ত্রিপুরার ছড়াজলের খণ্ডচিত্র:কুমারঘাট মহকুমা 

গোবিন্দ ধর 


ডেমছড়া

ডেমডুম এডিসি ভিলেজ যেখান থেকে শুরু হয়েছে সেই এন ই সি রাস্তার পাশের টিলা থেকে ডেমছড়ার উৎস। তারপর এমড়াপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশ ঘেষে পশ্চিম রাতাছড়ায় এসে মিশেছে ডেমছড়া।বর্ষায় খরস্রোতা হয়ে দুপাড় ভাসিয়ে নিয়ে জল কলকল প্রবাহিত হয়।এমনিতে অন্যান্য ঋতুতে ডেমছড়ার জল তেমন থাকে না।হরদম লোকজন চলাচলে কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি ডেমছড়া।আমাদের ছোটবেলা পশ্চিম রাতাছড়া হয়ে ডেমডুম যেতে পায়ে হেঁটে যেতে হতো।তখন ডেমছড়ায় একটি হাকম ছিলো।হাকম হলো বাঁশের খুঁটি দিয়ে উপরে বাঁশ বা ছোট গাছ ফেলে দুপাড়ের মানুষজনকে সহজে পারাপারের সুবিধা করে দেওয়ার গ্রাম্য ব্রীজ। 
এখন এন ই সি রাস্তার সংস্কার হওয়ায় ডেমডুমের জনজাতি অংশের জীবনমানের পরিবর্তন হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বেড়েছে। কাঞ্চনবাড়ি হয়ে কুমারঘাট  নালকাটা থেকে যেমন তাদের ত্রিপুরা ও বহি ত্রিপুরায় যোগাযোগ বেড়েছে তেমনি এন ই সি রাস্তার সংস্কারের জন্য আগরতলায় আসাযাওয়াও সহজ হয়েছে। 
ডেমডুমের লোকজনের ফটিকরায় কৈলাসহর যেতেও আগের মতো আর পশ্চিম রাতাছড়াকে অবলম্বন করতে হয় না।এখন ডেমডুম অঞ্চলের জনজীবনে অনেকটা সুবিধা তারা ভোগ করেন।
এক সময় ডেমডুমের লোকজন তিল কার্পাস জুমের লাউ কুমড়ো বাজারজাত করতে অনেক শ্রম দিতে হতো।যদিও এখন জুম চাষ আর তেমন নেই। কিন্তু জুমচাষের জন্যই ত্রিপুরার বনাঞ্চলের গাছপালা বনজঙ্গল আজ আর তেমন নেই। বড় বড় বৃক্ষ নিধন আমাদের পরিবেশের উপর নানা প্রভাব বিস্তার করেছে।আগের মতো বনজঙ্গল নেই তাই বন্য প্রাণীর মধ্যে শূকর বনমোরগ খরগোস, বনরুই,পাখির আর দেখাও মিলে না।
আমরা যতো উন্নত সভ্যতা সংস্কৃতির দিকে নিজেকে নিয়ে যাচ্ছি ততোই আমাদের জীবন মান এগিয়ে যাচ্ছে পাশাপাশি আমরা নির্মল পরিবেশ থেকে বঞ্চিতও হচ্ছি।

ডেমছড়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লোকজন মূলত জনজাতি অংশেরই।

২৬:০৩:২০২৪

ঝুরিছড়া

১৯৮৮ সালের আগে আমি জানতামই না ঝুরিছড়া নামে একটি অঞ্চল থেকে ঝুরিছড়া প্রবাহিত হয়ে পশ্চিম রাতাছড়ায় মিশেছে।ত্রিপুরায় দীর্ঘ দশ বছর বামফ্রন্ট সমর্থিত সরকার পরিচালিত হয় ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত।তারপর ১৯৮৮ সালের বিধানসভায় ভোটার উপজাতি টি ইউ জি এস ও কংগ্রেস জোট সরকারের পক্ষে ভোট না দিলেও ফটিকরায়ের উপনির্বাচন জোট সরকার সন্ত্রাসকে হাতিয়ার করে ফটিকরায় উপনির্বাচনে জয়লাভ করে। প্রার্থী তৎকালীন বিধায়ক তরুণীমোহন সিনহার আকস্মিক দুঃঘটনায় মৃত্যু বরণের ফলে উপনির্বাচন হয় ফটিকরায়।
সেই নির্বাচন শেষে প্রায়ই লেগে থাকতো উত্তেজনাকর বনধ।এরকমই এক বনধকে কেন্দ্র করে ঝুরিছড়া রাজনৈতিক হিংসায় জ্বলতে থাকে।ঠিক সে সময় আমি নবমশ্রেনীতে রাতাছড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। 
সকাল সকাল লোকমুখে ঝুরিছড়ার রাজনৈতিক হিংসার বাতাস এসে পশ্চিম রাতাছড়া পেরিয়ে পূর্ব রাতাছড়ায় নানা গুঞ্জন শুরু হয়।কেউ কেউ উগ্রবাদীর তান্ডব চলছে বলেও প্রচার করে বসেন।তারপর বাড়িঘর ছেড়ে লোকজন পশ্চিম রাতাছড়া থেকে জনস্রোতের মতো যে যা সামনে পেয়েছে নিয়ে আসতে শুরু করে।প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তা বিরত হলেও জনজাতি ও অন্যান্য জাতির মধ্যে দীর্ঘ সময় ছিলো সম্প্রীতির ফাটল।
মূলত ঝুরিছড়া মানে অনেকগুলো ছোট ছোট প্রবাহিত জলধারা নামতে নামতে একটি ছড়ার জন্ম হয়।এ থেকেই ঝুরিছড়া নামে ছড়াটিকে লোকজন চিহ্নিত করে। 
ঝুরিছড়ার উৎস থেকে প্রবাহিত জল এসে পশ্চিম রাতাছড়ায় মিশে গেছে। ঝুরিছড়ায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে।নাম পশ্চিম রাতাছড়া নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয় হলেও তা ঝুরিছড়ায় বিদ্যমান।
এন ই সি রাস্তা তৈরীর ফলে ঝুরিছড়ার লোকজনও কৈলাসহর, ফটিকরায় ও কুমারঘাটে যাতায়াত সহজ হয়েছে। 

২৬:০৩:২০২৪


রাতাছড়া 

হারিয়ে যাচ্ছে ছড়াজল ঝর্ণা নদী খাল বিল গাঙ কাটাখাল।
হাওর আজ জল শূন্য। 
এই আমরা কোথায় জলচর ছিলাম আজ স্থলচর।
কিন্তু জল আমাদের জীবনের গান।জলই জীবন।জলের বিকল্প জল।
অথচ জল কোথায়?
আগামী বিশ্ব নিশ্চিত জলের জন্য যুদ্ধে নামবে খাদ্যের অভাবে মরবে না।জলের অভাবে মরবে।তখন আমরা সজাগ হলে হবে না।
সুতরাং ছড়া জলের ইতিহাস খোদাই হোক।

আমার ছোটবেলা জল থইথই কাটাতাম দুটো ছড়ায়।আর একটি নদীতে। অসংখ্য ডোবা পুকুর আর এঁদো ডুবায় আমাদের গ্রামের বাড়ি ভরপুর ছিলো।

আমার ছোটবেলার স্কুল রাতাছড়া উচ্চ বুনিয়াদি বিদ্যালয়।পরবর্তী সময় রাতাছড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়।আজ নাম পরিবর্তন হয়ে হাজিবাড়ি দ্বাদশ শ্রেণি বিদ্যালয়।
এই হাজাবাড়ি দ্বাদশ শ্রেণি বিদ্যালয়ের পাশ ঘেষে রাতাছড়া কলকল প্রবাহিত।
আমরা স্কুলে গ্রীষ্মের দুপুরে খাতাবইপত্র তার পাড়ে রেখে সেকি ঝুপুরঝুপুর করতাম।মনে পড়লে আনন্দ প্লাবন বয় মনের ভেতর।
রাতাছড়া রাজমালার বর্ণনানুসারে রাঝধর ছড়া নামেই পরিচিতি পেয়েছিলো রাজ আমলে।কথিত আছে রাঝধর মাণিক্যের রাজ অভিষেক হয় রাতাছড়া যেখানে মনুনদীতে মিশেছে। অর্থসৎ রাঝধর ছড়ার মোহনায় অমর মাণিক্য রাঝধরের রাজ অভিষেক শেষে আফিম সেবনে আত্মহত্যা করেছিলেন। 
কালক্রমে রাঝধর ছড়া--> রাজধর ছড়া-->রাতাছড়া নামে অভিহিত হয়।
রাজমালার আরেক রকম ব্যাখ্যা অনুসারে রাতাছড়ার উৎস স্থলে প্রচুর রাতা বন মোরগ ছিলো।ককবরকে রাতা মানে পুরুষ মোরগ।রাতা মোরগ থেকে কালক্রমে রাতাছড়া নাম হয় ছড়াটির।
দুদিকের বিস্তৃত টিলাভূমি জুড়ে তখন জুমচাষ হতো।বর্ষার সময় জুমের লাউ কুমড়ো ভুঁইকুমড়ো বৃষ্টি হলেই লাফিয়ে লাফিয়ে জল নামার তরঙ্গে ভেসে আসতো জলের তোড়ে।
জল পলাতক আমরা বিদ্যার্থীরা ভয়ডরহীন সেই রাক্ষুসে ড্রাগনজলকে উপেক্ষা করে লাফিয়ে পড়তাম সেই জলের তোড়ে।কত দূর দূরান্তে ভেসে যেতাম জলের স্রোতে। তথাপি ছেলেবেলায় কার আর ভয় থাকে।ভাসিয়ে গেলেও তখনো ভয় এসে ঘাঢ় ধরেনে আমাদেরকে। 
খাবলে ধরতাম লাউ কুমড়ো।এমনি করে তখন সারা বছরের জ্বালানীর কাঠ সংগ্রহ করতেও বর্ষার খরস্রোতা রাতাছড়ায় জল নামার অপেক্ষায় থাকতেন দুপাড়ের সমতলবাসীরা।পাশাপাশি প্রান্তিক চাষীরা এমন কি বর্গা চাষীরাও রাতাছড়ার জল দিয়ে দুপাড়ে সবজি খেত করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
রাতাছড়ার বালুচরে একটু দোয়াশ মাটি বন্যার পর খেতে পড়তো।তাতে লাফিয়ে বাড়তো লাউ তগা।মিস্টি আলু।আলু।মূলো।শর্ষে ধনেপাতা,লাইপাতা,শশা আরো কত কি।ফুলকপি,বাঁধাকপি,ওল থেকে শুরু করে আরো হরেক রকম সবজির সবুজ খেতে রাতাছড়ার দুপাড় সেজে উঠতো।মনোরম সে দৃশ্য। 

