গোবিন্দ ধর-এর কবিতায় নিসর্গ ও প্রেমের অনুষঙ্গ
ড. পম্পা দাস

অতিথি অধ্যাপক, এম. বি. বি. কলেজ, আগরতলা, পশ্চিম ত্রিপুরা

সারসংক্ষেপ: প্রকৃতির নিসর্গতাকে নিবিড়ভাবে অনুভব করেননি এমন কবির

সংখ্যা বোধহয় কমই আছেন, কেউ কেউ তো প্রকৃতির মধ্যেই মুক্তি খুঁজে পেয়েছেন। আবার কোনো কোনো কবির কবিতায় প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বুদ্ধদেব বসু একবার বলেছিলেন যে 'কোন কবির কবিতা সেইখানেই সবচেয়ে সফল যেখানে কবিতায় প্রকৃতির বর্ণনা রয়েছে'। উত্তরপূর্বের বাংলা সাহিত্যে কবি হিসাবে গোবিন্দধরের খ্যাতি যথেষ্ট সম্মানের মর্যাদা রাখে। রূপময় ত্রিপুরার অন্যতম শ্রেষ্ঠকবি গোবিন্দ ধর বাংলা কাব্যে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। তিনি ছিলেন বাংলাকাব্যে আধুনিকতার পথিকৃতদের মধ্যে অন্যতম। তার কাব্যের বিষয়বস্তু হল প্রকৃতি ও প্রেম। এই কাব্যকলার অসাধারণ তত্ত্বই তাকে বৈচিত্র্য ও গভীরতা দান করেছে।

মূলশব্দ: প্রকৃতি, নিসর্গ, প্রেম, জল, নদী।

ভূমিকা: "আপন অন্তরের একনিষ্ঠ খননকর্মী হয়ে কবি গোবিন্দ ধর প্রকাশিতব্য 'দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি', একা' কাব্যগ্রন্থে নিজেকেই যেন বারবার আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। সুখের কথা, আশা ও আশ্বাসের কথা, কবির কবিতা একান্ত ব্যক্তিগত স্তরে আবদ্ধ হয়ে থাকেনি। বহুবহু পাঠকের ব্যক্তিগত জীবনদর্শনের সংগে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে এবং এখানেই কবি গোবিন্দধর একজন সৎ কবি, প্রকৃত কবি হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।"- (পীযুষ রাউত)'

প্রকৃতির নিসর্গতাকে নিবিড়ভাবে অনুভব করেননি এমন কবির সংখ্যা বোধহয় কমই আছেন, কেউ কেউ তো প্রকৃতির মধ্যেই মুক্তি খুঁজে পেয়েছেন। আবার কোনো কোনো কবির কবিতায় প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বুদ্ধদেব বসু একবার বলেছিলেন যে 'কোন কবির কবিতা সেইখানেই সবচেয়ে সফল যেখানে কবিতায় প্রকৃতির বর্ণনা রয়েছে'। যদিও



৩১৫

'বৃক্ষের মতো ছায়া হাত বাড়িও না।

মেঘ পর্ব এক মিথ্যে নদী

আষাঢ়ের দিনলপি' 'মনুসমগ্র'। এছাড়াও আরোও অনেক কবিতা ও ছড়া ভকেলন করেছেন কবি। কবি তাই যেন কবির আত্মা, স্রোতস্বিনী দিয়ে তার প্রংস্কৃতিক যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে স্রোত প্রকাশনাও বিবিধ সাংস্কৃতিক কর্ম কান্ড দিয়েই তার জীবন অতিবাহিত হয়। ছোটবেলা থেকেই কবি প্রাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পুতুলনাচ, যাত্রাদল, স্থানীয় ধামাইল, কবিগান, মনসা কারি এ সবই দেখোটি মনে পড়জে হয়। ত্রিপুরার বাংলা কবিদের মনসামঙ্গল দিয়ে এই কথাটি মনে পড়লো- 'নতুন কিছু করার ঝোঁকে তরূণ করিতে শিরোদেশে ঊনপঞ্চাশী পবন ভর করে, তখন যুগের চেয়ে হুজুগের দিকে কলম ছুটে চলে। নব্য কবিতার জন্মলগ্নে সেরকম দুর্ঘটনার ইঙ্গিত পাওয়া যালেম কখন দুর্বোধ্য শব্দের টংকার তুলে, কখনো ভাব-ভাষাকে মুচড়িয়ে দুমড়িয়ে এমন উৎকট উদ্ভট ব্যপার ঘটে যে ব্যকরণ-অভিধান-ভাষাবিজ্ঞান-ধর্মশাস্ত্র মন্থন করেও তার নাগাল পাওয়া যাবে না। সে যাই হোক, আধুনিক বাংলাকবিতা থেকে পাগলামির এলোমেলো হাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়ে কবিতা সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কবিতা ভূগোল- ইতিহাসের চৌহদ্দির বাইরে হলেও প্রত্যেক জাতিরই বিশেষ ধরণের প্রবণতা ও ঐতিহ্য আছে"। ৩ কবির জীবনে অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হওয়ার কারণে প্রায় কবিতায়ই সেই বিষাদের তান ধরা পড়েছে-

তার এতো জল মরু ভ্রম

হিরন্ময় হরিণ ভেবে

রামচন্দ্র এখনও পিছু পিছু ছুটছেন'। (মেঘপর্ব) গোবিন্দ ধরের কবিতায় অনেকটা খোলামেলা। অথচ শব্দ ব্যবহারের অসাধারণ নৈপুণ্যে প্রকৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গ কে উপমা, প্রতীক ও রূপকের ব্যঞ্জনায়, চিত্রকল্পের অসামান্য পরিবেশনে তিনি প্রকৃত শিল্পীর পরিচয় দিয়েছেন।

