রাতাছড়ায় সাংস্কৃতিক চর্চা
গোবিন্দ ধর 

বর্তমান ঊনকোটি জেলার কুমারঘাট ব্লকের অন্তর্গত উনত্রিশটি গ্রামের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ও প্রান্তিক গ্রাম রাতাছড়া। গ্রামের ঐতিহ্য অতি প্রাচীন। সেই সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বর্তমান রাতাছড়ার সাংস্কৃতিক গতিপ্রকৃতি। আধুনিকতায় পা দিয়েছে এই গ্রামের সাংস্কৃতিক জগৎ। রাতাছড়ার সাংস্কৃতিক বিকাশ নতুন না হলেও রাতাছড়ার ইতিবৃত্ত মোটামুটি ষাটের দশক থেকে পাওয়া যায়। ষাটের দশকের অনেক পূর্ব থেকেই এই গ্রামের সংস্কৃতির উজ্জ্বল অধ্যায় ছিল। কিন্তু তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

কিন্তু ইতিহাস টানার আগে স্থানটির নামকরণের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিলে গ্রামটি যে প্রাচীন তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। অমরমাণিক্যের আমলে (১৫৭৭-১৫৮৬ খ্রীষ্টান্স) ত্রিপুরার রাজধানী ছিল কৈলাসহর মহকুমার রাতাছড়ায়। এ থেকে ধারণা করা যায় ১৯৭৭ খ্রীষ্টাব্দ থেকে রাতাছড়ায় লোক বসবাস করতেন। রাজমালা অনেকেই রচানা করেছেন। রাজমালার রচনাকার বিভিন্ন জন থাকায় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে রাতাছড়ার উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকেই রাতাছড়ার কথা বলেছেন তাদের রচনায়। ভূপেন্দ্র চক্রবর্তীর রাজমালা থেকে পাওয়া যায় উত্তর ত্রিপুরার মনুনদীর তীরবর্তী তেতৈয়া নামক স্থানে মহারাজা অমরমানিক্য বিষপানে আত্মহত্যা করলে, জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজধরের রাজ্যাভিষেক হয়। এবং 'রাজধরছড়া' পরবর্তীকালে সময়ের পরিবর্তনে বর্তমান 'রাতাছড়া' হয়।

'যেই স্থানে রাজবর হইল নরপতি
সেই ছড়া নামবর রাজধর খ্যাতি।'

 -দুর্গামনি উজিরের রাজমালায় এইভাবে বলা হয়েছে। মহারাজ একদিন রাণীর সঙ্গে পরামর্শ করে মনুনদীতে বাঁশের ভেলা সাজিয়ে রাজধরের অভিষেকক্রিয়া সম্পন্ন করেন।যে স্থানে রাজধরের রাজঅভিষেক হয় সে স্থানের নাম হয় 'রাজধর ছড়া'। কালের ধারায় রাতাছড়া নামই বর্তমানকালে কুমারঘাট মহকুমার কুমারঘাট ব্লকের পশ্চিম প্রান্তে বয়ে চলা মনুনদী বিধৌত বর্ধিষ্ণু গ্রাম রাতাছড়া। গ্রামটি নিঃসন্দেহে অতি প্রাচীন।

রাজআমল থেকে এই গ্রামের সাংস্কৃতিক চর্চার বিকাশ ঘটলেও কালের স্রোতে আজ অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। নেই রাজধরের রাজপ্রাসাদ। নেই প্রাচীন কোনও ভাঙা ঘরবাড়ি। তবুও ষাটের দশক থেকে রাতাছড়ার সাংস্কৃতিক চর্চার ইতিহাস পাওয়া যায়।এখনো মাটি খুঁড়লেই রাতাছড়ায় পাওয়া যায় মাটির তৈরী বাসন পত্র। রাতাছড়ার টিলায় একটি তামার  বড় সেপ্টিপিন পেয়েছিলাম আমি।বহুদিন সাথে রেখেছি।কিন্তু তার ঐতিহাসিক মূল্য তখন অনুভব হয়নি।একদিন হারিয়ে গেছে সেপ্টিপিনটি।এ থেকেও বোঝা যায় এক সময় রাতাছড়ায় অমর মানিক্যের রাজধানী ছিলো রাতাছড়া। 
ষাটের দশকে রাতাছড়ার প্রথম যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হয় 'কোহিনুর'। এই পালার অভিনেতারা টেকই দাস, নীলমণি কর, লতিকা দাস, তরণীমোহন সিংহ প্রমুখ।

