আত্মক্ষর

পর্ব:৭
(বাবাকে নিয়ে শুধু নয়।ধীরে ধীরে লেখাটা মোড় নেবে, বাঁক নেবে।কখনো বাবা।কখনো তাঁর বাবা।কখনো বা বাবার বাবা।কিংবা আমার মাকে নিয়েও লিখবো না এমন নয়।লেখাটা যে আমার কবিজীবন,কিংবা প্রকাশনার টুংটাং কিংবা প্রেম অপ্রেম,অন্ধকার কিংবা আলোকিত অধ্যায় আসবে না এমন নয়।সবই আমার আত্মার অক্ষর। ক্ষরণগুলো হরপের ডানায় উড়ুক চাই।পড়ুন।সাথে থেকে পরামর্শ চাই।প্রতি রবিবার,বুধবার ও শুক্রবার)।

গোবিন্দ ধর

তখন মনে হতো জাম খেলে দাঁত কালো হয়।আর এখন জামের গুনাগুন মানুষদের জামের প্রতি লোভ বাড়িয়ে দিয়েছে।আমার জাম তো প্রিয়।পাই না।ছোটবেলা জাম গাছে চড়ে জাম খেতাম।আ কি মজা সেসব দিনের।এখন গাছে উঠতে পা কাঁপে।মনে হয় মড়াৎ করে পড়বো ডাল ভেঙ্গে।মনে নজরুলকে তাই মনে পড়ে"ও বাবা মড়াৎ করে পড়েছি সড়াৎ জুরে।"
আর তখন গরু মহিষ চরাতে আমাকে যেতে হতো।মহিষের পিঠে চড়তে চড়তে কত দুপুর কাটিয়ে দিয়েছি।আর মাঝে মাঝে বিশ্রাম।গাছ তলায়।কখনো তেঁতুল তলা তো কখনো আম তলা।তেঁতুল গাছে চড়ে মগ ডাল থেকে তেঁতুল পেড়ে খেতে কি আনন্দই না হতো তেঁতুলের নাম শুনলে জীবে এখনো জল আসে।সারা দিন মহিষ চরিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে এসে ক্লান্ত হতাম।তারপরও বই নিয়ে পড়তে বসতে হতো।না হয় বাবা সবার জন্য একটি জালি বেত রাখতেন।একজন অবাধ্য হলে আমাদের সেদিন সবার বরাদ্ধ ছিলো বেত।বকাবাদ্য আর শাসন।সে শাসনের উর্দ্ধে বরাবরই আমি ছিলাম।কিন্তু মাঝে মধ্যে যে বকুনি হয়নি তা কিন্তু নয়।
আমাদের একপাল গরু আর মহিষের আমিই রাখাল বালক।যদিও ছোটবেলায় একজন রহমত আলী নামে চাকর ছিলেন।তিনিও এক ভোরে উঠে অনেক ডাকাডাকির পর ঘর বাইরে থেকে সিটকিনি খুলে বাবা আবিস্কার করেন রহমত আলী নেই।
অনেক দিন পর দেখলাম আমাদের মনু নদীর উজান ধরে বড় নৌকার গুন টেনে সে মালপত্র বোঝাই নৌকা টানছে।আমি তখন তার সে পরিশ্রম দেখে কষ্ট পেয়েছি।বাবাকে বাসায় গিয়ে বলেছি, রহমতের কষ্টের কথা।কেনই বা মহিষ চরানোর চেয়ে গুন টানার কাজ নিলো রহমত।সে রহস্য আজও আমার গেলো না।আমি অবাক হই।
গরু মহিষ পালন আমাদের বাসায় অনেক দিন ছিলো।গরু আর মহিষ চরাতে খুব কষ্ট।কারণ বড় মাঠ না হলে অন্যের ফসলে মুখ দেবে।ফসল বাঁচিয়ে চরাতে গিয়ে সব সময় মনোযোগ দিতে হতো।একবার তো ক্লান্ত আমি গাছ তলায় বিশ্রাম করতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। একজন চাষার এক ফালি ধান খেয়ে ফেলে তখন আমাদের মহিষ।আমার সে কি অনুসূচনা।আমি খুব আহত হলাম।কিন্তু মালিক আমার আহত হওয়া তো আর বুঝবে না। বাবাকে বিচার দেন তিনি।বাবা আমাকে তখন কৃষকের ফসল খেলো কেন মহিষ জানতে চান।আমি কোথায় ছিলাম জানতে চান।বাবাকে সেদিন সত্যটা বলি।কিন্তু বাবার কি রাগ সেদিনই প্রথম টের পেলাম।বাবা আমার ক্লান্তিকে কোন গুরুত্বই দেননি।বরং কৃষকের পক্ষ নিয়ে আমাকে খুব করে বকে দিলেন।আমি সেদিন থেকে আজ অব্দি আর কারো ফসল নষ্ট হোক চাই না।
গরু মহিষ আমাদের গৃহে পালিত ছিলো তারপরও অনেক দিন।
আমি মহিষের দুধ দোয়াতাম।মহিষের বাচ্চা কি মায়াবী।বাচ্চার চাহিদাকে অপূর্ণ রেখে দুধ নেওয়াটাও আমার বুকে বাজতো।যদিও দুধ না নিলে বাচ্চার কৃমি হতো।গরুর দুধও আমি নিতাম।
কিন্তু কোন দিন আমাদের পরিবারে ছাগল পুষা সম্ভব হয়নি।মা একবার একটা ছাগল বাবাকে বলে চল্লিশ টাকা দিয়ে কিনেছিলেন।কিন্তু ছাগলটা বেশিদিন পুষ মানেনি।পেট খারাপ হয়ে ছাগলটা একদিন ইহলোক ত্যাগ করে।তখন থেকে আর কোন দিন আমাদের পরিবারে ছাগল আসেনি।কিন্তু ছাগল আমার পিছু ছাড়লো না আজও।

৩:৬:২০১৭
সময়:১০টা
উত্তর রাতাছড়া