১৭.০৭.২০২৪

…‘…তোমার কাছে এসে/সমস্ত সাঁতার ভুলে যাই… …’|| সেলিম মোস্তফা 

 সম্প্রতি কবি গোবিন্দ ধরের চারটি কাব্যগ্রন্থ হাতে এল । ‘দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি, একা’,(জানুয়ারি ২০১১) ‘শ্রীচরণেষু বাবা’ (ফেব্রুয়ারি ২০১৪) ‘আনোয়ারা নামের মেয়েটি’ (সেপ্টেম্বর ২০১৮), আর ‘দেও নদী সমগ্র’(সেপ্টেম্বর ২০১৮) । 

প্রথমটি ৯৬ পৃষ্ঠার গ্রন্থ, এতে কবিতা আছে একাত্তরটি । কবি কবে থেকে লিখছেন, জন্ম কবে, এসব তথ্য হয়ত এই গ্রন্থগুলোতে সম্ভবত নেই, আমি পাইনি ।  কবির বয়স আর লেখার বয়স পাঠকের মনে একটা পরিবেশ তৈরি করে ।

‘দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি, একা’ খুব সুন্দর গ্রন্থ নাম, আর রচনাগুলোও এই চেতনাকেই মেরুদণ্ড করে  গ্রন্থটি সাজানো হয়েছে ভেতরে আরও ৭টি ভাগ আছে ।

গ্রন্থে কবিতাকে  জবরদস্তি করে এমনভাবে সাজানোর পক্ষপাতি ব্যক্তিগতভাবে আমি নই । জীবনে কবিতা যেমন এসেছে গ্রন্থেও তেমনই কালানুক্রমিক থেকে গেলেই তা স্বাভাবিক থাকে । এর পরও ৭টি ভাগ কেন কবি ?  কবিতা তো শুধু একটা ইফেক্ট দেয়, কবির পরিচয় করিয়ে দেয় পাঠকের সঙ্গে, আর কিছুই না । তাই বয়সে বয়সে, পাঠে পাঠে, পাঠকে পাঠকে তা পাল্টে পাল্টে যায় ।

অনেকটাই অন্যরকম এই কবির কাব্য । সময়ের সঙ্গে একটা প্রতিভূমিকা রয়েছে এই কবির প্রায় সকল রচনাতেই । স্বাভাবিকতাই এর প্রধান কাব্যগুণ । 

‘এতদিন পথকে
মুক্তির পথ ভেবে
হোঁচট আর খাবি খেতে খেতে
পায়ের নখ সব উল্টে গেছে ।… …’
 (পর্যবেক্ষণ/দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি, একা)

এই সরল বিবৃতিই তার কাব্যচেতনার প্রধান অঙ্কুর । অনুরূপ অভিব্যক্তি আরও পাই—

‘ভুল পথে হাঁটতে হাঁটতে
পা বাড়ালেই ভুল হয়
পা ভুল না পথ ভুল
এই চক্রে ঘুরপাক খায় 
একটি লাটিম ।’  
 (দর্শন)
 লাটিম এক জায়গায় ঘুরলেও একটা জাগ্রত চেতনার প্রতীক । যা থেমে গেলে তাকে আমরা আর লাটিম বলতে পারি না । ‘লাটিম’ শব্দটি একাধারে কবির প্রতীক এবং রূপকও বটে, যা এই প্রথম পাওয়া গেল তার কাব্যের অলংকার হিসেবে । তবে এটাও বলা যায় এই দুটি উদ্ধৃতি কোনো ভিন্ন বার্তা বহন করে না পাঠকের কাছে । সেই অর্থে পুনরাবৃত্তিও বটে, যা সহজেই পাঠকের নজরে এসে যায় । বিষয়ভিত্তিক কবিতার গ্রন্থ হিসেবে এটাই আকর্ষণহীনতারও একটা কারণ হয়ে যায় । আমাদের দৈনন্দিন তৎপরতা কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই এর চেয়ে বেশি নাটকীয় এবং একঘেঁয়েমি  মুক্ত ।

