কুমারঘাটের সংস্কৃতি চর্চা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের রূপকার||অনিতা ভট্টাচার্য
কুমারঘাটের সংস্কৃতি চর্চা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের রূপকার||অনিতা ভট্টাচার্য
সংস্কৃতি আসলে শৈল্পিক প্রকাশ ৷সমাজ জীবনের স্বচ্ছ দর্পণ ৷এই দর্পণে আসলে সমাজের মানুষের জীবনাচার,জীবনবোধ , দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিচ্ছবি দেখা যায় ৷সমাজ কতটা উন্নত বা কতটা প্রগতিশীল তা সমাজের সংস্কৃতি মনষ্ক মানুষের সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমেই জানা যায় ৷ সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিনিময় ঘটে৷মানুষের মধ্যে বিভেদ দূরীভূত হয় ৷সংস্কৃতি যেমন জীবনকে সুন্দরের পথে নিয়ে যায় ,অপসংস্কৃতি তেমনি অসুন্দরের পথ দেখায় ৷অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয় ৷সংস্কৃতির মাধ্যমেই অতীতের ভাবধারা ,ঐতিহ্য বাহিত হয় ৷গুরুমুখী বিদ্যা শিষ্যের মাধ্যমে নতুনরূপে প্রকাশিত হয়৷
কুমারঘাট একটি নব রূপায়িত শহর ৷বহির্রাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগের জন্যে উল্লেখযোগ্য ৷২০১২সালের ১৯শে জানুয়ারী এটি মহকুমা হিসেবে শীলমোহর পায় ৷মহকুমায় উন্নীত হলেও গ্রামীন সংস্কৃতি এখনও বিরাজমান ৷এই শহরে জাতি-উপজাতি ,বাগানি,মনিপুরী ,সংখ্যালঘু সবধরণের লোকের বাস ৷কাজেইএখানে মিশ্র সংস্কৃতি লক্ষ্য করা যায় ৷উপজাতিদের মধ্যে ত্রিপুরী,ডার্লং,রিয়াং,চাকমা দের নাচ গান অত্যন্ত জনপ্রিয় ৷বিশেষ করে হজাগিরি নৃত্য ভারতবিখ্যাত ৷এখানে যেমন অত্যন্ত আধুনিক অর্কেষ্ট্রা যেমনি পরিবেশিত হয় তেমনি ধামাইল,লোকনৃত্য,গাজননৃত্য,ওঝা কর্তৃক মনসামঙ্গল নৃত্যও সমানভাবে অনুষ্ঠিত হয়৷ এখানে অনেক সংগীতশিল্পী,নৃত্যশিল্পী,যন্ত্রশিল্পী রয়েছেন যারা নিজেদের ঐকান্তিকতা ও চেষ্টা দ্বারা কুমারঘাটের সংস্কৃতি চর্চার উন্নীত সাধন করেছেন ৷তাছাড়া এখানে কবি,সাহিত্যিক,ঔপন্যাসিক,লেখক,ছড়াকার,ইত্যাদি বিষয়ে পারদর্শী গুণীজনের সমাবেশ দেখা যায় ৷ এঁদের মধ্যে বিশেষ কয়েকজন কবি ,সাহিত্যিক ত্রিপুরার বাইরেও সমাদৃত এবং বিভিন্ন ধরণের সম্মাননা এবং পদক প্রাপ্ত ৷কুমারঘাটে অনেক বৎসর আগে থেকেই সংস্কৃতি চর্চা চলছে ৷আজও সংস্কৃতির উন্নতি সাধনের চেষ্টা চলছে ৷বিশেষ করে সরকারী ভাবেঅনুষ্ঠিত বেশ কয়েকটি মেলা যেমন বইমেলা ,শিল্পমেলা ,কৃষি মেলা,স্ব-সহায়ক গ্রুপের মেলা ইত্যাদিতে সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ করে দেওয়া হয় ৷তবে দুঃস্থ শিল্পীদের সাম্মানিক বা ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করলে, দুঃস্থ শিল্পীদের শিল্পচর্চার প্রসার ঘটতো ৷এখানে টাউনহলের অভাব সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে অন্তরায় ৷যদিও নির্ণীয়মান টাউনহল তৈরীর কাজ সমাপ্তির পথে৷ টাউনহলের দারোদ্ঘাটন হলে সংস্কৃতি চর্চার বিশেষ সুযোগ পাওয়া যাবে ৷গত ২০আগষ্ট কুমারঘাটের নবীন ও প্রবীণ শিল্পী যারা নিরন্তর কর্মপ্রচেষ্টা দ্বারা সংস্কৃতি চর্চার উননতিসাধন করেছেন তাদেরকে ,সরকারীভাবে সম্বর্ধনা পত্র প্রদান করা হয় ৷এইভাবে শিল্পীদের উৎসাহ প্রদানের উদ্যোগ প্রশংসনীয় ৷
..................................