লংতরাই রিজার্ভ ফরেস্ট একপাশে রেখে অজস্র ছড়া নালা খাল বিল কলকল প্রবাহিত হয়ে ঝমঝমিয়ে মিশে গেছে মনুর বুকে।শাখানটাঙ থেকে দেও মনু একপাশে মনুর উৎপত্তি অন্য পাশে দেও।দেও নদ।দেও এর উপনদী নেই। মনুর অসংখ্য উপনদী নাতিন,পুতিন আরো কত কি কলকল প্রবাহিত হয়ে মনুতেই মিশে গেছে। নদী মানে ককবরকে তৈসা।আর ছড়া মানে তুইমা--->তৈমা।আবার ছড়াকে কেউ কেউ ককবরকে তৈসাও বলেন।তাহলে রাতাতৈসা নয় কেন রাতাছড়া?আসলে সমতলে রাতাছড়ার দুপাড়ে বসবাস করেন বাঙালি। আর উৎসে জনজাতি ত্রিপুরী জনগণের বসবাস। সুতরাং সমতলে এসে রাতাছড়া হয়ে কলকল প্রবাহিত হয়ে ঝমঝমে অস্তিত্ব জানান দিয়েছে মনুতে মিশে।
রাজমালায় কথিত আছে এক সময় অমর মাণিক্যের রাজপাট ছিলো রাতাছড়ার উৎস স্থলের অদূরে। তারই নিদর্শন স্বরূপ পাওয়া গিয়েছে ত্রিপদী।
আমার ছোটবেলার বেড়ে ওঠার কঠিন সময়ে রাতাছড়া আমাকে মাতৃস্নেহের সুধায় আগলে রেখেছে বুকে।পিতৃস্নেহে দিয়েছে নিরাপত্তা। এই রাতাছড়া গ্রামের সাথে আমার অজস্র স্মৃতি জড়ানো।রাতাছড়ায় আমার কবিতা লেখায় হাতেখড়ি।সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। যাত্রা নাটকে হাতেখড়ি। নাটক লেখায় হাতেখড়ি।লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক হিসেবে ত্রিপুরায় পরিচয় করিয়েছে রাতাছড়া।পাশাপাশি এখান থেকেই লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনী ও মেলা করার হাতেখড়ি। হাতেখড়ি হয়েছে সীল স্ক্রীণের কাজ ও গ্রাফিপ্রিন্টের জন্মের ইতিহাসের সাথে ।অভিনয় শিল্পী হিসেবে আমি সামান্যও ফিট নয় কিন্তু এই আমাকেও নাটক লিখতে বাধ্য করেছিলো ফটিকরায় উপ নির্বাচন।আমিও অভিনয় করতে হয় সেই নাটকে।নাটকটির নাম প্রতিদিনের প্রতিবাদ। 
উদ্দীপ্ত সংগ্রহশালা গঠন ও পরবর্তী সময় উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন পুঁথি-পত্র সংগ্রহশালা ও গবেষণা কেন্দ্রে উত্তরণও এই রাতাছড়ায়।
আনন্দ সংবাদ ও আমার গর্বের আতুড়ঘর স্রোত প্রকাশনাও রাতাছড়া থেকে আত্মপ্রকাশ ঘটে।এখানেই ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় লিটল ম্যাগাজিন ও গ্রন্থ উৎসব। এই উৎসব পর পর তিনদিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। 
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো স্রোতের। রাতাছড়ায় প্রতিটি পরিবারের সাথে যাত্রা নাটকের নাড়ির সম্পর্ক। প্রতি পরিবারেই একজন না একজন নাট্যশিল্পী আছেন।আসতো কলকাতা থেকে যাত্রাদল।

রাতাছড়াকে নিয়ে অনেকগুলো কবিতা আছে। আমি পরপর এগুলো এখানে রাখলাম। 

রাতাছড়া সমগ্র :এক

মাটিতেই আঁকতাম ঘাতক,বন্ধুক
বৈরী বাতাস এলে 
মাকে জড়িয়ে বলতাম আমি একাত্তরের যুদ্ধশিশু।
কখনই প্রকৃত বন্ধুক না ছুঁয়েই আমিও স্বাধীন। 

এ দেশ আমি ও আমার বন্ধু আব্দুল আলিম মতিন
আর মসজিদের যুবক বদরুল হোসেন, তারও।

যদিও বাহান্নের ভাষা আন্দোলনে ঠাকুরদা
রাতাছড়ায় প্রান্তিককৃষক,বাবা সবে নবমশ্রেণি।

২৪:০১:২০২০
সময়:৫:৫০মি
কুমারঘাট।

রাতাছড়া সমগ্র :দুই 

কৃষিবিদ ঠাকুরদা শিক্ষক ছিলেন 
ঠাকুমা সরোজিনী সামান্য সামাজিক 
বাবা লেব্রেটরী এসিটেন্ড আর
মা যৌথ পরিবারে জোড়াতালি দিতে দিতে
নিজেই নিজেকে রক্তাক্ত করে 
১০০% সফল গৃহিণী চিরকাল। 

২৬:০১:২০২০
সকাল:০৭:০০টা
কুমারঘাট।


রাতাছড়ায় সাংস্কৃতিক চর্চা

বর্তমান ঊনকোটি জেলার কুমারঘাট ব্লকের অন্তর্গত উনত্রিশটি গ্রামের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ও প্রান্তিক গ্রাম রাতাছড়া। গ্রামের ঐতিহ্য অতি প্রাচীন। সেই সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বর্তমান রাতাছড়ার সাংস্কৃতিক গতিপ্রকৃতি। আধুনিকতায় পা দিয়েছে এই গ্রামের সাংস্কৃতিক জগৎ। রাতাছড়ার সাংস্কৃতিক বিকাশ নতুন না হলেও রাতাছড়ার ইতিবৃত্ত মোটামুটি ষাটের দশক থেকে পাওয়া যায়। ষাটের দশকের অনেক পূর্ব থেকেই এই গ্রামের সংস্কৃতির উজ্জ্বল অধ্যায় ছিল। কিন্তু তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

কিন্তু ইতিহাস টানার আগে স্থানটির নামকরণের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিলে গ্রামটি যে প্রাচীন তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। অমরমাণিক্যের আমলে (১৫৭৭-১৫৮৬ খ্রীষ্টান্স) ত্রিপুরার রাজধানী ছিল কৈলাসহর মহকুমার রাতাছড়ায়। এ থেকে ধারণা করা যায় ১৯৭৭ খ্রীষ্টাব্দ থেকে রাতাছড়ায় লোক বসবাস করতেন। রাজমালা অনেকেই রচানা করেছেন। রাজমালার রচনাকার বিভিন্ন জন থাকায় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে রাতাছড়ার উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকেই রাতাছড়ার কথা বলেছেন তাদের রচনায়। ভূপেন্দ্র চক্রবর্তীর রাজমালা থেকে পাওয়া যায় উত্তর ত্রিপুরার মনুনদীর তীরবর্তী তেতৈয়া নামক স্থানে মহারাজা অমরমানিক্য বিষপানে আত্মহত্যা করলে, জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজধরের রাজ্যাভিষেক হয়। এবং 'রাজধরছড়া' পরবর্তীকালে সময়ের পরিবর্তনে বর্তমান 'রাতাছড়া' হয়।

'যেই স্থানে রাজবর হইল নরপতি
সেই ছড়া নামবর রাজধর খ্যাতি।'

 -দুর্গামনি উজিরের রাজমালায় এইভাবে বলা হয়েছে। মহারাজ একদিন রাণীর সঙ্গে পরামর্শ করে মনুনদীতে বাঁশের ভেলা সাজিয়ে রাজধরের অভিষেকক্রিয়া সম্পন্ন করেন।যে স্থানে রাজধরের রাজঅভিষেক হয় সে স্থানের নাম হয় 'রাজধর ছড়া'। কালের ধারায় রাতাছড়া নামই বর্তমানকালে কুমারঘাট মহকুমার কুমারঘাট ব্লকের পশ্চিম প্রান্তে বয়ে চলা মনুনদী বিধৌত বর্ধিষ্ণু গ্রাম রাতাছড়া। গ্রামটি নিঃসন্দেহে অতি প্রাচীন।

রাজআমল থেকে এই গ্রামের সাংস্কৃতিক চর্চার বিকাশ ঘটলেও কালের স্রোতে আজ অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। নেই রাজধরের রাজপ্রাসাদ। নেই প্রাচীন কোনও ভাঙা ঘরবাড়ি। তবুও ষাটের দশক থেকে রাতাছড়ার সাংস্কৃতিক চর্চার ইতিহাস পাওয়া যায়।এখনো মাটি খুঁড়লেই রাতাছড়ায় পাওয়া যায় মাটির তৈরী বাসন পত্র। রাতাছড়ার টিলায় একটি তামার  বড় সেপ্টিপিন পেয়েছিলাম আমি।বহুদিন সাথে রেখেছি।কিন্তু তার ঐতিহাসিক মূল্য তখন অনুভব হয়নি।একদিন হারিয়ে গেছে সেপ্টিপিনটি।এ থেকেও বোঝা যায় এক সময় রাতাছড়ায় অমর মানিক্যের রাজধানী ছিলো রাতাছড়া। 
ষাটের দশকে রাতাছড়ার প্রথম যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হয় 'কোহিনুর'। এই পালার অভিনেতারা টেকই দাস, নীলমণি কর, লতিকা দাস, তরণীমোহন সিংহ প্রমুখ।

ষাটের দশকে রাতাছড়ার সাংস্কৃতিক চর্চা বন্যার মতো শুরু হয়। পার্শ্ববর্তী অন্যান্য গ্রামের চেয়ে এগিয়ে যায় রাতাছড়া। এই সময়ে মঞ্চস্থ যাত্রাপালাগুলির নাম উদ্ধার করা সম্ভব না হলেও অভিনেতাদের মধ্যে যারা ছিলেন, তাঁরা হলেন হরিদাস দে, গোপীচরণ মালাকার, যতীন্দ্রমোহন দেব (মন্টুবাবু), বৈষ্ণবদাস দে, প্রমোদ দেব, অধর দেবনাথ, নীলমণি কর, তরণীমোহন সিংহ, মনোরঞ্জন দে (বাবু) প্রমুখেরা। এ ছাড়াও কৃপেশ মালাকার, কোকিল দে, দক্ষিণারঞ্জন ধর। অভিনয়ের জন্য দক্ষিণারঞ্জন ধর 'আলেয়ার আলো' বইখানি প্রথম পুরস্কার পান। তাদের প্রত্যেকের অক্লান্ত শ্রমের মাধ্যমে রাতাছড়া নাট্য-আন্দোলনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে। সাংস্কৃতিক চর্চায় কলকাতার জোয়ার এল। কলকাতার শ্রীদুর্গা অপেরার এক স্বনামধন্য অভিনেতার আগমনে রাতাছড়ার যাত্রাপালার ভাবধারাতে পরিবর্তনের বন্যা এল। তিনি নিতাই ভেলোয়ার।সেদিনকার অন্যান্য অভিনেতারা হলেন  সুবল দেব, কমলাকান্ত সিংহ, প্রতাপ দেবনাথ, নিখিল রঞ্জন দে , নৌশা মিঞা, রাকেশচন্দ্র ধর, যোগল দেব, ফটিকরঞ্জন দে প্রমুখ। একমাত্র অভিনেত্রী বীণা পালের নাম স্মরণযোগ্য। এই সময় অভিনীত হয় 'রক্তমাখা অন্ন', 'ফেরিওয়ালা' সামাজিক পালাগুলি। ঐতিহাসিক পালার মধ্যে 'শ্মশানের কান্না', 'মুর্শিদকুলি খাঁ' উল্লেখ করার মতো।
আশির দশকের রাতাছড়ায় ভোলানাথ অপেরা প্রতিষ্ঠা হয়। তাদের নিজস্ব ধারায় ভাসিয়ে দিল যাত্রামোদী মানুষের মনের মাটিকে। ভোলানাথের যাত্রা মঞ্চায়ন হতো মনুনদীর ভাঙনে নিশ্চিহ্ন রাতাছড়া বাজারে। বাজারটি আমতলী বাজার হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। এ সময় যারা অভিনয় করেছেন তাদের মধ্যে বকুল দে, সুজিত দেব, কুঞ্জেশ্বর সিংহ, যজ্ঞেশ্বর সিংহ, প্রানেশ দে, অখিল দত্ত, রাজকুমার মালাকার, নিতাইচাঁদ দে, অরুণ শীল, অঞ্জন শীল, বাবুল মজুমদার প্রমুখ। মঞ্চস্থ যাত্রাপালা হল 'রোশনিমহল।'জীবন্ত শয়তান'।

