আত্মক্ষর
পর্ব:বাবা-৪

গোবিন্দ ধর

আমাদের বাড়িও তো ছিলো মৌলবীবাজার।দাদু দেবেন্দ্রনাথ ধর ছিলেন মিঞারপাড়া প্রাইমারী স্কুলের প্রতিষ্টাতা প্রধান শিক্ষক।কাঁটা তার দেখতে দিলো না সেই স্কুল।এই আক্ষেপ রইলো।হয়তো একদিন যাবো।কিন্তু এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া যায় না যে ভারত বাংলাদেশের কাঁটাতার উঠে যাবে।দাদুর ছেঁড়া মানচিত্র বগলে নিয়ে আমার বাবা দক্ষিণারঞ্জন ধর দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে মোটা ভাত মোটা কাপড় তুলে দিতে চাইছিলেন -সে লড়াই আজো আমার অব্যাহত।
আমার দাদুর দেশ পাকিস্তান।আমার বাবার দেশ ছিলো পাকিস্তান।না পাকিস্তানও নয় অভিবক্ত ভারত ছিলো দাদু আর বাবা কাকা আমার মায়ের দেশ।
তারপর পাকিস্তান ও ভারত।রায়ট।বড় রায়ট।দাদুর বুকের পাঁজর থেকে সাহসের হাঁড়গুলো নড়বড়ে হতে লাগলো।ছেঁড়া মানচিত্র নিয়ে দাদু,বাবা কাকা আর মাকে নিয়ে একরাতে ভারতে চলে আসেন ১৯৫০সালে।বগলে মানচিত্র।সমস্ত গতর দেওয়া শ্রম আর ঘাম ঝরিয়ে তিলতিল গড়া বাড়ি,জমি ছেড়ে ইন্ডিয়ায় চলে আসা।বাবার ১৬বছরের চোখ দিয়ে দেখা পাকিস্তানকে ফেলা আসায় জমি হারানোর ব্যথার চেয়ে স্বপ্ন হারানো,হয়তো কোন গাছতলায় হাতরাখা টগবগে দিন বাক্স তোরঙ্গ ফেলে রেখে আসার চেয়ে নিশ্চিত দামি ছিলো।
একজন যুবকের স্বপ্নগুলো মুছে যায় না।আটকে দেয় কাঁটাতার।বাবাও তাঁর বাবার হাত চেপে, দাঁতে দাঁত চেপে কত চেনা গাছ,প্রাণী রেখে চলে আসতে হলো সে এক ইতিহাস।
আমাদের বারো হাল চাষের বলদ ছিল।এক সাথে চাষ দিতে মাঠে নামতো বারো হাল।
সে সব জমিন, গরু, গৃহ পালিত কুকুর,বেড়াল আর বাবার স্বপ্নগুলো পেছনে রইলো।বাবা তাঁর বাবার হাত ধরে বর্ডার পেরিয়ে রাতাছড়ায় আসেন।রাজ আমলের বর্ধিষ্ণ প্রত্যন্তপ্রদেশ আজকের রাতাছড়া।একসময় এখানে প্রচুর বনমোরগ পাওয়া যেতো।ককবরক রাতা মানে মোরগ।আর ছড়া তো ছোট নদী।ছোট নদীর আশপাশে প্রচুর মোরগ দেখা যেত বলে ককবরক ভাষীরা গ্রামকে রাতাছড়া নাম দেন।আবার রাজধর  মাণিক্যের রাজ অভিষেক হয় রাতাছড়ায় তাই রাতাছড়া=রাঝ(ধর)->রাজ(ধর)->রাতাছড়া। কালক্রমে আজকের রাতাছড়া।
বর্তমান করইটিলা যা এমড়াপাশা,ডেমডুম,কাঞ্চনবাড়ি,মশাউলি,তরনীনগর,সায়দারপার, ফটিকরায় সব অঞ্চল থেকে আজকের রাতাছড়া ছিলো লোকবসতি সহ ও উন্নত গ্রাম। আমার দাদুও তাই বসবাসের জন্য রাতাছড়াকে কলম্বাসের আমেরিকা আবিস্কার হিসেবেই দেখছিলেন।আজকে থেকে ৬৮বছর আগে বর্তমান কুমারঘাট যা পাবিয়াছড়া নামে পরিচিত ছিলো না।শুধু একটি ছড়ার চিহ্ন নিয়ে কলকল একটি জলধারা তখন দেওনদীর বুকে মিশতো।সুতরাং দাদুর চিন্তায় রাতাছড়া ছিলো আমেরিকা।আমাদের শেকড় বসলো।একটি জেতাগাছ শেকড় উপড়ে দীর্ঘ জার্নি তারপর আবার মাটিতে বসালে তার একটা ঝলসে যাওয়া থাকেই।দাদু,বাবা,কাকার জীবনে এটা এরকমই ছিলো।
বাবার মুখে শুনতাম তারপরও বারকয়েক বাবা চাতলাপুর চেকপোষ্ট ডিঙ্গিয়ে জন্মগ্রামে গেছেন।তখন গাড়ি ছিলো না।পায়ে হেঁটেই বাবা এ পথ পাড়ি দিতেন।আজকের সময় আমাদের কত মর্নিং ইভেনিং ওয়ার্ক।তবু রোগ অসুখের হাত থেকে আমাদের আর রক্ষা নেই।কিন্ত আমার বাবা কোন অসুখের কুকানি অর্থাৎ উঃ আঃ করতে দেখিনি।সন্যাস কেড়ে নিলো বাবাকে তৃতীয়বারের প্ররোচনায়।সেই রাত ১৯৯০ সাল।৩০ মে।রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে প্রতি রাতে গরমের সময় আমাদের বাড়ির রেয়াজ সবাই বাইরে বেঞ্চে বসে,কেউ কেউ চাটাই নিয়ে গল্প করতেন।সেই অভিশপ্ত রাতেও বাবা গল্পটল্প করে বিছানায় উঠেন রাত ১২টায়।রাত ১:৩০মিনিট।আমার চোখের সামনে কোন কথা বলতে না পেরেই স্ট্রোক করেন বাবা।বাইরে থেকে ঘরে এলেন।মাকে বললেন কি করছে শরীর।শুধু এই শুনলাম।তারপর বাবা নেই।আমরা হাসপাতাল নেওয়ার ব্যবস্থা করছি।রাতে পাড়ার ফার্মেসীর একজন কানে কানে বড়দাকে বললেন নেই।বাবা নেই।মা কিছুতেই রাজি নয়।বাবার নেই মানতে রাজি নয়।আঙ্গুলগুলো টানলে গিঁটগুলো শব্দ করছিলো।শরীর গরম তখনো।মা কিছুতেই মানতে রাজী নয়।বাবা নেই। আমরা ভাই বোনরা কেউ মানতে রাজি নয়।ধীরে ধীরে সকাল হলো।ছুটে এলেন চার গ্রামের মানুষজন।উঠোনে বাবা।সবার চোখে জল।সেদিন প্রথম বুঝলাম বাবা মানুষের মনে কি রকম ছিলেন।

২৮:০৫:২০১৭
সকাল:৫:৪৫মি।
কমলপুর।