ঈশ্বরচন্দ্র : আত্মশুদ্ধির দিন
#
গোবিন্দ ধর 

কথাবস্তু
#
ঈশ্বর কখনোই ঈশ্বরচন্দ্র নয় বলে শুধু বিদ্যাসাগরকেই আমরা ঈশ্বরচন্দ্র বলি।

আরম্ভ 
#
ঈশ্বরচন্দ্রের জন্মদিন। সেই ঈশ্বর যিনি দেশাচারের কাছে মানবতা আর যুক্তিকে বিসর্জন দেননি। বাংলা গদ্যকে সাবালক করেছেন।  শিক্ষাকে সবার জন্য উন্মুক্ত করতে চেয়েছেন, এদেশের মনু পরাশর রঘুনন্দন শাসিত সমাজের শোষণের জাঁতাকল থেকে মেয়েদের এবং গোটা সমাজকেই মুক্ত করতে চেয়েছেন। ঐতিহ্যের ভিতের ওপর  আধুনিকতার ইমারত গড়ার ইট সাজিয়েছেন। সেজন্য যত বিপদই আসুক এঁড়ে গরুর জেদ ছাড়েননি। আমাদের শিক্ষক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

ত্রিপুরার রাজভাষা ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর 

স্বপন কুমার ভট্টাচার্য 
#
ত্রিপুরার রাজভাষা বাংলা জেনে পুলকিত হয়েছিলেন বিদ্যাসাগর।
১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দ। ত্রিপুরার সিংহাসনে বীরচন্দ্র মাণিক্য। কর্ণেল মহিম ঠাকুর‌ তখন কলকাতায় পাঠরত। একদিন সাক্ষাৎ ঘটলো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে।মহিম ঠাকুরের সোনার চেনের সঙ্গে একটি মোহর দেখে বিদ্যাসাগর জানতে চাইলেন এটি কিসের মোহর।মহিম ঠাকুর‌ বললেন,এটি আমাদের রাজ্যের মোহর। বিদ্যাসাগর তা পাঠ করে বললেন,"ইহাতে যে বাঙ্গালা ভাষার ছাপ। তবে আমার বাঙ্গালা রাজভাষা?"
তারপর পুলকিত বিদ্যাসাগর এশিয়াটিক সোসাইটিতে নিয়ে গেলেন মহিম ঠাকুরকে। মহারাজা বীরচন্দ্রকে পত্র লেখা হলো। ' বঙ্গভাষা সংবর্ধনা সভা 'র পৃষ্ঠপোষক হলেন ত্রিপুরার রাজা।

রবীন্দ্র রচনা থেকে সংগৃহীত 
#
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

“বিদ্যাসাগর এই বঙ্গদেশে একক ছিলেন৷ এখানে তাঁহার স্বজাতি সোদর কেহ ছিল না৷ এ দেশে তিনি তাঁহার সমযোগ্য সহযোগীর অভাবে আমৃত্যুকাল নির্বাসন ভোগ করিয়া গিয়াছেন৷ তিনি সুখী ছিলেন না৷ তিনি নিজের মধ্যে যে-এক অকৃত্রিম মনুষ্যত্ব সর্বদাই অনুভব করিতেন চারিদিকের জনমণ্ডলীর মধ্যে তাহার আভাস দেখিতে পান নাই৷ তিনি প্রতিদিন দেখিয়াছেন—আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি তাহা বিশ্বাস করি না, যাহা বিশ্বাস করি তাহা পালন করি না; ভূরিপরিমান বাক্যরচনা করিতে পারি, তিলপরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না; আমরা অহংকার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতালাভের চেষ্টা করি না; আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি, অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে থাকি; পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহে আমাদের সন্মান, পরের চক্ষে ধূলিনিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিক্স, এবং নিজের বাকচাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তিবিহ্বল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য৷ এই দুর্বল, ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন, দাম্ভিক, তার্কিক জাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের এক সুগভীর ধিক্কার ছিল৷ কারণ, তিনি সর্ববিষয়েই ইহাদের বিপরীত ছিলেন৷................আজ আমরা বিদ্যাসাগরকে কেবল বিদ্যা ও দয়ার আধার বলিয়া জানি; এই বৃহৎ পৃথিবীর সংস্রবে আসিয়া যতই আমরা মানুষ হইয়া উঠিব, যতই আমরা পুরুষের মতো দুর্গমবিস্তীর্ণ কর্মক্ষেত্রে অগ্রসর হইতে থাকিব, বিচিত্র শৌর্য-বীর্য-মহত্ত্বের সহিত যতই আমাদের প্রত্যক্ষ সন্নিহিতভাবে পরিচয় হইবে, ততই আমরা নিজের অন্তরের মধ্যে অনুভব করিতে থাকিব যে, দয়া নহে,বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব...."
                                         —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ছাব্বিশে সেপ্টেম্বর  
#
দিলীপ দাস