কুমারঘাট সাংস্কৃতিক আন্দোলনের রূপকার গোবিন্দ ধর
সংস্কৃতি হল রুচিশীল মানসিকতার শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ ৷দৃষ্টিভঙ্গী যত স্বচ্ছ ও উদার হয় ,একজন ততই সংস্কৃতি মনস্ক হয়ে ওঠেন ৷জীবন গঠন ও উন্নয়নের সঙ্গে সংস্কৃতি অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত ৷মানব সমাজের রীতি-নীতি ,আচার-আচরণ চিন্তা-চেতনা,শিল্পকলা ইত্যাদির সমষ্টি হল সংস্কৃতি ৷সমাজে যত বেশী সংস্কৃতি মনস্ক মানুষ থাকেন ততই সমাজের মঙ্গল সাধিত হয় ৷এই সমাজের মঙ্গলকামী মানুষরা অনেক সময় মন্হর গতিতে হলেও গতানুগতিক ও অন্ধ কুসংস্কারগত ধ্যান ধ্যারণার ও মনমানসিকতার পরিবর্তন করে থাকেন ৷এমনই একজন মানুষ হচ্ছেন —গোবিন্দ ধর মহোদয় ৷যিনি অতি সাধারণ মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সীমিত ক্ষমতার মধ্যে থেকেও সাহিত্যের জগতে এক বিরাট ভূমিকা পালন করেন ৷ অতি ধীর গতিতে হলেও তিনি সাহিত্যের আঙ্গিনায় কবিতা,গল্প, ছড়া,প্রবন্ধ ,উপন্যাস ইত্যাদি বিষয়ে প্রচুর পুস্তক তাঁর স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশ করেন ৷অনেক কবি ,সাহিত্যিক,প্রবন্ধকার , গল্পকার,লেখক,ছড়াকারের পৃষ্ঠপোষকতা করেন ৷একজন শিশুকে যেমনভাবে হাঁটতে শেখাতে হয়,তেমনভাবে অনেক নবীন লেখক ,কবি ,সাহিত্যিকের সুপ্ত প্রতিভার উন্মোচন করেন এবং সাহিত্যের দরবারে নিয়ে আসেন ৷ ১৯৯৫সালের বিদ্যাসাগরের জন্মদিবসের দিন থেকেই স্রোত প্রকাশনার পথ চলা শুরু হয়েছিল ৷অক্লান্ত পরিশ্রম,নিষ্ঠা,সততা,দায়বদ্ধতার সাথেই নিপুণভাবে উনার নিরলস সাহিত্য সাধনা আজ অব্দি চালিয়ে যাচ্ছেন ৷প্রান্তিক রাজ্য ত্রিপুরার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল রাতাছড়া থেকেই স্রোতের পথ চলা শুরু হয়েছিল ৷বর্তমানে কুমারঘাটে বইপত্র এবং পান্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য অন্যতম প্রতিষ্ঠান উদ্দীপ্ত সংগ্রহশালা রয়েছে ৷তাছাড়া মুদ্রণের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান গ্রাফিপ্রিন্ট রয়েছে ৷আঁকা ও আবৃত্তি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান কবিতাঘর এবং শিশু সাহিত্যের কাগজ "কুসুম" রয়েছে ৷নানারকম প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও প্রায় তিন দশক ধরে স্রোত প্রকাশনার থেকে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ৷উত্তরপূর্ব ভারতের বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিকদের সাহিত্য সম্ভারঅ প্রকাশিত হয় ,যেগুলি যত্ন করে সংগ্রহ করে রাখার মতো গ্রন্থ ৷যে অসাধারণ সহনশীল ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে " স্রোত" প্রকাশনা জগৎ পরিচালিত হয় ,তিনি হলেন গোবিন্দ ধর মহোদয় ৷অনেক নিষ্ঠাবান ব্যক্তি এবং উপদেষ্টা মন্ডলীর সহায়তায় স্রোত আজ বেগবান ৷বহুবিধ কর্মকান্ড, অসংখ্য রচনা সম্ভার এই ক্ষুদ্র পরিসরে লেখা প্রায় অসম্ভব৷বাংলা ভাষার পাশাপাশি ককবরক ,চাকমা ,মনিপুরী ভাষায় অনুবাদ সাহিত্য স্রোত থেকে প্রকাশিত হয় ৷এই বিশাল কর্মযজ্ঞের নিরিখে গোবিন্দ ধরকে একজন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের রূপকার হিসেবে আখ্যা দেও য়া যেতে পারে ৷বর্তমানে তাঁর সমস্ত কাজকর্ম কুমারঘাটে বসেই পরিচালনা করেন।কুমারঘাটের সকল কবি সাহিত্যিকদের কোনো না কোনোভাবে তিনি সহযোগিতা ও এগিয়ে যেতে কাজ করেন। তাতে তিনি আনন্দই পান।কুমারঘাটের প্রতিটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের নেপথ্যের কারিগর তিনি।তাঁর নিপুন দক্ষতায় এই অঞ্চলে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশে জোয়ার প্রবাহিত।এমন কি ২০১২ সালে কুমারঘাট উৎসব আয়োজনের মধ্যে দিয়ে তৈরি হয়েছে সাহিত্য সংস্কৃতির বেগবান স্রোত।
0 Comments