একজন কবি তো জন্মসূত্রেই দ্রোহী হয়ে থাকেন, এর জন্য তাকে কোনো পতাকা ওড়াতে হয় না । কবিতায়ও কবির আচরণই ব্যক্ত হয়ে থাকে, তাকে বাড়তি শব্দ দিয়ে মেনিফেস্টো সাজাতে হয় না । বরং অভিব্যক্তির কত কাছে যাওয়া যায় তার জন্য অভ্রান্ত শব্দটি খুঁজে মরতে হয় ! আমার ভাবনায় কবিতা এমনই । যা লেখা হয়, তাকে আগে নিজে বিশ্বাস করতে হয় । বিশ্বাস অর্জন, অন্তত কবির ক্ষেত্রে, তাই একটা বিশাল ব্যাপার ।
কবি গোবিন্দ ধর নিশ্চিতই সেই বিশ্বাস অর্জন করতে চলেছেন বলেই এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে আমার । তার কনফেশন এরকম—

‘…বারবার বদলে ফেলি পরিচিতি
যে পথে বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ ছাড়াই 
নিজস্ব মুদ্রায় আঁকাবাঁকা হাঁটতে পারি…’
 (নিজস্ব পথ)
জীবন থেকে আবিষ্কৃত সত্য বা আপাত সত্য বা মিথ্যা বা নানাবিধ ভ্রমই আমাদের প্ররোচিত করে কিছু নির্মাণের মাধ্যমে তাকে প্রকাশ করা, যা মুখে মুখে বন্ধুকে বললে কোনো তাৎপর্যই ব্যঞ্জনা পায় না ।  আবার এমনও হয়, যা বলতে চাই তা কখনোই বলতে পারি না, তার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করি কিছু শব্দের চিহ্নায়নে । আঁচড় কাটার মতো ।
জলে থেকেও পিপাসার্থ রাজার মিথ-কাহিনি আমরা জানি । এই কবিও নিজেকে এমনই তুলে ধরলেন—

‘হৃদয়ে অনেক জল অনেক সমুদ্র
নিজেই নিজের জলে সাঁতার কাটি… …

জলে থেকেই জল পিপাসায় কষ্টে আছে ।’
 (জলপদ্য)
 
প্রসঙ্গক্রমে বলতেই হয়, ‘জল’ শব্দটি এই কবির একটা অদম্য অবসেশন । এই গ্রন্থে জল শব্দটি কবি ব্যবহার করেছেন চুয়ান্নো বার । একটা শব্দ একজন কবি কতবার ব্যবহার করবেন, সেটা তাঁর ব্যাপার । কথা হল সেটার তাৎপর্য নিয়ে । শব্দ যদি কেবলই রব হয়ে পড়ে থাকে,  তাহলেও একটা উদ্দেশ্য থাকে যে কবি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছেন, যে ভাষা আমরা জানি না, সেই ভিনদেশি ভাষা বোঝাবার জন্য মূকাভিনয়ের মতো । জল এখানে কোথাও জীবন হয়ে উঠেছে একথা অনস্বীকার্য । তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেবল চেনা তরল হয়ে রয়ে গেছে, কাব্যের মাত্রা বহন করতে পারেনি । এটা কোনো মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার কি না, তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় । তবে ‘জল’ শব্দের ব্যবহারে তিনি রেকর্ড করেছেন বলাই যায় !

কখনো মনে হয়েছে কিছু খ্যাত-উক্তি বা প্রচল শব্দবন্ধ কবি ব্যবহার করেছেন নিজের মতন করে । করাই যায়, কারণ শব্দ কারো একার সম্পদ নয় । কিন্তু এমন না হওয়াই বাঞ্ছনীয় । এতে বিভ্রান্তির জন্ম হয় ।

‘একটি পাতা, শাখাচ্যুত হল, নাড়ির টান নেই আর
একটি একটি করে যে কয়টি পাতা ছিল
সব খসে যাবে একদিন… …

একদিন সব পাতা ঝরে গেলে 
বৃক্ষ শুধু বৃক্ষ, তাকে কি বৃক্ষ বলে ?
পাতা নেই, শাখা নেই, এমন শ্রাবণ দিন !… …
  (৩০শে জুলাই,২০০৮)

