেয়ে বনগাঁও আছে।
আরো আছে আমি ঠিক বলতে পারছি না আর।
গোবিন্দ ধর :ও আচ্ছা। নানা রাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন উনারা। এক বার আসেন।ত্রিপুরার আত্মীয়দের দেখে যান।
কবে আসবেন বলবেন।যদি আগে থেকে জানি আমিও দেখা করবো।জানাবেন কেমন?
শিউলী মজুমদার :আচ্ছা,
তবে যাওয়ার ইচ্ছে আছে।
গতবছর সবকিছু গুছিয়ে উঠেছিলাম, দেশের পরিস্থিতির কারণে আর যাওয়া হলো না।
গোবিন্দ ধর :অস্থিরতা আসলে কোনো দেশকেই সুন্দর অবস্থানে পৌঁছায়৷ না। সমস্যা থেকে বেরুতেই হবে দেশ পরিচালকদের। নয়তো দেশ আরো অস্থিরতায় ডুবে যাবে।
দুদেশের সম্প্রতি সম্পর্কেও স্থিতিশীলতা থাকবে না এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে দেশের মানুষ কি ভাবছেন তা আপনারাই ভালো বুঝবেন।আমরাও চাই আপনাদের দেশ স্থিতিশীল হোক।আমরা পরস্পর আবার সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়ুক।নয়তো দেশের মানব সম্পদের পরিবেশে ঘনিয়ে আসে কালোমেঘ।
আপনি কি মনে করেন এই প্রসঙ্গে?
শিউলী মজুমদার :
আপনার কথাগুলো যথাযথ।
গোবিন্দ ধর :দুই দেশের সম্পর্ক কি রকম দেখতে চান?
শিউলী মজুমদার : পরিবর্তিত পরিস্থিতি থেকে একটি নির্বাচিত সরকার গঠিত হোক এইটুকুই প্রত্যাশা করি।
গোবিন্দ ধর : মেয়েবেলা নিয়ে বলুন,বন্ধু।
শিউলী মজুমদার : মেয়েবেলার কোনদিকগুলো জানতে চান?
গোবিন্দ ধর : শিক্ষা প্রেম সবই।
শিউলী মজুমদার :আমার গ্রামের স্কুলেই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হয়। আমাকে নিয়ে বাবার খুব স্বপ্ন ছিল। তাই ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালায় ভর্তি করিয়ে দেন। পাঠশালার সাথেই নিবেদিতা হোষ্টেলে থাকতাম। নিবেদিতা হোষ্টেলের পরিচালক শিশির কণা দিদিমনির আত্মীয়ের বাড়ি ছিল আমাদের বাড়ির পাশে। তাই ছোটবেলা থেকেই চিনতেন। আমায় খুব আদর করতেন। বাবার খুব ভক্ত ছিলেন তিনি। বাবার ঔষধ ছাড়া খেতেন না। দিদিমনি তখন দত্ত হোস্টেলে থাকতেন। নিবেদিতা হোষ্টেল তখন বেশ কিছুদিন পুরোদমে বন্ধ। দিদিমনি তখন আমাকে নিয়ে এই হোস্টেল খুলতে চাইলেন । অবশ্য পরে সাথে আরো দুজন হয়েছিল, অনিমা দি এবং লোপা দি। এই তিনজনকে নিয়েই নিবেদিতা হোষ্টেল খোলা হয়। পরে অবশ্য অনেক হয়েছে। পাঁচটায় প্রার্থনা, সাতটায় স্কুল ছিল। কিন্তু মা বাবাকে ছেড়ে নতুন পরিবেশে আমার কিছুতেই মন টিকছিল না। ছয় মাস থেকে কান্নাকাটি করে চলে আসি। বাড়ি আসার পর আমাকে মাসির বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। স্কুল ভালো ছিল আর মাসিদের বাড়ির কাছে ছিল। কিন্তু সেখানে আট মাস থাকার পর বাবা নিয়ে আসেন। আমাদের গ্রামের স্কুলেই ভর্তি করিয়ে দেন। স্কুল অনেক দূর ছিল। একঘন্টা হেঁটে যেতে হতো। তাছাড়া এলাকাও ভালো ছিল না। সেখানে ক্লাস নাইনে উঠলে বাবা আবার বাবা ঈশ্বর পাঠশালায় ভর্তি করিয়ে দেন। আবার নিবেদিতা হোস্টেল। কিন্তু গ্রামের স্কুল থেকে শিক্ষকরা টিসি দেননি। তাই বাধ্য হয়ে কুমিল্লা পড়ে পরীক্ষা দিয়েছি গ্রামে এসে। তারপর এস এস সি পর পরই বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর বি এস এস পাশ করি।
আর প্রেম হয়নি জীবনে। তবে এসেছিল।
গোবিন্দ ধর : কেন হয়নি?
শিউলী মজুমদার : হা হা হা....। ১৬ বছরে বিয়ে হয়ে যায়। প্রেম করার সুযোগ কই বলুন।
গোবিন্দ ধর :একজন কবি প্রেম করেনি। হতে পারে। কিন্তু কবিতা তো প্রেম চায়।প্রেম প্রতিবাদ দুঃখ এগুলো কবিতার মূল পতাকা।
শিউলী মজুমদার :হুম, ধরে নিন সেইটুকু স্বামীর কাছ থেকেই পুষিয়ে নিয়েছি। প্রেম, প্রতিবাদ, দুঃখ সবটাই।
গোবিন্দ ধর : আপনাকে ধন্যবাদ। দীর্ঘসময় নিয়ে আপনি এই আলাপচারিতায় অংশ গ্রহণ করেছেন। এই-ই আমার পাওয়া।
0 Comments