নব্বইয়ের দশকে রাতাছড়া চৌমুহনী বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে রাতাছড়ায় প্রথম কোনো সাংস্কৃতিক সংস্থা। সংস্থার নাম 'স্রোতস্বিনী'। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে এই লেখক অক্লান্ত শ্রমের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন গড়ে তোলেন রাতাছড়ায়। কিছুদিন 'মহামায়া নাট্যসংস্থা' নাট্য আন্দোলনের শরিক হয়ে কাজ করেছিলো।তখন গোবিন্দ ধর রচিত 'প্রতিদিনের প্রতিবাদ' সভ্যতার কথিত কাহিনী মঞ্চস্থ হয়। মঞ্চস্থ হয় কাজলকান্তি মালাকারের 'জেগে ওঠো ঘুমন্ত সমাজ' এবং 'শতাব্দীর শেষ প্রশ্ন'। এই সময় অভিনয় জগতে এলেন প্রতীকচন্দ্র সেন, নির্মলেন্দু দে, তপন মজুমদার, শিবুরঞ্জন দে, গোবিন্দ ধর সহ আরও অনেকেই।

স্রোতস্বিনী সাংস্কৃতিক সংস্থা সাংস্কৃতিক জোয়ার নিয়ে এল রাতাছড়ায়। স্রোতস্বিনী শুধু নাটক যাত্রাপালা নিয়ে কাজ করেনি। করেছে সংস্কৃতির অন্যান্য ধারায়ও। সাহিত্য সঙ্গীত সহ সংস্কৃতির সমস্ত ধারাতেই সংস্থার অবাধ বিচরণ আজও রাতাছড়াকে প্রাণবন্ত করে রেখেছে।স্রোতস্বিনী তিনদিন ব্যাপী লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনী ও মেলারও আয়োজন করতো।

গোবিন্দ ধর রচিত নাটক 'প্রায়শ্চিত্ত'-একাঙ্ক নাটক দিয়ে শুরু। তারপর একে একে 'দুই বিঘা জমি', 'পরের দৃশ্য শ্মশান'-শিবুরঞ্জন দে'র একাঙ্ক নাটক, 'আসামী হাজির' ইত্যাদি যাত্রা-নাটকগুলি স্রোতম্বিনী মঞ্চায়ন করেছে। এই সময়ে অভিনয়ে আসেন কাজলকান্তি মালাকার, শিবুরঞ্জন দে, সুধাংশু সরকার, গোবিন্দ ধর, ভানুলাল দত্ত, আব্দুল হক, আজিজুর রহমান, রাজকুমার দত্ত প্রমুখ।

রাতাছড়ার সাংস্কৃতিক চর্চা সমৃদ্ধ করতে 'উপহার উপদেশ' এবং 'ইমাম সাহেব ও স্কুলের মিঞা সাহেব' প্রকাশ করেন মুজাফ্ফর আলী চৌধুরী। এর রেশ ধরেই নতুন উন্মাদনায় এই নিবন্ধকারের প্রথম বই 'ভালোবাসার মনে' প্রকাশিত হয়। বইটির আলোচনাও হয়। আলোচনা করেন ডা: মোয়াজ্জেম আলী, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান রেজিস্ট্রার অধ্যাপক সুব্রত দেব। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় রাতাছড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন সুব্রত দেব। তাঁর রচিত 'টরেটক্কা', 'বকম বকম', 'ঝালমিষ্টি' সহ আরও অনেক বই রাতাছড়ার অহংকার।যদিও গোবিন্দ ধর 'ভালোবাসার মনে'বইটি বাজেয়াপ্ত করে দেন।কিন্তু অরুণোদয় সাহা মহাশয়ও বইটির আলোচনা করেন।
১৯৯৫ সালে নিবন্ধকারের পিতার জমানো বইপত্র দিয়ে শুরু হয় উদ্দীপ্ত সংগ্রহশালার যাত্রা। সম্পূর্ণ বেসরকারী উদ্যোগে বর্তমানে এই সংগ্রহশালায় প্রায় ২৫-৩০ হাজার বইপত্র সংগ্রহে আছে।যদিও উদ্দীপ্ত সংগ্রহশালার নাম পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে'উত্তর পূর্বাঞ্চলের লিটল ম্যাগাজিন পুঁথি পত্র সংরক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র 'নাম করণ করা হয়।

এছাড়াও এখান থেকে প্রকাশিত হয় স্রোত পত্রিকা যা বাংলা সাহিত্যের অহংকার। অনেক লেখকেরা এই পত্রিকায় লেখেন। তারপর স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয় 'মেঘ বৃষ্টি রোদ'-চল্লিশজন তরুণ প্রবীণদের কবিতার বই।

রাতাছড়া এক উর্বর সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকাণ্ডের নাম। এখানে তাই এখনও মহিলারা ধামাইল নৃত্য,মনসামঙ্গল করেন।  বাউলগীতের সুরে  রাতের ঘুম শেষে চাষে যায় কৃষক।  কীর্তনীয়ার  সঙ্গীত মূর্ছনায় পূজা প্যান্ডেল মুখরিত হয়।

রাতাছড়ার একমাত্র  লোকগীতিশিল্পী বীণা পাল কৈলাসহর বেতারে সঙ্গীত পরিবেশন করেন।এখানো আকাশবাণীর বিভিন্ন প্রোগ্রামে, যেমন-সাহিত্য আড্ডা, যুববাণী ইত্যাদিতে অংশ  নেন এই নিবন্ধকারও।  রাতাছড়ার সাংস্কৃতিক জগৎ ত্রিপুরার অন্যান্য গ্রামের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে আছে।


২১:০৩:২০২৪


করৈছড়া

আমাদের গ্রামের নাম রাতাছড়া।রাতাছড়া আবার পূর্ব রাতাছড়া পশ্চিম রাতাছড়া দুটো গ্রাম।পশ্চিম রাতাছড়াকে আমাদের ছোটবেলা এমড়াপাশা গ্রাম বলতে শুনেছি। কেউ কেউ করৈটিলা গ্রামও বলতেন।করৈটিলা থেকে একটি ছড়ার উৎপত্তি হয়ে পশ্চিম রাতাছড়ায় মিশে গেছে। খুব স্বপ্লদৈর্ঘ্যের ছড়াটি।করৈটিলায় মুসলিম জাতির মকবরা অর্থাৎ মৃতদের কবর দেওয়া হতো।কিছুদিন পূর্বেও কবরস্থানটি ছিলো।মানুষের স্বার্থপরতায় তা গিলে খেয়েছেন একজন।তারপর পাশ ঘেষে ছড়াটির দুই পাড়ে প্রচুর জালিবেত হতো।ছড়াটির উপরের আকাশ ঢেকে রাখতো বেতগাছ। এখানে দিনের বেলা বাঘের হালুম শুনে কোনোক্রমে লোকজন যাতায়াত করতে পারলেও রাতের বেলা এই জায়গা পেরিয়ে যাওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার। তার উপর ছিলো ঠগি বাহিনীর উপদ্রপ অসহনীয়। চোরেরা অবলীলায় সব লুটপাট চালাতো এখানে।ডাকাত দলের লুকোনোর মোক্ষম জায়গা ছিলো করৈটিলায়।পাশেই করৈছড়া।কেউ কেউ করৈছড়ার ভয়ঙ্কর ফাঁদে পড়ে সর্বশান্ত হতেন।এমন সুরু জায়গা ছিলো এখানে এলে চুর ঠগি বা ডাকাত আক্রমণ করতে সুবিধা। এতোটাই সুরু এই করৈছড়া।তার উপর ঢাকা থাকতো বেতগাছের ঝোপঝাড়ে।এ জন্য লোকমুখে এই করৈছড়াকে কেউ কেউ গলাচিপা ছড়াও বলতেন।
প্রকৃতির নির্মম পরিহাস আজকাল আর বেতগাছ তেমন নেই। নেই করই বৃক্ষ। বর্ষায় করৈ গাছ থেকে ঝরে পড়তো করৈবীজ। তা জলের তোড়ে ভেসে আসতো করৈছড়া হয়ে পশ্চিম রাতাছড়া হয়ে মনুনদীর জলধারায়।
এখন করৈছড়ায় একটি ব্রীজ আছে। নিচে প্রবাহিত করৈ ছড়ায় জল নেই। নেই বেতগাছ। নেই ঠগি বাহিনীর সন্ত্রাস। নেই চোরের আনাগোনা। নেই বাঘের হালুম। ব্রীজ আছে জল নেই। 
করৈটিলা আছে করই বৃক্ষ নেই। জলের স্রোত নেই। নেই সে পরিমাণ বৃষ্টিপাত।করৈ ছড়ায় বৃষ্টির জল আর আগের মতো নেচে নেচে পশ্চিম রাতাছড়ায় মিশতে আসে না।নেই মাছের প্রথম বৃষ্টির শব্দে ঝাঁক বেঁধে সারিসারি নেমে যাওয়া চালচিত্র। 
এখন করৈছড়া নামও নবীন প্রজন্মের নিকট অচেনা একটি ছড়া মাত্র। 
গাঁ ছমছম নেই এখন আর।এখন গাড়ি চলাচল রাতদিন  করৈটিলা পশ্চিম রাতাছড়ার মানুষের নিকট আশীর্বাদ। কিন্তু করৈছড়ার অনালোকিত অধ্যায় চাপা পড়ে আছে পিচ রাস্তায় টায়ারের ঘর্ষণে।
আধুনিক বিশ্বের যন্ত্র সভ্যতা আমাদের জীবন মানকে এগিয়ে দিলেও প্রকৃতির খেয়ালিপনা না থাকায় আমরা বড় অসুখের মধ্যে জীবনযাপন করছি তা অনস্বীকার্য। 

