রাতাছড়া  :ছড়ার নামে রাতাছড়া গ্রাম পঞ্চায়েত 

গোবিন্দ ধর 

হারিয়ে যাচ্ছে ছড়াজল ঝর্ণা নদী খাল বিল গাঙ কাটাখাল।
হাওর আজ জল শূন্য। 
এই আমরা কোথায় জলচর ছিলাম আজ স্থলচর।
কিন্তু জল আমাদের জীবনের গান।জলই জীবন।জলের বিকল্প জল।
অথচ জল কোথায়?
আগামী বিশ্ব নিশ্চিত জলের জন্য যুদ্ধে নামবে খাদ্যের অভাবে মরবে না।জলের অভাবে মরবে।তখন আমরা সজাগ হলে হবে না।
সুতরাং ছড়া জলের ইতিহাস খোদাই হোক।

আমার ছোটবেলা জল থইথই কাটাতাম দুটো ছড়ায়।আর একটি নদীতে। অসংখ্য ডোবা পুকুর আর এঁদো ডুবায় আমাদের গ্রামের বাড়ি ভরপুর ছিলো।

আমার ছোটবেলার স্কুল রাতাছড়া উচ্চ বুনিয়াদি বিদ্যালয়।পরবর্তী সময় রাতাছড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়।আজ নাম পরিবর্তন হয়ে হাজিবাড়ি দ্বাদশ শ্রেণি বিদ্যালয়।
এই হাজাবাড়ি দ্বাদশ শ্রেণি বিদ্যালয়ের পাশ ঘেষে রাতাছড়া কলকল প্রবাহিত।
আমরা স্কুলে গ্রীষ্মের দুপুরে খাতাবইপত্র তার পাড়ে রেখে সেকি ঝুপুরঝুপুর করতাম।মনে পড়লে আনন্দ প্লাবন বয় মনের ভেতর।
রাতাছড়া রাজমালার বর্ণনানুসারে রাঝধর ছড়া নামেই পরিচিতি পেয়েছিলো রাজ আমলে।কথিত আছে রাঝধর মাণিক্যের রাজ অভিষেক হয় রাতাছড়া যেখানে মনুনদীতে মিশেছে। অর্থসৎ রাঝধর ছড়ার মোহনায় অমর মাণিক্য রাঝধরের রাজ অভিষেক শেষে আফিম সেবনে আত্মহত্যা করেছিলেন। 
কালক্রমে রাঝধর ছড়া--> রাজধর ছড়া-->রাতাছড়া নামে অভিহিত হয়।
রাজমালার আরেক রকম ব্যাখ্যা অনুসারে রাতাছড়ার উৎস স্থলে প্রচুর রাতা বন মোরগ ছিলো।ককবরকে রাতা মানে পুরুষ মোরগ।রাতা মোরগ থেকে কালক্রমে রাতাছড়া নাম হয় ছড়াটির।
দুদিকের বিস্তৃত টিলাভূমি জুড়ে তখন জুমচাষ হতো।বর্ষার সময় জুমের লাউ কুমড়ো ভুঁইকুমড়ো বৃষ্টি হলেই লাফিয়ে লাফিয়ে জল নামার তরঙ্গে ভেসে আসতো জলের তোড়ে।
জল পলাতক আমরা বিদ্যার্থীরা ভয়ডরহীন সেই রাক্ষুসে ড্রাগনজলকে উপেক্ষা করে লাফিয়ে পড়তাম সেই জলের তোড়ে।কত দূর দূরান্তে ভেসে যেতাম জলের স্রোতে। তথাপি ছেলেবেলায় কার আর ভয় থাকে।ভাসিয়ে গেলেও তখনো ভয় এসে ঘাঢ় ধরেনে আমাদেরকে। 
খাবলে ধরতাম লাউ কুমড়ো।এমনি করে তখন সারা বছরের জ্বালানীর কাঠ সংগ্রহ করতেও বর্ষার খরস্রোতা রাতাছড়ায় জল নামার অপেক্ষায় থাকতেন দুপাড়ের সমতলবাসীরা।পাশাপাশি প্রান্তিক চাষীরা এমন কি বর্গা চাষীরাও রাতাছড়ার জল দিয়ে দুপাড়ে সবজি খেত করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
রাতাছড়ার বালুচরে একটু দোয়াশ মাটি বন্যার পর খেতে পড়তো।তাতে লাফিয়ে বাড়তো লাউ তগা।মিস্টি আলু।আলু।মূলো।শর্ষে ধনেপাতা,লাইপাতা,শশা আরো কত কি।ফুলকপি,বাঁধাকপি,ওল থেকে শুরু করে আরো হরেক রকম সবজির সবুজ খেতে রাতাছড়ার দুপাড় সেজে উঠতো।মনোরম সে দৃশ্য। 

