তৃতীয় ত্রিপুরা লিটল ম্যাগাজিনও গ্রন্থমেলা-২০২৩ এবং ভারত বাংলা লেখক সমাবেশ || বিজন বোস
তৃতীয় ত্রিপুরা লিটল ম্যাগাজিনও গ্রন্থমেলা-২০২৩ এবং ভারত বাংলা লেখক সমাবেশ || বিজন বোস
সাহিত্য সত্যকে ধারণ করে । মানবীয় অভিজ্ঞতায় জীবনকে উত্তীর্ণ করার যে পন্থা সাহিত্য নির্দেশ করে প্রকাশনা মঞ্চের ষষ্ঠ বর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে তৃতীয় ত্রিপুরা লিটল ম্যাগাজিন ও গ্রন্থমেলা -২০২৩ এবং ভারত বাংলা লেখক সমাবেশ থেকে আমরা তার রূপরেখার সন্ধান পেতে পারি , যা আগরতলস্থিত স্টুডেণ্ট হেলথ হোমে অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ২৬-২৭ শে মে । এই লিটল ম্যাগাজিন ও গ্রন্থমেলা এবং লেখক সমাবেশ থেকে বাংলা ভাষায় সৃষ্ট সাহিত্যের বৈচিত্র্য , উৎকর্ষ , শৈল্পিক পরিকাঠামো কতটা কিভাবে প্রসারিত হচ্ছে সে সম্পর্কে সাহিত্যবোদ্ধারা দীর্ঘ মতামত ব্যক্ত করেন ।
২৬শে মে বিকাল ৫টায় ৮০ টি দেশি বিদেশী বইয়ের স্টল এবং শ দেড়েক সাহিত্য ও সংস্কৃতিপ্রেমীর উপস্থিতিতে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন চট্টগ্রাম লিটল ম্যাগাজিন ও সংরক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক কমলেশ দাশগুপ্ত । প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কবি আসাদ মান্নান , সম্মানিত অতিথি হিসাবে "তুই লাল পাহাড়ির দেশে যা"... খ্যত গানের লেখক কবি অরুণকুমার চক্রবর্তী , বিশিষ্ট সম্পাদক পার্থসারথি ঝা , বিশিষ্ট ককবরক কথাসাহিত্যিক নন্দকুমার দেববর্মা , বিশিষ্ট প্রকাশক হুমায়ুন কবীর ঢালী সহ আরো বেশ কয়জন কবি সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব । মঞ্চের সম্পাদক বিজন বোস স্বাগত ভাষণে বলেন , " স্বাদ আছে সাধ্য নেই " সেই স্বাদের আহ্বানে আপনারা যেভাবে নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে বিভিন্ন প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে এখানে উপস্থিত হয়েছেন তার জন্য আমরা সকলর প্রতি কৃতজ্ঞ এবং সকলকে স্বাগত জানাচ্ছি । মেলার উদ্বোধক কমলেশ দাশগুপ্ত প্রকাশনা মঞ্চের এই উদ্যোগের ভূয়শী প্রশংসা করে বলেন , ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের বাংলা ভাষাভাষী লেখক এবং বাংলাদেশের লেখক প্রকাশক ও লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের এই সম্মেলন একটি মাইলস্টোন হয়ে থাকল । প্রধান অতিথি বিশিষ্ট কবি আসাদ মান্নান বলেন, " মানুষের মধ্যে সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে প্রকাশনা মঞ্চের এই পদক্ষেপ সময়োপযোগী । লেখক প্রকাশক সম্পাদকদের যৌথ জার্নিতে উপকৃত হবে বাংলা ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি ।
