নদ নদী বিষয়



[10/11/2019, 7:01 pm] GOBINDA DHAR: দেওনদীর জল:কবি ও গল্পকার পদ্মশ্রী মজুমদার
আলোচনা :সেবিকা ধর

 কথাসাহিত্য  বড়ো শিল্পাজ্ঞিক।একে অস্বীকার করার ক্ষমতা কারো  নেই।আমরা আজকে যাদের  নিয়ে কথা সাহিত্যের পাঠ  শুনবো  তারা অত্যন্ত  সতর্ক  বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সৎ ভাবে কাল ও শিল্প সচেতন সুহৃদ মনন নিয়ে এগিয়ে চলছেন কালের স্রোতে।
ত্রিপুরার অন্যতম কথা সাহিত্যিক  পাদ্মশ্রী মজুমদার।প্রতিবাদী  সংঘাত সংগ্রাম  দ্বিধা  দ্বন্ধ অস্থির সময়ের পাঠ থেকেই যার  লেখনি নদীর স্রোতের বিরুদ্ধে তরঙ্গ বিক্ষোভে প্রবাহিত। যাতে  বিদ্রোহ  নয় আছে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের কাহিনী। আছে নিজেকে উজাড়  করে দিয়ে সমাজকে মুক্তির  পথ খুলে দেবার আপ্রাণ  প্রচেষ্টা।  লেখিকার জুম, কৃষ্ণাবয়ব,রঙিলা ও অন্যান্য  গল্পে আমরা তার প্রতিচ্ছবি  দেখতে পাই।এরকম একজন গল্পকারের হাত ধরেই ডহরলাগা জল জীবনের গল্প "দেওনদীর জল"।

নারীর চোখে নদী কেমন?
যেখানে নদী আর নারী সমান
নদীর বুকে কলকল জল বয়
গহনে ডহরলাগা ঘোর
নদী ও নারী তাই
চির রহস্যময়।
তার প্রথম উপন্যাস
[11/11/2019, 5:58 am] GOBINDA DHAR: "নদীই সাক্ষী থাকে প্রকৃত প্রেমের"

মিলনকান্তি দত্ত

আঠারোটি শিরোনামহীন কবিতার সংগ্রহ। কবিতাকৃৎ গোবিন্দ ধরের "আনোয়ারা নামের মেয়েটি"। কবিতাগুলি সংখ্যাচিহ্নিত,
শিরোনাম না থাকলেও বোঝা যায়,প্রতিটি
কবিতার কণ্ঠস্বর আনোয়ারা। "আনোয়ারা"
আরবি শব্দ,অর্থ আলোর মালা। শুভদীপ
সেনশর্মাকৃত নামলিপি চমৎকার ! আরবি
হরফের ডৌল অথচ জলের উপর নাচকুশল
আলোছায়ার বিভঙ্গ। একটি ছড়ার নাম
"আনুয়াছড়া"। আনোয়ারা নামের একটি
মেয়ের আত্মহত্যার গল্প হয়ে স্রোতস্বিনী
বিষাদকবিতা। সমাজচৈতন্যের কবি তাই
তাকে নিয়ে রচনা করেছেন কিছু কবিতা।
খুবই বক্তব্যধর্মী। হয়তো কবিতার গহনধর্মে
ততোটা শ্লোক হয়ে ওঠেনি,কিন্তু কবির প্রেম
ও প্রতিবাদের একটা মূল্য আছে। "আনোয়ারা একটি নদী ও মেয়ে। /তার
শিৎকার শুনি মাঝরাতে। /তির তির তার
কল্লোল বজ্রনির্ঘোষ।"আলোর মালা পরতে
চেয়েছিল যে মেয়ে আনোয়ারা, "একটি
মেয়ে শুধু নয়/একটি সময় একটি সকাল"_
অথচ সে বিষাদবালিকা,তার ওষ্ঠে তিল ছিল,
তারই বিস্ফোরিত তিমিরে সে ঝাঁপ দিয়ে
চির তলিয়ে গেল ! "নদীও নারীর মতো"
নদীমাতৃক কবির বোধে তাই জেগে থাকে
আনোয়ারামিথ। কবিতাগুলো পড়তে ভালোই
লাগে। ব্লার্বে সেলিনা হোসেনের কথা এবং
নির্মলেন্দু গুণের পোট্রেট থেকে গৃহীত
প্রচ্ছদছবি এ বইয়ের অনন্য বৈভব।

স্রোত প্রকাশনার বই ।। মূল্য ৪০টাকা
[11/11/2019, 3:48 pm] GOBINDA DHAR: ছবিমুড়ার পথে


চিরশ্রী দেবনাথ 


পশ্চিমবাহিনী গোমতী নদী
সকালের  সূর্য নারীর  মতো মিশে যাচ্ছে জলে
এই জলপথে ছবিমুড়া যাওয়া যায়
কোন সে যুগ, আদিমতর, নিভৃত গুহাপ্রাসাদ  
কেমন ছিলেন রাজা চিচিং হা
রাণীর প্রসাধনে নাগকেশরের সুগন্ধি পাহাড় খুঁজে আনা, 
হাতির দাঁতের শ্বেত মাদুলি যেন  তামাটে নগ্ন গ্রীবায়  লালিত বৃংহণ। 
যেসব দিনে কালবৈশাখী উঠত, ছুট লাগাতো ডিঙি নৌকোর দল,
জোড়া ভৃঙ্গরাজ  পাখির বিপন্ন ডাকে, টালমাটাল বিকেল
...আর  দুজন জুমঘ্রাণ লাগা তরুণতরুণী, 
যারা বৈভব দেখেনি কোনদিন, 
বজ্রবিদ্যুত আর বৃষ্টিকে রত্নরাজি মনে করে  দেহে মেখে নেয় শুধু
তাদের বুকে দ্রোহের জন্ম এভাবেই... মাংসল, নরম আমিষ অন্নের মতো
দেবী চাকরাকমা হাসতেন, সাপের মুকুটে প্রশ্রয়ের অঙ্গরাগ, খসখসে তলপেট, কঠিন স্তন। 
সন্তানকে জড়াতে শেখেননি, দিয়েছেন শুধু যুদ্ধে ঠেলে  শতকের পর শতকে
এখন রাজা নেই,  রাণী নেই।
 ছমছমে গুহাটি আছে, সাপুড়ের লোভী বিন্, রহস্যের বাতায়ন। 
দুদিকের পাহাড়ে অন্ধ দেবমূর্তি, গ্রামের   জমাতিয়া বধূূর  মতোই তারা হলুদবরণ, চুপচাপ, 
নিবিড় দারিদ্র্য, মীন আর বাঁশকরুলের মশলাহীন যাপন শুধু  সন্ধ্যা ডেকে আনে । 
গোকুল রাগ বাজছে তবু, শামুকচী পক্ষী চলেছে অভিসারে, গোমতীর তীরে একটি দুটি  গাইরিং ... সবুুুজের হৃদয়ে  জলন্ত পলাশ , 
আসছে গড়িয়া পুজো
পাহাড়ের গায়ে জুমের ক্ষত হবে, বনমুরগী পোড়া  গন্ধে ফসলের আহ্বান । 
এই নির্জন পর্যটনে জনজাতি বৃদ্ধের  সারেঙ্গীর  সুুুর, 
আমাদের দিয়ে যাচ্ছে শ্লেষের আবহসংগীত ...টাক্কলের ধারালো হাসি
এখনও তাকে দেখলে মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক নর,
 সভ্যতা তার কাছ থেকে অনেক দূরে কেবলি পালিয়ে যায় শূকরীর মতো থপথপে পায়ে

[বাংলা সাহিত্যে​ নদ নদী কেন্দ্রিক সাহিত্য চর্চা 

গোবিন্দ ধর



 প্রাচীন সভ্যতাগুলো যেমন ছিল নদীকেন্দ্রিক তেমনি সাহিত্যের আদি নিদর্শনে নদী তার গতিময়তায় কবিতা-গানে প্রাণ দান করেছে। শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বিদেশি সাহিত্যেও নদী গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। মানুষের জীবনযাপন, সভ্যতার বিকাশ ও ঐশ্বর্যনির্মাণ, ইতিহাস, আন্দোলন-সংগ্রাম-সবকিছুতেই নদী দৃঢ়তর ভূমিকা পালন করে। মানুষের জীবনে নদী কখনো বন্ধু, কখনো ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ ও ধ্বংসকারী। নদীকে এড়িয়ে মানুষের জীবন গড়া ও সভ্যতার ঐশ্বর্য নির্মাণ অকল্পনীয়। নদীভিত্তিক আঞ্চলিক বিভিন্ন উপন্যাসে এ সত্য নানাভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। নদী ও মানুষ একে-অপরের সম্পূরক। বিভিন্ন উপন্যাসে এই​ সত্যতা ধরা পড়েছে বিভিন্ন রূপে।

 প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা সাহিত্যে নদী একটি অপরিহার্য বিষয়। সাহিত্যের প্রত্যেকটি শাখাতেই​ তার উপস্থিতি। নদীবিহীন জীবন যেমন বাঙালির কাছে অকল্পনীয়, সাহিত্যেও নদীর ভূমিকা যেন একই সত্য ধারণ করে রয়েছে। ‘চর্যাপদ’, ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য’, ‘মহাভারত’, ‘মনসামঙ্গল কাব্য’, ‘চণ্ডীমণ্ডল কাব্য’, ‘অন্নদামঙ্গল কাব্য’, ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’, ‘মেঘনাদবধ কাব্য’, ‘ব্রজাঙ্গনা’, প্রভৃতি কাব্যে নদী কোন না কোন ভাবে স্থান গ্রহণ করেছে। এই​ সকল সাহিত্যে নদী এসেছে নানাভাবে, বিচিত্র রূপে।


নদী কেন্দ্রিক উপন্যাস

রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন​ রচনায় নদীর​ প্রভাব :

নদী রবীন্দ্র-সাহিত্যের বিস্তৃত অংশ দখল করে রয়েছে​। ‘আমাদের ছোট নদী’র মতো শিশুতোষ রচনা কেবল নয় বাংলাদেশের পদ্মা নদী এবং শান্তিনিকেতনের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া কোপাই অথবা কলকাতার গঙ্গা নদীর সঙ্গে বিশাল ব্যাপ্ত শিল্পজগৎ গড়ে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের। 

বাংলাদেশে থাকার সময় শিলাইদহের প্রবাহিত ‘পদ্মা’ বা ‘গড়াই’ নদীর অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কবিকে মোহিত করে রেখেছিল। ‘পদ্মা’ নদী ছিল তাঁর শিল্পসাধনসঙ্গী। এই পদ্মাতীরে বসেই কবি তাঁর অন্তর্নিহিত কবিধর্মকে আবিষ্কার করেছেন। পদ্মার কলধ্বনিতে শুনেছেন বাংলার জনজীবনের কোলাহল। 

 শিলাইদহের যে রূপবৈচিত্র্য, তার মধ্যে পেয়েছিলেন তিনি লেখার অনুকূল পরিবেশ। নদীকে কেন্দ্র করে বিপুল সৃষ্টির উপকরণ অর্জিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের জীবনে। প্রমথনাথ বিশী‘ছিন্নপত্র’কে ‘পদ্মার মহাকাব্য’ বলে অভিহিত করেছেন। ভরা বর্ষায় দুকূলপ্লাবিনী পদ্মার কাছে রবীন্দ্রনাথ খুঁজে পেয়েছেন জীবনের আশ্বাস, এগিয়ে চলার মন্ত্র। ‘সোনার তরী’, ‘চিত্রা’, চৈতালী’র মতো কাব্য গড়ে উঠছে এ-সময়। 

নদীকে কেন্দ্র​ করেই গড়ে উঠেছে তাঁর অজস্র গান। ‘ছুটি’ গল্পের  ফটিক, ‘সুভা’ গল্পের সুভা বা ‘সমাপ্তি’ গল্পের ‘মৃন্ময়ী’কে তিনি পেয়েছেন নদীর তীরেই। ‘পোস্টমাস্টার’, ‘মেঘ ও রৌদ্র’ বা ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এর মতো গল্পের সৃষ্টিও পদ্মার পারেই। ‘দেনাপাওনা’, ‘শাস্তি’, ‘স্বর্ণমৃগ’ গল্পের সৃষ্টির পেছনে রয়েছে পদ্মাপাড়ের জনজীবন। ঔপন্যাসিক রবীন্দ্রনাথের একটি উপন্যাসের নাম ‘নৌকাডুবি’। নদীতে নৌকাডুবির ফলে সৃষ্ট জটিলতায় আখ্যান এগিয়েছে এখানে।



*
নদ নদী কেন্দ্রিক উপন্যাস:

 নদীকেন্দ্রিক আঞ্চলিক উপন্যাস, যা বাংলা উপন্যাস-সাহিত্যে এক উজ্জ্বতর যোজনা। বাংলা সাহিত্যের নদীকেন্দ্রিক উপন্যাস কম লেখা হয়নি। লেখক সহ সেই উপন্যাসগুলোর নাম নিম্নে দেওয়া হলো:

বাংলা সাহিত্যে​ নদী কেন্দ্রিক বিভিন্ন উপন্যাস :
১. বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় : ‘ইছামতী’(১৯৫০)

২. তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় : ‘কালিন্দী’(১৯৪০),  ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’(১৯৪৭)

৩. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ‘পদ্মা নদীর মাঝি’(১৯৩৬)

৪. অদ্বৈত মল্লবর্মণ : ‘তিতাস একটি নদীর নাম’(১৯৫৬)