লংতরাই রিজার্ভ ফরেস্ট একপাশে রেখে অজস্র ছড়া নালা খাল বিল কলকল প্রবাহিত হয়ে ঝমঝমিয়ে মিশে গেছে মনুর বুকে।শাখানটাঙ থেকে দেও মনু একপাশে মনুর উৎপত্তি অন্য পাশে দেও।দেও নদ।দেও এর উপনদী নেই। মনুর অসংখ্য উপনদী নাতিন,পুতিন আরো কত কি কলকল প্রবাহিত হয়ে মনুতেই মিশে গেছে। নদী মানে ককবরকে তৈসা।আর ছড়া মানে তুইমা--->তৈমা।আবার ছড়াকে কেউ কেউ ককবরকে তৈসাও বলেন।তাহলে রাতাতৈসা নয় কেন রাতাছড়া?আসলে সমতলে রাতাছড়ার দুপাড়ে বসবাস করেন বাঙালি। আর উৎসে জনজাতি ত্রিপুরী জনগণের বসবাস। সুতরাং সমতলে এসে রাতাছড়া হয়ে কলকল প্রবাহিত হয়ে ঝমঝমে অস্তিত্ব জানান দিয়েছে মনুতে মিশে।
রাজমালায় কথিত আছে এক সময় অমর মাণিক্যের রাজপাট ছিলো রাতাছড়ার উৎস স্থলের অদূরে। তারই নিদর্শন স্বরূপ পাওয়া গিয়েছে ত্রিপদী।
আমার ছোটবেলার বেড়ে ওঠার কঠিন সময়ে রাতাছড়া আমাকে মাতৃস্নেহের সুধায় আগলে রেখেছে বুকে।পিতৃস্নেহে দিয়েছে নিরাপত্তা। এই রাতাছড়া গ্রামের সাথে আমার অজস্র স্মৃতি জড়ানো।রাতাছড়ায় আমার কবিতা লেখায় হাতেখড়ি।সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। যাত্রা নাটকে হাতেখড়ি। নাটক লেখায় হাতেখড়ি।লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক হিসেবে ত্রিপুরায় পরিচয় করিয়েছে রাতাছড়া।পাশাপাশি এখান থেকেই লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনী ও মেলা করার হাতেখড়ি। হাতেখড়ি হয়েছে সীল স্ক্রীণের কাজ ও গ্রাফিপ্রিন্টের জন্মের ইতিহাসের সাথে ।অভিনয় শিল্পী হিসেবে আমি সামান্যও ফিট নয় কিন্তু এই আমাকেও নাটক লিখতে বাধ্য করেছিলো ফটিকরায় উপ নির্বাচন।আমিও অভিনয় করতে হয় সেই নাটকে।নাটকটির নাম প্রতিদিনের প্রতিবাদ। 
উদ্দীপ্ত সংগ্রহশালা গঠন ও পরবর্তী সময় উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন পুঁথি-পত্র সংগ্রহশালা ও গবেষণা কেন্দ্রে উত্তরণও এই রাতাছড়ায়।
আনন্দ সংবাদ ও আমার গর্বের আতুড়ঘর স্রোত প্রকাশনাও রাতাছড়া থেকে আত্মপ্রকাশ ঘটে।এখানেই ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় লিটল ম্যাগাজিন ও গ্রন্থ উৎসব। এই উৎসব পর পর তিনদিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। 
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো স্রোতের। রাতাছড়ায় প্রতিটি পরিবারের সাথে যাত্রা নাটকের নাড়ির সম্পর্ক। প্রতি পরিবারেই একজন না একজন নাট্যশিল্পী আছেন।আসতো কলকাতা থেকে যাত্রাদল।

রাতাছড়াকে নিয়ে অনেকগুলো কবিতা আছে। আমি পরপর এগুলো এখানে রাখলাম। 

রাতাছড়া সমগ্র :এক

মাটিতেই আঁকতাম ঘাতক,বন্ধুক
বৈরী বাতাস এলে 
মাকে জড়িয়ে বলতাম আমি একাত্তরের যুদ্ধশিশু।
কখনই প্রকৃত বন্ধুক না ছুঁয়েই আমিও স্বাধীন। 

এ দেশ আমি ও আমার বন্ধু আব্দুল আলিম মতিন
আর মসজিদের যুবক বদরুল হোসেন, তারও।

যদিও বাহান্নের ভাষা আন্দোলনে ঠাকুরদা
রাতাছড়ায় প্রান্তিককৃষক,বাবা সবে নবমশ্রেণি।

২৪:০১:২০২০
সময়:৫:৫০মি
কুমারঘাট।

রাতাছড়া সমগ্র :দুই 

কৃষিবিদ ঠাকুরদা শিক্ষক ছিলেন 
ঠাকুমা সরোজিনী সামান্য সামাজিক 
বাবা লেব্রেটরী এসিটেন্ড আর
মা যৌথ পরিবারে জোড়াতালি দিতে দিতে
নিজেই নিজেকে রক্তাক্ত করে 
১০০% সফল গৃহিণী চিরকাল। 

২৬:০১:২০২০
সকাল:০৭:০০টা
কুমারঘাট।

২১:০৩:২০২৪