আজ এমন এক বাঙালির  জন্মদিন  , যিনি বাঙালির রক্তে সঞ্চারিত  করতে  চেয়েছিলেন দার্ঢ্যের আভিজাত্য  , শিক্ষার উন্নত  চেতনা , ব্যক্তিত্বের প্রোজ্জ্বল  অহংকার,  মনুষ্যত্বের পূর্ণতর প্রকাশ   এবং ধর্মমোহ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে  যুক্তির শানিত দীপ্র অসি ঝংকার  । তিনি  ঈশ্বরচন্দ্র । প্রকৃত বাঙালি  , প্রকৃত  মনুষ্যত্বের অধিকারী এক মানব । কয়েক শতাব্দীতে এমন মানুষ  একজনই জন্ম নেন । তাঁকে সশ্রদ্ধ  প্রণাম  ।

আজ , প্রতিটি  বাঙালির  আত্মশুদ্ধির দিন , আত্মশক্তির অহংকারে  জাগ্রত হবার দিন , আত্ম-উন্মোচন ও আত্মনিরীক্ষার দিন , বাঙালি  হিসেবে নিজেকে ঘোষণা  করে বাঙালির  গর্বিত উত্তরাধিকার প্রমাণের দিন ।

এক যে ছিলেন
#
গোবিন্দ ধর 

এক যে ছিলেন 
বিদ্যাসাগর
যেমন তেমন নন।

শখ ছিল তাঁর
উদারতা আর
দয়ায় ভরা মন।

মায়ের প্রতি অগাধ 
তাঁর ছিল টান
স্রোতের চে বেশি। 

এমন ছেলে একজনই 
তিনি মেহেরবাণ
নয়কো ছদ্মবেশী। 

বাংলা মায়ের সেই ছেলে
ভীষণ দামাল
ভয়ডর নেই তাঁর। 

কাছে দূরে সাম্নে পিছে
কেউ বিপদে পড়লে
তিনিই সঙ্গী সবার।

২৬:০৯:২০২০
ভোর:০৪:২৫মি
আগরতলা।

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর
#
পুর্ণেন্দু পত্রী 

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর
ভীষণ বাজে লোক
বলতো কিনা বিধবাদের
আবার বিয়ে হোক।

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর
দেখতে এলেবেলে
চাইতো কিনা লেখাপড়া
শিখুক মেয়ে, ছেলে।

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর
দেমাগধারী ধাত
সাহেব যদি জুতো দেখায়
বদলা তৎক্ষনাৎ।

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর
বুদ্ধিসুদ্ধি কই?
লিখেই চলে লিখেই চলে
শিশুপাঠ্য বই!

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর
কপালে তার গেরো
ওষুধ দিয়ে বাঁচায় কিনা
গরীব-গুর্বোদেরও!

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর
মগজটা কি ফাঁকা?
যে যেখানে বিপন্ন তাঁর
জোগানো চাই টাকা ।