৫. সমরেশ বসু : ‘গঙ্গা’(১৯৫৭) 

৬. দেবেশ রায় : ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’(১৯৮৮)

৭. অমরেন্দ্র ঘোষ : ‘চর কাশেম’(১৯৫৬)

৮. অমিয় ভূষণ মজুমদার : ‘গড় শ্রীখণ্ড’(১৯৫৭)

৯. প্রফুল্ল রায় : ‘কেয়া পাতার নৌকা’(২০০৩)

১০. সাধন চট্টোপাধ্যায় : ‘গহীন গাঙ’(১৯৮০)

১১. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ : ‘কাঁদো নদী কাঁদো’(১৯৬৮)

১২. হুমায়ুন কবীর : ‘নদী ও নারী’(১৯৪৫)

১৩. সুবোধ বসু : ‘পদ্মা প্রমত্তা নদী’

১৪. প্রমথনাথ বিশুই : ‘পদ্মা’

১৫. নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায় : ‘মহানন্দা’

১৬. সরোজকুমার রায়চৌধুরী ; ‘ময়ুরাক্ষী’

১৭. বলরাম দাস : ‘মৎস্যগন্ধ্যা’

১৮. বোধিসত্ব মৈত্র​ : ‘ঝিনুকের পেটে মুক্তো’

১৯. চিত্ত সিংহ : ‘ঈশ্বর পাটণী’

২০. মনোজ বসু : ‘জলজঙ্গল’

২১. আব্দুল জব্বার : ‘ইলিশ মারির চর’

২২. আবু ইসহাক : ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’

(২৩)লোহিত পারের উপকথা:সমর দেব

(২৪)ইন্দিরা ওভারব্রীজ:নির্মল চৌধুরী

(২৫)গাঙগাঁথা:ঝুমুর পান্ডে

(২৬)সুরমা নদীর চোখে জল:ইমাদ উদ্দীন বুলবুল

(২৭)সুরমা গাঙের পানি:রণবীর পুরকায়স্থ 

(২৮)গোমতী:সুধাংশুবিকাশ সাহা

(২৯)সদাপূরাণ:অশোক দেব(২০১৮)

(৩০)দেওনদীর জল:পদ্মশ্রী মজুমদার(২০১৯)

(৩১)নদী থেকে হৃদয়ে:জহর দেবনাথ

(৩২)হৃদয় থেকে রাইমা:হারাধন বৈরাগী(২০১৯)

(৩৩)পোকা মাকড়ের ঘর সংসার:সেলিনা হোসেন

(৩৪)হাঙর নদী গ্রেনেড:সেলিনা হোসেন

(৩৫)জলপুত্র:হরিশংকর জলদাস

(৩৬)কৈবর্তজীবন:হরিশংকর জলদাস

(৩৭)জাল থেকে জালে:নূর উদ্দীন জাহাঙ্গীর

*
ত্রিপুরায় অনুগল্প ছোটগল্প 
জলকন্যা:চৈতন্য ফকির 
ছবিমুড়ার পথে:চিরশ্রী দেবনাথ

*
ত্রিপুরার কবিদের নদ-নদী বিষয়ক কাব্য সংকলন

(১)নদীমাতৃক:সন্তোষ রায়
(২)বিপিন মাঝির নাও:দিলীপ দাস
(৩)আনোয়ারা নামের  মেয়েটি :গোবিন্দ ধর
(৪)দেও:পদ্মশ্রী মজুমদার 
(৫)দেওসমগ্র:চৈতন্য ফকির


অপ্রকাশিত

(১)মনুখণ্ড সিরিজ:গোবিন্দ ধর
(২)


*
ত্রিপুরার নদ-নদী বিষয়ক প্রবন্ধ 

(১)মূক ফেণীর মুখর পাঁচালি:অশোকানন্দ রায়বর্ধন
(২)হাওড়ার ধারা:দিলীপ দাস
(৩)গোমতী উৎস থেকে মোহনা:তাপস দেবনাথ 
(৪)ফেণী একটি নদীর নাম:ড.রঞ্জিত দে
(৫)মুহুরীতটের জনপদ ও রঘুনম্দন পাহাড় :মাধুরী লোধ 
(৬)মনুনদী লোককথা,ইতিহাস ও স্মৃতিতে উজ্জ্বল আমার অবগাহনবেলা:গোবিন্দ ধর
(৭)ডহর হাওয়রের সন্ধানে :কল্যাণ চক্রবর্তী 
(৮)উদয় পুরের দীঘি,ছড়া,পুকুর ও জলাসয়:দেবাশিষ লোধ
(৯)ত্রিপুরার উপন্যাসে নদী:শ্যামল বৈদ্য
(১০)ত্রিপুরার বাংলা কবিতায় নদী প্রসঙ্গ:জ্যোতির্ময় দাস
(১১)দক্ষিণের মনু নদী কথা:উজ্জ্বলা দে
(১২)ধলাই নদী অঞ্চল আগে ও পরে:সোমা দাস
(১৩)রুদিজলার সাতকাহন:উত্তম সাহা
(১৪)সিগ্ধ-সুধা প্রবাহিণী লাউগাঙ নদী:তারাপ্রসাদ বণিক
(১৫)দেও নদীর পথে প্রান্তরে:পদ্মশ্রী মজুমদার
(১৬)নদীকথা:প্রসঙ্গ খোয়াই নদী:জহরলাল দাস
(১৭)অমরপুরের নদী জলাসয়:ভাস্কর ভট্টাচার্য 
(১৮)MAJOR RIVERS OF TRIPURA AND THEIR TRIBUTARIES:DEBASHIS CHAKRABORTY 
(১৯)বিজনী নদী ও ব্যক্তিগত স্বপ্নপথ:আকবর আহমেদ 
(২০)লঙ্গাই একটি নদীর নাম:প্রদীপ মজুমদার
(২১)মনু নদী কথা:সন্মাত্রনন্দ
(২২)ত্রিপুরার সাহিত্যে নদ-নদী :হারাধন বৈরাগী
(২৩)কবি গোবিন্দ ধর :হারাধন বৈরাগী
(২৪)কবি ও নদী:হারাধন বৈরাগী
(২৫)গোবিন্দ ধরের নদীকাব্য:হারাধন বৈরাগী
(২৬)মনুসমগ্র ও গোবিন্দনদী:হারাধন বৈরাগী
(২৭)জুরী রাতাছড়া আনোয়ারা মনু দেও:হারাধন বৈরাগী
(২৮)দেওসমগ্র ও গোবিন্দ ধর :হারাধন বৈরাগী
(২৯নদীমাতৃক গোবিন্দ ধর :
হারাধন বৈরাগী
(৩০)গোবিন্দ নদী:হারাধন বৈরাগী

*
নদ নদী বিষয়ক কবিতা চর্চায় ত্রিপুরার কবি

 
কল্যাণব্রত চক্রবর্তী 
রামেশ্বর ভট্টাচার্য 
দিলীপ দাস 
অশোকানন্দ রায়বর্ধন
নিয়তি রায়বর্মন
দেবাশ্রিতা চৌধুরী 
নির্মল দত্ত 
অপাংশু দেবনাথ 
গোবিন্দ ধর 
পদ্মশ্রী মজুমদার
চিরশ্রী দেবনাথ 
শচী চৌধুরী 
অভীককুমার দে 
হারাধন বৈরাগী
অমলকান্তি চন্দ 
অনিকেত মৃণালকান্তি
সঞ্জীব দে 
নবীনকিশোর রায়
গোপালচন্দ্র দাস 
সুমনা রায়
সুমিতা বর্ধন
সাচীরাম মানিক 
মুনমুন দেবরায় 
দিব্যেন্দু নাথ
সঙ্গীতা নাথ
[11/11/2019, 5:18 pm] GOBINDA DHAR: কমলিনী উপাখ্যান :পল্লব ভট্টাচার্য 
বুনোগাঙের চর:শ্যামল বৈদ্য

উজানভাটি:শ্যামল বৈদ্য

ইতরবিশ্ব:শ্যামল বৈদ্য

জন্মবদল:শ্যামল বৈদ্য-২০১৮

চাকমা দুহিতা:শ্যামল বৈদ্য-২০১৮

লাল মাটির শিকারী:শ্যামল বৈদ্য:২০১৯

জীবন যেরকম:ননী কর(মৌমিতা)

১৯৮০:অতুল দেববর্মা-(ককবরক)

অচিন বৃক্ষ :হরিভূষণ পাল

যুদ্ধোত্তর:কিশোররঞ্জন দে

নদীর নাম বদলায়:কিশোরঞ্জন দে

ব্যবধান:মানসী চক্রবর্তী -২০১২

জীবনের খোঁজে এক অন্য গল্প :গৌরী বর্মণ (ত্রিপুরা দর্পন-১৪১৯)

তুমি রবে নীরবে এ হৃদয়ে:সেমা গঙ্গোপাধ্যায় -(মানবী-২০১৪)

ঈশ্বরী কথন:সুতপা দাস-২০১৮( গাঙচিল)

সোনার দুয়ারী ঘর রূপার দুয়ারী ঘর:সুতপা দাস-২০১৭

আইলাইনার:দিব্যেন্দু নাথ-(স্রোত:২০১৮)

সাম্যবাদী :জহর দেবনাথ -(স্রোত -২০১৮

চিরন্তন ভাবনা:জহর দেবনাথ

পাহাড়ী ফুল:জহর দেবনাথ

নদী থেকে হৃদয়ে:জহর দেবনাথ(ত্রিপুরা দর্পন)

দেওনদীর জল:পদ্মশ্রী মজুমদার-(স্রোত-২০১৯)

পাতাম কাঠের নৌকা:শুভাশিস তলাপাত্র

পথের প্রদীপ:প্রদীপ আচার্য

বানথাঙি::সুধাংশুবিকাশ সাহা

গোমতী:সধাংশুবিকাশ সাহা

সদাপূরাণ:অশোক দেব-২০১৮(পৌণমী)

অতলান্নতিকা:নন্দকুমার দেববর্মা(পৌণমী)

দূরের কুয়াশা:সূজয় রায়

ঊনপ্রেম:পৃথ্বীশ দত্ত(সোমবার)

অন্য এক নারী :পথ্বীশ দত্ত (প্রয়াস প্রকাশনী)

:বিমল চক্রবর্তী(লিখতে হবে)

:বিমল চক্রবর্তী(লিখতে হবে)

হৃদয় থেকে রাইমা:হারাধন বৈরাগী

উত্তরাধিকার:দেবব্রত দেব(অসমাপ্ত উপন্যাস-সূত্র আজকের ফরিয়াদ)


ত্রিপুরার সাহিত্যের ক্রমাগত বিস্তার করে যাচ্ছেন কথাসাহিত্যিক কবি সকলের সমবেত প্রচেষ্টায়।প্রতিবছর প্রকাশ হচ্ছে নতুন নতুন উপন্যাস।এই তালিকায় লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত সব কটি উপন্যাস  তালিকাভুক্ত করতে পারিনি।সাকুল্যে ত্রিপুরায় ১০০-১৩৫টি উপন্যাসের গল্প শুনা যায়।যা আমার পড়ার বিস্তৃতি কম হেতু সব কটি উপন্যাস তালিকাভুক্ত করতে পারিনি।এখন দেশভাগ,ত্রিপুরার স্থান,নদী-নালা উঠে আসছে উপন্যাসে।


ত্রিপুরার কথাসাহিত্যে অপরিহার্য নাম শ্যামল বৈদ্য।বাংলা সাহিত্যের সাম্প্রতিক মুখ কথাসাহিত্যিক শ্যামল বৈদ্য মহোদয়,কবিতা দিয়ে শুরু করলেও ত্রিপুরার কথাসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। ‘বুনো গাঙের চর’ ‘উজানভাটি’, ‘ইতরবিম্ব’, ‘চাকমা দুহিতা’, ‘জন্মবদল’ আমাদেরকে ঋদ্ধ করেছে।  পেশায় ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। বিগত তিন দশক ধরে লেখালেখির সাথে যুক্ত। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৪টি। তার মাঝে আছে নাটক,কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং ছোটগল্প। 'পরাপর' গল্পগ্রন্থের জন্য ২০১৫ সালে ত্রিপুরা সরকারের 'সলিলকৃষ্ণ দেববর্মন স্মৃতি পুরস্কার’ -এ ভূষিত তিনি। 'অবয়ব' নাটকের জন্য পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ গ্রুপ থিয়েটারের পক্ষ থেকে 'কালীপ্রসাদ চক্রবর্তী স্মৃতি পুরস্কার '। সর্বশেষ সম্পাদিত গ্রন্থ 'ত্রিপুরার সাম্প্রতিক ছোটগল্প 'এ বছর স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। স্বপ্ন দেখেন হিংসা-বিদ্বেষ মুক্ত সুন্দর বিশ্ব। বিশ্বাস করেন ভালোবাসাই হবে জীবনের জীয়নকাঠি। ত্রিপুরার তরুণ তুর্কী সব্যসাচী লেখক শ্যামল বৈদ্যA মহোদয়কে দক্ষিণারঞ্জন ধর স্মৃতি স্রোত পুরস্কারে ভূষিত করা হবে এবছর। তাঁর একটি কথা আমার খুব মনে ধরেছে,"সামাজিক উৎসব বলতে কিছু রিচুয়াল ব্যাপার মানে ক্রিয়াকরম তার সঙ্গে সঙ্গীত, নৃত্য, ভোজন সহযোগে আনন্দ করা বোঝায়। এতে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের উন্নতিও ঘটে। বন্ধন মজবুত হয়। কিন্তু সাহিত্য উৎসব ব্যাপারটা এমন নয়। এখানে মানুষ মানুষের সঙ্গে বিনিময় করেন মেধা, মনন, জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রগতি ও ভাবনা। উদর পূর্তি না হলেও এই উতসবে মানুষ তার সমস্ত খিদেকে  পূরণ করতে পারে।"


