বাদ -বাংলার কবিতায় রীতির বিপরীত রীতি

রবীন্দ্র গুহ 

... রীতির বিরুদ্ধ রীতিভঙ্গি নিয়ে ত্রিপুরার কবিতার ভূমি কাঁপিয়ে দেয় একঝাঁক তরুণ- তুর্কি। তাদের মধ্যে বহুচর্চিত নাম: মানিকা বড়ুয়া, গোবিন্দ ধর, চিরশ্রী দেবনাথ, অভিজিৎ চক্রবর্তী, অশোক দেব, প্রবুদ্ধসুন্দর কর, তপন দেবনাথ, নির্মল দত্ত, শঙ্খ সেনগুপ্ত, শিউলি শর্মা, মৃদুল দেবনাথ, বিমল চক্রবর্তী, বিনয় সিনহা, মানিক চক্রবর্তী, জাফর সাদেক, সুস্মিতা চৌধুরী, নিধির রায়। এইসব কবিদের পেশা ও অভিজ্ঞতায় দুস্তর বৈভিন্ন্য। বিশ্বাস এবং মতাদর্শের দিক থেকেও পরস্পরবিরোধী। অনেকেই বেজায় খামখেয়ালী, ভাবুক, স্থাশক্তির স্বপক্ষে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি প্রবল চোরাটান। কেউ কেউ বাস্তুচ্যুত। তবে পীযূষ, কল্যাণব্রত, এবং স্বপন সেনগুপ্তের মত স্মৃতিকাতর নয়। বরং পূর্বাঞ্চলের প্রকৃতির প্রতি গভীর টান। রাজনীতি সচেতন। মার্কসীয় চিন্তাধারায় আলোড়িত। মনিকা বড়ুয়া, অশোক দেব, নির্মল দত্ত, প্রবুদ্ধসুন্দর করের মত অন্তর্মুখিন নয় শঙ্খ সেনগুপ্ত, শিউলি শর্মা, বিনয় সিনহা এবং গোবিন্দ ধর। সামাজিক অবক্ষয় চূড়ান্ত বলে অনেকেই মনে করে। সবসময় মানুষের কাছে থাকায় অঙ্গীকারবদ্ধ কবি গোবিন্দ ধর যেমন প্রতীকের রহস্যময়তায় মুগ্ধ, তেমনি বাস্তববাদী অবদামিত মন নিয়ে তার কবিতার জগত। গোবিন্দ নিজেকে বলে: অক্ষরশ্রমিক। আমি বলি: কিংবদন্তির রূপকার। যার মধ্যে আছে প্রকৃতির যাবতীয় প্রাণের স্পন্দন, নাড়ির যোগ, মোহনীয় মায়াজাদু, সৌন্দর্য্যের সুধারস- যা কবিকে দেয় মাধুর্য- লীলার নিমিত্ত লীলা,
অনন্ত মুগ্ধতা- এবং আত্মচীৎকারের যন্ত্রণা। তখন কবি আর অক্ষর শ্রমিক থাকে না। রূপকার হয়ে যায়। কবিতার কাছে চলে যায়। যেতে তাকে হয়-ই। কবির আত্মখননের তর্জনী বিষয়ে বলতে গিয়ে সুস্মিতা দাস সেই অসামান্য কথাটি যথার্থ বলেছেন। কবি "এক দ্রোহবীজ। যা তার স্বখোদিত ভাস্কর্যের মতো প্রস্ফুটিত।। তার কবিতা পাঠের সাথে সাথে পাঠক খননের সলিলে ডুবে যাবেন..."।" মুখে লাগে শীত/হাড় হিম করে চলে গেলো"। গোবিন্দর বাচনভঙ্গি, পংক্তি-বিন্যাস, জ্বলে ওঠা দৃশ্যসমূহ সহযাত্রী কবি জাফর সাদেক, মনিকা বড়ুয়া, মানিক চক্রবর্তীর ঘরানার দুর্জেয় রহস্যের মত নয়। কবি ক্ষুদ্রতার গল্প করতে করতে আস্তে ধীরে নেমে যায় অনিশ্চয়তায়। কবিতার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে কবিতার রহস্যে ডুবে যাওয়া সহজ নয়। এইরকম কৃতিত্বের অধিকারী পীযূষ রাউত, প্রদীপবিকাশ রায়, কল্যাণব্রত চক্রবর্তী। প্রদীপ বিকাশের পছন্দ গদ্যছন্দ। তার স্বপ্নের ভিতর টেলিফোন বাজে- তাই লিখে ফেলেন 'গোপন টেলিফোন'। গোবিন্দ একইরকমভাবে খুঁজে পায় দ্রোহবীজের ভেতর ছেদচিহৃহীন অবচেতনমানসের দ্রোহবীজ। সে লিখে ফেলে। 'এই পৃথিবীতে তুমুল তুফান...। 'ভাঙচুর হওয়ার মতো যথেষ্ট/কিছুই নেই অবশিষ্ট/ অথচ প্রতিবার ভাঙছি... অথবা/এবং, 'সমস্ত দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি একা, একা'...। গোবিন্দের একক কবিতা সংকলন ৫, যৌথ সংকলন ৯। 'সূর্যসেন লেন', 'জলঘর', 'মনসুনমাছি', 'দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি একা, একা'। ত্রিপুরার বাংলা কবিতাকে, অবশ্যই সমৃদ্ধ করবে গোবিন্দ ধরের মেধা। একজন কবিকে জানতে একাধিক কবিতার প্রয়োজন নেই। উজ্জ্বল কিছু পংক্তিই যথেষ্ট। তপন দেবনাথ, অশোক দেব, গোবিন্দ ধরের প্রায় কাছাকাছি সময়ে আরো কিছু ভিন্ন রীতির কবিকে পাওয়া যায়। যেমন, অভিজিৎ চক্রবর্তী, স্বাতী ইন্দু, নকুল রায়, সিরাজউদ্দিন আহমেদ। এরা প্রায় সকলেই প্রকৃতির সৌন্দর্যে মগ্ন। এবং একের সঙ্গে অপরের সম্পর্ক গভীর। অথচ, শূন্য দশকের এইসব কবিদের কবিতা ভাবনায় আদৌ মিল নেই। কেউ বলেন, 'কবিতা একান্তই বাতাসের গতি- অস্থির মানসিক দ্যুতি।' কেউ বলেন, 'কবিতা মধ্যদুপুরের খোলামাঠে মায়া-চিকচিকা'। কেউবা বলেন, 'নির্জন বুকের কৌতুক- শ্লোক, সুন্দরের মনোবিকলন- শব্দের দখলদারির ভাব-প্রকাশ'। প্রসঙ্গত ডানা জোইয়ার (Dana Gioia) একটি রচনা পড়েছিলাম-' ক্যান পোয়েট্রি ম্যাটার?' বাঙালি ও বাঙলার বর্তমান কালখন্ডে বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। মনে পড়ছে, হ্যাঁ, বেশ কয়েক বছর আগে,.. পত্রিকায় উক্ত রচনা পড়েছিলাম। পত্রিকাটি আমাকে খুব যত্ন সরকারে পাঠিয়েছিল সমীর রায়চৌধুরী। বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়েছিল রচনাটি নিয়ে। ওই সময়ই আর একটি রচনা পড়ি 'হু কিলড পোয়েট্রি'? লিখেছিলেন জোসেফ এ্যপস্টেন। আমাদের দেশে এরকম কেউ ভাবেনা। আমাদের কবিরা 'কবিতার স্কুলের' কথা বলেন। ভাষাবদলের কথা বলেন। কাব্যানুষ্ঠানের সংখ্যা বিস্ময়কর। সংকলন বেরোয় হাজারা হাজার। বিলি হয়। আলোচনা নেই। বাহবা আছে খুব- আর কবিদের অহংকার। ত্রিপুরায় স্রোতামণ্ডলী আছে। বিশেষজ্ঞ আছে। আলোচনাচক্র আছে। ওয়ার্কশপ হয়। একাধিক পত্রিকা (স্রোত, কবিতাঘর, কুসুম, অন্যপাঠ) সম্পাদনা ছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চলে কবি গোবিন্দ ধর কবিসভা করেন। কবিতার নিহিতার্থ, আঙ্গিক নিয়ে তর্কাকর্তি হয়। বিভ্রান্তবোধ করেন না কেউ। কবিতার স্কুলে অ্যাকাডেমিক চর্চা হয়- পান্ডিত্যের প্রকাশ ঘটে- কবি হওয়া যায় না। এটা মেনে নেয়া সঙ্গত, কবিতা উপসংস্কৃতি নয়, ধর্মপ্রচার নয়। ফ্যাটের মধ্যে কবিতা চলাচল করে না। বিদ্যালয়ে একদা সুসজ্জিতভাবে যা হবার হত, এই সময়কার নতুন কবিতায়, পারফর্মেন্সের আনন্দ নেই- পাঠককে আকৃষ্ট করার চ্যালেঞ্জ আছে। গোবিন্দ ধরের সৎ এবং দৃঢ় মন্তব্য: "কবিতা আমার কাছে সাবলিল ভাবে ধরা দেয়। আমার কবিতায় বুদ্ধির কোন চকমকি নেই। হৃদয়ের গহন থেকে ঠিক যে রকম আসে আমি খুব একটা কাঁটাছেড়া করিনা।"