২১:০৩:২০২৪


আনোয়াছড়া 

গঙ্গানগরের পশ্চিম থেকে ছোট ছোট টিলা পাহাড় থেকে বৃষ্টির জল নেমে বিস্তৃর্ণ অঞ্চলের ক্ষেত মাড়িয়ে মনু নদীতে মিশে গেছে আনোয়াছড়া। আনোয়াছড়া মূলত জমির উপর দিয়ে প্রবাহিত বৃষ্টিপাতের জলধারা।দীর্ঘ সময় জল নামার তরঙ্গে একটি সুরু রেখায় থইথই প্রবাহকেই আসলে কালের স্রোতে লোকমুখে প্রচলিত হয় আনোয়াছড়া।
জনশ্রুতি অনুসারে বর্ষায় জলের প্রবল জমির উপর দিয়ে প্রবাহিত খরস্রোতা হয়ে ওঠে। রাতাছড়া গ্রামের লোকজন মূলত কৃষিজীবী। জমিন তাদের নিকট সম্পদ।জলের প্রবাহ নামতে নামতে একটি টিলায় এসে বাঁধা পায়।সেখানে রাতাছড়ার কৃষিজীবী মানুষের শ্রমের মাধ্যমে আনোয়াছড়াকে গতি দেওয়া হয়।
এই জলধারা আনোয়াছড়া নাম করণের রহস্য উদঘাটন করতে গ্রামের বয়স্কদের সাথে আলাপ আলোচনা করে জানতে পারি এক সময় মুসলিমরা আরো রক্ষণশীল ছিলেন।তাদের কারো পরিবারের একটি মেয়ে একজন হিন্দু সম্প্রদায়ের কাউকে ভালোবেসেছিল। কিন্তু মুসলিম পরিবার ও গ্রামের ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা এই ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেন। মেয়েটির নাম আনোয়ারা বেগম।সে ছিলো অপরূপ সুন্দরী। টান টান হরিণাক্ষী।মিশুকে ছিলো মেয়েটি।অনেক আগে সমাজ ব্যবস্থায় এখনের মতো ততো মেলামেশা সম্পর্ক ছিলো।তখনকার সময় এই ভালোবাসা মেনে নেওয়ার মতো সমাজের রক্ষণশীলতাকে ডিঙিয়ে আনোয়ারা নামের মেয়েটির ভালোবাসাও স্বীকৃতি পায়নি।অথচ আনোয়ারা নাছোড়বান্দা। সমাজ যখন এই ভালোবাসার কোন স্বীকৃতি দিতে নারাজ তখন মেয়েটির কাছে আত্মহত্যাই একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায়। 
এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় মেয়ে রাতাছড়া ডিঙিয়ে প্রবাহিত জলের তোড়ে নিজেকে সমর্পণ করে বসে।সেই থেকে এই অঞ্চলের এই সুরু প্রবাহকে লোকজনের নিকট আনোয়াছড়া নামেই পরিচিতি পায়।
এই আনোয়ারা নামের মেয়েটি নিয়ে আমার এক গুচ্ছ ভাবনা অনেকটা কবিতার মতো করে আমি আনোয়ারা নামের মেয়েটি নামে একটি কাব্য সংকলন প্রকাশ করেছি।এখানে সেগুলো তুলে দিলাম।

মেয়েটি বিষাদ বালিকা, তার ওষ্ঠে যে তিল তাতেই লেখা আছে মৃত্যুবাণ।

এক.

আমি যে গ্রামে বড় হয়েছি নাম তার রাতাছড়া। আমাদের বাড়ির চারিদিকেই সামনা। বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে সূর্য যে দিকে উঠে সেদিকে মুখ করে দাঁড়ালে বাম হাতে পড়ে করমছড়া কৈলাসহর রোড। এই রোডের ডানদিকে আমাদের ছোটবেলার ছবিগ্রাম রাতাছড়া।

দুই.

গ্রামের একটি ছড়া আছে। তাহার নাম রাতাছড়া। আমার পাঠশালা স্কুলের পাশ ঘেসে ছড়াটি চিকচিক বালুস্রোত বয়ে মনুর সাথে সঙ্গমে আসে।

তিন.

রাতাছড়ার ককবরক নাম রাতাছড়া। রাতা মানে ককবরকে পুরুষ মোরগ। রাজমালায় রাঝধর ছড়া কালক্রমে রাজধরছড়া- ক্রমে ক্রমে রাতাছড়া।

চার

রাজমালায় বলা আছে রাজধরের অভিষেক হয় মনুনদী নিকট রাতাছড়ায়। তারপর আফিম সেবনে আত্মনিবেদন করেন তাঁর পিতা।তারপর থেকে রাজধর ছড়াই আজকের রাতাছড়া।

পাঁচ.

আমার বাড়ির বাঁদিক বরাবর একটি ছোট হাওর এক কিমি অব্দি যাওয়ার পর টিলা হয়ে আছে। এই হাওর ধরে চোখ মুদে হাঁটলেও যাওয়া যায় গঙ্গানগর।

ছয়.

হাওর থেকে অজগরের মতো নামছে একটি নালকাটা ছড়া তার নাম আনোয়াছড়া।

সাত,

আনুয়াছড়া নিয়ে জনশ্রুতি একটি প্রেমকাহিনী। একটি মেয়ের আত্মহত্যার গল্প একটি মেয়ের স্বপ্ন, বিকেলের আগেই কি রকম হেজেমজে গেলো একটি মেয়ের বুকের চারাগাছ অকালে মরে যাওয়া গল্প।

আট

বিকেল আসার আগেই তার মুখ থেকে সূর্য থেমে গেলো। রোদ ঝলমল মুখ থেকে ফেনিয়ে বেরিয়ে এলো পূরণ না হওয়া একটি ছোটগল্প যার নাম আনোয়াছড়া।

নায়

আনোয়ারা কেকাম একজন সংখ্যালঘু মেয়ে। প্রেমের সখ্যতা তার ছিলো ছড়াজলের সাথে।

দশ

আনোয়ারা বেগম ছড়াজলে পা ডুবিয়ে প্রিয়সখার বুকে মাথা রেখে একটু ঘুমাতে চেয়েছিলো। চারজন নিরক্ষর তর স্বপ্ন কেড়েনিলো জলের স্রোতের মতো মিশে গেলো জলে মেয়েটি। মেয়েটি জলে গুলে গেলো। অকালে মরে যাওয়া গল্প।

এগারো 

ছোট ছোট টিলার জল লাফিয়ে লাফিয়ে সাগরের ঢেউ মতো। জলের স্রোত সব কেড়ে নেয়। মানুষের পুকুর  ডুবুডুবু। হাওর জলে জলাকার জলকাতর মানুষেরা জলবন্দি জল নামছে জল নামছে জলের তোড়ে সব ভাসিয়ে নিলো। মেয়েটি আনোয়ারা নামের মেয়েটিও। দুই টিলার ফাঁক বরাবর নামছে দালান বাড়িঘর সব ভাসিয়ে জল নামছে।

বারো,

একজন সংখ্যালঘু মেয়ের নাম আনোয়ারা একজন মেয়ে মানুষের নাম আনোয়ারা একজন প্রেমিকার নাম আনুযায়ী একজন মানুষের নাম আনোয়ারা। একটি অপূর্ণতার নাম আনোয়ারা। একটি সবুজ ফুলের নাম আনোয়ারা। একটি ছড়াজলের নদীর নাম আনোয়ারা একটি জীবনের নামে আনোয়ারা আনোয়ারা আসলে একটি প্রতিবাদও।

তেরো,

কপট ভালোবাসার কাছে জীবন দিয়েছে আনোয়ারা বেগম?

নাকি সমাজ করেছে নিষিদ্ধ এই প্রেম লোকমুখে গালগল্প ফিসফাস তার প্রেম বুকে নিয়ে কলকল শিৎকারে জল যায় মনুর নিকট।

চৌদ্দ 

নিজেকে লুকাতে দিয়ে মেয়েটি তার মেম কোমায় লুকালো। আনোয়ারা তো একটি মেয়ে শুধু নয় একটি সময় একটি সকাল। তার সূর্য তো দেতে না কখনো। সমাজ বদলের সলতে সে রোপন করেছিলো।

পনেরো,

ধীরে ধীরে মেয়েটি অভিমানে মিশে যায় ঘোলাজলে। দূরে বসে কেউ একজন পাঁজরের হাঁড়ের ভেতর কনকনে শীত টের পায়। মেয়েটির কোন রোগ ছিলো না। মেয়েটির ভালোবাসা ছিলো নিখাদ কেউ একজন কেড়ে নিলো মেয়েটির সকল পাখি।

ষোলো.

মেয়েটি পাখি ছিলো
মেয়েটি স্বপ্ন বুনতো আকাশের মতো
নানান রঙ্গের।
সব রঙ জলে মিশে জলাকার
মেয়েটি জলের মত
কলকল বয়ে যায় নদীর কাছে।
নদীও নারীর মতো
আনোয়ারা একটি ছোটনদী
ভিরতির প্রবাহিত।

সতেরো.

আনোয়ারা একটি নদী ও মেয়ে। তার শিৎকার শুনি মাঝরাতে। তিরতির তার কল্লোল বজ্র নির্ঘোষ।

আঠারো.

সব পথ নদীতে এসেই মিশে যায়। নদীই সাক্ষী থাকে প্রকৃত প্রেমের। আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টিজল বয়ে নিয়ে সাক্ষী রইলো আনোয়ারার লোকশ্রুতি।

২৩:০৩:২০২৪

সায়দাছড়া 

সায়দা নামক স্থান থেকে সায়দাছড়া কলকল প্রবাহিত হয়ে মনুতে মিশে গেছে। দুপাড়ের জঙ্গল সমতল পাহাড়ি এবড়োখেবড়ো পথ ডিঙিয়ে সায়দাছড়া ফটিকরায়ের বিস্তীর্ণ পথ পরিক্রমা করে কৈলাসহর ধুমাছড়া রাস্তার শিমূলতলীতে এসে পাকাব্রীজ ক্রস করে সামনে মনু ও দেও মোহনার কাছাকাছি অঞ্চলের মনুর লালডহরে বিলীন হয়ে গেছে সায়দাছড়া।