শ্রমিকের অর্জিত অধিকারকে অসম্মান করে পৃথিবীর ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়।শ্যামল বৈদ্যের সাহিত্যে 

এসব বারবার ফিরে ফিরে এসছে।দেশকালদেশভাগের যন্ত্রণাবিদ্ধ মানুষের কথা তাঁর উপন্যাসের পরতে পরতে এসছে।  

তিনি ১৯৪২ সালে নোয়াখালি দাঙ্গার পরপরই তাঁর পিতার আজন্মের বাসভূমি ছেড়ে ত্রিপুরাতে প্রবেশ ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরু।এসবই একজন কথাকারকে পুষ্ট করে।লড়াই করতে করতেই সংসার, সন্তান। তাই দারিদ্র্যের কঠোর বাস্তবের মধ্যেই বেড়ে উঠেন আজকের শ্যামল বৈদ্য। নাট্যকার, কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক শ্যামল বৈদ্য-এর জীবনের প্রথমবেলা ছিল প্রচণ্ড জীবন্ত। প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা এক প্রাণচঞ্চল বালক ছিলেন তিনি। ছোটবেলার এই দুরন্ত শৈশবের মধ্যেই লুকিয়েছিল ভাবপ্রবণ, জিজ্ঞাসু একটি মন। তাই তো বন্ধুদের যুক্তিতে সেদিন স্কুলের লাইব্রেরি ঘরের জানালা দিয়ে বন্যায় ভিজে যাওয়া বইয়ের সাথে বাইরে ফেলে দিলেন কিছু ভাল বইও। সেই বইগুলিই ছিল তাঁর জীবনের তুরুপের তাস। তখন থেকেই শুরু বইয়ের প্রতি নেশা, এই নেশাই তাঁকে এগিয়ে দেয় সৃষ্টির কাজে। অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালীনই সাহস করে লিখে ফেললেন একটি উপন্যাস। এর জন্য পড়াশোনা তাঁর থেমে থাকেনি। কর্মক্ষেত্রে একজন সফল ইঞ্জিনিয়ারও তিনি। যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুললেন তাঁর সৃষ্টিশীল জগৎ। পাঠককে তিনি উপহার দিতে লাগলেন কবিতা, নাটক, উপন্যাস ও ছোটগল্প। গল্পগ্রন্থ ‘পরাপর’ ২০১৫ সালে তাঁর ঝুলিতে নিয়ে এল ত্রিপুরা সরকারের ‘সলিলকৃষ্ণ দেববর্মণ স্মৃতি পুরস্কার’। ত্রিপুরার প্রকৃতি, মানুষ, তাদের মনোজগৎ তাঁর ছোটগল্পের আশ্রয়। চারপাশের জগৎটাকে তিনি শুধু দেখেনই না সচেতন প্রয়াসে তোলে আনেন কলমের কালিতে। এ ভাবেই সৃষ্টি হয় তাঁর কাহিনি ও চরিত্র, পূর্ণ হয় পাঠকের ঝোলা।জীবনের পাঠ নেওয়া শ্যামল বৈদ্য পরপর সৃষ্টিতে থেকে আমাদেরকে দিয়ে যাচ্ছেন পরপর, বুনোগাঙের চর,ইতরবিম্ব,উজানভাটি,জন্মবদল,চাকমা দুহিতা,লালমাটির শিকারি"র মতো উপন্যাসগুলো।

আমরা শ্যামল বৈদ্য ঝর্ণা কলম থেকে  সময়ের ধ্বনিবিন্যাস শুনার প্রতিক্ষায় জেগে থাকবো।তাঁর কলম থেকে আমাদের সময়ের ঘোড়াকে সহিস মেরে একদিন অন্ধকার দূর করে আকাশ আলোকিত করার মন্ত্র তিনি লিখে দেবেন পাঠকের জন্য এই প্রত্যাশা আমাদের আছে।

কথাসাহিত্যে শ্যামল বৈদ্য সংকলনটি সামন্য শ্যামল উন্মোচনের প্রচেষ্টা। পাঠকের ভালো লাগলে আমাদেরও ভালো লাগবে।



৩০:০৪:২০১৯
[20/11/2019, 11:09 am] GOBINDA DHAR: কুমারঘাটের সাহিত্যে নদ-নদী 

গোবিন্দ ধর 

চৈতন্য ফকিরের নদীমাতৃক কবিতাটি :

ঘাতক নদীর কাছে উৎস্বর্গ করেছি জল।
তল কই জলের বিবর্ণতা মরুমায়াময়।
জল দাও জল দাও নদীকে বলি।
নদী তার জল নিয়ে মরীচিকাময়।

জল রঙে নিজেকে ডুবাতে গিয়ে
ফিরে ফিরে আসে নদীর ছলনা।
ভুল বানানে লেখা পাঠটিকা সিলেবাস
নদীমাতৃক উপসর্গে হাঁটে বয়স্ক বায়না।

গভীর মায়ার কাছে জীবন উৎসর্গ রাখি
ভাবি মুখের মুখোশ নাই শুধুই মুখ
নদীর নাব্যতাই ভাবি এক জীবনের সব
তারি কাছে খুঁজে খুঁজে হয়রান সুখ।

 বৃহত্তরো মহকুমা কৈলাসহরের এক বর্ধিষ্ণ গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে এক সময় কুমারঘাট বৃহত্তমো জেলা উত্তর ত্রিপুরার জেলা হেড কোয়ার্টার ছিলো কুমারঘাট। তখন ত্রিপুরার রাজ্যপাল বি.কে নায়ার।সম্ভবত তখন ত্রিপুরার প্রথম রাজ্যপাল তিনি।কুমারঘাট হয়ে তিনি কৈলাসহর গিয়েছিলেন।রাস্তা ছিলো তখন এবড়োখেবড়ো। জল জলা ও জঙ্গল ডিঙিয়ে কৈলাসহর থেকে ফিরতে তিনি কুমারঘাট সুশীতল ধরের আপ্যায়নে অবস্থান করেন কুমারঘাট।তারপর যথারীতি রাজধানী চলে যান।তারপরই বিধানসভার গেজেট নোটিফিকেশন করেই জেলা সদর ঘোষণা হয় কুমারঘাট।মাত্র তিন মাস জেলাসদর থাকার পরেই কুমারঘাট থেকে জেলাসদর কোন এক অদৃশ্য আঙুল পরিচালনায় কৈলাসহর স্থানান্তরিত হয় কুমারঘাট থেকে জেলা সদর।

তারপর ধীরে ধীরে গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে নগরপঞ্চায়েত হলো কুমারঘাট ১৯৮৮ সালের পর।দীর্ঘ দিন পর কুমারঘাটে থানা হলো।২০১২ সালে কুমারঘাট নগর পঞ্চায়েত হয় কুমারঘাট পুরপরিষদ।এখনো নগরের সৌন্দর্য  আসলেনি। কুমারঘাট পুরপরিষদ পরিকল্পনা ও নগর উন্নয়নের সঠিক মাত্রায় পৌছেনি।তবুও আমরা নগরবাসী।
যাক আমার আলোচনা কুমারঘাটের সাহিত্যে নদ-নদী। 
কুমারঘাটের নদ-নদী গুলো হলো,মনু,দেও।ছোটনদীকে এই অঞ্চলের লোকজন ছড়া বলেন।ছড়া হলো অগভীর। প্রধানত বৃষ্টির জল বুকে নিয়ে কলকল তাদের গতি কোন না কোন নদীর সাথে মিশে যাওয়া।এই মহকুমা শহর কুমারঘাটের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছড়া হলো:রাতাছড়া,আনোয়াছড়া, পাবিয়াছড়া,সায়দাছড়া।ফটিকছড়া,জুরিছড়া।

এই বিস্তীর্ন অঞ্চলে নানা জাতির বসবাস।বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী,  মৈতেয়ী মণিপুরী, হিন্দু মুসলিম, খৃষ্টান,দেববর্মা, ত্রিপুরী,রিয়াং,দার্লং,চাকমা,বড়ুয়া,দে,দত্ত, ধর,দাস,বনিক,মজুমদার,সরকার, দেব,নাথ,দেবনাথ, শর্মা নানা শ্রেণির মানুষজন এখানে বসবাস করে আসছেন দীর্ঘ সময় ধরে। 

রাতাছড়া বিশেষ সময়ে রাজধর মানিক্যের রাজধানী স্থানান্তরের কারণে বিখ্যাত।রাজধর মানিক্যের অভিষেক ক্রীয়া হয়েছিল। 
কথিত আছে রাতাছড়ায় অমর মাণিক্যের আত্মহত্যাহেতু রাজধর মাণিক্য রাজা হয়ে রাতাছড়া যেখনে মনুর সাথে মিশছে সঙ্গমস্থলের কোথাও রাজধর মাণিক্য রাজধানী স্থাপন করে রাজ্যপাট চালিয়ে গেছেন।

রাতাছড়ার ঘরে ঘরে নাট্যচর্চা যাত্রাচর্চা থাকলেও ১৯৯১ সালের আগে কখনো এই অঞ্চলে লেযখালেখি শুরু হয়নি। সেই ১৯৯১ সালে প্রথম গোবিন্দ ধর এর হাত ধরে রাতাছড়ায় সাহিত্য চর্চা শুরু হয়।
কুমারঘাটেও সাহিত্য চর্চা ছিলো ১৯৮০-৮২ সাল থেকেই। গোবিন্দ ভট্টাচার্য,  রতিকান্ত দাশগুপ্ত, বিপুলরঞ্জন আচার্য,নিরঞ্জন ঘোষসহ কয়েকজন মিলে শুরু করেন মণিহার। মণিহার যদিও নব পর্যায়ে আবার গোবিন্দ ধর ও গোপালচন্দ্র দাসের পরক্ষ মদতে মণিহার প্রকাশিত হয়।
তারপর থেকে কুমারঘাটে আসেন গোবিন্দ ধর। 
শুরু হয় সাহিত্যের নানা আয়োজন।স্রোত আয়োজিত  কুমারঘাট উৎসব,লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ,আড্ডা সাহিত্য উৎসব,সাহিত্য সংস্কৃতি উৎসব থেকে সম্মাননা, পুঁথি পাণ্ডুলিপি উৎসব,সংগ্রহশালার উৎসব,সময়োপযোগী নানা কর্মকাণ্ডে কুমারঘাটে উদযাপিত হয়।
এই অঞ্চলে নদ-নদীকে কেন্দ্র করে কবিতা,গল্প ও উপন্যাস এবং কাব্য সংকলন প্রকাশিত হয়ে ত্রিপুরার সাহিত্য মুখকে সমৃদ্ধ করে যাচ্ছেন কয়েকজন কবি সাহিত্যিক।
তাদের মধ্যে কথাসাহিত্যিক কবি পদ্মশ্রী মজুমদারের নাম সর্বাগ্রে।পদ্মশ্রীর আস্ত একটা কাব্য সংকলন :'দেও 'নামে প্রকাশিত।পদ্মশ্রী মজুমদারের কবিতা মিলনকান্তি দত্তের ছবিসহ দেও কাব্য সংকলন নদী চর্চায় আলেকবর্তিকার মতো।উপন্যাস :দেওনদীর জল পদ্মশ্রীকে আলাদা চিহৃায়িত করবে।কুমারঘাটের দেওনদী কেন্দ্রিক লোকসাহিত্য, লোকজ আচার, সংস্কৃতি,মেয়েলি ব্রত  এবং শ্রীহট্টীয় খেলাধুলোসহ এই অঞ্চলের জল জীবনের ধারাপাত রচনা করেন তার দেওনদীর জল উপন্যাসের পরতে পরতে।তার কবিতায়ও দেও দেওলা,ডহরের ঘোর নিয়েই ছোট ছোট চরণে লিপিবদ্ধ করেন দেও কবিতা সংকলনে।তার কয়েকটি কবিতা নিচে:

দেও সিরিজ
১)দেওনদীর ওপার থেকে/
ছুটে আসছে মেঘেরা/
এপারে বাড়িতে আছড়ে পড়ল/
ঝম্ ঝম্ ঝম্ ঝম্/
মুহূর্তে ধুয়ে গেল সব সম্পর্কের রঙ/
আমরা সবাই একেকটা/
সাদা-কালো মানুষ হয়ে গেলাম।

২)আজ আশ্বিনের সংক্রান্তি/
শ্রীহট্টীয় ভাষায় 'আট-আনাজের সংক্রান্তি'/
দেওনদী শহরের শ্রীহট্টীয় মানুষ/
আরও একবার খুঁজবে শেখড়/
দেওনদীর দু-তীর জুড়ে /
ধান আর সবজি ক্ষেতে/
চালতা পাতার'টগা'আর /
কৃষক গিন্নিদের উলুধ্বনিতে/
বসুন্ধরা আজ গর্ভবতী।/

দেওনদী এভাবেই প্রবাহিত হোক/
সমস্ত লোকাচার নিয়ে/
আমাদের শিরায় শিরায়/
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।
৩)বিকেলের গোধুলি রঙে/
সেজেছে বাড়ি/
পশ্চিমের আকাশে/
মুহুর্মুহু বদলে যাচ্ছে রঙ/
এত রঙ !রঙের ছটায়/
দেওনদীতে ডুবে যাচ্ছে সূর্য।
৪)বর্ষা যাচ্ছে,আসছে শরৎ/
একই সঙ্গে দেওনদীর বুকে ঘোলাজল/
তীরে কাশফুল /
মহালয়ার তর্পন আর দশমীর বিশর্জন নিতে /
তৈরী সে--নির্বিকার /