"সারা বেলা মেঘলা হৃদয়

হৃদয়ে বাদলা নেমেছে বর্ষার মত এই ভরা বাদলায় আপনি কাছে নেই কাছে থাকতে নেই।

[19/07, 20:12] SROT PRAKASHANA: উদ্দালক

সকল কবির কবিতায় প্রকৃতি প্রধান বিষয় হয়ে উঠবে এমন কোনে ঋদ নেই তবে প্রধান বিষয় নাহলেও প্রকৃতি ছাড়া কি। কোনোও কবিতা পরিপূর্ণ ২০ প্রকৃতি কবিতার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন আকার ধারণ করে কবির রিজ মানসিকতায়। কখনো কল্পনার মধ্যদিয়ে ও কবিতা আমাদের কাছে সে অনুভূতি দেয়। যেমন আলোকরঞ্জন দাসগুপ্তের একটি কবিতায় মা, প্রি অনুভূতি দের প্রকৃতির সঙ্গে এমন ওতপ্রোতার হয় মারা দিয়েছে যে কা মানুষ মার কাছে মনে হয়েছে যেন এই মা তারই মা। শুধু জয় গোরামি মোহদের মতো সাধারণ পাঠক ও তোর মায়ের শেএকায় হতে পা আমাদেরই। আমি যত গ্রাম দেখি / মনে হয়/ মায়ের শৈশব/ আমি যত প্রাচ যত মুক্তক পাহাড় শ্রেণি দেখি/ মনে হয় প্রিয়ার শৈশব / পাহাড়ের হৃদয়ে যং মালচে সবুজ করনা দেখি / মনে হয় / দেশে গাঁয়ে ছিল/ কিন্তু ছেড়ে যাস

প্রতিটি মানুষ'। একুশ শতকের লেখক গোবিন্দ ধর একদিকে যেমন সম্পাদক, সাংঘাতি প্রকাশক, কথাকর্মী সংগীত রচনাকার, নাট্যকার তথা নাট্যশিল্পী অন্যদিকে তিি মূলত কবি। কবি অশোকদেব গোবিন্দ ধরের লেখনি সম্পর্কে বলেছিলেন, 'গোবিন্দ নিম্নম্বরে বলেন চিতকারের কথা' যদিও কবিকে আমরা এ রূদ্ধে চিনি। ত্রিপুরার বাংলা সাহিত্যে কবি গোবিন্দধরের নাম চিরোজ্জ্বল হয়ে থাকবে। ২০০৭-এ 'কবিতা প্রতিমাসে' কলকাতা থেকে প্রকাশিত তার কারগ্রস্থ 'জলঘর'-এ কবির পরিচিতি সংক্ষেপে দেওয়া হয়েছে এইভাবে-

"কবি গোবিন্দ ধর। দক্ষিণারঞ্জন ধর ও সুষমারানী ধরের পুত্র। জন্ম ৩০ শে জুলাই ১৯৭১ ইং। ধর্মনগরের পদ্মপুর অফিস টিলায়। বড় হয়ে উঠা উত্তর ত্রিপুরার রাতাছড়ায়। বর্তমান ঠিকানা হালাইমুড়া; জীবনানন্দ লেন, কুমার ঘাট উত্তর ত্রিপুরা। পেশায় শিক্ষক। প্রথম কবিতা প্রকাশ ৮ নভেম্বর, ১৯৯১। 'স্রোতস্বিনী' নামে সাহিত্যপত্র ও 'স্রোত' সাহিত্যপত্রের সম্পাদক। ১৯৯৪ সাল থেকে 'উদীপ্তসংগ্রহশালা' নামে একটি গ্রন্থাগার পরিচালনা করেছেন।

স্কুলে পড়াকালীন কবি কাঁচা হাতের লিখন- 'ভালোবাসি ভালোবাসি- তোমাকে সত্যি ভালোবাসি'। 'জলঘর' (২০০৭) কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে বাংল কবিতার জগতে কবির প্রথম আত্মপ্রকাশ। তারপর একে একে 'সূর্যসেন লেনা (২০০৭), 'মনসুন মাছি' (২০০৭), 'দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি একা' (২০১১), 'আনুয়ারা নামের মেয়েটি (২০১৮), 'দেওনদী সমগ্র' (২৯১৮), 'মনসুন মাছি', 'শ্রীচরণেষু বাবা,
[


১৪



সকল কবির কবিতায় প্রকৃতি প্রধান বিষয় হয়ে উঠবে এমন কোনে ঋদ নেই তবে প্রধান বিষয় নাহলেও প্রকৃতি ছাড়া কি। কোনোও কবিতা পরিপূর্ণ ২০ প্রকৃতি কবিতার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন আকার ধারণ করে কবির রিজ মানসিকতায়। কখনো কল্পনার মধ্যদিয়ে ও কবিতা আমাদের কাছে সে অনুভূতি দেয়। যেমন আলোকরঞ্জন দাসগুপ্তের একটি কবিতায় মা, প্রি অনুভূতি দের প্রকৃতির সঙ্গে এমন ওতপ্রোতার হয় মারা দিয়েছে যে কা মানুষ মার কাছে মনে হয়েছে যেন এই মা তারই মা। শুধু জয় গোরামি মোহদের মতো সাধারণ পাঠক ও তোর মায়ের শেএকায় হতে পা আমাদেরই। আমি যত গ্রাম দেখি / মনে হয়/ মায়ের শৈশব/ আমি যত প্রাচ যত মুক্তক পাহাড় শ্রেণি দেখি/ মনে হয় প্রিয়ার শৈশব / পাহাড়ের হৃদয়ে যং মালচে সবুজ করনা দেখি / মনে হয় / দেশে গাঁয়ে ছিল/ কিন্তু ছেড়ে যাস