কিছু বোঝা গেল । জীবন পরিণতির দিকে যত যায়, তত খসে খসে যায় তার পার্থিব বাহুল্য । যেন ত্যাগে ও পরিত্যাগে পরিনির্বাণের দিকে এগিয়ে যাওয়া । আবার এও বলা যায় যা সম্পদ আছে তা খসে খসে পড়ে গিয়ে নিঃস্ব করে তুলবে একদিন,  অথচ তা হবার কথা ছিল না ।  
পরের স্তবকের দিকে লক্ষ করলে বলা যায় ‘এমন শ্রাবণ দিন !’, অথচ বৃক্ষের শরীরে এই রোমাঞ্চভরা দিন উপভোগ করার মতো শক্তি নেই উপকরণ নেই । উপরন্তু কবিতাটির নাম একটা বিশেষ দিনকে উপলক্ষ করে নির্মিত । শব্দ তো চিহ্ন মাত্র । এক একটি শব্দের শতেক দিকনির্দেশ থাকতে পারে, এবং তৈরিও করা যেতে পারে । ভাষা তার ব্যুৎপত্তিবাহক শব্দের মধ্যে আর বাঁধা নেই, বা বলা যায় ভাষা অনেকাংশে  স্বাধীনতা দিয়েছে শব্দকে— মুক্তি দিয়েছে তার অর্থের বেড়াজাল আর যৌক্তিকতা থেকে । কবি যেমন পাখিচরিত্র এঁকেছেন এই কবিতায় অনেকটা এমনই শব্দেরও চরিত্র এখন, বা হয়ত চিরকালই ছিল, আমরা বুঝিনি, আর এখানেই লুকিয়ে রয়েছে কবিতার অনেকার্থদ্যোতনা— ব্যঞ্জনা—ধ্বনি—

‘… পাখিদের কোনো স্থায়ী ঘর নেই
পাখিদের কোনো ঘর থাকতে নেই
পাখিরা উড়বে—পাখিরা উড়াল দেবে
দিগন্তে—তাদের ঘর নেই বসবাস নেই
এ-ঘর সে-ঘর থেকে পাখিরা 
যে নীড় গড়ে— নিজ চঞ্চুতে
সে-ঘর ভেঙে ফেলে
আবার ফের স্বপ্ন দেখে অন্য ঘর ।… …’
 (জল ছুঁই ছুঁই দহনবেলা)

এই সময়কে বলা হয় age of theory, তত্ত্বের যুগ ।  তবে তত্ত্ব ব্যাপারটা সব সময়ই ছিল, আমরা কখনো সেভাবে ভাবিনি বলে জানিনি, জানার প্রয়োজনও পড়েনি ।  মাছ যেমন জলের তলায় থাকে, মানুষ যেমন বাতাসে নিমজ্জিত থাকে, তেমন তত্ত্ব দ্বারা মানুষ আর এই সভ্যতাও পরিবৃত হয়ে আছে । যার যার তার তার আদর্শ, মান্যতা, অমান্যতা, প্রতিজ্ঞা, চরিত্র, এগুলোই তত্ত্ব । তাহলে এখন কেমন হবে তত্ত্ব ? কেমন হবে আমার চরিত্র বা আদর্শ বা কেমন হবে আমার মান্যতা আর অমান্যতাগুলো ? কেমন হবেন একজন কবি ? কেমন হলে লোকে বলবে না সেকেলে ? আমি যদি কবি, তাহলে কেমন হবে আমার কান্না, কেমন হবে প্রেম, কেমন হবে আমার দ্রোহ ? আজকের সময়ের প্রবৃত্তি কী ?
আবার এও এক বড় প্রশ্ন যে, এই সব আমাকে জানতে হবে কেন ? জানতে হবে এ কারণে যে, যেহেতু আমি একটা কর্মকাণ্ডে ঢুকেই পড়েছি, যার দুটো অংশ, রচনা ও প্রদর্শন । আবার প্রদর্শনেরও আরেকটা অংশ আছে, যাকে বলা হয় সঞ্চারণ । এসবই অবশ্য পুরোনো ব্যাপার । ভরতের নাট্যশাস্ত্রে এর বিশেষ উল্লেখ আছে বলে জানি ।