তবু,আমরা ---দেওনদীর শহরের লোকেরা/
নিতে পারিনা/
শুরু আর শেষের এই সহজপাঠ/

তারপর গোবিন্দ ধরও চৈতন্য ফকির  ছদ্মনামের আড়ালে : 'দেওসমগ্র' কাব্য সংকলন প্রকাশ করেন।

গোবিন্দ ধরের 'আনোয়ারা নামের মেয়েটি 'এবং 'মনুখণ্ড সিরিজ' অসংখ্য জল জলা নদ-নদী বিষয়ে রচনা।  তার কবিতা রচনায় জলজযাপনেই গোবিন্দ ধর নিজেকে উৎসর্গ করেছেন জলজজীবনে।
তার কয়েকটি কবিতা:


বাইশ. 
তুমি নদীর মতো জল হয়ে নিচের দিকে গড়াও।
নক্সী কাঁথার নিচে চলে এসো জলের তুমি।

প্রেমিকা নদী হয়ে আসে হাত ধরে নিয়ে যায় ঘরে।
সকল ভালোবাসা তার কাছে জলের চিঠিতে লিখি।

নদীর জলের মতো তুমি কেমন সকাল হয়ে আসো।
বাসীরাত তখনো লেগে আছে নীল শাড়ির ভাঁজে।

এমন সকাল কতদিন আসেনি তুমি জল রঙা শাড়ি
আমি শাড়ির জমিন জুড়ে লেপ্টে থাকা চোরকাঁটা।

তেইশ. 
জলনেই জলনেই এক সরোবরে একলা মাছ তুমি।
খলবল খলবল সারাক্ষণ নেচে বেড়াও
জলজ হাওরে।
তোমার পাখনায় লেগে থাকা বয়স ঊনিশ,হৃদয়ে একুশ।
জলের তোড়ে সাঁতার কেটে চলে আসো
ওপাড় থেকে এ পাড়ে-কাঁটাতার বিচ্ছিন্ন করে সাইবেরিয়ান পাখি।
ইদানিং আমি পাখি পুষি বাসা বানাই।
ডাকি এসো হৃদয়ের বাসায়।
জলের অতল থেকে সন্তরণরত মাছ তুমি
পাখনাকে ডানা করে উড়াল মুদ্রায় এসো
পাখনাডানারহাত ধরে হেঁটে যাই প্রজন্মচত্বর।


চব্বিশ. 
জল ডুব ডুব খেলতে খেলতে
আমার পরিজনের শরীরের গন্ধ এসে আমাকে সজাগ করেন।
আমি জলে জলে গুলে যাই
দোয়াশমাটির মতো।

পঁচিশ .

মনুনদীর কাছেই খনকার গাঁও
মৌলভীবাজার জেলার মিঞারপাড়া
আমার ঠাকুরদা দেবেন্দ্রনাথ
তাঁর বাবা রতিরামসহ বাস করতেন।

আমার বাবা তাঁর বাবার হাত ধরে
চাতলার বর্ডার ক্রস করে
বড় রায়টের সময় রাতাছড়া আসেন।

রাতাছড়া আর খনকারগাঁও দুটো গ্রামের
একটি নদী:মনুনদী।

মনু আমার বাবার নদী
মনু আমার ঠাকুরদার নদী
মনু আমার ঠাকুরদার বাবার নদী
মনু আমাদের বংশের বংশনদী।

অথচ মনুকে ছেড়ে আমি ছিন্নমূল
দেওনদীর সঙ্গম অববাহিকা হালাইমুড়ায় আছি
ঠিক যেখানে দেওনদী খেয়ে নিয়েছি মনু।

মনুর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা আমার শরীর।
আমার ছোটবেলার নদী মনু
আমার সাঁতার শেখার নদী মনু
আমার মহিষ চরানোর চর মনু
আমার জলডুব ডুব লাইখেলার নদী মনু
আমার প্রথম প্রতিশ্রুতির নদী মনু
আমার বাবার শরীর পুড়াছাই ভাসিয়ে নিলো যে নদী সে মনু
আমার মায়ের শরীর পুড়াছাই ভাসিয়ে নিলো যে নদী সে মনু

মনু আমার শরীরে লেপ্টে থাকা একটি জলোৎচ্ছাস।
মনুর জল বেয়ে পানসীনৌকো স্রোত ডিঙ্গিয়ে উজান যেতে আমি দেখেছি।
মনুর জল ভেঙ্গে পালতোলানৌকো উজান যেতে আমি দেখেছি।
মনুর স্রোত তিরতির মাড়িয়ে গুণ টানা নৌকো উজান যেতে আমি দেখেছি।

মনুর সাথে আমার জীবনের গল্প লেগে আছে।
মনুর সাথে আমার বাবার গল্প লেগে আছে।
মনুর সাথে আমার ঠাকুরদার গল্প লেগে আছে।
মনুর সাথে আমার পাঁচ পুরুষের গল্প জমে আছে।

ঠাকুরদা বলতেন তাঁরও পাঁচ পুরুষ মনুতেই স্নান করে সাঁতার শিখতেন।

মনু আমার সংস্কৃতি রাধারমণের ধামাইল।
মনু আমার জারি সারি লালন চারণ বাউল আর
শাহ আব্দুল করিমের মরমীয়া ভাটিয়ালি সুর।

মনু আমার কবিতা গান 
আমাদের হা ভাতের সংসারে এক হাঁড়ি পিপাসার জল।
জমিনের এঁটেলমাটি শরীর থেকে মনুতেই মিশিয়ে
আমরা পাঁচবোন তিন ভাই সিগ্ধ হয়ে খেটেখুটে বড় হয়েছি।

মনুর বন্যায় কতবার আমাদের ভিটা ছাড়া হতে হয়েছে।
মনুর তীর ভেঙ্গে ভেঙ্গে আমাদের বাড়ি ছুঁইছুঁই
মনু আমাদের জীবনের অন্যরকম গল্পের নাম।

মনুর কাছেই জীবনের সবুজ মেখে পৃথিবী দেখি
মানুষকে বড় সবুজ দেখি আখপাতার মতো
অথচ মনুর সবুজ আখ পাতার ধারালো কিরিচ
সারাটা জীবন ধরে রক্তই ঝরিয়ে গেলো 
মনুর জল সে কি আর জানে!

ছোটবেলা ঝিল থেকে জেতা কই লাইন দিয়ে
মনুতেই মিশে যেতো।
শিং মাগুর টেংরা একটু বৃষ্টি হলেই ঝিল ছেড়ে
নালায় নেমে সাঁতার কাটতো। সামনেই মনু।
মাছগুলো মনুতেই চলে যেতো।

আমার বুকের ভেতরেও শিং মাছ সেই থেকে সারাক্ষণ ঘা মেরে সাঁতরায়।

ছাব্বিশ .
নদীই একমাত্র সঠিক বংশ পরিচয়।
আমরা হয় নদীর উজান ধরে এগিয়ে যাই।
না হয় নামতে থাকি ভাটির টানে।
নদী মানুষের বংশলতিকা।

নদীই মানুষকে ঘর ছাড়া করে
বাউল করে লালন করে
রাধারমণ করে।
নদী গান।নদী আমার বংশরেখা।

একটি সহজ সরল মানচিত্র।

সাতাশ.
মনুনদী বুকে লেপ্টে আছে।
আর মনুর জলে যত আর্সেনিকই থাক তবু আমাদের পিপাশার পানি ছিলো।মনুর চিকন মিহিবালু গায়ে লেপ্টে বালুতে কত খেলাঘর গড়েছি।কিন্তু সব ঘর ভেঙ্গে যায়।ভেঙ্গে ভেঙ্গে যায়।আবার ঘর বানাই।মনু এসে গিলে খায়।এই আমার নিয়তি।তবু আমি মনুর সন্তান।মনু পাড়ের লোক।চিরকাল লোক-ই রইলাম।মানুষ হলাম কই।

আঠাশ.

নীলরঙা শাড়িতে মনু
নদীর মতোই কবিতা।
জলে জলে গহীন তুমি সাত পুরুষের পিপাশা।


বিক্ষিপ্ত ভাবে গোপালচন্দ্র দাসও মনুনদী, শাখাবরাক নিয়ে ধারাবাহিক নদীচর্চা করে চলেছেন।
কবি গোপালচন্দ্র দাস এর একটি কবিতা:
নদীও আমার প্রেমিকার মতো

একা একা চলতে চলতে নদীতীরে/
নিজেকে হারিয়ে খোঁজি এখানে সেখানে/
বুকটা মুচড়ে উঠে কণ্ঠে অনেক ব্যথা/
ধিকি ধিকি মন জ্বলে নিঃশব্দে গন্ধবিহীন ।
একসময় এই নদীতীরে দুরন্ত হাওয়ায়/
তোমার চুল কাপড় ছেড়ে/
ইচ্ছে করে তোমি বেশামাল হতে/
কাপড় ছাপিয়ে তোমার দুরন্ত যৌবন/
আমার কাছে সমর্পিত ছিলো।
আজ যেদিকে তাকাই একিত্বের বার্তা পাই/
আমি যেনো এক ভিন দেশের যাত্রি ।
ওহ! নদী ---নদীর চলন্ত স্রোত/
একগুয়ে আমার প্রেমিকার মতো ।
আজকাল সহজ সরল কোন কবিতা পাই না/
কবিতা আমার থেকে দুরে দুরে যায় ।
এখন নদীতীরে আর হাটা হয় না /
যেদিকে তাকাই চরমাটিতে প্লাষ্টিক বোতল ক্যারিবেগ/
ভাগাড়ের বর্জ্য জঞ্জাল দুর্গন্ধ ছড়ায়/
কাটাডাটা লজ্জাবতী রক্ত ঝড়ায়/
পায়ের দিকে তাকিয়ে চলতে হয়/
পলিমাটির ফাঁটলে বাসা বেঁধেছে অনেক শরীসৃপ ।

এই / চিহ্ন গুলো উঠিয়ে নেবেন,এক লাইন বুঝাতে ব্যবহার করেছি।দাড়ি ঠিক থাকবে। ধন্যবাদ ।

রঞ্জিত চক্রবর্তীও মনুনদীর জলোচ্ছ্বাস তর্পন ইত্যাদি রবীন্দ্র পূর্ববর্তী সময়ের বাঁকে বসে নদীচর্চা করেন।
ত্রিপুরার সর্বকণিষ্ট শিশুসাহিত্যিক গৈরিকা ধরের কবিতায়ও নদীর কথা ঘুরেফিরে আসে।
নদীর জল কলকল প্রবাহিত হয়ে যেমন সাগরে ঢেউ তুলে তেমনি কুমারঘাটের, কবি সাহিত্যিকদেরও নদীচর্চা ত্রিপুরাকে সমৃদ্ধ করে তরতর এগিয়ে যাচ্ছে। কুমারঘাটের সাহিত্য ত্রিপুরার সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।ত্রিপুরার সকল অঞ্চলের সফল সাহিত্য চর্চার সাথে সমান তালে এই অঞ্চলেও সাহিত্য সংস্কৃতি আড্ডা আলেচনায় বেগবতী দেও-মনু,ছোটনদীর জলোচ্ছ্বাসের মতো শিৎকার উঠছে সাহিত্য আঙিনায়। এই আনন্দধ্বনিকে আরো এগিয়ে নিতে সমকালীন কবি সাহিত্যিকদের নিজেকে পাঠক হিসেবে তৈরী করে সাহিত্য যাপনে থাকতে হবে।আমাদের বিশ্বাস কুমারঘাটের সাহিত্যে এই আনন্দধ্বনির আওয়াজ শুনবেন সফল কবিরা,কথাসাহিত্যিকেরা।

২০:১১:২০১৯
রাজেন্দ্রনগর।
[01/12/2019, 12:38 pm] GOBINDA DHAR: স্রোতের সারস্বত আড্ডায় ত্রিপুরার নদনদী 
-----------------------------------------------------------------
সঞ্জীব দে 