প্রতিটি মানুষ'। একুশ শতকের লেখক গোবিন্দ ধর একদিকে যেমন সম্পাদক, সাংঘাতি প্রকাশক, কথাকর্মী সংগীত রচনাকার, নাট্যকার তথা নাট্যশিল্পী অন্যদিকে তিনি মূলত কবি। কবি অশোকদেব গোবিন্দ ধরের লেখনি সম্পর্কে বলেছিলেন, 'গোবিন্দ নিম্নম্বরে বলেন চিৎকারের কথা' যদিও কবিকে আমরা এ রূদ্ধে চিনি। ত্রিপুরার বাংলা সাহিত্যে কবি গোবিন্দধরের নাম চিরোজ্জ্বল হয়ে থাকবে। ২০০৭-এ 'কবিতা প্রতিমাসে' কলকাতা থেকে প্রকাশিত তার কারগ্রস্থ 'জলঘর'-এ কবির পরিচিতি সংক্ষেপে দেওয়া হয়েছে এইভাবে-

"কবি গোবিন্দ ধর। দক্ষিণারঞ্জন ধর ও সুষমারানী ধরের পুত্র। জন্ম ৩০ শে জুলাই ১৯৭১ ইং। ধর্মনগরের পদ্মপুর অফিস টিলায়। বড় হয়ে উঠা উত্তর ত্রিপুরার রাতাছড়ায়। বর্তমান ঠিকানা হালাইমুড়া; জীবনানন্দ লেন, কুমার ঘাট উত্তর ত্রিপুরা। পেশায় শিক্ষক। প্রথম কবিতা প্রকাশ ৮ নভেম্বর, ১৯৯১। 'স্রোতস্বিনী' নামে সাহিত্যপত্র ও 'স্রোত' সাহিত্যপত্রের সম্পাদক। ১৯৯৪ সাল থেকে 'উদীপ্তসংগ্রহশালা' নামে একটি গ্রন্থাগার পরিচালনা করেছেন।

স্কুলে পড়াকালীন কবি কাঁচা হাতের লিখন- 'ভালোবাসি ভালোবাসি- তোমাকে সত্যি ভালোবাসি'। 'জলঘর' (২০০৭) কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে বাংল কবিতার জগতে কবির প্রথম আত্মপ্রকাশ। তারপর একে একে 'সূর্যসেন লেনা (২০০৭), 'মনসুন মাছি' (২০০৭), 'দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি একা' (২০১১), 'আনোয়ারা নামের মেয়েটি (২০১৮), 'দেওনদী সমগ্র' (২৯১৮), 'মনসুন মাছি', 'শ্রীচরণেষু বাবা,


৩১৬

কারণ কাছে থাকলে হৃদয় ভিজে যাবে

সে কি হয় নাকি? হৃদি জল: ছল ছল (সূর্যসেন লেন) 'সূর্যসেন লেন' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত 'হৃদিজল: ছলছল' কবিতায় বর্ষার অনাচ হৃদয় ভিজে যাওয়ার ঘটনাকে তাতপর্যপূর্ণ ভাবে ব্যবহার করেছেন। মেষ বৃষ্টি নয় একটু জল নিয়ে কবি বাঁধতে চায় জল ঘর। কবি তাঁর কবিতা চার্জিংএ দেখেন জীবনচর্চার সঙ্গে প্রোত করে। বেঁচেথাকার জন্য কবিতাকে নিয়েছে প্রেরণা হিসেবে।

সংবেদন শীল অনুসন্ধিৎসু মন ধরা পড়ে তার 'জলবর্ষা' কবিতায়-সময়ের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে বুকে নিয়ে নিজেকে আবিস্কারের প্রবনতা ধরা পড়েয় এখানে তিনি অনুভব করেছেন সীমানা পথের।

'পড়শিরা সীমানা বাড়ান বিজ্ঞের মতো হাঁটেন আমি জমিন থেকে হারাই নিজস্ব অধিকার।'(সীমান্ত সমস্যা) কবিতাটির অন্তর্নিহিত বিষয়ের সারবস্তু ব্যর্থতা। প্রতিবেশীরা সম্পত্তির সীমানা বাড়ানোর জন্য অন্যের জমিন কেটে নিজের অংশ বাড়িয়ে দেয় অর্থাৎ অনোর জমিদখল করে নেয় স্বাভাবিকভাবেই নিজস্ব জমির অধিকার হারানোর প্রসঙ্গে কবি উক্তিটি করেছেন। লেন-দেন বিষয়টি শিল্পরূপে বিম্বিত হয়েছে কবিতায়। 'ভেতরে ভেতরে বাস্তুসাপ, কামড়ায় মনমেধা ও সংস্কৃতি আমি ও ভেতরের আমি লালসুতোয় আবদ্দ সেখানে জিহ্বা বের করে ফোঁস ফোঁস ভেতরে ভেতরে বাস্তুসাপ প্রতিদিন কামড়ায়' (বাস্তুসাপ)।

'বাস্তুসাপ' কথার অর্থ হল বিষহীন সাপ। প্রতিটি বাড়িতেই একটা বাস্তুসাপ থাকে। যদিও তারাও আক্রমণ করে কামড় দেয়, কিন্তু তাদের বিষ নাই। কবিরও তার বাস্তব সংসার জীবনে আবদ্ধ হলে বাস্তুসাপ যেন তাকে কামড়ায় প্রতিদিন। বিষ না থাকলেও কবির মনকে বিষাক্ত করে তোলেছে তার সাংসারিক জীবন।
 ৩১৮