এত্ত সব না জানলেও কেউ কিছু বলবে না । বলতে হলে জানতে হয় । আবার বলাটাও অনেকের সহ্য হয় না । সবচেয়ে বড় কথা আমরা নিজেকে জানি না । নিজেকেও যে জানতে হয়, সেটাও জানি না । প্রেমিকা বা ছদ্ম প্রেমিকা যে আমাকে আসলে নাচাচ্ছে, সেই পুতুল নাচের ইতিকথাও তো আমি পড়িনি ! আমি তো পড়িনি ফুকো কিংবা বদ্রিলার ! আমি তো রবীন্দ্রনাথও পড়িনি !
তবু না লিখে পারি না । লিখতে হয়ই । কেন হয়, তাও জানি না । ব্যক্তিগতভাবে আমি ঠিক করেছি এখন শুধু পড়ব । ছাপানো বই পড়ব, শুধু নেট থেকে নয় । আমদের কবি গোবিন্দ ধর বলেন—

‘কখন নামবে জ্বর
এই অপেক্ষায় হাট খুলে রাখি
হৃদয়ের দরজা
বন্ধ দরজা ইঁদুর কাটে
অন্ধ উই খায়
অথচ আপনি যতটুকু কাছে আসেন
ততটুকু দূরে থাকেন’ … …
 (কনসেপ্ট)
কবিতাটি এর পর আরও দু-লাইন আছে, সেটা আমার দরকার পড়েনি, মনে হয়েছে উপসংহার । কবিতার কোনো সংহার নেই, তাই উপসংহারও নেই । শুরু নেই তাই শেষও নেই ।
‘বন্ধ দরজা ইঁদুর কাটে/অন্ধ উই খায়’ । তার মানে কবি নিজেকে টের পাচ্ছেন । তিনি ছাড়াও যে আরও কিছু আছে, যার কাছে তিনি পরাস্ত হচ্ছেন, যে খেলাচ্ছে, যে নজরে রাখছে তাতে— তার অবস্থাকে এবং কুরে কুরে খাচ্ছে এটা কবির চেতনায় আছে । সম্ভবত এটাই এই সময়ের একজন কবির কাছে মুখ্য সংকট । কবিতা মাত্রেই  সংকটের হয়ে যায় । আজকের দিনে কেউ লেখে না— জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ ।  আনন্দ হলেও সেটাকে প্রকাশ বা প্রদর্শনের জন্য ব্যাকুল হয় না, কখনো এটাকে কোনো বলার মতো বিষয়ই মনে করে না, আর মনে যদি বা করে, তাহলে চুপি চুপি চলে যায় কবিতা পাঠের জন্য হলদিয়া বা মালদহ ! কলকাতা থেকে চলে আসে রাতাছড়া । একটা ভিন্ন কপট জলস্রোত আছে সাহিত্যের মতো পবিত্র তৎপরতারও তলে তলে ফল্গুর মতো । আর এটাও হয়ে উঠছে সাহিত্যের বিষয় । কারণ এটাও সংকট ।

 শব্দ বা ধ্বনি বা স্ফোট বা চিহ্ন, এসবের সর্বাধিক গুরুত্ব কবিতায় । কবিতা সাহিত্যের নির্যাস । কবিতা মানেই শব্দ কম, কথা বেশি । হিটারোগ্লোসিয়া, অনেকার্থদ্যোতনা কবিতার প্রাণ । বস্তা বস্তা বহুব্যবহৃত শব্দের আয়োজন বা আবাহন, কবিতাকে ধর্ষণ ছাড়া আর কিছুই করে না । ভাষারও বলাৎকার ঘটে যায় । ‘ঘাতকঘর’ কবিতায় কবি বলেন—

‘এসো কাটাকাটি খেলি
আমাকে কাটো ।… … 

হত্যাপ্রবণ এই ঘাতজ্বর থেকে
শুধু কাতুকুতু দ্বন্দ্ব
কারো ত্রাণ নেই… …

একেকটা ঐতিহাসিক রসিকতার আগে
একেকবার হাসি-হাসি আদল করে
এসো, ব্যবচ্ছেদ করি
 আমাদের ঘাতকঘর ।’ 
 (ঘাতকঘর)