গতকাল ত্রিশ নভেম্বর, ২০১৯, সন্ধ্যা ৬টায় আগরতলা প্রেসক্লাব সংলগ্ন  গল্পকার পদ্মশ্রী মজুমদারের সঞ্চালনায় ও পুনম মজুমদারের সূচনা সংগীতের মাধ্যমে জমে উঠে আড্ডা। আড্ডার শুরুতেই গোবিন্দ ধর শুভেচ্ছা পর্বে বলেন  ত্রিপুরায় আড্ডার ইতিহাস আছে।আড্ডা মিলনের মননের উর্বরতা যোগায়।কামান চৌমুহনীর আড্ডা,ত্রিপুরা দর্পনের শারদ আড্ডা হয়ে আড্ডার বিস্তার সারা রাজ্যে।ধর্মনগর থেকে সাব্রুম,মহুরীতট থেকে দেওভ্যালী আড্ডার ছুঁয়ায় জেগেছেন হরিভূষণ পাল থেকে সেলিম মুস্তফা। কৃষ্ণকুসুম পাল থেকে চারুকৃষ কর।সুব্রত দেব থেকে সন্তোষ রায়।পীযুষ রাউত থেকে হরিহর দেবনাথ। কম বেশ আড্ডারু সকল সাহিত্যিকই।আড্ডা মানে প্রাণের জোয়ার।
সাহিত্য আড্ডায় জোনাকির আড্ডা স্মরণযোগ্য।আবার সাব্রুমের সৃজনীর সাহিত্য আড্ডাও মনে রাখার মতো।তারপর আগরতলায় নানান গোষ্ঠীর সাহিত্য আড্ডার পাশাপাশি ধলাই প্রবাহের সাহিত্য আড্ডা,রাতাছড়ায় স্রোত সাহিত্য আড্ডা শুরু হয় নয়ের দশকের এক শারদ সন্ধ্যায়।তারপর ২৬শে সেপ্টেম্বর ১৯৯৫ সাল থেকে সাহিত্য আড্ডা করে আসছে স্রোত। ২০০৩ সালে কুমারঘাট এই পক্ষ সাহিত্য আড্ডা বসে।সে সময়ও দীর্ঘ দিন কুমারঘাটকে জাগিয়ে রাখে এই পক্ষ।
জলজ সাহিত্য আড্ডা দীর্ঘ দিন থেকে ধর্মনগরের সাহিত্যের সলতে পাকিয়ে টিকে আছে জলজ।তা থেকে সাতদিন প্রকাশনা।তাও সফল বই প্রকাশসহ ধর্মনগর লিটল ম্যাগাজিন মেলা,সাহিত্য উৎসব, সাহিত্য পিকনিক করে আড্ডাকে সজীব রাখার মূল কারিঘর সন্তোষ রায় আমাদের নিকট মহীরুহ। 
কৈলাসহরেও অঙ্গীকার সাহিত্য আড্ডা থেকে বেশ কজন কবি সাহিত্যিক উঠে আসেন।সোমবার পত্রিকাকে কেন্দ্র করে কৈলাসহর মোটরস্ট্যান্ডে দীর্ঘ দিন সত্যজিৎ দত্ত, বিশ্বজিৎ দেব, নির্মল দত্ত, মলয় দে,মৃদুল বণিকসহ আড্ডায় বক্তাও  বার দুয়েক উপস্থিত হয়েছে, হয়েছে সাতদিনের আড্ডা,অঙ্গীকারের আড্ডায়ও।সন্দীপন সাংস্কৃতিক সংস্থাও সাহিত্য আড্ডার আয়োজন করতেন।তাতেও উনার উপস্থিতি কমবেশ ছিলো।
কুমারঘাটের আড্ডায় নীলিমেশ পাল, গোবিন্দ ধর, পদ্মশ্রী মজুমদার, মোয়াজ্জেম আলী, অরূপরতন শর্মাদের উপস্থিতি  আড্ডাকে বেগবান করে।এই পক্ষ বলে একটি পাক্ষিক লিটল ম্যাগাজিনও তার ফসল।
কুমারঘাটে সর্বশেষ সমবেত আড্ডার আয়োজন করে দেও-মনু সাহিত্য মঞ্চ।কাঞ্চনপুরও কম নয়।সেই মন্বন্তর থেকে সত্যেন্দ্র দেবনাথের এই বনভূমি হয়ে আড্ডার হাত বদল হয়ে বর্তমানে রসমালাই,বনতট,দোপাতা"র কাণ্ডারী হারাধন বৈরাগী, অমলকান্তি চন্দ, দিব্যেন্দু নাথদের হাতে এসে পৌঁছে দেও নদীর স্রোতের মতো কলকল প্রবাহিত।
এই রকম এক উর্বরতার সাক্ষী স্রোত।স্রোত ক্রমাগত আড্ডার সলতে প্রজ্জ্বলিত করে কখনো কুমারঘাট তো কখনো রাতাছড়া,কাঞ্চনবাড়ি হয়ে পানিসাগর,কৈলাসহর, সাব্রুম ।স্রোত সাহিত্য আড্ডা থেকেই এক সময়ে স্রোত লিটল ম্যাগাজিন।তারপর কোন এক সময় তা প্রকাশনা।সেই রেশ ধরে ত্রিশ নভেম্বর ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায়  আমন্ত্রিত সাহিত্যজনদের নিয়ে সীমিত জায়গায় সারস্বত সাহিত্য আড্ডায় উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানান। দীপক বিশ্বাস বাবুর ভাড়া ঘরে সল্প জায়গা।সুতরাং  স্বপ্ন থাকলেও এক সাথে সকলের স্বর ও আড্ডার উষ্ণতা স্রোত  গ্রহণ করতে না পারার দায় নিয়েই এই আয়োজন।স্রোত আশা করছে প্রতিমাসে আমন্ত্রিত এই আড্ডায় গুণীজনদের সহযোগিতা পেয়ে সাহিত্যের সেবা করতে পারবে।সকলের সহযোগিতা  এগিয়ে চলার আলোক বর্তিকা আশা  করে স্রোত।
 তিনি বলেন নদ নদী নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা তিনি পেয়ছেন - দিলীপ দাসের অসাধারণ বই নদীকে নিয়ে লেখা " বিপিন মাঝির নাও ' পড়ে। নদ নদী নিয়ে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁদের কয়েকজনের নাম আলোচনায় উঠে এসেছে তাঁরা হলেন --- পদ্মশ্রী মজুমদার -- দেও",  সন্তোষ রায়- নদী মাতৃক ", সন্মাত্রানন্দ -- " মনু নদী ", দিলীপ দাস -- নদীর জল ছুঁয়ে আছে নদীর এপার ও ওপার", গোবিন্দ ধর -" আনোয়ারা মেয়েটি ", ও দেও নদী সমগ্র "সহ আরো অনেকের গল্পের কথা উঠে এসেছে।  

স্রোত সারস্বত আড্ডায় আমন্ত্রিত যে সব আড্ডারুরা ছিলেন রামেশ্বর ভট্টাচার্য,শ্যামল বৈদ্য,বিমল চক্রবর্তী, নিয়তি রায় বর্ধন,পদ্মশ্রী মজুমদার, 
দেবাশ্রীতা চৌধুরী, জহর দেবনাথ, অর্পিতা আচার্য,
বিল্লাল হোসেন,অমলকান্তি চন্দ, অভীককুমার দে, 
,সঞ্জীব দে, গোপালচন্দ্র দাস,বিজন বোস,সুমিতা পাল ধর,পুনম মজুমদার,গৌরব ধর, গৈরিকা ধর, 
সঞ্জীবনী দে,প্রমুখ। 

  আজকের আড্ডার বিষয়বস্তু ছিল ত্রিপুরার সাহিত্যে নদনদী। পুরো আড্ডাই নদ নদীর মধ্যেই
সীমাবদ্ধ ছিল। শুরুতেই নদ নদী নিয়ে আড্ডা জুরে দিলেন কথাশিল্পী শ্যামল বৈদ্য। ঘরোয়া মেজাজে আড্ডার মজাই আলাদা। তিনি বলেন নদ নদী খালবিল নিয়ে আরশি নগর একটি বই, জহর দেবনাথের -- ধলাই নদী নিয়ে লেখা একটি গল্পের কথা উঠে আসে তার কথায়। যে গল্পে জহর বাবু ধলাই নদীকে ফানক সাপের ছোবলের শব্দের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে আমাদের রাজ্য নদী মাতৃক নয় তবে পাহাড় শাসিত রাজ্য। বর্ষা কালে খরস্রোতা নদীগুলোর রাজত্ব ভয়ানক। দেও মনু ধলাই মহুরির বন্যার ভয়াবহ রূপের কথাও উঠে আসে আড্ডার ছলে।  আবার ধলাই নদীর কথা বলতে গিয়ে বলেন ধলাই নদী বন্যা একদিকে যেমন দুঃখ বয়ে আনতো অন্যদিকে আনন্দ বয়ে আনতো। কারণ ফসল পলির নিচে চয়ে যাওয়া যেমন দুঃখ আবার মাছ ধরার আনন্দ ও আছে।তেমনি পলি জমার আনন্দ কারণ পলিতে ফসল ভালো হয়। তিনি বলেন নদী পাহাড় নিয়ে ত্রিপুরায় খুব একটা উপন্যাস হয়নি। তবে মাধুরি লোধের 'মুহূরী চরের মানদা ', অশোক দেবের সদা পুরাণ, ইত্যাদি বইতে সমাজ জীবনে নদীর কথা উঠে এসেছে। আবার পদ্মশ্রী মজুমদারের নদী নিয়ে যে গল্প লিখেছেন তাতে তিতাসের ছায়া রয়েছে দারুনভাবে। এতে তিনি সিলেট সংস্কৃতিকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেন নদী নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন আরো বেশি করে কারন নদী আমাদের জীবের সাথে ওতপ্রোতভাবে জরিত। জলের অপর নাম যেমন জীবন তেমনি নদীর অপর নাম জীবন বললেও বেশি বলা  হবেনা।তিনি নদীর গভীরতা বাড়ানো উপর জোর দেন। শেষে তিনি বলেন প্রকৃতিকে রক্ষা না করলে নদী রক্ষা হবে না। 
  এরপর নদীকে নিয়ে দেবশ্রীতা দি তাঁর "প্রতিধ্বনি ' কবিতাটি শুনাইলেন। কবিতাটিতে তিনি খুব সুন্দরভাবে নদীকে জীবনের সাথে একাত্ম করে দেখিয়েছেন। কবিতা শেষ হতেই সুরে সুরে গান ধরলেন গৈরিকা। সুরের অনুরণন শেষ হতে না হতেই অর্পিতা দি চলে গেলেন আবার নদীর আলোচনায়। তিনি বলেন নদীর বিচিত্র রূপের কথা। সাহিত্যের জন্য নদীর সাথে জীবনের যোগ একান্ত প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। আলোচনা শেষে নদীকেন্দ্রিক 'নৈশব্দ', 'কাহিনি' দু'টি কবিতা পড়ে আড্ডাকে আরেক ধাপ এগিয়ে দিলেন। এরপর আড্ডায় মেতে উঠলেন ধলাই নদীর সুখ দুঃখ নিয়ে একটা সামাজিক চিত্র তুলে ধরলেন জহর দেবনাথ। উঠে এল ধলাই নদীকে কেন্দ্র করে জনজীবনের কথা। ভেসে উঠা স্মৃতি উগরে দেলেন আড্ডার ছলে। এরপর ভবানী প্রসাদ মজুমদারের দুটো ছড়া নিয়ে হাজির সঞ্জীবনী। আবার বিজন বোসের কথায় কবিতায় উঠে এলো মনু নদীর গুরুত্ব । এরপর ছন্দে ছন্দে সিনাই নদীকে বেঁধে আনলেন নিয়তি রায় বর্ধন। চিত্রকল্পে নদী ও জীবন যেন একাকার হয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। এই নদী আর জীবনের একাত্মতায় উজ্জীবিত হয়ে অভীক বসে থাকতে পরেনি, সে নিয়ে এলো তিনটি কবিতা। তাঁর কবিতায় দেশভাগ, এন আর সি সহ নদী কেন্দ্রীক জীবনের কথাই ঘুরে ফিরে উঠে এল তার ছান্দিক অনুভবে।দীর্ঘক্ষণ সহ্য করে মহম্মদ রোবেলও এইবার উঠে দাঁড়ালো পদ্মশ্রীর ডাকে। নদীকে নিয়ে তার কবিতাও বলে গেল জীবনের কথা,নদীর বুকে জমা দুঃখের কথা। এরপর উঠলেন কথায় কবিতায় গোপাল দা, একরাশ স্মৃতি তুলে ধরে মনুর আত্ম কথা শুনিয়ে গেলেন। এইদিকে বিল্লাল উঠতে উঠতে বল্লেন প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে দুটি নদী থাকে। তিনি নদীকে বুকে ধারন করে শুনাতে শুরু করলেন স্বরচিত কবিতা 'নদীর অসুখ'। ঠিক মানুষের মতো নদীরও অসুখ থাকে। জীবনের প্রয়োজনে সেই অসুখ আমাদেরকেই সারিয়ে তুলতে হবে। এরপর পদ্মশ্রীর ডাকে ভেবাচেকা হয়ে এককোনে বসে থাকা গোবিন্দ ধর উঠে দাঁড়ালেন কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্যের কবিতা নিয়ে। 

এরপর আড্ডাকে চাবুক হাতে সৈনিকের মতো কবি বিমল চক্রবর্তীর আলোচনার সম্মোহনী শক্তিতে এক বিশাল স্তরে পৌঁছে দেয়। যার দ্বারা পুরো আড্ডাকে একটা সুতায় বেঁধে দিয়েছেন তিনি। তিনি শুরু করেন ছোট গল্পে ত্রিপুরার নদ নদী নিয়ে তথ্যসহ গবেষণাভিত্তিক আলোচনা। ত্রিপুরার ছোট গল্পে নদ নদী কিভাবে উঠে এসেছে তার একটা বিস্তারিত পরিস্কার চিত্র তাঁর আলোচনায় আমরা পেয়ে গেছি। তিনি বলেন রাইমা শরমা এই দুইবোনের সন্ধানই আসলে গোমতি। ত্রিপুরার সাহিত্যে নদ নদী নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন ত্রিপুরা একসময় সমুদ্র ছিল কালক্রমে ভূমিকম্পের ফলে এই ভূখন্ড। ত্রিপুরা কথাটি এসেছে তৈপ্রা থেকে। তৈ মানে জল প্রা মানে দেশ। তার মানে ত্রিপুরা কথার অর্থ দাঁড়ালো জলের দেশ। ভূতাত্ত্বিকদের গবেষণায় এই মত উঠে এসেছে বলে দাবি করেন। তিনি এও বলেন ত্রিপুরা বৃহৎ বঙ্গেরই অংশ,ত্রিপুরাকে বৃহৎ বঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে চলবেনা। অন্যদিকে ত্রিপুরার সাহিত্যে নদ নদী দরুনভাবে উঠে এসেছে বলে তিনি মনে করেন। ক্রমস --------