ষাটের দশকে রাতাছড়ার সাংস্কৃতিক চর্চা বন্যার মতো শুরু হয়। পার্শ্ববর্তী অন্যান্য গ্রামের চেয়ে এগিয়ে যায় রাতাছড়া। এই সময়ে মঞ্চস্থ যাত্রাপালাগুলির নাম উদ্ধার করা সম্ভব না হলেও অভিনেতাদের মধ্যে যারা ছিলেন, তাঁরা হলেন হরিদাস দে, গোপীচরণ মালাকার, যতীন্দ্রমোহন দেব (মন্টুবাবু), বৈষ্ণবদাস দে, প্রমোদ দেব, অধর দেবনাথ, নীলমণি কর, তরণীমোহন সিংহ, মনোরঞ্জন দে (বাবু) প্রমুখেরা। এ ছাড়াও কৃপেশ মালাকার, কোকিল দে, দক্ষিণারঞ্জন ধর। অভিনয়ের জন্য দক্ষিণারঞ্জন ধর 'আলেয়ার আলো' বইখানি প্রথম পুরস্কার পান। তাদের প্রত্যেকের অক্লান্ত শ্রমের মাধ্যমে রাতাছড়া নাট্য-আন্দোলনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে। সাংস্কৃতিক চর্চায় কলকাতার জোয়ার এল। কলকাতার শ্রীদুর্গা অপেরার এক স্বনামধন্য অভিনেতার আগমনে রাতাছড়ার যাত্রাপালার ভাবধারাতে পরিবর্তনের বন্যা এল। তিনি নিতাই ভেলোয়ার।সেদিনকার অন্যান্য অভিনেতারা হলেন  সুবল দেব, কমলাকান্ত সিংহ, প্রতাপ দেবনাথ, নিখিল রঞ্জন দে , নৌশা মিঞা, রাকেশচন্দ্র ধর, যোগল দেব, ফটিকরঞ্জন দে প্রমুখ। একমাত্র অভিনেত্রী বীণা পালের নাম স্মরণযোগ্য। এই সময় অভিনীত হয় 'রক্তমাখা অন্ন', 'ফেরিওয়ালা' সামাজিক পালাগুলি। ঐতিহাসিক পালার মধ্যে 'শ্মশানের কান্না', 'মুর্শিদকুলি খাঁ' উল্লেখ করার মতো।
আশির দশকের রাতাছড়ায় ভোলানাথ অপেরা প্রতিষ্ঠা হয়। তাদের নিজস্ব ধারায় ভাসিয়ে দিল যাত্রামোদী মানুষের মনের মাটিকে। ভোলানাথের যাত্রা মঞ্চায়ন হতো মনুনদীর ভাঙনে নিশ্চিহ্ন রাতাছড়া বাজারে। বাজারটি আমতলী বাজার হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। এ সময় যারা অভিনয় করেছেন তাদের মধ্যে বকুল দে, সুজিত দেব, কুঞ্জেশ্বর সিংহ, যজ্ঞেশ্বর সিংহ, প্রানেশ দে, অখিল দত্ত, রাজকুমার মালাকার, নিতাইচাঁদ দে, অরুণ শীল, অঞ্জন শীল, বাবুল মজুমদার প্রমুখ। মঞ্চস্থ যাত্রাপালা হল 'রোশনিমহল।'জীবন্ত শয়তান'।

নব্বইয়ের দশকে রাতাছড়া চৌমুহনী বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে রাতাছড়ায় প্রথম কোনো সাংস্কৃতিক সংস্থা। সংস্থার নাম 'স্রোতস্বিনী'। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে এই লেখক অক্লান্ত শ্রমের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন গড়ে তোলেন রাতাছড়ায়। কিছুদিন 'মহামায়া নাট্যসংস্থা' নাট্য আন্দোলনের শরিক হয়ে কাজ করেছিলো।তখন গোবিন্দ ধর রচিত 'প্রতিদিনের প্রতিবাদ' সভ্যতার কথিত কাহিনী মঞ্চস্থ হয়। মঞ্চস্থ হয় কাজলকান্তি মালাকারের 'জেগে ওঠো ঘুমন্ত সমাজ' এবং 'শতাব্দীর শেষ প্রশ্ন'। এই সময় অভিনয় জগতে এলেন প্রতীকচন্দ্র সেন, নির্মলেন্দু দে, তপন মজুমদার, শিবুরঞ্জন দে, গোবিন্দ ধর সহ আরও অনেকেই।