রাতাছড়ার পশ্চিমের কালাপাহাড় থেকে তার উৎপত্তি। উৎপত্তিস্থল থেকে রাজকান্দি গঙ্গানগর জয়গন্তী গোকুলনগর রাজনগরের পাশ বরাবর ভৈরবথলী হয়ে লালডহর দীর্ঘ জার্নি সায়দাছড়ার।
পাহাড় টিলা রাভার বাগান সংলগ্ন রাস্তায় দুপাড়ের মানুষজনকে কৃষিকাজের সুবিধা ও পূর্বে খাবার জলের মতো সুবিধা দিত সায়দাছড়া।
শিমুলতলীতে এক সময় কাঠের ব্রীজ ছিলো।রাতাছড়া কাঞ্চনবাড়ি এমড়াপাশা লালজুরী ডেমডুমসহ ঝুরিছড়া মরাছড়া অঞ্চলের লোকজন এই ব্রীজ পেরিয়ে ফটিকরায় কুমারঘাট মহকুমা শহর কৈলাসহর প্রথম প্রথম পায়ে হেঁটে পৌঁছতেন।পরবর্তী সময় একমাত্র মহেন্দ্র জীবই ভরসা ছিলো।
শিমূলতলী অঞ্চলে কাঠেরব্রীজের প্রায় ভগ্নদশায় সে কি লাঞ্চনা মানুষের। গাড়িও তখন আমাদের ছোটবেলা একটি মাত্র ছিলো।সকালে রাতাছড়া থেকে স্টার্ড হতো।রাতে ফিরতো।একবার গাড়ি কেউ ধরতে না পারলে তখন সেই লোকটি ঐদিন আর গন্তব্যে পৌঁছাতে পারতেন না।
মানুষের জন্য এই ব্রীজ খুবই প্রয়োজন ছিলো।এখন পাকাসেতু।অনেকটা যাতায়াতের সুবিধা সুলভ।কিন্তু প্রকৃতির ভারসাম্য সে আগের মতো নেই।ভৈরবতলী অঐ্চল সেকালে ডাকাতদের উপদ্রপ ছিলো।ছামনু থালছড়া গোবিন্দবাড়ি থেকে লোকজন অবিভক্ত উত্তর ত্রিপুরার ফটিকরায় বাজারে দুতিন দিন পায়ে হেঁটে আসতেন।বাজার সেরে ফেরার সময় ডাকাত দলের কবলে পড়তেন বাজার ফেরত লোকজন।এখানে বড় হাফের নিকট ডাকাতের আস্তানা ছিলো।ডাকাত সড়দার ছিলেন ভৈরভ সাধক বলে জনশ্রুতি আছে। তিনি  সাধনা করতেন বলে ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের নাম হয় ভৈরবতলি।
বৃষ্টি হচ্ছে না। সে পরিমাণ বৃষ্টিপাত নেই। 

২১:০৩:২০২৪

মরাছড়া

একবার চড়কমেলায় মরাছড়া গিয়েছিলাম।তখন সবে নবম শ্রেণিতে আমি।রাতাছড়া বাড়ি থেকে মরাছড়া যেতে প্রথমে রাজকান্দি বাজারে পৌঁছতে হবে।রাজকান্দি থেকে জনজাতি এলাকায় পায়ে হেঁটে যদিও সারা পথ যেতে হয়।যদিও তখন বাবার ভাঙা হারকোলিস চালিয়ে গেছিলাম রাজকান্দি। ফটিকরায় থেকে রাজকান্দি যেতে রাজনগর, গোকুলনগর,গঙ্গানগর, রাধানগর,জয়গন্তি হয়ে পৌঁছতে হবে।তারপর মরাছড়া।মরাছড়ায় সাধারণত তেমন জল নেই। বৃষ্টি হলে মরাছড়ায় বর্ষার জল জমে আর স্রোতের তোড় নামে লুঙ্গা ছাপিয়ে।সেই মরাছড়া তখন চড়কমেলা বসছে চৈত্রের পাঁচ কি ছয় তারিখ। আমি লটারী খেলা নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম।জনজাতিরা লটারী টিকিট কেটে ছোট বড় পুরস্কার জিতে বেশ আনন্দিত হয়েছিলেন।সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম জনজাতি অংশের লোকজনের সরলতা।আবার একবার উনারা ঠগেছেন বুঝতে পারলে প্রতিরোধও জানেন।কিন্তু প্রথমেই ওদের সরলতায় আমিও মুগ্ধ হয়েছি।
সন্ধ্যার আগেই চড়কমেলায় পসরা সাজানো জনজাতি পুরুষ মহিলাদের অনেকেই সারিবদ্ধ চুলাই নিয়ে বসে গেছেন।কারো কারো লাঙ্গি।কোনো রকম রাখোটাকো লুকোচুরির বিষয় নেই। যারা নেশায় বুদ হতে চায় তো গলদকরণ করছেন দেশিচুলাই।
আমিও প্রথমবার চায়ের কাপে এককাপ দেশিচুলাই গলায় ঢেলে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম মাদকাসক্ত কখনোই হবো না।কারণ দেশিচুলাই সেবনের স্বাদ তো নেই-ই বরং মুখটাই সেদিন বিষাদে রূপান্তরিত হয়েছিলো।পাশাপাশি দেশিমদের তিক্তঘ্রাণ তিনপুরুষ অব্দি মনে থাকবে আমার।অথচ বিপিনবাবুর কারণ সুধায় সেদিন কতজনের ঠেংখোঁড়া হয়েছিলো কালবৈশাখীর তাণ্ডব আর দেশিচুলাইয়ের মিশেল আক্রমণে দেখে বড় করুণা হয়েছে আমারও।দেশি সেবন যারা করেন তাদের মধ্যে সাম্যবাদ প্রকট।একজনের পান করা চুলাইকাপ অন্যজনের ঠোঁটে আলতা চুমু খেলেও কাপ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার সময়ও নেই আর ঝামেলাও নেই। পরপর একটি কাপেই  চলছে সাম্যবাদের পাঠশালা।
যাকগে চড়ক মেলায় নাচগান চলছে।হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় দিকবিদিক কালো ঘুটঘুটে আঁধারে ছেয়ে ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়।
মেলার লোকজন যে যার মতো দৌঁড়ে দৌঁড়ে ধারেকাছে আশ্রয় নিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন।তখন সন্ধ্যাও নেমে গেছে মরাছড়ার দুকূল ছাপিয়ে। 
সেদিনই প্রথমবার এবং সেদিনের পর অদ্যাবদি আর কখনো মরাছড়া যাওয়া হয়নি। অবশ্য রাজকান্দি বাজারে আরো বার কয়েক গিয়েছি।
মরাছড়া ফটিকরায় থেকে পশ্চিম উত্তর অক্ষাংশ বরাবর অঞ্চলে অবস্থিত।

২৩:০৩:২০২৪


পাবিয়াছড়া

পাবিয়াছড়া নাম বহু পুরাণো।ঠিক কেন কুমারঘাটের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নাম পাবিয়াছড়া হলো সে ইতিহাস লোকমুখে প্রচলিত শুধু। আর তেমন কোনো তথ্য তেমন নেই। 
পং ছড়ার দক্ষিণ পচ্চিম পাড়ের পাহাড় সিদং ছড়ার সংলগ্ন অঞ্চল থেকে পাবিয়াছড়া লোকালয়ে আসতে থাকে লকলক করে।জল নামতে নামতে এসে দেওনদে মিশেছে। জনশ্রুতি আছে পাবিয়াছড়ায় এক সময় প্রচুর পাবদামাছ পাওয়া যেতো।তা থেকেই এই ছড়ার নামকরণ হয়।আর পাবিয়াছড়ার নাম থেকেই পাবিয়াছড়া বাজার ও বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নাম কালক্রমে পাবিয়াছড়া হয়।বহু পর গ্রীপ কোম্পানি আসাম আগরতলা রাস্তার কাজের সময় দেওনদের পশ্চিম পাড়ের কুমারঘাট নামটি পাবিয়াছড়া অঞ্চলের কাজের সময় সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিলে তা লোকমুখে প্রচলিত হয়ে এখন পাবিয়াছড়াও ধীরে ধীরে কুমারঘাট হয়ে গেছে। পূর্বে দেওনদের পশ্চিম পাড়ের নাম কুমারঘাট আর পূর্ব পাড়ের নাম পাবিয়াছড়া ছিলো।মূলত পাবিয়াছড়ার নাম অনুসারে পাবিয়াছড়া হয় এই অঞ্চল। কিন্তু গ্রীপ কোম্পানির রাস্তা নির্মাণের সময় তা কুমারঘাট সাইনবোর্ডকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে প্রচলিত হয় কুমারঘাট। পাবিয়াছড়া ও কুমারঘাট মূলত দুটো গ্রাম পঞ্চায়েত ছিলো।১৯৮৮ সালে নগর পঞ্চায়েত হয়।২০১২ সালে ত্রিপুরা আটটি জেলা ঘোষণা হলে কুমারঘাট হয় মহকুমা। আর কুমারঘাট তখন থেকেই নগর পঞ্চায়েত থেকে পুর পরিষদে উত্তীর্ণ হয়।
কুমারঘাটে এক সময় হাতি ধরা হতো।আর স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু পরেও লোকজন তেমন ছিলেন না।সতীশচন্দ্র সেন ও সুশীতল ধর দুজন বাংলাদেশের ভানুগাছ থেকে এখানে বসবাস শুরু করলে ক্রমশ লোকজন বাস করা শুরু হয়।এই সময় মানিক ঘোষও কৈলাসহর থেকে এখানের বহু জায়গা দখলদারী শর্তে ভোগ করা শুরু করেন।আর এই দখলদারী ও মালিকানা দুই গ্যাড়াকলে কুমারঘাটের সমতল ভূমি ত্রিপুরা সরকার ও ভারত সরকারের খাস ভূমিতে রূপান্তরিত করা হয়।এতে আইনী অধিকারের জন্য সুশীতল ধর ও মানিক ঘোষের মধ্যে আইনী লড়াই অনেকদিন থেকে লেগে আছে।যদিও দুজনই এখন স্বর্গত।
আজ আর পাবিয়াছড়া তেমন অস্থিত্বের জানান দিতে অক্ষম। পাবিয়াছড়া বাজারের নোংরা আবর্জনা ছড়াটির মোহনাকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। অথচ এই ছড়াটির জন্য একটি অঞ্চল ছিলো গ্রাম পঞ্চায়েত হিসেবে।অচিরেই সরকারের সুনজরে না এলে ছড়াটি আসাম আগরতলা ও পাবিয়াছড়া বাজারের ব্যবসায়ীদের আবর্জনা স্তুপ হবে পাবিয়াছড়া। 

নিচে আমার লেখা একটি কবিতা পাবিয়াছড়াকে কেন্দ্র করে লেখা । নজরদারি না হলে ক্রমশ ছড়াটি প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে।এই কষ্ট থেকেই কবিতাটি 
২০:১০:২০১৭ তারিখ সকাল:১০:৩৫মিনিটে লেখা। 

আমাদের শহর এখন কুমারঘাট।
দেওবাহিত শহরের মাঝ বরাবর কাটাকটি খেলে
পাবিয়াছড়া লিকলিকে নামছে
শহরের মলমূত্র
আর ব্যবহৃত নিরোধের ভেতর মৃত স্বপ্ন নিয়ে।

আমাদের শহর কুমারঘাট।
গ্রামীণ সারল্য ছিলো মানুষের বুকের ফসল।
সাহিত্য সংস্কৃতি যা ছিলো
প্রাণ ঢেলে দিতো তখন।

এখন দাদাদের চোখের তর্জনী থেকে আগুন ঝরে।
দেওবাহিত শহরের লোক পড়শির পিঠে হাত রেখে
কেউ বলে না"কেমন আছো"!

