শ্রীহট্টীয় বা সিলেটি আঞ্চলিক পরব:টগা

গোবিন্দ ধর 

মাধুরী লোধ খুব সুন্দর বললেন এই ব্রত নিয়ে।আমি তাঁর মন্তব্যটি কপি করে হুবহু তুলে দিলাম।নোয়াখালীরা এই ব্রত কিরকম উদযাপন করেন তা আমাকে পুলকিত করলো।শ্রীহট্টীয় অঞ্চলেও একই রকম প্রায় এই ব্রতটি পালন করা হয়।
""ফল পসারী দিয়ে নৈবেদ্য দেওয়া হয়।ধুপ দীপ জ্বালিয়ে শুদ্ধ চিত্তে নিবেদন করা হয় ।বিশেষত পুত্র সন্তানদের মঙ্গল কামনায় দেওয়া হয় এ পূজা। ব্রতী সেদিন ধান চাউলের কিছু খান না। সন্ধ্যায় ঐ হাঁড়িতে জল দিয়ে ভালো করে বেঁধে দেওয়া হয় মুখ। পরদিন বাড়ির সবাই স্নান করে ঠাকুর প্রণাম করে পালন করে কলা নারকেল দিয়ে । সাথে থাকে দৈ  গুড়।এ প্রসাদ খেলে রোগ ব্যাধি ভালো হয় এ বিশ্বাসও পোষন করে গৃহস্থরা। হাঁড়িতে নতুন জল দিয়ে রাখা হয় বাড়ির জামাই এর জন্য ।জামাই এর নাকি আয় মঙ্গল হয়।
আমরা ছোটবেলায় দেখেছি বাবা জাল মেরে মাছ ধরতেন ঐ পান্তা ভাত খাবার জন্য। সকালে গুড় কলা দিয়ে খেলেও দুপুরে খেতেন মাছ বিশেষত কাচকি  বা মরিয়া মাছ দিয়ে।
নয়তো সিদল চাটনি।
পূজার পাঁচালী আছে কিন্তু আমার মা   গড় গড় করে আশ্বিন পূজার মাহাত্ম্য শুনাতেন। মায়ের মৃত্যুর পর আমিও ব্রত পালন করেছি।
বর্তমানে নানান ঝামেলায় ব্রত পালন করতে পারি না। যে কোন  পরিচিত বাড়িতে গিয়ে প্রসাদ গ্রহণ করি।
এ প্রথা বাঙ্গালী সমাজে বহমান। সংস্কার বা রীতি যা হোক না কেন আমরা নোয়াখালী এলাকার লোকরা বিষয়টি চুটিয়ে উপভোগ করি। আমার বাবা বলতেন খাইবার হুজা। মা ক্ষেপে যেতেন ।বাবা সব কিনে আনতেন।এই আনন্দ বোধ আমরা হারিয়ে  ফেলেছি যুগের সাথে তাল দিতে গিয়ে।পুরুত ছাড়া এ পূজা অন্য পূজার মতোই উন্মাদনার ।
জয়  আশ্বিন ঠাকুর এর জয়।""

এরকম আরো সহযোগিতা করলো জয় দেবনাথ :

"আশ্বিনে রাইন্ধি কাত্তিয়ে খায়,
যেই বর মাগে হেই বড় হায়!"

আশ্বিনে রান্ধুম কাত্তিয়ে খামু
যে বর চামু সেই বর পামু!

     (নোয়াখালি আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগ)

 সৌজন্যে :জয় দেবনাথ,সম্পাদক:মনন. স্রোত

কথাসাহিত্যিক মাধুরী লোধ এরকমই বলেন:

আশ্বিন এ রান্ধে কার্তিক এ খায়
যেই বর চাইবো সেই বর হায়

আর আমাদের অঞ্চলে এরকম লোক মুখে শুনতে পাই। প্রচলিত ডিটানটি:

আশ্নিনে রান্ধিয়া কাতিত খাও
যে বর মাঙ্গঅ সে বর পাও।

     (শ্রীহট্টীয় ভাষা)

টগা শ্রীহট্টীয় বা সিলেটি সংস্কৃতি জগতে ধনের দেবীর সন্তান জন্মদানকে শ্রদ্ধা জানানোর এক আঞ্চলিক লৌকিক অনুষ্ঠান। 
আশ্বিন যাইতে কাতি হামাইতে লক্ষীয়ে পাঠাইসন মরে চুয়া চন্দনে বরিতে তোমারে, চুয়া চন্দন সুন্দা মেথি চৈইলতা পাতায় হিজা মেলিস আড়াই আত, চৈইলতা পাতায় ধরছে কাড়াড় এক গুনে নন বাড়ার এরকমই এক সংস্কৃতির কথা সিলেটিরা আজকের দিনে পালন করেন।
সকাল থেকেই শুদ্ধ ভাবে আশ্বিন মাসের শেষ দিনে নিরামিষ রান্না করে লক্ষ্মীকে দেওয়া হয়।তারপর সবাই আহার করেন।আর অবশিষ্ট রান্না রেখে দেওয়া হয় আগামীকাল খাওয়ার হয়।কথিত আছে আশ্বিনে রান্না কাতিত খাবার খেলে লক্ষ্মীর নিকট যে বর মাগা হয় সেই বরই লাভ করা যায়।
আসলে কৃষি প্রদান শ্রীহট্টীয়দের ঘরে ঘরে তখন লাগানো ধান চারায় দুধ আসে।আর দুধধান চাল হওয়ার সময় যে পরব তাকে লক্ষ্মীর হাদা বা সাধ খাওয়ানো বলা হয়।হাদা মানে সাধভক্ষণ। আমাদের মানবমানবীদের সন্তান প্রসবের আগে যেমন সাধ খাওয়ানোর প্রথা এরও তেমনি এক প্রথা।শ্রীহট্টীয়রা তাকে ধর্মাচারে পালন করেন।লক্ষ্মীব্রত হিসেবেও এই ব্রত প্রচলিত।

গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে এই দিন এই ব্রত পালন করা হয়।আধুনিক সমাজে শহর কেন্দ্রিক জনগণ হয়তো ততো জাঁকজমকপূর্ণভাবে এই আচার পালন করেন না।তাও নিয়ম রক্ষা করার প্রচলন এখনো বিদ্ধমান।আমাদের কৃষি নির্ভর সমাজ ব্যবস্থায় গ্রামীণ এই আচার পালনে মঙ্গল চিন্তারই নিদর্শন পরিলক্ষিত। 

"আইজ আট আনাজ -- 
টগা লাগানির দিন!
টগা বিপদ থাকিয়া রক্ষা করে 
ধনধান্যে পরিপূর্ণ করে।
অয় -- আইজ আমরা রান্ধি
কাইল খাই -- আমরা বাঙালি
উৎসবর শেষ নাই।"-কবি দেবাশীষ চৌধুরী। 

১৮:১০:২০১৯
বেলা:০৪:১৫মি
কুমারঘাট।

0 Comments