 সাব্রুমের ফেনী নদী  : ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির বহমান ধারা 





একটি বহুল প্রচারিত বাংলা প্রবাদ ‘ভাগের মা গঙ্গা পায়না’ ৷ প্রবাদটির মধ্য দিয়ে মায়ের অসহায়ত্বের যন্ত্রণাটিই ব্যক্ত হয়েছে ৷একাধিক পুত্রকন্যার মা শেষ বয়সে কার কাছে থাকবেন, কার যত্ন-আত্যি পেয়ে শেষ দিনগুলো কাটিয়ে জীবনের পরিসমাপ্তি টানবেন তা নিয়ে  অধিক সন্তানের মায়েদের ক্ষেত্রে  থাকে অনিশ্চয়তা ৷ থাকে টানা পোড়েন ৷ একজন একজনের উপর দায়িত্ব অর্পনের অছিলায় মাকে কাটাতে হয় নিসঙ্গ জীবন ৷ এমনকি তাঁর মৃত্যুকালীন সময় ও পরবর্তীকালের পারলৌকিক কার্যাদিও সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়না সেই ভাগাভাগির কারণেই ৷ সেই অর্থেই গঙ্গা পাওয়া অর্থাৎ স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটেনা ‘ভাগের মায়ের’ ৷ গঙ্গা যেমন একটি নির্দিষ্ট নদীর নাম তেমনি পরবর্তীকালে তার অর্থবিস্তারের ফলে সমস্ত নদীকেই গঙ্গা নামে অভিহিত হতে দেখা যায় ৷ সেই হিসেবে গঙ্গাকে যেমন পবিত্র নদী হিসেবে মান্য করা হয় এবং তাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কতিক আচার-আচরণ পালন করা হয় তেমনি গঙ্গা অববাহিকা থেকে দূরবর্তী স্থানে বসবাসসকারী লোকসাধারণ গঙ্গানদীকে সহজে কাছে না পাওয়ার কারণে ও দারিদ্র্যহেতু ব্যয়সংকোচের পরিকল্পনায় নিজেদের জনপদের নিকটস্থ নদীটিকে গঙ্গাতুল্য মান্য করে এবং লৌকিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় আচারসমুহ পালন করে থাকে ৷ ফলে যে কোন নদীই বৃহত্তর অর্থে ‘গঙ্গা’ ৷ এই গঙ্গা থেকেই উদ্ভুত বাংলাশব্দ ‘গাঙ’ ৷ নদী অর্থে ৷ সেকারণেই ত্রিপুরার নদীগুলোর স্থানীয় নাম—মনুগাঙ, দেওগাঙ, জুরিগাঙ, ধলাইগাঙ, মুহুরীগাঙ ইত্যাদি ৷ সাধারণত নদী অর্থে গাঙ,দরিয়া, স্রোতস্বিনী, প্রবাহিনী, তটিনী,তরঙ্গিনী, ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হয় ৷ নদী শব্দের উৎস হিসেবে বলা হয় যে, যে প্রবাহিনী নাদ অর্থাৎ গম্ভীর ধ্বনি সৃষ্টি করে প্রবাহিত হয় তাই নদী ৷ নদী শব্দের পুংলিঙ্গে বলা হয় ‘নদ’ ৷ নদ বা নদীর বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা নিয়ে বিশেষজ্ঞগণ পুরুষবাচক ‘নদ’ শব্দটি সৃষ্টি করেছেন ৷ উভয়ে মিলে নদ-নদী ৷

নদী, জীবন ও লোকজীবন :

 পৃথিবীর সমস্ত আদি সভ্যতা নদীকেন্দ্রিক ৷ নদীকে কেন্দ্র করে নদীতীরবর্তী অঞ্চলেই গড়ে উঠেছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতা ৷ যেমন— নিলনদের তীরে মিশরিয় সভ্যতা, ইরাকের ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর তীরে সুমেরিয় সভ্যতা, হোয়াংহো ও ইয়াংসি নদীর তীরবর্তী চিনসভ্যতা, ভারতের সিন্ধু নদীতীরবর্তী মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা সভ্যতা ৷ এই নদীতীরবর্তী সভ্যতাসমূহ গড়ে ওঠা এবং শ্রীবৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল নদীতীরবর্তী উর্বরাভূমি এবং এই ভূমিতে চাষাবাদের অফুরন্ত নদীজল ৷ জীবনের অপরিহার্য পানীয়জলের উৎসও এই নদী ৷ তাছাড়া নদীগুলোর নাব্যতা থাকার ফলে প্রাচীন মানুষ যাতায়াতের সুলভ মাধ্যম হিসেবে নদীকে বেছে নিয়েছে ৷ তার ফলশ্রুতিতে নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বহু জনপদ ও ব্যবসাকেন্দ্র ৷ নদনদীর ছুটে চলার গতির সঙ্গে মানুষও তার চলার গতি মিলিয়ে নিয়েছে বহু প্রাচীনকাল থেকে ৷ পাহাড়-পর্বত থেকে নেমে আসা নদী যেমন সাগরে মহাসাগরে মেশার আকুলতায় ছুটে চলে তেমনি যেন মানবস্রোতধারা জীবনপ্রবাহ বয়ে ধেয়ে যায় অসীমের সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষায় ৷ নদী ও জীবনের এক অদ্ভুত মিল এখানে ৷ এই নিরন্তর ছুটে চলার ধর্মে একে অন্যকে জড়িয়ে  ধরেছে সহোদরের মতো ৷ মানবজীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, উত্থান-পতনের অমরগাথা বুকে নিয়ে নদী অবিরাম ছুটে চলে মোহনা পর্যন্ত ৷ 
          লোকজীবনে নদীর প্রভাব অসীম ৷ নদী একটি জাতির ঐতিহ্যের স্মারক, ধারক ও বাহক হয়ে থাকে ৷ জনপদের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীসমূহ তাদের স্রোতধারার সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলে কিংবদন্তী, লোকগাথা,  লোকশিল্প, লোকসঙ্গীত, অন্যান্য লোকসাহিত্যের উপাদান, সংস্কৃতি ও ইতিহাস ৷ নদী তার উৎস, অবস্থান, গতিপ্রকৃতি সব মিলিয়ে লোকজীবনকে সমৃদ্ধ করে ৷ এক একটি নদীকে ঘিরে নিবিষ্ট সন্ধানে উঠে আসে বহুবিধ লোক-উপাদান, ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রত্নচিহ্ন ৷

ত্রিপুরার জনজীবন ও নদী :

ত্রিপুরারাজ্যে বাঙালি জনগোষ্ঠী ও জনজাতির লোকজন সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে সুদীর্ঘকাল ধরে বসবাস করে আসছে ৷ ফলে এই রাজ্যে একটা মিশ্র সংস্কৃতির বাতাবরণ তৈরি হয়েছে ৷ পার্বত্য নদীবিধৌত এই রাজ্যের জনগণ পারস্পরিক সহাবস্থানের মাধ্যমে স্ব স্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারণ, লালন ও চর্চা করে আসছে তাতে অন্যান্য প্রাকৃতিক পরিমন্ডলের সাথে সংযোগের পাশাপাশি নদী তার বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে ৷ রাজ্যের বিভিন্ন নদীর তীরেই জনপদ, শহর ও বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছে ৷ একসময় রাজ্যের প্রায় প্রতিটি নদীরই নাব্যতা ছিল ৷ পণ্য পরিবহনের মাধ্যম ছিল এই নদী ৷পার্বত্যভূমিতে উৎপন্ন কৃষিজ ফসল অর্থাৎ ধান, পাট, তিল, সরিষা, কার্পাস ইত্যাদি নদীপথেই নৌকাযোগে বিভিন্ন বাজারে তোলা হত ৷ অপেক্ষাকৃত সমতলভূমিতে পলিমাটিপুষ্ট উর্বর নদীতীরবর্তী অঞ্চলের ভূমিতে চাষবাস করে ফসল উৎপাদন করা হয়৷ নদীর জলে জলসেচের সুযোগও রয়েছে ৷ প্রায় প্রতিটি নদীই ত্রিপুরার পাহাড়-পর্বত থেকে সৃষ্টি হয়ে রাজ্যের পার্বত্য ও সমতলভূমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে ৷ কোনো কোনো নদী ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত বরাবর প্রবাহিত হয়েছে ৷ আবার কোনো কোনো নদী ত্রিপুরার অভ্যন্তর থেকে উৎপন্ন হয়ে নিম্নমুখে প্রবাহিত হয়ে রাজ্যের বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরের কোনো নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে ৷ ফলে বহু প্রাচীনকাল থেকেই নদীর মাধ্যমে এই দুই ভূখন্ডের মানুষের  পরিবহন ও পরিযায়নের মাধ্যমে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনও তৈরি হয়েছে ৷ ফলে রাজ্যের জনগণের যে লৌকিক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস সবকিছুতেই নদীর প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ও আশ্রয় রয়েছে ৷ ত্রিপুরার নদীকে কেন্দ্র করে রয়েছে লোকসঙ্গীত ৷ রয়েছে রাইমা সাইমা লোককাহিনির মতো নদীর উৎসকথা, বিজয়নদের তীরে গৌড়ের সুলতান হুসেন শাহের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজার সৈন্যদের বীরত্বব্যঞ্জক লড়াইয়ের গাথা, ‘ফান্দে পড়িয়া বগা’র ধলাই নদীর পাড়ে কান্নার বিষাদগীতি, মনু নদীর তীরে সর্বস্ব হারানো রাজা অমরমাণিক্যের আত্মহননের কথা, অমরপুরের গভীর অরণ্যে গোমতীর তীরে পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা বিরল প্রত্নচিহ্ন ইত্যাদি ৷ সময়ের প্রবাহে মানুষের বন কেটে বসত করার তাগিদে, সীমাহীন লোভের আস্ফালনে আজ রাজ্যের নদীগলো তাদের নাব্যতা হারিয়েছে ৷ এমনকি তাদের অস্তিত্ব আজ প্রশ্নের সম্মুখীন ৷ নদী যেদ লোকঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এবং জীবনস্বরূপা তা আধুনিক মানুষ ভুলতে বসেছে ৷ অথচ একদিন এই নদীগুলো জীবনপ্রবাহে প্রাণবন্ত ও বেগবান ছিল ৷ ছিল নদীর উদার উপাখ্যান ৷ যথাযথ সংগ্রহের ও সংরক্ষণের অভাবে নদীকেন্দ্রিক লোকঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যময় বহু উপাদান কালগর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে ৷ অনেককিছু হারিয়েও গেছে ৷
   
            ত্রিপুরারাজ্যের ভূখন্ডের উপর দিয়ে যে সমস্ত নদী প্রবাহিত হয়েছে তার অনেকগুলোকে নিয়ে কিংবদন্তী, লোককথা ও ইতিহাস রয়েছে ৷ সমস্ত নদীকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত আলোচনা এখানে সম্ভব নয় ৷ ত্রিপুরারাজ্যের দক্ষিণ প্রান্তের যে নদীটি  পুরোপুরি ভারত ও বাংলাদেশের সীমানাকে চিহ্নিত করে প্রবাহিত হয়েছে সেই ফেনী নদীকে কেন্দ্র করে আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস নেওয়া হবে ৷
 ত্রিপুরা রাজ্যের প্রান্তিক নদী ও রাজন্য ত্রিপুরা এবং বর্তমান রাজনৈতিক ভূখন্ডের সীমানির্দেশক প্রাকৃতিক চিহ্ন হিসেবে ফেনী নদীর উল্লেখ পাওয়া যায় কিছু কিছু প্রাচীন গ্রন্থ ও পুঁথিসাহিত্যে ৷

উৎস, গতিপথ  ও অধিবাসী  :

    ফেনী নদী ত্রিপুরারাজ্যের কালাঝারি পাহাড় থেকে ক্ষীণ স্রোতধারার আকারে প্রবাহিত হয়ে গোমতী জেলার করবুক মহকুমার জলেয়াতে আরো কিছু ছোটো ছোটো ঝরনা, ছড়ার জলে পুষ্ট হয়ে ফেনী নাম নিয়ে 23°20’ উত্তর অক্ষাংশ ও 91°47’ পূর্ব দ্রাঘিমারেখার উপর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুমের আমলিঘাট পর্যন্ত ত্রিপুরারাজ্যের দক্ষিণ সীমানাকে চিহ্নিত করে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে 22°50’ উত্তর অক্ষাংশ ও 91°27’ পূর্ব দ্রাঘিমারেখাতে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে ৷ উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত ফেনীনদীর দৈর্ঘ 153 কিলোমিটার ৷ এই নদী ভারতের ত্রিপুরারাজ্যের গোমতী জেলা এবং দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার পার্বত্যভূমির প্রান্ত দিয়ে এবং বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি পার্বত্যজেলার প্রান্ত ধরে প্রবাহিত হয়ে ত্রিপুরার আমলিঘাট জনপদের পর  বাংলাদেশে প্রবেশ করে ওই দেশের ফেনী জেলা ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই উপজেলাকে বিভক্ত করেছে ৷পার্বত্য অঞ্চল ও সমভূমি এলাকায় ফেনীর দুইপারে বিস্তীর্ণ জনপদ, বর্ধিষ্ণু গ্রাম ও বাণিজ্যকেন্দ্র রয়েছে ৷ নদীতীরের ভূমিও খুব উর্বরা ৷ ফেনীনদীর নিম্নাঞ্চলে বাংলাদেশের ভেতর জেলাসদরও ফেনী নামে পরিচিত ৷ এই শহরও বেশ প্রাচীন ৷ ফেনীনদীর পার্বত্য অংশের ভারতীয় অংশে ও বাংলাদেশের দিকে দীর্ঘকালব্যাপী মিশ্র জনবসতি রয়েছে ৷জনজাতির জনগণের মধ্যে ত্রিপুরি, মগ ও চাকমা জনগোষ্ঠীর লোকজনই তুলনামূলকভাবে বেশি ৷ বাঙালি অংশের মানুষজনের বসতি শুধুমাত্র বর্ধিষ্ণু জনপদ এবং বাণিজ্যকেন্দ্রেই বেশি ৷ সমভূমি অংশে বাঙালি জনগোষ্ঠীরই প্রাধান্য রয়েছে ৷

