মাটির নিকট ভূমিষ্ট লেখাগুলো’ কাব্যিক শব্দের অফুরান অনুভুতি|| সুবল দত্ত
‘মাটির নিকট ভূমিষ্ট লেখাগুলো’ কাব্যিক শব্দের অফুরান অনুভুতি|| সুবল দত্ত
সাহিত্য বিজ্ঞান অধ্যাত্মিকতা এইসব সৃজনশীল প্রবাহের আমাদের দেশে বর্তমানকালে কোনদিন সঠিক মূল্যায়ন হয়না। তাদের মূল্যাঙ্কন করে ভবিষ্যতের মানুষ। কিন্তু এখনকার অদূরদর্শী মানুষেরা ঠিক তার সমাদর বোঝেন।
অধুনা সময় হলো আধুনিকতা থেকে উত্তর আধুনিকতায় যাওয়া, লেখার ফর্ম ভেঙে এন্টিফর্মে যাওয়া। এই শর্ত মেনে পরম্পরাগত ঐতিহ্য বজায় রেখে কবি গোবিন্দ ধরের এক অপূর্ব কাব্য অমনিবাস ‘নির্বাচিত কবিতা ১০০০’।
এই কবিতার বইটি একটি জীবনদর্শনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রতি ছত্রে ছত্রে জীবনযাপনের যাবতীয় পথ, সম্পর্ক, স্মৃতি, আনন্দ, দুঃখ বেদনার চিত্রকল্প লিপিবদ্ধ আছে তা পড়ে চমত্কৃত হতে হয়। কাব্যভাবনায় অনেক চেপে রাখা সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। কাব্যিক সরণি বেয়ে হেঁটে আসে অনেক সুখ, দুঃখ, ভালোলাগা, অভিমান, উল্লাসের এক একটা মুহূর্ত। তাঁর কবিতায় এখনকার জীবনদর্শন ফুটে ওঠে। সেই সময় থেকেই সামাজিক সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক অবক্ষয়ের কথাও তাঁর কলম থেকে নিঃসরিত হয়েছে। তাই তাঁর কবিতা এক নান্দনিক সমাজের মুখপত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। পদ্য সেখানে প্রাণবন্ত বাস্তব। প্রতিবাদ তাঁর অনায়াস লেখন। মর্মলোকের বিবর্তনধারায় সৃষ্টিশীল লেখকের একটা ভূমিকা রয়েছে। আর যখন সেই তাগিদে যখন সে লেখে সেটা পাঠকের কাছে প্রশংসনীয় হয়। তাঁর কবিতার ধারা এই ভূমিকা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। ‘এখন লিখতে হবে সময়ের ভাষার চাবুক’ এবং ‘কন্ডোম আসলে একটার সাথে আরেকটার বিরোধ চিরকালীন’ কবিতার লাইন ব্যক্তিকবির প্রতিবাদী মানসিকতা। ‘কেবল যোগ করতে করতে বিয়োগ ভুলে যাই’, ‘তুলির আঁচড় দিলাম হ্যাণ্ডমেড কাগজ দাও/লিখি অসুখ নিজের বসন্ত’ কবিতার এই অতিসংবেদনশীল লাইনগুলোর তুলনা হয়না।
তাঁর বেশ কয়েকটি পদ্যাণু কবিতা এক্সপেরিমেন্টাল বিস্তারধর্মী কবিতা। ‘পথ পথ দেখায়/তারপর একসময় /অরণ্য গিলে খায় রাস্তা’ ‘নিকটে গেলেই ছোট লাগে অবয়ব/বরং ছবিতে জুম করে দেখবো ঐশ্বর্যারাই’ ‘তোমার কাছে ভায়লীন আমার বাজাও’ ‘স্রোতের দিকেই জল গড়ায়/ যতই উল্টো ঢালো নদী’ কবিতার এই ক্ষুদ্র লাইনগুলি জীবন দর্শনের অনেককিছুই বলে দেয়। কবিতাগুলি পড়লেই বোঝা যায় তিনি সর্বদা সজাগ, জীবনের সমস্ত ঘাত প্রতিঘাত বিষয়ে। শুধু তাই নয়, প্রচ্ছন্নভাবে অধ্যাত্মিক ভাব ও সমর্পণ কবিতায় ফুটে উঠেছে। তাঁর এই কাব্য অমনিবাসে ‘রাধারমণ’ কথাটি এসেছে অনেকবার।
আরো কয়েকটি পদ্যানু কবিতায় দেখি ‘এসো নদী সভ্যতার নুপুর’ ‘পাখি বৃক্ষ এঁকে অরণ্য গান ধরে/আমরা আরোও সবুজ হই’ কবিতাগুলিতে অন্তর্লীন প্রকৃতিপ্রেম ধরা পড়ে । পরত পরত ভাবের অলঙ্কারে ভূষিত এই কাব্য গ্রন্থ। সবে মিলে উত্তর আধুনিক ধাঁচে সাবেকী পটভূমির উপর এই কবিতাগুলি বিশেষত্বের দাবী রাখে। প্রচুর পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। প্রচ্ছন্ন আত্মখন্ডন কবিতায় কবিতায়। বেশীরভাগ কবিতাতে নদী বারবার এসেছে। বাস্তবিক নদী কবি গোবিন্দ ধরের জীবনে ওতপ্রোতে জড়িয়ে আছে। দেও ও মনু নদী তাঁর অন্তর্নাড়ীতে প্রবহমান,এই স্পর্শকাতরতা তাঁর কবিতার উত্সমুখ। এই স্বতঃ চেতনা মানুষের মৌলিক আবেগ। যেমন নদীমাতৃক কবিতায়, 'জল দাও জল দাও নদীকে বলি/নদী তার জল নিয়ে মরীচিকাময়'। এক অদ্ভুত হা হুতাশের দর্শন কবিতাময়।
কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা 'বেঁচে থাকার কবিতা' এক অনন্য শপথ যা গ্রন্থটি শেষ অব্দি পড়তে বিবশ করে। যেমন, 'এসো বেঁচে থাকতে থাকতে যা যা লাগে লিখি কবিতায়/ এসো জলের কথা বলি/ এসো ভাত শিকার লিখি/ এসো লিখি কৃষক আন্দোলন...'কিছু অতি রূঢ় বাস্তব চিত্রকল্প, যেমন, 'এসো লিখি হাঁটতে হাঁটতে পরিযায়ী শ্রমিক/কেমন রুটি ধরতে ট্রেনে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিলেন, 'এম এন রেগা শ্রমিকের স্বপ্ন কেমন ডাকাতি হয়' এবং আরও। অনেক কবিতার মধ্যে নৈরাশ্য ফুটে উঠলেও কিন্তু কবিকে নৈরাশ্যবাদী বলা যাবেনা। কবিতা অতি বাস্তববাদী। সেখানে আশা নিরাশা যুগপত্ এক দর্শনের ভূমিকায়। কবি এখানে সমূহ মানবতার স্খলন ইঙ্গিত করছে। যেমন, 'মধ্যরাতের পদ্য' কবিতায়, ... কারো নিকট আশ্রয়ে মাথা রাখা যাবেনা/ সকলেই একএকজন মানব ভাইরাস....। এবং ' নদীমানুষ' কবিতায়, ...প্রিয় নদী হারিয়ে গেলে পিপাসায় রচিত হয় মৃত্যু...।
আবার দেখি কিছু কবিতায় চরম অমূর্তভাব অদ্ভুত ভাবে সালভাদর দালির মত সুররিয়ালিজম ফুটে ওঠে। যেমন, 'শান্তিবিড়ি' কবিতায় শান্তির ছবি এইরকম,...শান্তিবাজারের ডাকবাংলোয় দাঁড়িয়ে আছে/বিড়িগাছ/ শ্রমের সাথে ফুঁকে খায় নিজেই নিজেকে শ্রমিক.....। এবং 'নিজস্বনদী' কবিতায়, ... ঘুমের মাঝে নদীর শীত্কার শুনি/লাফ দিই,শঙ্খ লাগি/মিলে মিশে একাকার নদীর শীত্কার.... । ঠিক তার উল্টো ভাবনায়, ' আত্মস্তব' কবিতায়, ... আমার ছাই সমুদ্রে যাবে এমন বাসনা নাই/তাদের কান্নার ছন্দে যেন নিরাপদে পৌঁছে যাই/নিরন্ন মানুষের নিকট... ।
কিছু বর্ণনাত্মক ও বক্তব্যমূলক কবিতা,যেমন, ঢাকা (এই মাটির বুকে হাঁটলে ৭ মার্চের ভাষণ শুনি), অর্জুন (লক্ষ্য স্থির রাখো পাখির চোখ হোক দিল্লি) , তেমনি উজ্জ্বয়ন্ত প্রাসাদ, দেওনদী সমগ্র এবং আরও অনেক কবিতায় সমাজের যে কোনও অন্যায় অবিচারের প্রতিবাদ। সাধারণ মানুষ তাদের প্রাত্যহিক যন্ত্রণার সঙ্গী হিসেবে পেতে পারে কবিতাগুলিতে। সমাজের প্রতিটি অসাম্য, ন্যায়বিচারের প্রতিটি অভাব চিহ্নিত করা হয়েছে। এই বিস্তারধর্মী কবিতাগুলোর উৎস প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে। বেশকিছু কবিতা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাজনৈতিক পটভূমির উপরে মানুষের দুর্দশা কষ্ট ও তার জন্যে বেদনার প্রশ্নচিহ্ন উঠে উঠেছে, যেমন, যুদ্ধ(আমি যুদ্ধ শিশু), ১৯০৬৬৫৩ (রোহিঙ্গা থেকে ভয়ানক সময় থমকে আছে), আমৃত্যু বামপন্থী আমি, দেশ সিরিজ ২, রক্তঝরার পাঠ ৩ এবং আরও। কী অসাধারণ চাবুক চালিয়েছেন তিনি। কিছু কবিতায় একরকম অদ্ভুত সুররিয়ালিস্টিক চেতনা অথচ নিষ্ঠুর সত্য দেখতে পাই। এতো পরিষ্কার ও সূক্ষ্ম বাস্তব দৃশ্যপটের বর্ণনা কবিতায় আমি খুব কম পড়েছি। সব মিলেমিশে কবি গোবিন্দ ধরের ‘নির্বাচিত ১০০০ কবিতা’ এই কাব্য অমনিবাসটি অপূর্ব অনুভুতি ও কাব্যিক সুবাসে ভরপুর। আশাকরি আগামী কয়েক প্রজন্মের কবিদের কাছে উপাদেয় হয়ে থাকবে।
0 Comments