আলোর পথিক বিদ্যাসাগর
#
আনসার উল হক

কে খুলেছে আলোর ঝাঁপি
কে খুলেছে দোর
কে এঁকেছে বাংলা-ভাষায়
স্বাধীনতার ভোর ?
কে বাজালো আলোর বাঁশি
সুরেলা ছিমছাম ?
বীরসিংহের সিংহ-শিশু
বিদ্যাসাগর নাম।
#
কে দেখালো স্বপ্ন বোনা
আখর-ভরা রথ
কে শেখালো মানুষ হবার
স্বর্ণালী শপথ ?
বর্ণমালার কর্মশালায়
ভরলো সোনার ঘড়া
যুগের সাথে যুগ মিলেছে
কালের পরম্পরা।
#
চিন্তাতে যার স্বচ্ছ মাথা
কল্পনাতে ঠাসা
বুকের মাঝে সারাজীবন
কান্না-ভালোবাসা।
'বোধোদয়' আর 'কথামালা'য়
ছড়িয়ে দিলো আলো
তার কথাতেই ছুটে পালায়
জমাট-বাঁধা কালো।
#
সাগরজলে অগ্নিভরা
ঢেউয়ের মাঝে সুর
মার্জিত তার ভাবনাগুলো
খুশির সমুদ্দুর।
সাঁতরে সে যে পার হয়ে যায়
লক্ষ ঢেউয়ের ফণা
বর্ণপরিচয়ের পাতায়
ঝিকোয় হিরের কণা।
#
রক্তঝরা কঠিন সময়
বাতাস ভরা বিষ
কিংবদন্তী যুগ-সচেতন
ভাবনা অহর্নিশ।
দুশো বছর অবলীলায়
গাঁয়ের পথের বাঁকে --
মানবতার মূর্তপ্রতীক,
প্রণাম জানাই তাঁকে।

বিদ্যাসাগর

#
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

সমাজের ক্ষয় এর মুখে বাঙালি জাতি
আবার স্মরণ করছে আপনাকে
শিক্ষার অঙ্গন যখন কলুষিত
দৃঢ়চিত্ত শিক্ষক হিসেবে চাইছি আপনার
শিক্ষা 
একদিন নারী বেরিয়ে এসেছিল অন্দর মহল থেকে
আপনার স্কুল তাকে দিয়েছিল মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার
আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে ওঠা গোপালেরা
দিশা খুঁজছে রাখালদের 
মিথ্যাচারিতার সঙ্গে যুঝবার
সমাজ পাল্টে দেবার যুদ্ধ বিধবার বিয়ে
দিয়ে শুরু হয়েছিল
এখনো নারী শুধুই নারী সমাজের সেবা দাসী
পশুর অধমের লালসার শিকার 
ধর্ম আর জাতপাতের ভেদ উচ্চারণের পাশে আপনার সুমহান হৃদয কেঁদে ওঠে
মানুষের জন্য
সাগরে শুধু বিদ্যা নয় দয়ার ঢেউ উচ্ছ্বসিত
আর গর্বে বুক বেড়ে যাচ্ছে বীর সিংহের

আসুন একটিবার আবার ভারত  নামে মানব সাগরের তীরে
সিংহ শিশুর গর্জন  শুনি
সমাজকে অন্ধকার নয় আলোর প্রয়োজন
আলোয় আপনার ছাতার নীচে 
আশ্রয় দিন আমাদের
অতুলনীয় স্পর্শে আমাদের বোধোদয় হোক

ঈশ্বরচন্দ্র 
#
সনাতন চৈতন্য
 
এক.
#
সময়ের গতিসূত্র থেকে অনেক অনেক পথ 
পায়ে হেঁটে হেঁটে ল্যাম্পপোষ্টের আলোয় পাড়ি 
একজনই দিতে সক্ষম তিনি ঈশ্বরচন্দ্র।

দুই.
#
বর্ণমালার শরীর থেকে আজও যে সৌন্দর্য 
ঠিকরে বের হয় তুমি রূপকার
বাংলা ভাষার বন্ধুজন ঈশ্বরচন্দ্র।

তিন.
#
সময়ের পলিতে কখন চাষ দিয়ে ফসল তুলতে হয় গোলায়
তুমি সময়ের সাথে লড়ে লড়ে কাজ করেই
বীরসিংহ পুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র।

চার.
#
আজও প্রাসঙ্গিক বিষয় তোমার পথ
তোমার করুণা মায়া মায়ের প্রতি টান।
সকল সংকটে তুমি দ্রোহপুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র।

পাঁচ
আমাদের অন্ধচোখে আলোঘর তোমার
সময়ের থেকে কয়েক পা এগিয়ে চলার 
প্রতিটি মুহূর্তে এখনো তুমিই ঈশ্বরচন্দ্র