ফেনী নদীর উৎস নিয়ে সৃষ্টিকথা  :

ভূবিজ্ঞান অনুযায়ী ফেনী নদীর উৎস ও গতিপথ সম্বন্ধে যে চিত্র উপরে তুলে ধরা হয়েছে  তা আধুনিক কালের বিজ্ঞানসচেতন  মানুষের প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানলব্ধ তথ্য ৷কিন্তু আদিম মানুষ কোনো বস্তু, প্রাণী বা বিষয়ের উৎস সম্বন্ধে একধরণের সৃষ্টিকথা লোকমুখে প্রচলিত রাখত ৷ এগুলোকে বলা হয় লোকপুরাণ ৷ ফেনী নদী সম্বন্ধেও এখানকার প্রাচীন অধিবাসীদের মধ্যে একটি লোকপুরাণ প্রচলিত আছে ৷ জনজাতীয় জনগোষ্ঠীভেদে কিঞ্চিৎ রূপান্তর আছে কোথাও কোথাও ৷ নোয়াখালি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সামান্য রূপান্তর ঘটিয়ে এই কাহিনিটি প্রচলিত ৷ 
        প্রাচীন এই লোকপুরাণ অনুযায়ী জানা যায় যে, এক জুমিয়ার দুটি কন্যা ছিল ৷ তারা ছিল মাতৃহীন ৷ জুমিয়া বাবা তাদের, মায়ের মতো আদর স্নেহ দিয়ে লালন পালন করত ৷ দুইবোনও বাবাকে যথাসাধ্য সাহায্য করত ৷ বাবা জুমে খেতের কাজে গেলে তারা তাদের টংঘরে রান্নাবান্না করে বাবার জন্যে খাবার  নিয়ে যেত জুমে ৷ বাবাকে খাইয়ে দাইয়ে টংএ ফিরত ৷ একদিন তারা দুবোন বাবার জন্যে খাবার নিয়ে রওনা হয়েছে কিন্তু পথে পড়ল হাতির পাল ৷ ওরা দলবদ্ধ হয়ে রামকলাগাছ খাচ্ছিল ৷ যতক্ষণ হাতির পাল সরে না যায়, দুবোন অপেক্ষা করতে লাগল ঝোপের আড়ালে ৷ এদিকে সারাদিনের পরিশ্রমে জুমিয়া ক্লান্ত হয়ে অপেক্ষা করছে খাবারের জন্যে ৷ বেলা যায় ৷ কিন্তু মেয়েরা আসছেনা ৷ ক্ষুধায় পিপাসায় কাতর হয়ে জুমিয়া টিলার উপর উঠে দেখতে লাগল চারিদিক ৷ কিন্তু মেয়েদের দেখা যাচ্ছেনা ৷ একসময় খাদ্য ও পানীয়ের জন্যে কাতর হয়ে জুমিয়া পাহাড়ের উপরেই মৃত্যুবরণ করল ৷ একসময় হাতির পাল সরে গেলে শেষবেলার দিকে মেয়েরা বাবার জুমখেতে আসে ৷ কিন্তু বাবাকে দেখতে পায়না তারা ৷ এদিকে পাহাড়ের আড়ালে সূর্য ডুবে আসছে ৷ অন্ধকার হয়ে আসছে চারিদিক ৷ দুইবোন জোরে জোরে ডাকতে লাগল বাবাকে ৷ কিন্তু ওদের আকুল ডাক পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল ৷ বাবাকে খুঁজতে খুঁজতে তারা পাহাড়ের মাথায় উঠে এল ৷ দেখল সেখানে তাদের বাবা পড়ে রয়েছে ৷ গায়ে হাত দিয়ে দেখল বাবার শরীর ঠান্ডা ৷ ওরা বুঝল ওদের বাবা মারা গেছে ৷ মাকে তো ওরা অনেক আগেই হারিয়েছে ৷ এবার বাবাকেও হারিয়ে তারা একেবারে অনাথ হয়ে গেল ৷ দুবোন পাহাড়ের চুড়োয় বসে দুজন দুদিকে ফিরে কাঁদতে লাগল ৷ ওদের চোখের জল গড়াতে লাগল পাহাড়ের চুড়ো থেকে দুইদিকে দুই ঢাল বেয়ে ৷ওদের কান্নার অশ্রু থেকে জন্ম নিল দুটি নদী ৷ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা এই দুটি নদী দুবোনের নামে সৃষ্টি হয়েছে— কর্ণফুলী ও ফেনী ৷ কাহিনির শেষে বলা হয়, দুইবোনের বাবা যেহেতু খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে মারা গেছে সেকারণে তাদের চোখের জলে সৃষ্ট নদী মানুষকে খাদ্য ও পানীয় যোগাবে ৷ ফেনী নদীর সৃষ্টিকথার এই কাহিনির মধ্যে  নারীজীবনের এক গভীর মর্মসত্য নিহিত রয়েছে ৷ বাপের বাড়িতে বোনেরা একসাথে বড়ো হলেও বিবাহের পর কে কোথায় সংসার করতে চলে যায় তা বলা যায়না ৷ দূরদেশে বিয়ের ফলে কদাচিৎ বোনে বোনে দেখা হয় বা মোটেই হয়না ৷ ফেনীপারের মানুষের মধ্যে একটা লোকপ্রবাদ প্রচলিত আছে—নদীএ নদীএ দেআ অয়, ভইনে ভইনে দেআ অয় না ৷ পাহাড়ের দুইধার দিয়ে বয়ে যাওয়া দুইবোন ফেনী আর কর্ণফুলীর মধ্যে আর কোনোদিন দেখা হয়নি ৷ যেমন হয়না বাস্তবজীবনে দুইবোনের মধ্যে ৷ সেজন্যেই তো নদী ও জীবন, নদী ও সংস্কৃতি আর নদী ও নারী এক অবিচ্ছিন্ন সম্পর্কে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের জীবন জুড়ে ৷ ফেনী নদীর লোকপৌরাণিক ব্যঞ্জনা জীবনবোধেরই প্রকাশ ৷

ফেনী নদীর নামকরণ  :

         ড. আহমদ শরীফ তাঁর ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, “ প্রাচীনকালে আধুনিক ফেনী অঞ্চল ছাড়া নোয়াখালির বেশির ভাগ ছিল নিম্ন জলাভূমি ৷ তখন ভুলুয়া ( নোয়াখালির আদিনাম)  ও জুগিদিয়া (ফেনী নদীর সাগরসঙ্গমে অবস্থিত)  ছিল দ্বীপের মতো ৷ ছাগলনাইয়া নামকরণ সম্পর্কে কেউ কেউ বলেন যে, ইংরেজ আমলের শুরুতে  (Sagor) শব্দটি ভুলক্রমে ( Sagol) নামে লিপিবদ্ধ হয়েছিল ৷ তাই ছাগলনাইয়া শব্দটি প্রচলিত হয়ে ওঠে ৷ উল্লেখ্য ইংরেজ আমলের পূর্বে কোনো পুঁথিপত্রে ছাগলনাইয়া নামের কোনো স্থানের নাম পাওয়া যায়না ৷’ কোনো কোনো গবেষকদের মতে, একসময় সাগরনাইয়ার আংশিক  এলাকা, সোনাগাজি ও ফেনী সদরের পুরোটাই বঙ্গোপ সাগরের উপকূলের চরভূমি ছিল ৷ তখন সাগরের ফেনায় ঢাকা থাকত মোহনা অঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন নদীটি ৷ তার থেকে নদীর নাম হয় ‘ফেনী’ ৷ কেউ কেউ বলেন ‘ফেনী’ নামে কোনো রাজার নাম অনুসারে এই অঞ্চলের নদীটির নাম হয় ‘ফেনী’ ৷ তবে ইতিহাসে তেমন কোনো রাজার নাম পাওয়া যায়না ৷
        সমুদ্রগুপ্তের আমলের শেষভাগে (375-414খ্রি.) চিনা পরিব্রাজক ফা-হিয়ান ভারত সফরকালে  চট্টগ্রামে আসেন এবং সমুদ্রতীরবর্তী এই অঞ্চলে কিছুদিন অবস্থান করেন ৷ তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে ‘ভুলুয়া’ নামে একটি বিখ্যাত জনপদ ও সমুদ্রবন্দরের কথা উল্লেখ করেছেন ৷ এই অঞ্চলে তাঁর অবস্থানহেতু তাঁর নামানুসারে কালক্রমে ‘ফা-হিয়ানী’ থেকে ‘ফেনী’ হয়েছে বলে কেউ কেউ বিশ্বাস করেন ৷

ফেনী নদীর নামকরণে লোকভাষা  :

    ফেনী নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী মগ জনজাতীয়রা এই নদীর নাম তাদের দেওয়া বলে দাবি করেন ৷ তাঁরা বলেন, ‘ফোয়ে-নি-রে’ অর্থাৎ ‘গোসাপের আবাস’ বা ‘এখানে গোসাপ থাকে’ বলতে যে শব্দগুচ্ছ তাঁরা ব্যবহার করেন তা থেকে কালক্রমে পরিবর্তিত হয়ে ‘ফেনী’ শব্দটি এসেছে বলে এই জনগোষ্ঠীর জনগণ দাবি করেন ৷ পর্বতসংকুল ফেনী নদীর পারে ঝোপেঝাড়ে একসময়  প্রচুর গোসাপের আড্ডা ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে ৷ ফেনী নদীর উচ্চগতিতে পার্বত্য অঞ্চলে বাংলাদেশের অংশে নদীর পাড় থেকে কিছুটা দূরে একটা পার্বত্য জনপদ রয়েছে যার নাম ‘গুইমারা’ ৷ স্থানীয় বাংলায় গোসাপকে ‘গুইল’ বলা হয় ৷ সম্ভবত এখানে গোসাপ বা গুইল মারা পড়ত বলে স্থানটির নাম ‘গুইলমারা’থেকে ‘গুইমারা’ হয়েছে ৷ শিকারে ধরা পড়া এবং মারা যাওয়া বন্যপ্রা‌ণীর নামানুসারে স্থাননামের উদাহরণ ত্রিপুরায় বহু রয়েছে ৷ যেমন— বাঘমারা, হাতিমারা, হাতিমরাছড়া, হরিণমারা, কাউয়ামারা ইত্যাদি ৷ গুইমারাও সেরকম একটি স্থাননাম ৷ 
     চাকমা ভাষাতেও ‘ফেনী’ শব্দটি পাই  প্রত্যাবর্তন অর্থে ৷ যেমন, চাকমা লোককাহিনি রাধামন-ধনপুদি পালায় রয়েছে— ‘দোমে বাজায় ধোল দগর/ ফেনী যেইয়ুং নুরনগর’ ৷ এখানে ‘ফেনী যেইয়ুং নুরনগর’ বলতে  নুরনগর ফিরে যাওয়ার কথা বোঝাচ্ছে ৷ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ফেনী নদীর উজান এলাকায়  ত্রিপুরা ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চাকমা জনজাতির বাস রয়েছে ৷ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশাল এলাকা একসময় চাকমা রাজাদের অধীন ছিল ৷ ত্রিপুরারাজ্যের রাজাদের সঙ্গে চাকমা রাজাদের বিবাদ-বিরোধের তেমন কোনো নিদর্শন ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায়না ৷ চাকমা রাজারা সম্ভবত তাঁদের রাজ্যসীমা ফেনী নদীর পাড় পর্যন্ত রেখেছিলেন ৷ফেনী নদীর পাড় পর্যন্ত তাঁদের রাজ্যসীমা চিহ্নিত করে তাঁরা তাঁদের রাজ্যের অভ্যন্তরভাগে ফিরে গেছেন ৷ এই বক্তব্যের সূত্র ধরে এই নদীর নাম ফেনী বলে চাকমাগোষ্ঠীর জনগণের অনেকে মনে করেন ৷ ফেনী নদীর পাড়ে বাংলাদেশে দেওয়ানবাজার নামে একটি স্থান আজও রয়েছে ৷ 
    ইতিহাস, পুরাকথা, লোককাহিনি, লোকভাষা ইত্যাদির মধ্যে যেমন ফেনী নদীর নামকরণের বৈচিত্রময় উৎস খুঁজে পাওয়া যায়, তেমনি ফেনীপারের অনেক স্থাননামের সঙ্গে পৌরাণিক স্থাননামের সাজুয্য খুঁজে পাওয়া যায় ৷ যেমন, এই নদীর উজানভাগে বাংলাদেশ অংশে রয়েছে  অযোধ্যা, রামগড় আর ভাটির দিকে রয়েছে কালিদহ, চম্পকনগর ইত্যাদি নামের বহু প্রাচীন জনপদ ও বাণিজ্যকেন্দ্র ৷ আবার কিছুদূরেই চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উপর সীতাকুন্ড নামে একটি উষ্ণ প্রস্রবন রয়েছে ৷ শুধুমাত্র ফেনী নদীই নয়, নদীর দুইপাড়ে কাছে দূরে অনেক স্থানই  নানা নামমাহাত্ম্য বহন করে চলেছে ৷  

