জামশেদপুর     ২৫ জানুয়ারী ২০২২
         
প্রিয়জনেষু
গোবিন্দ ধর

কবি এবং সম্পাদক স্রোত সাহিত্য পত্রিকা
বিষয় : স্রোত প্রকাশনা ও স্রোত সাহিত্য এবং কবি গোবিন্দ ধরের কাছ থেকে আমরা কি প্রত্যাশা করি।
সুধী
আমি সৌভাগ্যবান যে, আমি স্রোত পরিবারের সাথে (হোয়াটস এপ গ্রুপ ‘প্রতিদিন বাংলা ভাষা,স্রোত’) যুক্ত। স্রোত সাহিত্য পত্র ও স্রোত প্রকাশনা যে ভাবে অধুনা সময়োপযোগী হয়ে সাবলীল স্রোতে বাংলা ভাষাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই যে, দেও ও মনু নদীর সঙ্গমস্থল হালাইমুড়া উল্লেখযোগ্য স্থান হিসেবে চিহ্নিত হবে সাহিত্যের ইতিহাসের পাতায়। যদিও এই অনিন্দ্য সুন্দর স্থান আমার এখনও দেখার সৌভাগ্য হয় নি কিন্তু সেখানের অপরূপ বর্ণনায় বুঝি, যেখানে নদী কথা বলে,পাখি গান গায় সবুজ বনানীতে শান্তি বিরাজমান সেখানে নির্মল সাহিত্য রচনা অবশ্যই হওয়া সম্ভব। তাই শুধু সাহিত্য প্রকাশনার তীর্থক্ষেত্র নয়, উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন সংরক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রও হয়ে উঠেছে। কোভিডের বাধা নিষেধ মেনে জানুয়ারী ২০২২ তেও ত্রিপুরার আট জেলায় স্রোত প্রকাশনী অবলীলায় বই উত্সব করে যাচ্ছে শুনে বোঝাই যায় সাহিত্য চর্চা কোথায় স্ফুরিত কোথায় স্তিমিত। আমি বিশ্বাস করি ত্রিপুরা অঞ্চলের বাইরে বহির্বঙ্গে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী সেইরকম আমি দেখছি না অন্তত সাহিত্যের মত নিত্য-প্রবহমান শিল্প প্রকরণের এমন উদ্যমী সংস্থায় আমরা যারা সাহিত্যকর্মী,ভরসা করতে পারি আপনাদের প্রকাশনা ও প্রসারের এই সাবলীল গতি বাংলা সাহিত্যের ক্যানভাস স্প্রেড করবে এটা বলা যায়। যদিও স্রোত সাহিত্য পত্রিকা এখন পূর্বাঞ্চলের অন্যতম একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে গণ্য করা হয় তবুও এর প্রচার ও প্রসার দেখে মনে হয় খুব শীঘ্রই সারা বাংলায় এর সমাদর হবেই। সাহিত্যিক প্রণব চৌধুরী বলেন, ‘স্রোত প্রকাশনা ত্রিপুরার প্রকাশনা ক্ষেত্রে একটি বিপ্লব বিশেষ। নতুন নতুন সাহিত্যিক এই প্রকাশনার মাধ্যমে উঠে এসেছেন। ত্রিপুরার সাহিত্য জগত সমৃদ্ধ হয়েছে এর মাধ্যমে’। বহু কথা সাহিত্যিক স্রোত পরিবারের সাথে জড়িত। মানস দেববর্মন, বিমল চক্রবর্তী,ডক্টর দেবব্রত দেবরায়,শ্যামল ভট্টাচার্য তন্ময় বীর প্রমুখ স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব এই মননশীল পত্রিকাতে আছেন। আরাত্রিক পত্রিকার একটি বিশেষ সংখ্যা ‘ভারতের বাংলা গল্প’ সম্পাদক তন্ময় বীর এই স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ৭৭টি বাংলা গল্পের এই সংকলন আমাদের দেশে চিরকালের ইতিহাস হয়ে থাকবে। সাহিত্য বিজ্ঞান অধ্যাত্মিকতা এইসব সৃজনশীল প্রবাহের আমাদের দেশে বর্তমান কালে কোনদিন সঠিক মূল্যায়ন হয়না। ভবিষ্যতে তাদের মূল্যাঙ্কন করে ভবিষ্যতের মানুষ। কিন্তু অদূরদর্শী মানুষেরা ঠিক তার সমাদর বোঝেন। শ্যামল ভট্টাচার্যের বহুস্তরীয় ভৌগলিক অভিজ্ঞতা ও তারফলে অন্যভাষার সাংস্কৃতিক সম্পদ তাঁর গল্প ও উপন্যাসে ব্যবহার একটি নতুন ধারা প্রবাহের সংযোজন করেছেন স্রোত প্রকাশক গোবিন্দ ধর। এবং আরও অনেক উল্লেখযোগ্য বই ও পত্রিকা প্রকাশনে আপনি দেখিয়েছেন কোলকাতা কেন্দ্রিক যে সব