প্রথম দিনের দ্বিতীয় পর্ব ছিল লিটল ম্যাগাজিন ও বই প্রকাশ অনুষ্ঠান । পনেরটি লিটল ম্যাগাজিন ও কুড়িটি বই প্রকাশ হয় এই পর্বে । অম্বয় প্রকাশক হুমায়ুন কবীর ঢালি বলেন একসঙ্গে পনেরটি ম্যাগাজিন যার মধ্যে আবার ৭টি প্রথম সংখ্যা এবং কুড়িটি বই প্রকাশ মঞ্চের কর্মকর্তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও লিটল ম্যাগাজিনের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসা ছাড়া কখনোই সম্ভব নয় । প্রথম দিনের দুটি সেশনই সভাপতিত্ব করেন মঞ্চের সভানেত্রী নিয়ত রায়বর্মন ।
২৭ শে মে " মৈত্রী ও সৌভ্রাতৃত্ব " এই শ্লোগানকে সামনে রেখে সকাল ৯টায় স্টুডেণ্ট হেলথ হোমের সামনে থেকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পদযাত্রা । বিশালাকার ফ্ল্যাক্সকে সামনে রেখে পদযাত্রায় হাটেন এপার ওপারের শতাধিক কবি লেখক শিল্পী সাহিত্যিক তথা সাংস্কৃতিক কর্মী । পদযাত্রা স্টুডেণ্ট হেলথ হোম থেকে বেরিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে দিয়ে সোজা রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনের সামনে থেকে ফিরে এসে কর্ণেল চৌমুহনী ছুঁয়ে পুনরায় ফিরে আসে স্টুডেণ্ট হেলথ হোমে । সকাল সাড়ে নয়টায় ভারত বাংলা দুদেশের জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় হলের ভিতরে দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রম । প্রথম পর্বে "বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধে ত্রিপুরা " শীর্ষক আলচনায় অংশ নেন ড. আশীষ কুমার বৈদ্য এবং ড. ব্রজগোপল মজুমদার । সভাপতিত্ব করেন কবি নজমুল হেলাল ।
এদিনের দ্বিতীয় পর্বে শুরু হয় সম্পাদকীয় আড্ডা । সকাল সাড়ে দশটায় শুরু হওয়া দেড়ঘণ্টাব্যপী এই আড্ডায় অংশ নেন দেশবিদেশের চল্লিশ জন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক । সভাপতিত্ব করেন আসামের প্রতিনিধি "সেবা" পত্রিকার সম্পাদক অপর্ণা দেব । সম্পাদকদের আলোচনা উঠে আসে বিশ্বায়নের ঠেলায় লিটল ম্যাগাজিনের নানা সংকটের কথা । তথাপি ভালোবাসার কাছে হার মানে প্রতিবন্ধকতা -এই রকম বক্তব্য উঠে আসে মেঘালয়ের তুরা থেকে আগত বরিষ্ঠ সম্পাদক তিমির দে-র বক্তব্যে । প্রবাহ সম্পাদক জহর দেবনাথের কথায় , " সংকট থাকলেও লিটল ম্যাগাজিন 'স্পর্ধায় নেয় মাথা তুলবার ঝুঁকি ' ...উদাহরণ স্বরপ বলেন - গত পাঁচ বছর ত্রিপুরায় যে পরিমাণ লিটল ম্যাগাজিন আত্নপ্রকাশ করেছে তা বিগত পঞ্চাশ বছরের কোন দশকে পরিলক্ষিত হয়নি ।