উদ্দালক

এখানে মূলত জীবন সংগ্রামের কথা, জীবনে চলতে গিয়ে যে অভিজ্ঞত হয় তারপরে ও নিজস্ব সত্তাকে হারাতে চায় না মানুষ। একটু একটু সংসার জীবনে নিজেকে পুড়ানো যেন মরূমায়ায় হাটার মত প্রতিট মাটিকামড়ে ধরে রাখতে চায়। আমাদের পরিচিত বিভিন্ন শব্দকে কবি কবিতা এমন ভাবে ব্যবহার করেন যে পরিচিত শব্দ ও তার নিজস্ব সীমা অতিক্রা করে আমাদের শব্দাতীত জগতে নিয়ে যায়। আর তখনই তা কবিতা হয় ওঠে। শব্দের এই সীমানা অতিক্রম করার ক্ষমতাই হল ব্যঞ্জনা। যেমন গোবিয় ধরের 'স্বদেশ মালা' কবিতার এই পঙতি পাঠকের মন ছুঁইয়ে যায়। 'তোমার কাছে আকাশ ছিলো

পাখি ছিল উড়তে দিলে কই? তোমার কাছে সব থেকেও রিক্ত আমি জলের মাঝে জলকষ্ট সই।' (স্বদেশ মালা)

এখানে 'পাখি' তার সাধারণ অর্থের সীমা অতিক্রম করে পৌঁছতে চেয়েছে অন

এক প্রতীকে বা দ্যোতিতে। এখানে 'পাখি' হয়ে উঠেছে স্মৃতির চিহ্নায়ক ব

প্রতীক। কবিতা শব্দ তীর রহস্যময়তায় পৌঁছানোর জন্য আশ্রয় নেয় বিভিন্ন ইঙ্গিতের, ব্যঞ্জনায়, প্রতীক ও চিত্রকল্পের। প্রতিটা মানুষের কাছে বাঁচার প্রেরণা থাকে কিন্তু বাস্তবে যদি সেই চাওয়ার মতো ঠিক ভাবে না পায় সেই প্রসঙ্গেই কবি বলেছেন জলের মাঝে থেকেও জলকষ্ট সইতে হচ্ছে। গোবিন্দ ধরের কবিতায় আমরা ফিরে পেলাম প্রকৃতির প্রতি তীব্র ভালোবাসা ও এক মরমী টান ও তার কাছে ফিরে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা। প্রকৃতির প্রতি এই টান ও আত্মনিবেশী মনন কাজ করেছে সময় ও সমাজের

গ্লানি, বৈকল্য, নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা, দহন, অস্থিরতা থেকে মুক্তি

পাওয়ার পথ হিসেবে। প্রকৃতির সঙ্গে তিনি মিশে যেতে চেয়েছেন-

'দূর থেকে ভেসে আসে বাউলের তান

টগর মালতী গন্ধ বাতাসে ভাসমান,

কোকিলের দরবারী মৌতাত প্রকাশের ভাষাহীন

গ্রামছাড়া আর কোথা আছে প্রাণ'?
 উদ্দালক

৩১৫

'বৃক্ষের মতো ছায়া হাত বাড়িও না।

মেঘ পর্ব এক মিথ্যে নদী

আষাঢ়ের দিনলপি' 'মনুসমগ্র'। এছাড়াও আরোও অনেক কবিতা ও ছড়া ভকেলন করেছেন কবি। কবি তাই যেন কবির আত্মা, স্রোতস্বিনী দিয়ে তার প্রংস্কৃতিক যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে স্রোত প্রকাশনাও বিবিধ সাংস্কৃতিক কর্ম কান্ড দিয়েই তার জীবন অতিবাহিত হয়। ছোটবেলা থেকেই কবি প্রাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পুতুলনাচ, যাত্রাদল, স্থানীয় ধামাইল, কবিগান, মনসা কারি এ সবই দেখোটি মনে পড়জে হয়। ত্রিপুরার বাংলা কবিদের মনসামঙ্গল দিয়ে এই কথাটি মনে পড়লো- 'নতুন কিছু করার ঝোঁকে তরূণ করিতে শিরোদেশে ঊনপঞ্চাশী পবন ভর করে, তখন যুগের চেয়ে হুজুগের দিকে কলম ছুটে চলে। নব্য কবিতার জন্মলগ্নে সেরকম দুর্ঘটনার ইঙ্গিত পাওয়া যালেম কখন দুর্বোধ্য শব্দের টংকার তুলে, কখনো ভাব-ভাষাকে মুচড়িয়ে দুমড়িয়ে এমন উৎকট উদ্ভট ব্যপার ঘটে যে ব্যকরণ-অভিধান-ভাষাবিজ্ঞান-ধর্মশাস্ত্র মন্থন করেও তার নাগাল পাওয়া যাবে না। সে যাই হোক, আধুনিক বাংলাকবিতা থেকে পাগলামির এলোমেলো হাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়ে কবিতা সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কবিতা ভূগোল- ইতিহাসের চৌহদ্দির বাইরে হলেও প্রত্যেক জাতিরই বিশেষ ধরণের প্রবণতা ও ঐতিহ্য আছে"। ৩ কবির জীবনে অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হওয়ার কারণে প্রায় কবিতায়ই সেই বিষাদের তান ধরা পড়েছে-

তার এতো জল মরু ভ্রম

হিরন্ময় হরিণ ভেবে

রামচন্দ্র এখনও পিছু পিছু ছুটছেন'। (মেঘপর্ব) গোবিন্দ ধরের কবিতায় অনেকটা খোলামেলা। অথচ শব্দ ব্যবহারের অসাধারণ নৈপুণ্যে প্রকৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গ কে উপমা, প্রতীক ও রূপকের ব্যঞ্জনায়, চিত্রকল্পের অসামান্য পরিবেশনে তিনি প্রকৃত শিল্পীর পরিচয় দিয়েছেন।