প্রকাশক ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে ধুয়ো তুলে নিজেদেরকে শিল্প প্রকরণের নতুনত্বের প্রতিষ্ঠান বলে বিজ্ঞাপন দেন, সেটা সবটা সত্য নয়। বাংলা সাহিত্যের ক্রমবিকাশ যে ত্রিপুরা ঝাড়খণ্ড মধ্যপ্রদেশ দিল্লি থেকেও যে হয় এবং আধুনিক হয় সে কথা পশ্চিমবঙ্গের কতিপয় সমালোচকের অহমিকায় ধরা পড়ে না। আপনি সর্বভারতীয় স্তরের বাংলাভাষার গুণী সাহিত্যিককে আপনার স্রোত প্রকাশনা মঞ্চে এনে সমস্ত প্রাদেশিক আবেগময়তাকে বিসর্জন দিয়ে, বাংলা গদ্যভাষাকে আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে পেরেছেন এইকথা আমার মনে হয়। যদিও বাংলা সাহিত্যের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বলে এখন তেমন জোরদার কিছু নেই,সোশ্যাল মিডিয়া এবং প্রিন্ট মিডিয়ার
সহজগম্যতার ফলে বাজারে প্রচুর অপ্রাতিষ্ঠানিক ম্যাগাজিনের আবির্ভাব হয়েছে। তাই গতানুগতিক বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলির আর রমরমা প্রসার সেরকম নেই। এবং তাদের নিজেদের ছক অনুযায়ী লেখকদের কথাও আর বেশি কেউ মনে রাখে না। পাঠকও অনেক বোদ্ধা হয়েছেন। এইসময় যিনি ঠিকমত ভাবী সাহিত্যের উত্তরসূরী খুঁজে নিতে পারেন, ইংরেজিতে যাকে বলে ট্যালেণ্ট হান্ট, তিনিই সফল প্রকাশক হতে পারেন। এবং আমার যা মনে হয় আপনি আপনার স্রোত প্রকাশনা থেকে তা পারবেন। এখন যে যুগ, তা হলো আধুনিকতা থেকে উত্তর আধুনিকতায় যাওয়া, লেখার ফর্ম ভেঙে এন্টিফর্মে যাওয়া, রোমান্টিসিজম না রেখে ডাডাইজমের দিকে এগিয়ে যাওয়া। সেই পুরোনো সাংসারিক টানাপোড়েন বিষয়ক একই রকম সংস্কৃতির বর্ণনা মানুষ আর পড়তে চায়না। সেইসব ভ্রান্তিবিলাস কিছু লোক যদি পড়েও, প্রকাশকের হয়তো লাভও হয়, কিন্তু সেটা কী প্রোগ্রেসিভ মানে প্রগ্রতিশীল? এককেন্দ্রিক মহানগর সভ্যতার ও সংস্কৃতি বাদ দিয়ে কত যে বিপুল পরিমাণে অজানা লোক সংস্কৃতি জীবনযাপন পড়ে আছে, প্রকাশকের একটা সরাসরি দায়িত্ব পাঠকদের কাছে তা উন্মেষ করা। এবং সেটা যেন অন্তরঙ্গ হয় পাঠকের কাছে এমন লেখককে খুঁজে বার করার দায়িত্বও বর্তায়। মর্মলোকের বিবর্তনধারায় সৃষ্টিশীল লেখকের একটা ভূমিকা রয়েছে। আর যখন সেই তাগিদে যখন সে লেখে সেটা পাঠকের কাছে প্রশংসনীয় হয়। কিন্তু কিছু লোভী ঠকবাজ প্রকাশক দুর্ভেদ্য জাল পেতে মহানগরে বসে আছেন। সেই ফাঁদে সত্যিকারের সৃষ্টিশীল লেখক ধরা পড়ে এবং ঠকে হেরে থকে তার সৃষ্টিশীলতার উদ্যম শেষ হয়ে বিমুখ হয়ে যায়। প্রকাশকের ব্যবসা লাটে উঠুক একথা আমি বলছিনা। তবে প্রোডাকশন খরচের অতিরিক্ত নিয়ে নিজের লাভটুকু হিসেব মতো বুঝে সেই লেখককে বইকিছু ডেলিভারি দিয়ে খালাস হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বহু প্রকাশককে দেখেছি। এতে লেখকের প্রাপ্য প্রশংসা ও প্রচার কিছুই হয় না। প্রকৃতির যেমন প্রত্যন্ত দুর্গম বিজন অরণ্যে ফোটা এবং মরে যাওয়া দুর্লভ বিস্ময়কর ফুলের মত সেই ধরনের সৃজনশীল লেখকেরা। যাকে কেউ দেখল না চিনল না। সে ফুটল আর অকালে ঝরে গেল। আপনাকে আমার বিশেষ অনুরোধ, সেই সব ট্যালেন্ট খুঁজুন। ব্যবসায়িক দিক দিয়ে কোনো ক্ষতি না করে, তার প্রচারের প্রসারের দায়িত্ব নিন। পরম সৃষ্টিকারের অশেষ কৃপা বর্ষণ হবে আপনার উপর।
 
ইতি
আপনার গুণগ্রাহী
সুবল দত্ত   
 

0 Comments