কবি কী লিখেছেন কবিই জানেন । আমি ভাবি নিজের কথা । আমি নিজেই নিজের লাক্ষাগৃহ সাজিয়ে বসেছি, যেখানে অহরহ দ্বন্দ্ব । চিন্তা-চিতার থেকে আদৌ ত্রাণ নেই কারো । ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়েও ফিরে আসি ।

কবিতা যখন নির্দিষ্ট অভিলক্ষে ধেয়ে যায়, তখন সেটা একান্তই ব্যক্তিগত হয়ে যায় । পাঠকের কাছে দুঃখের প্যানপ্যানানি হয়ে যায়, আর পাঠক কিছুতেই নিজেকে সেটার অংশভাক করে তুলতে পারেন না । কবিকে তাই ভাবতে হয় বহুমুখী চিহ্নায়ন নিয়ে, এক কথায় শব্দ নিয়ে, শব্দের ব্যবহারের পরিমিতি নিয়ে । উদ্ধৃত কবিতাটিতে আরও কিছু কথা ও কাহিনি আছে,যা এগুলোকে জড়িয়েই কিছু বিস্তৃতি, যা আমার প্রয়োজন পড়েনি কবিকে চিনে নিতে । সেই চিরাচরিত কথাটিই আবার বলতে হয় যে,  অন্তত কবিতার ক্ষেত্রে যা মোক্ষম কথা, সেটা হচ্ছে কবিতাকে অবশ্যই বিশেষ থেকে নির্বিশেষ হয়ে উঠতে হবে । এই কবি শব্দকে যথেচ্ছ ব্যবহার করেছেন ফলে, তার ভেতরের অগ্নিশিখাটি অনেক ক্ষেত্রেই ছাইচাপা পড়ে গেছে যেন ।

তার ‘বেলামাসি’ কবিতাটি একটা দুর্দান্ত রচনা হয়ে উঠতে পারতো চাপা যৌনতার প্রেক্ষিতে, কিন্তু হল না অতিসপ্রতিভতার কারণেই হয়ত । কবি নিজের ভাবনার প্রতি আর শব্দের প্রতি আরও মনোযোগী হবেন নিশ্চয় । নিজের  গুণের প্রতি শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস সবার আগে অর্জনীয় । নিজের রক্তবিন্দুটির ছাপ, নিজের ঘামের গন্ধ, এসব মুছে ফেললে হবে না । অবশ্যই না !

‘… বড় কঠিন, একই তক্তপোশ—
কতখানি স্বাধীন হাত-পা ছুঁড়তে পারি
আগাম সতর্ক থাকা
অথবা ঐ রাত্রির সাথে যাপন ।

এভাবে বিনিদ্র রাত, এভাবে উপোসের রাত
এভাবে কত ক্রোধ মনুর জলে ভাসিয়ে
সন্তর্পণে হাঁটি ‘তৃণ হতে দীনতর’ হই ।

তুমি রাত্রি । তুমি অন্ধকারে
সিংহের গর্জন ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে
হাসতে পারো অট্টহাসি ।… …

… তোমার কাছে এসে
সমস্ত সাঁতার ভুলে যাই ।’… … 
 (আলো নেই)

খুব সুন্দর কবিতা । নিবেদনেই প্রেম । নিবেদনেই মহত্ত্ব । ‘তৃণাদপি সুনীচেন তরোরপি সহিষ্ণুনা’…। নিচু না হলে জলধারা আসে না । চিৎকারের চেয়ে নীরবতার অভিঘাত বেশি ।

 ‘…তোমার কাছে এসে/সমস্ত সাঁতার ভুলে যাই’ । এর পর আর কিছু বলার থাকে না । কবিতার উদ্ধৃত অংশের পরেও কিছু আছে বাকি, আমার মনে হয়েছে সেটা ব্যাখ্যা, যা কবিতাটি দাবি করে না ।