"সারা বেলা মেঘলা হৃদয়

হৃদয়ে বাদলা নেমেছে বর্ষার মত এই ভরা বাদলায় আপনি কাছে নেই কাছে থাকতে নেই।

[19/07, 20:12] SROT PRAKASHANA: উদ্দালক

সকল কবির কবিতায় প্রকৃতি প্রধান বিষয় হয়ে উঠবে এমন কোনে ঋদ নেই তবে প্রধান বিষয় নাহলেও প্রকৃতি ছাড়া কি। কোনোও কবিতা পরিপূর্ণ ২০ প্রকৃতি কবিতার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন আকার ধারণ করে কবির রিজ মানসিকতায়। কখনো কল্পনার মধ্যদিয়ে ও কবিতা আমাদের কাছে সে অনুভূতি দেয়। যেমন আলোকরঞ্জন দাসগুপ্তের একটি কবিতায় মা, প্রি অনুভূতি দের প্রকৃতির সঙ্গে এমন ওতপ্রোতার হয় মারা দিয়েছে যে কা মানুষ মার কাছে মনে হয়েছে যেন এই মা তারই মা। শুধু জয় গোরামি মোহদের মতো সাধারণ পাঠক ও তোর মায়ের শেএকায় হতে পা আমাদেরই। আমি যত গ্রাম দেখি / মনে হয়/ মায়ের শৈশব/ আমি যত প্রাচ যত মুক্তক পাহাড় শ্রেণি দেখি/ মনে হয় প্রিয়ার শৈশব / পাহাড়ের হৃদয়ে যং মালচে সবুজ করনা দেখি / মনে হয় / দেশে গাঁয়ে ছিল/ কিন্তু ছেড়ে যাস

প্রতিটি মানুষ'। একুশ শতকের লেখক গোবিন্দ ধর একদিকে যেমন সম্পাদক, সাংঘাতি প্রকাশক, কথাকর্মী সংগীত রচনাকার, নাট্যকার তথা নাট্যশিল্পী অন্যদিকে তিি মূলত কবি। কবি অশোকদেব গোবিন্দ ধরের লেখনি সম্পর্কে বলেছিলেন, 'গোবিন্দ নিম্নম্বরে বলেন চিতকারের কথা' যদিও কবিকে আমরা এ রূদ্ধে চিনি। ত্রিপুরার বাংলা সাহিত্যে কবি গোবিন্দধরের নাম চিরোজ্জ্বল হয়ে থাকবে। ২০০৭-এ 'কবিতা প্রতিমাসে' কলকাতা থেকে প্রকাশিত তার কারগ্রস্থ 'জলঘর'-এ কবির পরিচিতি সংক্ষেপে দেওয়া হয়েছে এইভাবে-

"কবি গোবিন্দ ধর। দক্ষিণারঞ্জন ধর ও সুষমারানী ধরের পুত্র। জন্ম ৩০ শে জুলাই ১৯৭১ ইং। ধর্মনগরের পদ্মপুর অফিস টিলায়। বড় হয়ে উঠা উত্তর ত্রিপুরার রাতাছড়ায়। বর্তমান ঠিকানা হালাইমুড়া; জীবনানন্দ লেন, কুমার ঘাট উত্তর ত্রিপুরা। পেশায় শিক্ষক। প্রথম কবিতা প্রকাশ ৮ নভেম্বর, ১৯৯১। 'স্রোতস্বিনী' নামে সাহিত্যপত্র ও 'স্রোত' সাহিত্যপত্রের সম্পাদক। ১৯৯৪ সাল থেকে 'উদীপ্তসংগ্রহশালা' নামে একটি গ্রন্থাগার পরিচালনা করেছেন।

স্কুলে পড়াকালীন কবি কাঁচা হাতের লিখন- 'ভালোবাসি ভালোবাসি- তোমাকে সত্যি ভালোবাসি'। 'জলঘর' (২০০৭) কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে বাংল কবিতার জগতে কবির প্রথম আত্মপ্রকাশ। তারপর একে একে 'সূর্যসেন লেনা (২০০৭), 'মনসুন মাছি' (২০০৭), 'দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি একা' (২০১১), 'আনুয়ারা নামের মেয়েটি (২০১৮), 'দেওনদী সমগ্র' (২৯১৮), 'মনসুন মাছি', 'শ্রীচরণেষু বাবা,
[

155N: 2320-9275

গোবিন্দ ধর-এর কবিতায় নিসর্গ ও প্রেমের অনুষঙ্গ

ড. পম্পা দাস

অতিথি অধ্যাপক, এম. বি. বি. কলেজ, আগরতলা, পশ্চিম ত্রিপুরা

সারসংক্ষেপ: প্রকৃতির নিসর্গতাকে নিবিড়ভাবে অনুভব করেননি এমন কবির

সংখ্যা বোধহয় কমই আছেন, কেউ কেউ তো প্রকৃতির মধ্যেই মুক্তি খুঁজে পেয়েছেন। আবার কোনো কোনো কবির কবিতায় প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বুদ্ধদেব বসু একবার বলেছিলেন যে 'কোন কবির কবিতা সেইখানেই সবচেয়ে সফল যেখানে কবিতায় প্রকৃতির বর্ণনা রয়েছে'। উত্তরপূর্বের বাংলা সাহিত্যে কবি হিসাবে গোবিন্দধরের খ্যাতি যথেষ্ট সম্মানের মর্যাদা রাখে। রূপময় ত্রিপুরার অন্যতম শ্রেষ্ঠকবি গোবিন্দ ধর বাংলা কাব্যে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। তিনি ছিলেন বাংলাকাব্যে আধুনিকতার পথিকৃতদের মধ্যে অন্যতম। তার কাব্যের বিষয়বস্তু হল প্রকৃতি ও প্রেম। এই কাব্যকলার অসাধারণ তত্ত্বই তাকে বৈচিত্র্য ও গভীরতা দান করেছে।

মূলশব্দ: প্রকৃতি, নিসর্গ, প্রেম, জল, নদী।

ভূমিকা: "আপন অন্তরের একনিষ্ঠ খননকর্মী হয়ে কবি গোবিন্দ ধর প্রকাশিতব্য 'দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি', একা' কাব্যগ্রন্থে নিজেকেই যেন বারবার আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। সুখের কথা, আশা ও আশ্বাসের কথা, কবির কবিতা একান্ত ব্যক্তিগত স্তরে আবদ্ধ হয়ে থাকেনি। বহুবহু পাঠকের ব্যক্তিগত জীবনদর্শনের সংগে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে এবং এখানেই কবি গোবিন্দধর একজন সৎ কবি, প্রকৃত কবি হিসেবেই 