দিনে দিনে শহর বড় হয় নদীর নাব্যতা কমে
আমাদের শহর কখন যে
পাবিয়াছড়া বাদ দিয়ে এখন কুমারঘাট
জেঠামশাইও জানেন না।

আমরা পাবিয়াছড়ার পাবদাকে
হারিয়ে অন্ধ্ররুই রসনায় তুলে দিই

আমাদের শহর এখন কুমারঘাট।
দাদারা সাবলক।শহর পুরপরিষদ।
ড্রেন আর ডাস্টবিন নাই বা হলো
আমাদের শহর তবু আমাদের কুমারঘাট।


কুমারঘাট নামকরণ সংক্ষিপ্ত বিবরণ 

আমাদের ছোটবেলা গুণ টানা নৌকা মনুর জলে ভেসে স্রোতের বিপরীতে কী ভীষণ কষ্টে মাঝি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দেখেছি। তখন নদী নির্ভর জীবনযাত্রা ছিল। আমার বেড়ে ওঠা রাতাছড়া গ্রামে। জীবনের ছোটবেলাকে সরিয়ে ২০০৩ সালে কুমারঘাটে বসবাস করছি। বহু পুরনো কথা, ইতিহাস আমার অজানা। বিভিন্ন জনের সাথে আলাপ-আলোচনা করে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি কুমারঘাটের একটা সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং ইতিহাস তৈরী হোক। এরই ফলশ্রুতি এই নিবন্ধ।আসলে কুমারঘাট ও পাবিয়াছড়া দুটো গ্রাম পঞ্চায়েতকে কেন্দ্র করেই এই অঞ্চলের লোকজনের বসবাস।কুমারঘাট নামটির প্রচার শুরু হয় গ্রীপ কোম্পানির আসাম আগরতলা রাস্তা তৈরীর সময়।দেওনদের পশ্চিম পাড় কুমারঘাট নামেই পরিচিতি ছিলো। পূর্ব পাড় পাবিয়াছড়া নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। মূলত পাবিয়াছড়া নামে ছড়াটিকে কেন্দ্র করেই বিস্তৃর্ণ অঞ্চলের নাম পাবিয়াছড়া হয়।পরবর্তী সময় আসাম আগরতলা রাস্তা তৈরীর সময় পাবিয়াছড়াসহ সমগ্র অঞ্চলই কুমারঘাট নামে পরিচিতি হয়।সরকরী দলিল দস্তাবেজও সেরকম বিভিন্ন দপ্তরে লেখা শুরু হয়ে অদ্যকার কুমারঘাট গ্রাম পঞ্চায়েত হয়ে ওঠে কুমারঘাট মহকুমা শহর।


সাহিত্য চর্চা

আমি চেষ্টা করছি কুমারঘাট মহকুমার সাহিত্যচর্চার একটা রূপরেখা তুলে ধরতে।

কুমারঘাট ছিল একটা গাঁওসভা। দেও এবং মনু নদীর সঙ্গমস্থল। মনোরম প্রকৃতি। দেও- ব্রীজ নেমেই ৪৪ নং জাতীয় সড়ক। এই সড়ক থেকে চার দিকে তাকালে কুমারঘাটকে নিম্নভূমি বলে মনে হলেও আসলে যে দিকেই তাকান, আশপাশ উঁচুনিচু টিলায় বিস্তীর্ণ এই অঞ্চল জাম্পুই রেঞ্জ এর সাথে যুক্ত ভৌগোলিক দিক থেকে। অথচ শাখান পাহাড় থেকে কলকল মনু এসে বিধৌত করে চলেছে তার দু'কূলের জনবসতি। মনু আর দেও আমাদের কৃষিনির্ভর সমাজে কৃষকের প্রাণ। তাই মনুর চরে এখনো আঁখ ক্ষেত আমাদের দোলা দেয়। পানীয় জলের চাহিদাও দেও-মনু পূরণ করে দিচ্ছে। জলই জীবন। যদিও মাঝে মাঝে লোভী কিছু শিকারী মানুষ নদীতে বিষ প্রয়োগ করেন, তবুও নদীমাতৃক লোকজ কৃষ্টি-সংস্কৃতির টান অনুভব আছেই আমাদের হৃদয়ে। পদাবলী, ধামাইল, হাসন, বাউল, লালনের পাশাপাশি এই অঞ্চলের মাটির ডাকে সাড়া দিয়েছেন কবিয়াল বিষ্ণুরমণ দত্ত। চারণ কবি বিশ্বেশ্বর দাস, চারণ কবি রজনীকান্ত দাস। গ্রামের হাটগুলোতে সন্ধ্যায় কবি গান শোনার লোকের অভাব হতো না, আজ যদিও কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন পাঠক। হয়তো দুর্বোধ্য বলে, হয়তো কবিতার নিবিষ্ট পাঠকের অভাবে আমাদের কবিতা ততোটা বোধগ্রাহ্য হচ্ছে না। সময়ই বলবে সময়ের কথা। কিন্তু কাব্য সংকলন পাঠ না করেই কবিতার ঘাড়ে অভিযোগ না চাপানোই ভালো। কবিতাতো আসলে অঙ্ক নয়। সিঁড়ি ভাঙ্গা সরল নয়। ক্রমাগত পাঠই কবিতার রস সঞ্চারের মাধ্যম। আমরা দেখেছি, যে কবিতা একজন পাঠক পাঠ করলে দুর্বোধ্য ভাবেন, সেই একই কবিতা একজন আবৃত্তিকার এই পাঠককে আবৃত্তির মাধ্যমে আনন্দ দিতে পারেন। নদী নির্ভর কুমারঘাটও এক সময় সড়ক কেন্দ্রিক। ব্যস্ত মানুষ। এখন আর গুণ টেনে দেও-এর উজান বেয়ে মাঝি ভাই নাও টানেন না। কুমোর নাও নিয়ে মাটির হাঁড়ি- বাসন ঘাটে ভীড়ান না। এখনো হাঁড়ি-কলসি বাজারে আসে। অথচ, ইতিহাস ভুলা যায় না। না লিখেও যে ইতিহাস ধ্বংস হয় না কালের সাথে সাথে লোক মুখে থাকে, তা বিস্মৃত হয় না। দেও নদীর ঘাটে কুমোররা মাটির তৈরী জিনিস-পত্র বিক্রির জন্য পসরা সাজিয়ে বসতো। কালক্রমে হয়ে যায় কুমোর কুমার ঘাট কুমারঘাট। যদিও কুমারঘাটের সাথে রাজা কুমার মাণিক্যের নামও জড়িত। কেউ কেউ বলেন, কুমার মাণিক্যের নাম থেকেই কুমারঘাট নাম হয়েছে। কুমারঘাট অঞ্চলের আশেপাশে চাকমা জনজাতির বাস বর্তমান সময়ও আছে। কুকিদেরও বসবাস ছিল, তাই কেউ কেউ দাবি করেন, কুমার কুকির নাম থেকেই কুমারঘাট নামের উৎপত্তি। আবার অন্য কয়েকজনের অভিমত, দারচৈ এ. ডি. সি. ভিলেজ অঞ্চলের দার্লং সম্প্রদায়ের রাজা শাসনকর্তা ছিলেন। এই ভাবে নানা জনশ্রুতি থেকে বুঝা যায়, এই অঞ্চলের প্রাচীনত্বের ইতিহাস।

কুমারঘাটে ১৯৭৯-৮০ সালে সাহিত্য চর্চার সূচনা হয়। কবিতা চর্চার মাধ্যমেই তার সূচনা। প্রথম কবিতাপত্র 'মণিহার'। সম্পাদক ছিলেন রতিকান্ত দাশগুপ্ত। সভাপতি গোবিন্দ ভট্টাচার্য। মণিহারে কবিতা লিখতেন রতিকান্ত দাশগুপ্ত, গোবিন্দ ভট্টাচার্য, দীলিপ ঘোষ, নেপাল রায়, মলয়কান্তি দত্ত, নিরঞ্জন ঘোষ, বিপুলরঞ্জন আচার্য। মলয়কান্তি দত্ত ও নিরঞ্জন ঘোষ ইংরেজী কবিতা লিখতেন। বিপুলরঞ্জন আচার্যের টগবগে কবিতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দীলিপ ঘোষ ছাত্র অবস্থায়ই কবিতা লেখা শুরু করেন।

দ্বিতীয় সাহিত্যপত্র তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরের দেওয়াল পত্রিকা 'অন্বেষা'। সম্পাদক বিষ্ণুলাল ঘোষ। এতে সম্পাদক সহ চর্চা করতেন বিশ্বনাথ দত্ত। ১৯৮০ সাল বা তার আগে-পরে সুভাষ চন্দ নিয়মিত তথা সংস্কৃতি দপ্তরের দেওয়াল পত্রিকাতে কবিতা লিখতেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে কবিতার তার দৃপ্ত পদচারণা সচেতন পাঠক আজও মনে করেন।

১৯৮২ সাল নাগাদ প্রকাশিত হয় 'ধ্রুবতারা'। সম্পাদক মাণিকলাল দাস। চর্চা করতেন ভবেশরঞ্জন গুহ। একে একে প্রকাশিত হয় 'প্রয়াস' ফটিকরায় থেকে। সম্পাদক ছিলেন মণিকা চক্রবর্তী। নীলিমেশ পাল, প্রদীপ মুখার্জী ছাড়াও এতে চর্চা করতেন গোবিন্দ ধর, সত্যজিৎ দত্ত, অজিতা চৌধুরী, সন্তোষ রায়। এই সময়েই প্রকাশিত হয় গোবিন্দ ধরের সম্পাদনায় 'স্রোতম্বিনী' সাহিত্য পত্র। এতে মোঃ আলাল উদ্দীন, ভানুলাল দত্ত, গোকুল ধর সহ নীলিমেশ পাল, মিলনকান্তি দত্ত সহ ত্রিপুরার অনেকেই কবিতা, গল্প চর্চা করেছেন।

তারপর তপন বণিকের সম্পাদনায় 'নিবেদন', সুদর্শন বৈদ্য সম্পাদিত 'নিশানা' প্রকাশিত হয়। চর্চা করতেন অবনী দেবনাথ, কাজল চক্রবর্তী, গোবিন্দ ধর। ফটিকরায় থেকে শংকর বসুরায় সম্পাদিত 'একাল' পত্রিকা একটা মাত্র সংখ্যার পরই বন্ধ হয়ে যায়।

২০০৩ সালে কুমারঘাটে সাহিত্য চর্চার জোয়ার আসে। নীলিমেশ পাল, গোবিন্দ ধর 'এই পক্ষ' সাহিত্য আড্ডার আয়োজনের মাধ্যমে কুমারঘাটে সাহিত্য চর্চা বেগবান হয়। এই সময় উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে আড্ডায় উপস্থিত হতেন। নীলিমেশ পাল, গোবিন্দ ধর, পদ্মশ্রী মজুমদার, সুমিতা পালধর, গোকুল ধর, সুধাংশু সরকার, বিজয়লক্ষ্মী সিংহ, নীলিমা দেব, বিধানচন্দ্র রায়, কাজল চক্রবর্তী, মিলনকান্তি দত্ত, ডাঃ সৈয়দ মোয়াজেজম আলী, নীলমণি দে সহ আরো অনেকেই। এক সময় ব্যস্ত শহরের ব্যস্ততার মতোই 'এই পক্ষ' সাহিত্য আড্ডা বন্ধ হয়ে যায়।