ঠিক এই রকমই চিন্তাভাবনা বরাক উপত্যকার কবি বিশ্বজিৎ চৌধুরী, দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য, সুব্রত কুমার রায়, মলয় নাগের কাবিতায় প্রত্যক্ষ করা যায়। এরা প্রত্যেকেই ৮০ দশকের চিহৃিত কবি। কবিতার শৈলী, অনুভূতির গভীরতা, দৃষ্টির নতুনত্ব তথা আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ। প্রসঙ্গত, এব্যাপারে আরো নাম মনে এসে যায়, যেমন-বিশ্বজিৎ নন্দী, প্রাণেশ কর, জগদীশ বর্মন, কমল সাহা, হেলানুজ জামান, মজীদুর রহমান, দিলীপকান্তি লস্কর। এরা সবাই বাদ-বাংলায়া স্বীকৃতি পেয়েছেন।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবীনদের দ্বন্দ্ব ও বিপরীত ঐক্যের কথা, বিচারশীল আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তির কথা, ভিন্ন ভিন্ন রীতিভঙ্গির কথা আগেই বলেছি- তারা সবাই কালখন্ডের সেরা রূপবান ভাবুক।

ঋণ:বাদ-বাংলার কবিতায় রীতির বিপরীত রীতি :রবীন্দ্র গুহ,স্রোত প্রকাশনা: প্রথম প্রকাশ:২০১৯ মূল্য :১৩০.০০

0 Comments