৩১৭

... নীড় নেই

বাসায় ফেরা নেই

পরিযায়ীর মত উড়তে উড়তে

একদিন ভিনদেশে চলে যাই।' (জলঘর)

সমস্ত পরকীয়া এভাবেই যেন হয়, নিজস্ব দেশ থেকে অন্যদেশে গিয়ে জীবনের জাসদ খুঁজে নেওয়া। এই কবিতায় পাখিদের যেমন বাসায় ফেরা নেই, পরিযায়ীর হতো উড়তে উড়তে পাখিরা একদেশ থেকে অন্যদেশে চলে যায়, কবির মন ও সংগার জীবন থেকে বেড়িয়ে অন্য জগতে চলে যেতে চায় যেখানে শুধু ভালোবাসার মানুষ থাকবে, যাকে নিয়ে ভিনদেশে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়েছে কবির। যেকোন মানুষ তার জীবনে সমস্ত কর্মব্যস্ততা, অবসন্নতা ক্লান্তিকে পিছনে ফেলে দিয়ে নিজের মুখোমুখি হতে চায়। দুরন্ত পিপাসায় প্রকৃতির রীমাহীন পথে পরিযায়ীর মত কবি ঘুরে বেড়াতে চেয়েছেন। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে দুঃসহ যন্ত্রনাকে পিছনে ফেলে নতুন পথের সন্ধান করে চলেছেন। প্রকৃতির কোমলতায়, প্রেমে, জীবনের চরম বিস্তারে শুভ্র নবকায়ায় জন্ম দেয় নতুন প্রাণের।

'জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা বাঘ, বাঘ নয়,

মানুষকে বড় ভয়

তারা জঙ্গলে থাকে না। (শিরোনাম নেই)

সংঘর্ষে ভরা এই পৃথীবিতে এখন আর বাঘকে দেখে ভয় লাগে না, মানুষদের ভয় করে তারা জঙ্গলে থাকে না। মানুষ আর পশু- এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে জর্জরিত হয়েছে কবি গোবিন্দ ধরের কবি মানস, ভারাক্রান্ত হয়েছে কবিমন। দিশেহারা কবি চেতনে অবচেতনে সংকট মুক্তির পথ খুঁজতে চেয়েছেন এই প্রকৃতির কাছে-

'প্রতিদিন একটু একটু পুড়ি

প্রতিদিন।

পুব-পশ্চিম ঘুরি।

প্রতিদিন মরূমায়ায় হাঁটি

প্রতিদিন কামড়ে ধরি মাটি'। (প্রতিদিন)


৩১৮

উদ্দালক

এখানে মূলত জীবন সংগ্রামের কথা, জীবনে চলতে গিয়ে যে অভিজ্ঞত হয় তারপরে ও নিজস্ব সত্তাকে হারাতে চায় না মানুষ। একটু একটু সংসার জীবনে নিজেকে পুড়ানো যেন মরূমায়ায় হাটার মত প্রতিট মাটিকামড়ে ধরে রাখতে চায়। আমাদের পরিচিত বিভিন্ন শব্দকে কবি কবিতা এমন ভাবে ব্যবহার করেন যে পরিচিত শব্দ ও তার নিজস্ব সীমা অতিক্রা করে আমাদের শব্দাতীত জগতে নিয়ে যায়। আর তখনই তা কবিতা হয় ওঠে। শব্দের এই সীমানা অতিক্রম করার ক্ষমতাই হল ব্যঞ্জনা। যেমন গোবিয় ধরের 'স্বদেশ মালা' কবিতার এই পঙতি পাঠকের মন ছুঁইয়ে যায়। 'তোমার কাছে আকাশ ছিলো

পাখি ছিল উড়তে দিলে কই? তোমার কাছে সব থেকেও রিক্ত আমি জলের মাঝে জলকষ্ট সই।' (স্বদেশ মালা)

এখানে 'পাখি' তার সাধারণ অর্থের সীমা অতিক্রম করে পৌঁছতে চেয়েছে অন

এক প্রতীকে বা দ্যোতিতে। এখানে 'পাখি' হয়ে উঠেছে স্মৃতির চিহ্নায়ক ব

প্রতীক। কবিতা শব্দ তীর রহস্যময়তায় পৌঁছানোর জন্য আশ্রয় নেয় বিভিন্ন ইঙ্গিতের, ব্যঞ্জনায়, প্রতীক ও চিত্রকল্পের। প্রতিটা মানুষের কাছে বাঁচার প্রেরণা থাকে কিন্তু বাস্তবে যদি সেই চাওয়ার মতো ঠিক ভাবে না পায় সেই প্রসঙ্গেই কবি বলেছেন জলের মাঝে থেকেও জলকষ্ট সইতে হচ্ছে। গোবিন্দ ধরের কবিতায় আমরা ফিরে পেলাম প্রকৃতির প্রতি তীব্র ভালোবাসা ও এক মরমী টান ও তার কাছে ফিরে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা। প্রকৃতির প্রতি এই টান ও আত্মনিবেশী মনন কাজ করেছে সময় ও সমাজের

গ্লানি, বৈকল্য, নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা, দহন, অস্থিরতা থেকে মুক্তি

পাওয়ার পথ হিসেবে। প্রকৃতির সঙ্গে তিনি মিশে যেতে চেয়েছেন-

'দূর থেকে ভেসে আসে বাউলের তান

টগর মালতী গন্ধ বাতাসে ভাসমান,

কোকিলের দরবারী মৌতাত প্রকাশের ভাষাহীন

গ্রামছাড়া আর কোথা আছে প্রাণ'?