২০০৭ সালে শুরু হয় 'স্রোত সাহিত্য আড্ডা'। এখনো প্রতি ইংরেজী মাসে চলছে পাক্ষিক এই আড্ডা। আড্ডায় অংশ নেন মিলনকান্তি দত্ত, সমর চক্রবর্তী, বিধাত্রী দাম, পদ্মশ্রী মজুমদার, গোবিন্দ ধর, সুমিতা পালধর, সম্পা বণিক, সুপ্রিয়া দাস, উমা মজুমদার, সন্ধ্যা দেবনাথ, মাখনলাল দেবনাথ, সৌভিক পণ্ডিত, জয়ন্তকুমার ঘোষ, সুতপা কর, জয়া দত্ত, প্রদীপ্তা পাল সহ অনেকেই। এই আড্ডা কেন্দ্রিক কবিতা চর্চার পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ চর্চা হয়।

কুমারঘাটের রাতাছড়ায় সর্ব প্রথম সাহিত্য আড্ডা কেন্দ্রিক সাহিত্যপত্র 'স্রোতম্বিনী' প্রকাশ হয় ১৯৯৫ সালে। এই সময় স্রোতম্বিনী থেকে যাত্রা ও নাটক মঞ্চস্বও হয়েছে। আড্ডায় অংশ নিতেন রাজকুমার দত্ত, কাজল মালাকার, শিবুরঞ্জন দে. গোকুল ধর, গোবিন্দ ধর প্রমুখ।

কুমারঘাটের সাহিত্য চর্চায় ফটিকরায়ের 'গ্রন্থাগার অন্নেষা' উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এ ছাড়া বিবেকানন্দ সাহিত্যকেন্দ্র, উদ্দীপ্ত সংগ্রহশালা'সহ ভবতারিণী পাঠাগার স্মরণযোগ্য অবদান রেখেছে।

২০০৭ সালে 'কবিতাঘর', ২০০০ সালে 'কুসুম', ১৯৯৫ সালে 'স্রোত' প্রকাশ গোবিন্দ ধরের সম্পাদনায় কুমারঘাটে নব দিগন্তের সূচনা করেছে। 'স্রোত' সাহিত্যপত্রে ত্রিপুরা-আসাম-পশ্চিমবঙ্গের উল্লেখযোগ্য সকল কবি সাহিত্যিকদের লেখা ছাপা হয়েছে। 'স্রোত প্রকাশনা' এখন অব্দি প্রায় ১০০ (এক শত) শিরোনামের বই প্রকাশ করেছে। কবিতা সংকলনের পাশাপাশি আছে উপন্যাস, প্রবন্ধ, গল্প, লোককাহিনী, শব্দকোষ, 'অভিধান সহ বিবিধ গ্রন্থ।

রাতাছড়া থেকে সর্বপ্রথম কাব্য সংকলন 'মেঘ বৃষ্টি রোদ' প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে।। সম্পাদক গোবিন্দ ধর। উত্তর পূর্বাঞ্চলের চল্লিশ জনের কবিতা ছিল এই সংকলনে। ২০০৭ সালে গোবিন্দ ধর ও পদ্মশ্রী মজুমদার সম্পাদিত 'গোপন জ্যোছনা' কুমারঘাটের পাঁচ জন কবির কবিতা প্রকাশিত হয়। এ ছাড়াও উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে গোবিন্দ ধর সম্পাদিত 'পীযূষ রাউত: উজজ্জ্বল উদ্ধার' 'হিমাদ্রি দেব সমগ্র' স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত।

কুমারঘাটের প্রথম উপন্যাস 'কেউ সুখী নয়' লেখক মাণিক দাস। প্রকাশিত নাটক- 'রক্তে ঝরা নদীগাঁ' হীরেন্দ্র দাস রচিত। নাটক লেখেন অভিজিৎ চক্রবর্তী, কাজল মালাকার, নীলিমেশ পাল, শিবুরঞ্জন দে, গোবিন্দ ধর। গোপালকৃষ্ণ সেন এর কাব্য সংকলন 'স্বর্ণমাখা রোদ' এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী ননীগোপাল ঘোষ গোস্বামীর 'দেবভূমি শ্রীহট্ট ও স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনলিপি' ২০০৪ সালে প্রকাশিত। প্রকাশ স্থান- - নতুন বাজার, পূর্ব কাঞ্চনবাড়ি।

কবিতা চর্চায় নিরলস আছেন রবীন্দ্রকুমার সিনহা, নীলিমেশ পাল, ইপ্সিতা ঘোষ, পারমিতা ভট্টাচার্য, পিংকী বর্ধন, শেখর ভট্টাচার্য, গোকুল ধর প্রমুখ।

প্রবন্ধ চর্চায় স্বপনকুমার বৈষ্ণব, দীলিপ ঘোষ, তপন বণিক, নন্দন পাল, গোবিন্দ ধর, নীলিমেশ পাল প্রমুখ।

বিক্ষিপ্ত ভাবে আমরা যাদের লেখাপত্র পাই তাদের মধ্যে শর্মিষ্ঠা দত্ত, স্বরূপা দত্ত,আলাল উদ্দীন, শিবুরঞ্জন যে, সংকর বসুরায়, প্রদীপ মুখার্জী, একটি দেবনাথ, আব্দুল বারিক, অমর সিনহা, প্রওরীর শুরবৈদ্য প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

১৯৮৭ সালে ফাটকরামের 'গ্রন্থাগার অন্বেষা'' আয়োজিত তাৎক্ষণিক ছড়া লেখায় প্রারমেশ পাল অনেকগুলো ছড়া লেখেন। পরে তা থেকেই 'সুখবুণ' ছড়া সংকলন প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া এন কিং. বিজয়লক্ষ্মী সিংহের গল্প সংকলন প্রজাপতি জীবন' ভালো গল্প সংকলন।

কুমারঘাট সাহিত্যচর্চায় সাংস্কৃতিক অন্যান্য শাখার মতোই ক্রমশঃ তার উল্লেখযোগ্য জায়গা আদায় করে নিচ্ছে, তা আমরা জোরালো ভাবেই দাবি করতে পারি। সময়ের দাবি মেনেই কুমারঘাট ত্রিপুরার সাহিত্যচর্চার এক উর্বর ভূমি। 'স্রোত' এর টানে তাই ১লা সেপ্টেম্বর ২০১২, ছুটে আসেন কলকাতা থেকে কবি সুবোধ সরকার সহ একশো জনের মতো কবি সাহিত্যিক। এক মঞ্চ থেকে প্রকাশিত হয় ১৪ (চৌদ্দ) টি নতুন বই।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত হোন কবি অশোকানন্দ রায়বর্ষন, অলক দাসগুপ্ত, অপাংশু দেকনাথ, গোগেশ চক্রবর্তী, জয়গোবিন্দ দেবরায়, জ্যোতিময় রায়, নির্মল দত্ত, বিশ্বজিৎ দেব, স্নেহময় রায়চৌধুরী, পীযূষ রাউত, গল্পকার দেবব্রত দেব, নাটাকার বিদ্যুৎজিৎ চক্রবর্তী, শেখর দেবরায়, ইতিহাস বিদ অমলেন্দু ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠান সম্মান পান ককবরক সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ শ্যামলাল দেববর্মা, উপন্যাসিক শ্যামল ভট্টাচার্য, কবি মিলনকান্তি দত্ত, কবি গল্পকার শঙ্খশুভ্র দেববর্মন এবং কবি ও  আবৃত্তি শিল্পী বিধাত্রী দাম। উপস্থিত ছিলেন  আবৃত্তি  ও নাট্য শিল্পী রাখেয়া রায়। অনুষ্ঠানে ছিল নাট্য ও অক্ষন কর্মশালা। উপস্থিত হন প্রশিক্ষক হিসেলে গৌতম সিনহা, সুজন পাল ও সৌভিক পড়িত, উমা মজুমদার।

এ ছাড়া বিভিন্ন সময় কুমারঘাটে চাকুরী সূত্রে ছিলেন কবি প্রদীপবিকাশ রায়, বিনয় সিনহা মৃদুল বণিক, বনবিহারী বড়ুয়া, বিশ্বজিৎ দেব,সৈয়দ মোয়াজ্জম আলী প্রমুখ।

পেচারতলেও সাহিত্য চর্চা ছিল ১৯৭০ সাল থেকেই। কবি জনেশ চাকমা 'জোনাকি'তে কবিতা লিখে বিখ্যাত। বনবিহারী কড়ুয়াও বড়ুয়া ভাষায় কবিতা লেখেন। চাকমা ভাষায়ও কবিতা চর্চা হয়। 'দেও গাঙ' বলে একটা সাহিত্য পত্রিকা কুমারঘাটের চাকমা ভাষার দলিল।।

রাজধানীর বাইরে কুমারঘাটে ১৯৯৪ সালে প্রথম বইমেলা কুমারঘাটের সাহিত্য চর্চাকে বেগবান করে। বইমেলা স্মরণিকা 'সিদং' একটা সংখ্যা প্রকাশিত হলেও উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রিকা হবার সুপ্ত প্রবাহ ছিল তার বুকে বলা যায়। এ ছাড়াও ২০০৭ সালে সাপ্তাহিক সংবাদ পত্রিকা 'এই সময়' প্রকাশ হয়, সম্পাদক শুভ্রজ্যোতি মজুমদার। 'এই সময়' শারদ সংখ্যাও প্রকাশিত হয়। এই ভাবে কুমারঘাটের সাহিত্যচর্চা ধীরে ধীরে ত্রিপুরার বাইরেও তার প্রভাব ফেলেছে। আমাদের বিশ্বাস কুমারঘাট এক সময় দেও মনুর জলের মতো সামনের দিকেই প্রভাহিত হবে।কিন্তু দেখানো পথে কেউ কেউ এত আঁতেল চ্যাওম্যাও শুরু করে দিয়েছেন যেন সাহিত্যের ইতিহাস গড়ছেন উনারা এমন ভাব দেখাচ্ছেন।অথচ সাহিত্যের প্রবাহ নদীর স্রোতের মতো।একা কারো জমিদারি নয় সে কথা বেমালুম ভুলে বসে আছেন উনারা।