স্রোতস্বিনী সাংস্কৃতিক সংস্থা সাংস্কৃতিক জোয়ার নিয়ে এল রাতাছড়ায়। স্রোতস্বিনী শুধু নাটক যাত্রাপালা নিয়ে কাজ করেনি। করেছে সংস্কৃতির অন্যান্য ধারায়ও। সাহিত্য সঙ্গীত সহ সংস্কৃতির সমস্ত ধারাতেই সংস্থার অবাধ বিচরণ আজও রাতাছড়াকে প্রাণবন্ত করে রেখেছে।স্রোতস্বিনী তিনদিন ব্যাপী লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনী ও মেলারও আয়োজন করতো।

গোবিন্দ ধর রচিত নাটক 'প্রায়শ্চিত্ত'-একাঙ্ক নাটক দিয়ে শুরু। তারপর একে একে 'দুই বিঘা জমি', 'পরের দৃশ্য শ্মশান'-শিবুরঞ্জন দে'র একাঙ্ক নাটক, 'আসামী হাজির' ইত্যাদি যাত্রা-নাটকগুলি স্রোতম্বিনী মঞ্চায়ন করেছে। এই সময়ে অভিনয়ে আসেন কাজলকান্তি মালাকার, শিবুরঞ্জন দে, সুধাংশু সরকার, গোবিন্দ ধর, ভানুলাল দত্ত, আব্দুল হক, আজিজুর রহমান, রাজকুমার দত্ত প্রমুখ।

রাতাছড়ার সাংস্কৃতিক চর্চা সমৃদ্ধ করতে 'উপহার উপদেশ' এবং 'ইমাম সাহেব ও স্কুলের মিঞা সাহেব' প্রকাশ করেন মুজাফ্ফর আলী চৌধুরী। এর রেশ ধরেই নতুন উন্মাদনায় এই নিবন্ধকারের প্রথম বই 'ভালোবাসার মনে' প্রকাশিত হয়। বইটির আলোচনাও হয়। আলোচনা করেন ডা: মোয়াজ্জেম আলী, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান রেজিস্ট্রার অধ্যাপক সুব্রত দেব। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় রাতাছড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন সুব্রত দেব। তাঁর রচিত 'টরেটক্কা', 'বকম বকম', 'ঝালমিষ্টি' সহ আরও অনেক বই রাতাছড়ার অহংকার।যদিও গোবিন্দ ধর 'ভালোবাসার মনে'বইটি বাজেয়াপ্ত করে দেন।কিন্তু অরুণোদয় সাহা মহাশয়ও বইটির আলোচনা করেন।
১৯৯৫ সালে নিবন্ধকারের পিতার জমানো বইপত্র দিয়ে শুরু হয় উদ্দীপ্ত সংগ্রহশালার যাত্রা। সম্পূর্ণ বেসরকারী উদ্যোগে বর্তমানে এই সংগ্রহশালায় প্রায় ২৫-৩০ হাজার বইপত্র সংগ্রহে আছে।যদিও উদ্দীপ্ত সংগ্রহশালার নাম পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে'উত্তর পূর্বাঞ্চলের লিটল ম্যাগাজিন পুঁথি পত্র সংরক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র 'নাম করণ করা হয়।

এছাড়াও এখান থেকে প্রকাশিত হয় স্রোত পত্রিকা যা বাংলা সাহিত্যের অহংকার। অনেক লেখকেরা এই পত্রিকায় লেখেন। তারপর স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয় 'মেঘ বৃষ্টি রোদ'-চল্লিশজন তরুণ প্রবীণদের কবিতার বই।

রাতাছড়া এক উর্বর সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকাণ্ডের নাম। এখানে তাই এখনও মহিলারা ধামাইল নৃত্য,মনসামঙ্গল করেন।  বাউলগীতের সুরে  রাতের ঘুম শেষে চাষে যায় কৃষক।  কীর্তনীয়ার  সঙ্গীত মূর্ছনায় পূজা প্যান্ডেল মুখরিত হয়।

রাতাছড়ার একমাত্র  লোকগীতিশিল্পী বীণা পাল কৈলাসহর বেতারে সঙ্গীত পরিবেশন করেন।এখানো আকাশবাণীর বিভিন্ন প্রোগ্রামে, যেমন-সাহিত্য আড্ডা, যুববাণী ইত্যাদিতে অংশ  নেন এই নিবন্ধকারও।  রাতাছড়ার সাংস্কৃতিক জগৎ ত্রিপুরার অন্যান্য গ্রামের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে আছে।