৩১৯

পৈর মালতীর গন্ধ, কোকিলের গান, গ্রামের মুগ্ধতা এসব কিছুই মানুষকে প্রতছানি দেয় নতুন উদ্যমে বাঁচার। কর্মব্যস্ত মানুষ ক্লান্ত হয়ে প্রকৃতির কাছেই যেন আশ্রয় নেয়। ঠিক যেভাবে প্রকৃতির নিয়মে সকালে সূর্য উঠে সন্ধায় সূর্য অস্ত যায়। সেভাবে সুখ-দুঃখ, ভালোলাগা মন্দলাগা জীবনে এসে ভীড় করলেও নতুন আশার আলো দিকেই ধাবিত হয় মানুষের মন। মানব চেতনার সঙ্গে প্রকৃতিকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। মানুষ ও প্রকৃতির এক নিবিড় সহাবস্থান রয়েছে কবি গোবিন্দ ধরের কবিতায়। কবি গোবিন্দ ধরও তাই অনেক কর্মব্যস্ততার মাঝে ও সময় খুঁজে হারিয়ে যেতে চেয়েছেন প্রকৃতির নিবিড় ডাকে সাড়া দিয়ে-

'দিনে দিনে প্রতিদিন বিশ্বাস ভেঙে যায় যদি বলি পাপ এসব মিথ্যা আস্ফালন, আমাদের বৈরাগ্য হয়, চেতনার সন্নাস হয় (লিপি সংকেত)। প্রিয়জনের প্রতি বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার প্রসঙ্গে কবি উক্তিটি করেছেন। যতটুকু পাওয়ার ইচ্ছে ছিল ততটুকু না পাওয়ার জন্য বিশ্বাস ভঙ্গ হতে পারে অথবা একজন আরেক জনকে ঠকানোর জন্য ও বিশ্বাস ভঙ্গ হতে পারে। যখন কিছুই পাওয়ার থাকে না তখনই মানুষ বৈরাগ্যের আশ্রয় নেয়, চেতনায় সন্নাস হতে চায়। শেষপর্যন্ত এই একাকীত্ব ও দোলাচলতাকে তিনি বরণ করেন-

'ভেতরে ভেতরে নিক্কনের শব্দ বাজে বাইরে আমি একা সমস্ত দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি একা, একা'

(দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি একা)।

'দ্রোহবীজ' কথার অর্থ হল প্রতিবাদ। প্রতিবাদটাকে যখন বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখে মানুষ তখন তার বুকের যন্ত্রণাটা হয়তো প্রকাশ পায় না নূপুরেরধ্বনির মতো ভেতরে ভেতরে তখন ঝাঝরা হয়ে যায়। বিশ্বাস নাই, প্রেরণাও নাই তখন প্রতিবাদ হয়তো থাকে কিন্তু প্রতিবাদ সে করে না। তাই কবি বলেছেন দ্রোহবীজ পুঁতে রেখেছেন একা।

'পথে নামি, পথ হারিয়ে যায় প্রদর্শক পথ বাতলে দাও

আবহমান পথিক থাকি। (পথিক)
৩২০

গোবিন্দ ধরের কবিতায় তাই ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে, কাল থেকে কালোবা দেশ থেকে দেশোত্তরে মুক্তি প্রধান প্রসঙ্গ। তার কবিতায় দেখি খন্ডকালার তিনি দাঁড় করিয়ে দেন অখন্ড কালের মাঝে। ফলে গোবিন্দ ধর সমস্ত খরাতে আত্মদংশন, আত্মসমালোচনা, আত্মবঞ্চনাকে উপেক্ষা করে আত্মবিস্তারের পাত্রে নিজেকে চালিত করেছেন। কল্পনা আর বাস্তবের দোলাচলে, সুখ আর দুধের বুননে কবি গোবিন্দ ধরের অনেক কবিতাই মূর্ত হয়ে উঠেছে। সম্পূর্ণভাবে কিছু না পাওয়ার বেদনা, কখনো প্রেমের অস্তিত্বের অসহ্য বিমুড়তাও ভাষা পেয়েছে তাঁর কবিতায়-

'আপনি মায়ামৃগ

ছুট ছুট

পিছে আছি- রামচন্দ্র

মায়া দেখব।' (কথকতা)

এই কবিতাটিতে কবি রামচন্দ্রের মতোই ভুল করেছেন মায়ামৃগ দেখে। শ্রীরামচন্দ্র যেমন মায়ামৃগ দেখে পিছন পিছন ছুটেছিলেন সীতাকে খুশি করবে বলে কবিও নিজের জীবনে মায়ামৃগের মায়া দেখার জন্য পিছন পিছন ছুটেছিলেন। প্রকৃতির বিষয় যখন আসে তখন নদী যেন আরো মনোরম হয়ে উঠে কবির লেখনীতে। কবি গোবিন্দ ধর ও তার কবিতায় নদী প্রসঙ্গে বলেছেন-

'আমার ছোটবেলার নদী জুরি

বয়ঃসন্ধির নদী মনু

ভাটি বয়সের নদী দেও'।

কবির জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় ত্রিপুরার এই তিনটি নদী সুগভীর

রেখাপাত করেছে।

'এই তিনটি নদী অর্থাৎ ত্রিবেণী সঙ্গমের সাথে কবির আজীবন সখ্য যা তাঁর মনন জমিন তৈরীতে অসামান্য ভূমিকা পালন করে চলেছে। অসামান্য ভুমিকা পালন করে চলেছে নদী মনুর সাথে জড়িয়ে থাকা দুটি ছড়া- রাতাছড়া ও আনুয়ারা ছড়া। এগুলি যেন কবির কাছে শুধু নদী কিংবা ছড়া নয়। এরা কবির কাছে হয়ে উঠেছে মানব মানবী কবিতাপুরুষ ও কবিতানারী'। 8