পরবর্তী সেশন , আলোচনার বিষয়-" প্রকাশনা একটি শিল্প : লেখক প্রকাশকের যৌথ জার্নি " , সময় দুপুর ১২ টা থেকে ১টা । আলোচনায় অংশ নেন পনের জন বরিষ্ঠ প্রকাশক। সভাপতিত্ব করেন বাংলদেশের বিশিষ্ট বুনন প্রকাশক খাদেদ উদ-দীন । প্রকাশনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিনিষপত্রের উর্দ্ধমুখী দামের কথাই ঘুরে ফিরে উঠে আসে আলোচকদের আলোচনায় । মিডিয়ার কিছু সাংবাদিক বন্ধু তথাকথিত 'প্রকাশকদের ' কাছে মাথা বিক্রি করছেন । তাদের বদান্যতায় প্রকাশকরা ওঠ-বস করছেন । সততার খুবই অভাব সর্বত্র । বাংলাদেশের বিশিষ্ট প্রকাশনা সমস্থা "ত্রয়ী"-র কর্ণধার মাধব চন্দ্র দাস বলেন , " প্রকাশনা শিল্পে আরেকটি দুঃখজনক অধ্যায় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় উদারতার অভাব" । মনে রাখা দরকার সরকার এবং সমাজের সংস্কৃতিপ্রেমী বৈভবশালীদের উদার পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া প্রকাশকদের বেঁচে থাকা কঠিন । এই পর্বে সঞ্চালক ছিলেন কবি ও বাচিকশিল্পী নন্দিতা ভট্টাচার্য , সঙ্গীত পরিবেশন করেন কৃষ্টিবন্ধনের শিল্পী বৃন্দ ।
ঘড়িতে তখন ১টা । শুরু হয় আমন্ত্রিত কবিদের কবিতা পাঠ -"বহুভাষিক কবি সম্মেলন " । সভাপতি - কবি মিলনকান্তি দত্ত । মঞ্চের সম্পাদক কবি বিজন বোসের সঞ্চালনায় সোয়া দুইঘণ্টাব্যপী দীর্ঘ সেশনে স্বরচিত কবিতা পাঠে অশ নেন ৪০ জন বহুভাষিক কবি । সর্বকনিষ্ঠা কবি তথা সম্পাদক অর্পিতা দাসের কবিতা দারুণ প্রশংসা অর্জন করে ।
পরবর্তী সেশন শুরু হয় বিকাল সোয়া তিনটায় । বিষয়-
" ত্রিপুরার কবিতায় সুরারোপ " । অংশ নেন বউল শিল্পী শাশ্বতী চ্যাটার্জী , শাশ্বতী দাস , রীতা পাল । তিনজন শিল্পীই কবি গোবিন্দ ধরের কবিতায় সুর সংযোজন করেন । "তুই লাল পাহাড়ির দেশে যা ...." খ্যাত গানের রচয়িতা কবি অরুণ কুমার চক্রবর্তীর উপস্থিতি এই পর্বে বাড়তি মাত্রা যোগ করে । সঞ্চালনায় ড. শ্যামোৎপল বিশ্বাস । এই পর্বের শেষার্ধে কবি শ্যামলকান্তি দে ও শীলা দাশগুপ্ত শ্রুতি নাটক পরিবেশন করেন । নৃত্য পরিবেশন করেন শাশ্বতী কর্মকার । সঞ্চালনায় ছিলেন সুচিত্রা দাস ।
বিকাল ৪টা ১৫ মিনিটে বাচিক শিল্পী পিণাকপাণি দেব কবি মিলনকান্তি দত্তের কবিতা আবৃত্তি করে হলভর্তি দর্শক শ্রোতাদের বিপুল করতালি লাভ করেন ।
পরবর্তী পর্ব বিকাল ৪টা ২৫ মিনিট থেকে ৫টা । আলোচনার বিষয় -ত্রিপুরার কবিতায় স্থানিক ও লোকজ শব্দের প্রয়োগ ও আবৃত্তি । সভাপতিত্ব করেন নজমুল হেলাল,কবি বাংলাদেশ । কবিতার লাইন ধরে ধরে মনোজ্ঞ আলোচনা করেন কবি ও লোকগবেষক অশোকানন্দ রায়বর্ধন । সঞ্চালক - সুমনা দাশ পাটারি ।
ঘড়িতে তখন বিকাল ৫টা । শুরু হয় অনুগল্প পাঠের আসর । সভাপতিত্ব করেন মুখাবয়ব সম্পাদক তথা বিশিষ্ট গল্পকার দেবব্রত দেব। একে একে অণুগল্প পাঠ করে শোনান নন্দিতা ভট্টাচার্য অসীমকুমার পাল , অলোক বিশ্বাস , নিবেদিতা আচার্য । সঞ্চালনায় ছিলেন বাচিকশিল্পী মৌসুমী কর ।