সব কবিতার আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করি না । তাঁর সব কবিতাতেই কিছু কিছু আশ্চর্য কথা রয়েছে, যাকে ঘিরে হয়ত আবর্তিত হয়েছে আরও কিছু শব্দ । বস্তুত একথা অনস্বীকার্য সব কবিতাই জীবনের ভগ্নাংশস্বরূপ । ‘প্রিয় গ্রাম’ নামে কবিতাগুলোও খুবই আন্তরিক । কিছু কবিতায় সরাসরি দার্শনিকসুলভ বাক্যও আশ্রয় নিয়েছে । এতে কবিতা  exposed  হয়ে যায় । কবিও দার্শনিক, কিন্তু  তার উচ্চারণের অন্তরে লীন হয়ে থাকে দর্শন, বাইরে আসে না । আর যে মায়াবী উচ্চারণের আচ্ছন্নতায় বাইরে আসে না, সেখানেই হয়ত কবিতার নিবাস, যার ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য বহন করে অজস্র দিশা ও ব্যঞ্জনা । কবি রচনা করেন আর পাঠক তাকে কবিতা করে তোলেন, হারিয়ে যায় কবির দেয়া মন্ত্র । কবি গোবিন্দ ধরের এই কবিতাটির মতোই কি ?

‘এতো রঙ
বদলাতে বদলাতে
নিজের রঙ নিজেই জানে না
কোন্টা আসল
কোন্টা নকল
চিনতে চিনতে বর্ণান্ধ ।’  (গিরগিটি)

দ্রোহবীজের কবি এক জায়গায় বলেছেন— ‘আমাদের মানচিত্র অসংখ্য ঘাতকের আঁকা’ । বলেন—

‘মাথা তো তুলতে চাই
ঠিক ঠিক ল্যাম্পপোস্টের মতো
কোথা থেকে কি এসে
মাথাকে আবার তারা
  নোয়াতে চায়’… …  (খয়ের খাঁ)

এই সময়ে এটাই বিষয় । সব সুখ তুমি পাবে, কিন্তু মাথা নিচু করে থাকতে হবে । মাথা ঘোরাতেও পারবে না, তুমি নজরবন্দি আছো ।

এরপর  আরও তিনটি ক্ষীণ কাব্যগ্রন্থ  রয়েছে আমার হাতের কাছে । এর মধ্যে দুটি ২০১৮-র সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়েছে । ‘শ্রী চরণেষু বাবা’ বেরিয়েছে ফেব্রুয়ারি ২০১৪-তে ।  ৩৫টি কবিতাখণ্ড নিয়ে ৪৮ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে কবি তার বাবার প্রতি তার সকল আনতি স্মৃতিমেদুর উচ্চারণে বিবৃত করেছেন । অমর হোক কবির এই পিতৃভক্তি ।

 ‘আনোয়ারা নামের মেয়েটি’ গ্রন্থে, ভেতরে মেয়েটির নাম ‘আনুয়ারা’ হয়েছে । যেকোনো একটা শব্দ ব্যবহার করা উচিত ছিল । আনোয়ারা নামে কোনো যুবতির ধর্ষিতা হবার পরবর্তীতে তার আত্মহত্যার ঘটনার হৃদয়বিদারক কাব্যরূপই এই গ্রন্থের উপজীব্য । ১৬ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে একই কবিতার ১৮টি ক্ষুদ্র খণ্ড রয়েছে ।  কবি ‘জল’ শব্দটি এখানে ব্যবহার করেছেন একুশবার । 

দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘দেওনদী সমগ্র’-ও অনুরূপ একই কবিতার ১৮টি খণ্ডে গড়ে উঠেছে । এখানে কবি মোট ১১৯ টি পঙ্ক্তিতে ‘জল’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ৪৬ বার । 

পরিশেষে এটাই আমার মনে হয়েছে যে, কবি গোবিন্দ ধর গভীর মননের অধিকারী হয়েও  কিঞ্চিৎ বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে । আরও একটু একাগ্রতা হয়ত তাঁকে সেই আসনে প্রতিষ্ঠিত করবে যা পাঠককে নতুন কিছু দিতে পারবে ।

 কবির নতুন অভিযাত্রার প্রতীক্ষায় এখানে আপাতত ইতি ।

0 Comments