২২:০৩:২০২৪


কাছারিছড়া

কুমারঘাট থেকে ধর্মনগর যাওয়ার সময় আসাম আগরতলা জাতীয় রাস্তায় সিদং  ছড়া অঞ্চলে কাছাড়িছড়ার পাকাব্রীজ পাওয়া যায়। কুমারঘাট থেকে তাঁতিপাড়া হয়ে শিবথলী পেরিয়ে বি এস এন এল অফিস ডান দিকে রেখে কাছাড়িছড়া সহজে পৌঁছা যায়।কুকিটিলা থেকে কলকল প্রবাহিত ঝর্ণার মতো সুরু যে প্রবাহ তা হলো কাছাড়িছড়া।জনশ্রুতি অনুসারে এখানে কুকিরা বসবাস করতেন। তারা রাজমালার বর্ণনানুসারে ভয়ংকর জনজাতি। তাদেরকে ত্রিপুরার রাজারা সৈন্য বিভাগে নিয়োগ দিয়েছিলেন।সে অনেক কাহিনী।এখন কুকিরা হালাম বা হিড়ম্ব হিসেবে পরিচিত।মূলত দারচৈ এ ডি সি ভিলেজ থেকে কাছাড়িছড়ার উৎপত্তি স্থল।
এই অঞ্চলের গভীর বনভূমি তৃণ আচ্ছাদিত অন্ধকারময় গুহা ডিঙিয়ে ছড়াটি সিদং এর পাশ ঘেসে দেওনদে মিশে গেছে। 
ক্যান রোড হয়েও কাছাড়িছড়া যাওয়া যাবে। এখানে অলীক বিশ্বাসে কেউ কেউ ছড়াটি থেকে পাথরের নানা আকার সংগ্রহ করে কুকিটিলায় পুঁতে রেখে ভক্তিভরে পুজো অর্চনাও করেন।যদিও সে এক অন্য বিষয়। সে প্রসঙ্গে আলোচনা আজ নয়।
কুকিটিলা থেকে বৃষ্টি হলে জল লাফিয়ে লাফিয়ে নামে।সারাক্ষণ বনাঞ্চলে ঢাকা গভীর অন্ধকারময় বহু পথ অতিক্রম করার সময় জলের তোড়ে পাথরের নানা রূপ তৈরি হয়েছে সে আমিও নিজ চোখে পরখ করে বুঝেছি।কিন্তু ধর্ম বিশ্বাসীদের নিকট এই প্রাকৃতিক আকার বা রূপগুলোই ঈশ্বরের অলৌকিক শক্তি। কিন্তু প্রকৃতির রুদ্র রোষানলে পাথরগুলোর উপর দিয়ে দীর্ঘ সময় জল প্রবাহিত হয়ে একেকটি পাথরের নানান রূপে বদলকে ঈশ্বর বিশ্বাসীরা শিবজ্ঞানে পুজোর্চনা করেন।সে তো আছেই।
পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং এই ছড়াটি ট্যুরিস্টদের জন্য যাতায়াতের সুবিধা করে দিলে এখানেও গড়ে উঠতে পারে একটি পর্যটন কেন্দ্র। যা সরকারের আর্থিক তহবিলে শুল্কবৃদ্ধি ঘটবে।পাশাপাশি কাছাড়িছড়াকে কেন্দ্র করে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠা সম্ভব। কাছাড়িছড়া যাওয়ার সময় পাশেই মা ভবতারিণী মন্দির। এখানে শিবচতুর্দশীতে পাঁচদিন ব্যাপী মেলা ও উৎসব বসে।স্থানীয় ও ত্রিপুরার নানা প্রান্তের ধর্মপ্রাণ লোকজন আসেন। পসরা সেজে তুলেন ব্যবসাহিরা।একটু অদূরবর্তী অঞ্চলে শিবথলী।বৌদ্ধ মঠ।সব মিলে অঞ্চলটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। 
এখানে চাকমা, তাঁতি, হালাম, গোয়ালা,হিন্দু, খ্রিস্টান মিলে মিশে বসবাস করেন। 
সব দিক দিয়ে কাছাড়িছড়া বাঁশবাগান শিবথলীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে সুপরিকল্পিত ইকোপার্ক। 

২২:০৩:২০২৪

পং ছড়া

তখনও বিকেল নামেনি।কুমারঘাট ব্লক থেকে তিন চার কি মি দূরত্বে একটি প্রত্যন্ত জন জাতি গ্রাম।পং ছড়া দুই টিলার মধ্যে গড়ে ওঠা লুঙগায় এক শিক্ষা স্বাস্থ্যে সমানতালে বেড়ে উঠা পাহাড়ী এলাকা।দেও উপত্যকার সিদং ছড়া থেকে খুব কাছেই এই পং ছড়া।জন জাতির জীবিকা শূকর পালন।কলা আর টেঁকিশাক বাঁশ কড়ুল।আর নিশ্চয়ই চুলাই।সব মিলে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে এই গ্রামে রাত নামে। রাত আটটার মধ্যে রাতের খাওয়া শেষ করেন সবাই।
দক্ষিণ ঊনকোটি এ ডি সী ভিলেজের অন্তর্গত এই গ্রাম শান্ত নীরব।সকলের চোখেই জিজ্ঞাসা আমরা হঠাৎ কেন।আমরা আশ্বস্ত করে বলি নিতান্ত অবসর বিনোদন।গ্রামীণ সুন্দর্য উপভোগ করাতেই আমাদের আগমন।
স্থানীয় উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিচালিত পুতুল নাচ ছিলো বিকেলে।তা আগে থেকে আমরা জানতাম না।চলো স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যাই ছিলো পুতুল নাচের বিষয়।জন চেতনা মুখ্য বিষয়।ভালো লাগলো প্রায় ছোটবেলায় চলে যাই। চল্লিশ বছর আগে রাতাছড়ায় চব্বিশ পয়সার বিনিময়ে পুতুল নাচ দেখে যে আনন্দ পেয়েছিলাম আজও আবার সেরকমই লাগলো।স্মৃতিগুলো পরপর আসছিলো।নির্মল আনন্দ লাভ ঘটলো।পং ছড়ার ঝুলন্ত লোহার ব্রীজ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো হাওড়া ব্রীজ ওভার কাম করছি।সন্ধ্যার মায়াবী আলো মুখে এসে পড়ছে সবারই।কাছের পরিচিতজনও যেন খুব অপরিচিত সুন্দর দেখাচ্ছে।
প্রসঙ্গত বলি দিল্লি বইমেলায় গিয়ে অসুস্থ ছিলাম বেশ কদিন।মনটা কুঁকড়ে আছে।আর্সেনিন ইনফেকশন হয়ে আমি প্রায় মরে মরে এখনো জীবিত।অভীক ছিলো দিল্লি মেলায় আমার সহযাত্রী। ও না থাকলে শেষমেশ বডি দিল্লিতেই রাখতে হতো।অভীকের পাশাপাশি সৈয়দ হাসমত জালালদা,চৈতালী দাস মহোদয়া অঞ্জলিদি রীতা বিশ্বাস সবাই বারবার খবর নেওয়ায় মনে সাহস নিয়ে বাড়ি এলাম।
শান্ত পংছড়ার ঝুলন্ত ব্রীজ পেরিয়েই প্রাথমিক স্কুল।একটু দূরেই গাছের সাঁকো।বহুদিন পর পায়ে হেঁটে পার হলাম।পদ্মশ্রী তো পংছড়ার জল পেরিয়ে আসতে আতঙ্কিত।বারবার সাহস দিয়ে পাহাড়ী রমণীর সহযোগিতায় পেরিয়েছে।তারপরেও পদ্মশ্রীরর বুক ধড়পড় করছে।সাঁকো পেরিয়ে পেলাম ডাংগুলি খেলছে আদিবাসী শিশু কিশোররা।মনটা নেচে উঠলো।কতদিন খেলি না ডাংগুলি।
মাঝে মাঝে গরু গুলো নিয়ে ঘরে যাচ্ছেন কেউ কেউ। রাস্তাজুড়ে কুকুরের দাপট।কুকুরের ঘেউ ঘেউ পদ্মশ্রীকে দেখলাম আনন্দিত।প্রণবদার এটা ওটা বলে দিয়ে গাইডের ভূৃমিকা অভিভাবকের মতো লাগলো।
মধুমিতাদির নির্মল হাসি বেশ চনমনে লাগলো।এক সময় মধুমিতাদি পদ্মশ্রী টংঘর দোখতে একটু দূরে চলে গেলো।সাথে তখন ভাগ্নি তানিয়া ছিলো।একটানা জীবন থেকে বেরিয়ে মিশে গেলাম অদূরেই প্রকৃতির কোলে চাকমা জনজাতি বেষ্টিত পংছড়ার লতাপাতায় ঘেরা গ্রাম দক্ষিণ ঊনকোটি। 
মনের বিষাক্ত ভাব দূর করে আজ একটু রোদ এলো।সন্ধ্যায় পংছড়ার টিলায় কাস্তে চাঁদ উঁকি দিতেই মনে হলো অপূর্ব।
ঠিক তখন গোধূলীর আলোয় মাদূর বিছিয়ে আমরা সবাই সাথের টিপিন নিয়ে বসি।মধুমিতাদি পদ্মশ্রী পুকুলি গৈরিকা প্রণবদা স্বপন আমি সবাই এক রাউন্ডে বসলাম।বাসায় রান্না করা বয়লার আর পুরি মিষ্টি বাসার জল সবই সাথে করে নিয়ে যাওয়ায় শক্ত টিপিন হলো।টুনি নিঁখুত পরিবেশন করে ও নিজেও খেলো।
রাত তখন বেড়ে যাচ্ছে।অন্ধকারে ঝিঁঝি ডাক ব্যস্ত শহর থেকে একটু দূরেই।মজাটাই আলাদা।পুরো ট্রিপের আজকের ক্যাপ্টিন প্রণবদা।প্রণবদার প্রকৃতি প্রেম আমাদের কাছে তেমন জানা ছিলো না।আজ আবিষ্কার করতে পেরে মধুমিতাদিও নায়কীর মতো হাসলেন।
টুনির যত্নআত্তি মুগ্ধ করার মতো।
পংছড়ার উৎস পংছড়াতেই।আর মোহনা দেও নদীর সিদং এলাকায়।পংছড়া অববাহিকা আসলে ঊনকোটির ঢালু উতঙ্গ অঞ্চল।দুদিকে খাড়া টিলা।মাঝ বরাবর দুই কিমি জায়গা নিয়ে বেড়ে উঠা এক পাহাড়ী জনপদ।মানুষগুলোর সরলতা মুগ্ধ করার মতো।সদ্য নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি জনিত কোন সমস্যা নেই।এখনো ভোট চলা কালীন গড়ে ওঠা বোথ অফিশ আছে।পতাকা বসন্ত বাতাসে উড়ো উড়ো।নেই কোন হিংসে।ওদের সরলতার কাছে মানবিকতার কাছে পাঠ নিয়ে যখন ঘরে আসবো তখন রাত সাতটা তিরিশ।তারপর আবার টুনী চা না খাইয়ে ছাড়বে না।অগত্যা কী আর করা চা পানের বিরতি আর আড্ডায় আরো একটু সময় চলে গেলো।
এই সময় জানলাম আমার আত্মজ গৌরব আর্ট কলেজের ফাস্ট সেমিস্টার প্রথম  বিভাগে উত্তীর্ণ। মনটা আরো আনন্দে নেচে উঠলো।মনে হলো সার্থক একটি বিকেলে গর্বিত এক পিতা আমি।

২০:০৩:২০১৮
রাত:০৮:৩৫মি
কুমারঘাট।


কুকিছড়া

নটিংছড়া