সন্ধ্যা ৬টা , দুদিনব্যপী অনুষ্ঠানের অন্তিম পর্ব। পূর্ব নির্ধারিত সম্মাননা প্রাপক গুণীজনরাও এসে গেছেন অনুষ্ঠানস্থলে । নিয়তি রায়বর্মনের সভাপতিত্বে এবং শাব্দিক সম্পাদক সনজিৎ বণিক , কবি মিলনকান্তি দত্ত প্রকাশক হুমায়ুন কবীর ঢালি ,সম্পাদক পার্থসারথি ঝা কে মঞ্চে অতিথি করে শুরু হয় এই বিশেষ পর্ব । তরুণ কবি তপন দেবনাথ স্মৃতি সম্মাননা -২০২৩ প্রদান করা হয় তরুণ কবি সুমন পাটারীকে , রমাপ্রসাদ দত্ত স্মৃতি লিটল ম্যাগাজিন ও প্রকাশনা সম্মাননা -২০২৩ গ্রহণ করেন সন্ধিক্ষণ সম্পাদক বিধানচন্দ্র দে , সন্দীপ দত্ত স্মৃতি লিটল ম্যাগাজিন সম্মাননা -২০২৩ প্রদান করা হয় চট্টগ্রাম লিটল ম্যাগাজিন সংরক্ষণ কেন্দ্রের কর্ণধার কমলেশ দাশগুপ্ত , কবিতা ক্যম্পাস সম্পাদক অলোক বিশ্বাস , জলসিড়ি সম্পাদক তিমির দে সহ আরো বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট সম্পাদককে । সমরেশ মজুমদার স্মৃতি আজীবন সুকৃতি সম্মাননা -২০২৩ এ ভূষিত হন বিশিষ্ট কবি ও জোনাকি সম্পাদক পীযূষ রাউত । কল্যাণী ভট্টাচার্য স্মৃতি শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা সম্মাননা -২০২৩ প্রদান করা হয় বিশিষ্ট প্রকাশক হুমায়ুন কবীর ঢালী সহ মোট ১৫ জন বিশিষ্ট প্রকাশককে ।কথাসাহিত্যিক বিমল চৌধুরী স্মৃতি সম্মাননা -২০২৩ প্রদান করা হয় কথা সাহিত্যিক শ্যামল বৈদ্যকে । শ্যামলাল দেববের্মা স্মৃতি কথা সাহিত্য সম্মাননা-২০২৩ দেওয়া হয় ককবরক কথা সাহিত্যিক নন্দকুমার দেববর্মাকে । প্রবন্ধ সহিত্যে অমরেন্দ্র কুমার শর্মা স্মৃতি সম্মাননা-২০২৩ লাভ করেন প্রাবন্ধিক ড. সেবিকা ধর । কবিতায় বিশেষ কৃতিত্বের জন্য চন্দ্রকান্ত মুড়াসিং স্মৃতি সম্মাননা -২০২৩ প্রদান করা হয় কবি মিলনকান্তি দত্তকে । সাংবাদিক ভূপেন দত্ত ভৌমিক স্মৃতি সাংবাদিক সম্মাননা -২০২৩ প্রদান করা হয় আগরতলা প্রেস ক্লাবের সম্পাদক জয়ন্ত ভট্টাচার্যকে । অনুষ্ঠান আরো বেশ কয়েকটি বিষয়েে বেশ কয়েকজনকে সম্মানিত করা হয় ।
সম্মাননা পর্বের পর সন্ধ্যা ৭টায় ধন্যবাদসূচক বক্তব্য রাখেন মঞ্চের সহ সভাপতি জহর দেবনাথ । সভাপতি নিয়তি রায়বর্মন সভার সমাপ্তি ঘোষণা করার পরও অতিথি প্রতিনিধিদের মন হল ছেড়ে যেতে চাইছিলো না ।রাত নয়টা পর্যন্ত চলে ধামাইল নৃত্য আর লোক সংগীত । খাওয়া দাওয়া শেষে রাত দশটা নাগাদ অতিথি প্রতিনিধিরা স্টুডেণ্ট হেলথ হোম ত্যাগ করলে পরবর্তী আরো তিনদিন আগরতলা শহরের সাংস্কৃতিক আড্ডাস্থল সহ বেশ কয়টি অনুষ্ঠানে প্রকাশনা মঞ্চের দুইদিনব্যপী মহাসমারোহের রেশ লক্ষ্য করা যায়। সার্বিকভাবে তৃতীয় ত্রিপুরা লিটল ম্যাগাজিন ও গ্রন্থমেলা -২০২৩ এবং ভারত বাংলা লেখক সমাবেশ একটি মাইলস্টোন হয়ে থাকলো ।....
0 Comments