কবি গোবিন্দ ধরের কবিতায় প্রকৃতির বৈচিত্রের পাশাপাশি প্রকৃতির বিভিন্ন রূপ রয়েছে। তাঁর নিজস্ব দৃষ্টি ও অপরূপ সৃজনীশক্তি সবকিছু কে


২১.
 রূপান্তর ঘটাইট

সক্ষম হয়েছিলেন। বিশ্বসাহিত্যের অন্যান্য রোমান্টিক কবিদের মতো তিনিও প্রকৃতির মধ্যে রোমান্স সৃষ্টি করেছেন, প্রকৃতি ও প্রেমের মধ্যে সাঁকো দৌরে রোমান্টিক-আবহ সৃষ্টি করে চমৎকার সাহিত্যিক পরিবেশ নির্মাণ করেছেন। কবি গোবিন্দ ধরের আনুয়ারা নামের মেয়েটি' নামক কাব্য গ্রন্থে শিরোনাম হীন আঠারোটি কবিতা রয়েছে। এই কবিতায় আনুয়ারা নামের একষ্টে গ্রামের মেয়ের আত্মহত্যার বিষাদময় কাহিনী মূল আলোচ্য বিষয়। কবি

লিখেছেন-

'আনোয়ারা একটি নদী ও মেয়ে তার চিৎকার শুনি মাঝরাতে তিরতির তার কল্লোল বজ্র নির্ঘোষ'।

এখানে লোকমুখে চর্চিত আনোয়ারা বেগম নামী জৈনক কুমারী মেয়ে ভালোবেসে ছিল হিন্দু যুবককে। কিন্তু সমাজের চোখে সে অপরাধী। আনুয়ারা ধর্ষিত হয়। সমাজের কাছে ভালোবাসার কাছে হার মেনে মেয়েটি আত্মহত্যা করে এই ছড়ায়। কবির ভাবনায়-

"নিখাদ ভালোবাসা যেন নিখাদ মাটির মতো মিশে যায় ঘোলা জলে। ভালোবাসার কোন ধর্ম নেই। ভালোবাসা সর্বদা ভালোবাসাই। তার রঙ নেই। সে আউলিয়া। একবুক আগুনের প্রজ্বলিত লুকা। তাকে ঘিরে উড়তে থাকে স্বপ্ন সম্ভার পাখী। কিন্তু কেউ একজন কেড়ে নেয় মেয়েটির সকল পাখি। এপাখি কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারোর থাকতে পারে না। না না। এ কবিহৃদয়ের আর্তি আমাদের নিয়ে যায় আনুয়ারার আর্তির কাছে"।"

উত্তরপূর্বের বাংলাসাহিত্যে কবি হিসাবে গোবিন্দ ধরের খ্যাতি যথেষ্ট সম্মানের মর্যাদা রাখে। রূপময় ত্রিপুরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি গোবিন্দ ধর বাংলা কাব্যে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। তিনি ছিলেন বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃতদের মধ্যে অন্যতম। তার কাব্যের বিষয়বস্তু হল প্রকৃতি ও প্রেম। এই কাব্যকলার অসাধারণ তত্ত্বই তাকে বৈচিত্র্য ও গভীরতা দান করেছে। এছাড়াও তার বিভিন্ন গ্রন্থে শিল্পী শৈলী ও বর্ণাঢ্য চিত্রকল্পের মাধ্যমে প্রকৃতি ও প্রেমের নানাদিক উদ্ঘাটিত হয়েছে। গোবিন্দ ধরের কাব্যের নিঃসঙ্গ বিষন্নতা, ইতিহাসচেতনা এবং বিপন্ন মানবতার ব্যাথা তার স্বকীয় বিশিষ্টতা নিয়ে স্থান লাভ করেছেন।

উদ্দালক-২১
২২

উল্লেখপঞ্জি:

১। ধর, গোবিন্দ, দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি, একা, স্রোত প্রকাশনা, ২০১২।

২। ধর, গোবিন্দ, 'জলঘর' কবিতা প্রতিমাসে, কলকাতা, ২০০৭, পৃঃ ২।

৩। বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. অসিতকুমার, 'বাংলাসাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত', মডার্ন বুক এজেন্সি, পুনর্মুদ্রণ, ২০০৮-৯, পৃ. ৪৪১-৪২।

৪। বৈরাগী, হারাধন, 'গোবিন্দ ধরের নদী নদীর গোবিন্দ', ঊনকোটি ত্রিপুরা, কলকাতা বইমেলা, ২০২৩, পৃ. ৫৭।

৫। বৈরাগী, হারাধন, 'গোবিন্দ ধরের নদী নদীর গোবিন্দ', ঊনকোটি ত্রিপুরা, কলকাতা বইমেলা, ২০২৩, পৃ. ৯৯।

গ্রন্থপঞ্জি:

১। ধর, গোবিন্দ (২০০৬), জলঘর: কবিতা প্রতিমাসে।

২. ধর, গোবিন্দ (২০০৭), সূর্যসেন লেন, স্রোত প্রকাশনা।

৩. ধর, গোবিন্দ (২০১২), একা, পুঁতে রাখি দ্রোহবীজ, স্রোত প্রকাশনা।

৪. ধর, গোবিন্দ (২০১৪), শ্রীচরণেষু বাবা, সরট প্রকাশনা।

৫. ধর, গোবিন্দ (২০১৮), দেওনদীসমগ্র, স্রোত প্রকাশনা।

৬. বৈরাগী, হারাধন (২০২৩), 'গোবিন্দ ধরের নদী নদীর গোবিন্দ', কলকাতা বইমেলা: ঊনকোটি ত্রিপুরা।

৭. বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. অসিতকুমার (২০০৮-৯), 'বাংলাসাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত', কলকাতা: মডার্ন বুক এজেন্সি।

0 Comments