ফেনী নদী  : প্রাচীন গ্রন্থ ও পুঁথিসাহিত্যে  :

মহারাজা ধর্মমাণিক্যের আমলে (1431-62খ্রি.) শ্রীহট্ট জেলার অন্তর্গত দক্ষিণ পরগণার ঠাকুরবাড়ি গ্রামের অধিবাসী দুজন পুরোহিত শুক্রেশ্বর ও বাণেশ্বর বাংলা পয়ার ছন্দে রাজমালা রচনা করেন ৷ তাঁরা ধর্মমাণিক্যের আমন্ত্রণে তাঁর পূর্বপুরুষের কীর্তিকাহিনি  শোনার বাসনায় বাংলা হরফে একটি সংস্কৃত পুঁথি রচনা করেন ৷ তার নাম ‘শ্রীরাজরত্নাকরম’ ৷ এই পুঁথিতে লেখকের নাম বা রচনার কোনো সন-তারিখ উল্লেখ নেই ৷ তবে এর রচনাকাল 1462 খ্রি.র মধ্যে কোনো এক সময়ে হয়ে থাকবে ৷ সেই পুঁথির শেষাংশ অর্থাৎ দ্বাদশ সর্গের শেষভাগে রাজচন্তাই দুর্লভেন্দ্রর বয়ানে ত্রিপুরার সীমাবর্ণনা রয়েছে এইভাবে—
                                      দুর্লভেন্দ্র উবাচ
                অতিপ্রাচীনমেবেদং রাজ্যং ত্রিপুরসংজ্ঞিতম৷
                মহাদেবং বিহারার্থং ব্রহ্মণা নির্মিতং পুরা ৷৷ 94 
                ত্রিপুরেশবনং পুণ্যং-প্রসিদ্ধং সত্যকালতঃ ৷
                কিরাতনিচয়াস্তত্র নিবাসং চক্রিরে পুরা ৷৷ 95
                তে কালে বিপুলং রাষ্ট্রং কৃতবন্তো ধনুর্ধরাঃ ৷
                ভবানী কৃপয়া রাজন্ ত্রেতায়ামিতি শুশ্রূমঃ ৷৷ 96
                ব্রহ্ম-কিরাত-ভূভাগ পূর্বসীমা প্রকীর্তিতা ৷
                দেশস্তু কচ্ছলিঙ্গাখ্যঃ সীমাগ্নেয়ী প্রকীর্তিতা ৷৷ 97
                ফেনবতী নদী তস্যস্থিতা দক্ষিণ সীমনি ৷
                নৈঋত্যাং কচ্ছরঙ্গো হি তস্য সীমোচ্যতে জনৈঃ ৷৷98
( দুর্লভেন্দ্র বললেন—ত্রিপুর নামক রাজ্যটি অতি প্রাচীন ৷পুরাকালে ব্রহ্মা মহাদেবের বিহারার্থ এই রাজ্য  নির্মান করেছিলেন ৷ ৷94৷ সত্যযুগ থেকেই ত্রিপুরেশের পবিত্রবন হিসেবে এই রাজ্য প্রসিদ্ধ ৷ (অবশ্য) পুরাকালে কিরাতগণ এখানে নিবাস স্থাপন করেছিল ৷ ৷95৷ হে রাজন, ধনুর্ধর কিরাতেরা কালক্রমে এক বিপুল রাজ্য নির্মান করেন ৷ শোনা যায়, ভবানীর কৃপায় ত্রেতাকালে এই ব্যাপারটি সম্ভব হয়েছিল৷৷96৷ ব্রহ্ম ও কিরাতদেশে এর পূর্বসীমা বলে প্রকীর্তিত ৷ কচ্ছলিঙ্গ নামক দেশ এ রাজ্যের শুভ আগ্নেয়ী (পূর্ব-দক্ষিণ) সীমা বলে সুবিদিত ৷৷97৷ এর দক্ষিণ সীমায় ফেনবতী নদী প্রবাহিত ৷ কচ্ছরঙ্গ দেশের নৈঋত দিকে অবস্থিত বলে লোকত প্রসিদ্ধ ৷৷98৷ এখানে স্পষ্ট বোঝা যায়, ত্রিপুরা রাজ্যের দক্ষিণ সীমা নির্দেশক ‘ফেনবতী’ নদীটিই বর্তমানের ফেনী নদী ৷
         মধ্যযুগের কবিদের রচিত পুঁথিসাহিত্যে একটিবিশেষ নদীর জলধারা এবং খেয়া পারাপারের জন্যে ব্যবহৃত ঘাট হিসেবে ‘ফনী’ শব্দটির উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায় ৷ পঞ্চদশ শতকের শেষ ও ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধে চট্টগ্রাম শাসন করেন আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (1494-1519খ্রি.) ও তাঁর পুত্র নসরৎ শাহ (1519-1533খ্রি.) ৷ এইসময় চট্টগ্রামে শাসক ছিলেন লস্কর পরাগল খাঁ ও তাঁর পুত্র ছুটি খাঁ ৷ সেসময় চট্গ্রামের প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল পরাগলপুরে যা লস্করপুর নামেও খ্যাত হয় ৷ এখানে রাজধানী স্থাপন করে লস্কর পরাগল খাঁ ও তাঁর পুত্র ছুটি খাঁ প্রায় ত্রিশ বছরের বেশি সময় চট্টগ্রামে শাসনকার্য পরিচালনা করেন ৷ মধ্যযুগে লস্করপুর অর্থাৎ পরাগলপুর ছিল চট্টগ্রামের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রশাসনিক অঞ্চল ৷ এই সময়ে রাজসভার কবি ছিলেন কবীন্দ্র পরমেশ্বর ও শ্রীকর নন্দী ৷ মধ্যযুগে বাংলাসাহিত্যচর্চার এক প্রধান কেন্দ্র হয় ওঠেছিল তখন পরাগলপুর বা লস্করপুর ৷ প্রথমজন অর্থাৎ কবীন্দ্র পরমেশ্বর রচনা করেছিলেন পরাগলী মহাভারত এবং দ্বিতীয়োক্ত শ্রীকর নন্দী ছুটি খাঁর নির্দেশে পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে মহাভারতের অশ্বমেধ যজ্ঞ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন ৷ তাঁর এই অনুবাদকর্ম ছুটি খানি মহাভারত নামে বাংলাসাহিত্যে সমাদরের সঙ্গে আলোচিত হয় ৷ কবি শ্রীকর নন্দী পরাগলপুর বা লস্করপুরের পরিচয়প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন—

                                চাটিগ্রাম নগরের নিকট উত্তরে
                                চন্দ্রশেখর পর্বত কন্দরে ৷৷
                                চারুলোল গিরি তার পৈতৃক বসতি
                                বিচিত্র নিরমিল তাক কি কহিব অতি ৷৷
                                পরি বর্ণ বসে লোক সেনা সন্নিহিত
                                নানা গুণে প্রজা সব বসএ তথাত ৷৷
                                ফেনী নদী নামে এ বেষ্টিত চারিধার
                                পূর্বদিকে মহাগিরি পার নাহি তার ৷৷
                                লস্কর পরাগল খানের তনয়
                                সমরে নির্ভএ ছুটি খান মহাশয় ৷৷
          স্পষ্টই বোঝা যায় যে মধ্যযুগে লস্করপুর বা পরগলপুর নামের নগরটি ফেনী নদীর তীরে অবস্থিত ছিল ৷ আর এই নদীর তীরের এই শহরটি একদিন বাংলা ভাষাসাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল ৷
          সতেরো শতকের আর একজন কবি মির্জা নাথান-র ফার্সি ভাষায় রচিত ‘বাহারিস্তান-ই-গায়েবী’-তে ‘ফণী’ শব্দটি ফেনীতে পরিণত হয়ে গেছে ৷ আঠারো শতকের শেষভাগে কবি আলী রেজা বা কানু ফকির তাঁর পিরের বাসস্থান হাজিগাঁওর অবস্থান বর্ণনাকাল উল্লেখ করেছেন, 
                              
                                   ‘ফেনীর দক্ষিণে এক ষর উপাম
                                    হাজিগাঁও করিছিল সেই দেশের নাম’
       কবি মোহাম্মদ মুকিম তাঁর পৈতৃক বাসস্থানের বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন, ‘ফেনীর পশ্চিমদিকে যুগিদিয়া দেশে……’৷ এখানে লক্ষ্যণীয় যে এই কবিগণও নদীটির নাম বোঝাতে ‘ফেনী’রই ব্যবহার করেছেন ৷
        আনুমানিক 1712 খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ শিক পরগণার কৈয়রা গ্রামে সমসের গাজির জন্ম হয় ৷1784 খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী সমসের গাজির অধিকারভুক্ত হয় ৷ তখন থেকে  বারো বছর তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের সর্বময় কর্তা ছিলেন ৷ সমসের গাজির জীবনের আকস্মিক উত্থান-পতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর মৃত্যুর পর শেখ মনুহর গাজি নামে এক পল্লীকবি  রচনা করেন ‘গাজিনামা’ ৷ 1813 খ্রিস্টাব্দে নোয়াখালির সেরেস্তাদার মৌলবি খবির মুদ্রিত করেন এই গাজিনামা ৷ এটি ত্রিপুরার ইতিহাসাশ্রিত কাব্যগ্রন্থ ৷ ‘গাজিনামায়ও সমসের গাজির গড় জগন্নাথ-সোনাপুর গ্রামের বর্ণনায় পাই—

                             দক্ষিণে ফেনী নন্দী       পূর্বে গিরি মুড়াবন্দী
                                         উত্তরেতে এহেন জলধি ৷
                             পশ্চিমে মলয়াপানি       তার মধ্যে ভদ্রাখানি
                                         মধ্যে যেন খিরুদের দধি ৷৷

      এখানেও সমসের গাজির গড়বন্দী গ্রামের সীমা প্রসঙ্গে ফেনী নদীর উল্লেখ রয়েছে ৷ ফেনীপারের এই বিদ্রোহী বীরের উত্থানে সেদিন ত্রিপুরার রাজসিংহাসন কেঁপে উঠেছিল ৷ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সমসের গাজির কেল্লা এবং বিশাল দীঘিটি আজও দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুম মহকুমার পশ্চিম প্রান্তস্থ সীমান্ত গ্রাম আমলিঘাটে বিদ্যমান ৷ আমলিঘাট থেকেই ফেনী নদীর নিম্নগতির শুরু এবং প্রশস্ত জলপ্রবাহের রূপ ধরে দক্ষিণাভিমুখী হয়ে বাংলাদেশের সমতলক্ষেত্রের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে ৷
 
ফেনী নদীর তীরের জনপদে ইতিহাস ও কিংবদন্তীর মেলবন্ধন  :

        ফেনী নদীপ্রবাহের ভারতভূখন্ডের শেষ প্রান্তিক জনপদ আমলিঘাট ৷ আমলিঘাট ও তার পার্শ্ববর্তী লোকালয় ঘিরে বেশ কিছু প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন ও লোককাহিনি জড়িয়ে রয়েছে ৷ আমলিঘাটের একপ্রান্তেই সীমান্ত ঘেঁষে রয়েছে এই অঞ্চলের কৃষক বিদ্রোহের নায়ক সমসের গাজির দীঘি ও কেল্লার ধ্বংসাবশেষ ৷ কেল্লাটি আজ জঙ্গলাকীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে ৷ দীঘির বৃহত্তর অংশই কাঁটাতারের ওপারে, যার একাংশ বর্তমানে বাংলাদেশ ভূখন্ডের অন্তর্ভুক্ত ৷ দীঘিটির তেমন সংস্কার নেই ৷ পাড় কেটে অনেকে চাষের জমি বানিয়ে ফেলেছে ৷ এই দীঘিকে কেন্দ্র করে লোককাহিনিও প্রচলিত ছিল একসময় লোকমুখে ৷ দীঘির পাড়ে তালিকা রেখে মানত করলে নাকি বাসন-কোশন পাওয়া যেত উৎসব অনুষ্ঠানে নেমনতন্নের কাজ সমাধা করার জন্যে ৷ দীঘির একটা কোনা থেকে একটা সুড়ঙ্গপথ সমসের গাজির কেল্লা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে, যা এখন বনজঙ্গল ঘেরা এবং বাদুড়,চামচিকে, সরীসৃপের আবাসস্থল ৷ লোকপ্রচলিত কথা আছে, এই সুড়ঙ্গপথ দিয়ে সমসের গাজির কেল্লার অভ্ন্তরের পর্দানসীন মহিলারা দীঘির জলে স্নান করতে আসতেন ৷
       সমসের গাজির এই দীঘিটির চারধারে যে উর্বর নি,্ন সমভূমি রয়েছে এবং যা বর্তমানে বাংলাদেশের অংশের চাষের ভূখন্ড তার নাম ‘কালিদহ’ ৷ এই কালিদহকে কেন্দ্র করেও একটি পুরোনো লোককথা প্রচলিত রয়েছে ৷ সেই অনুযায়ী জানা যায় যে এই কালিদহেই নাকি চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙা ডুবেছিল ৷ বছর চল্লিশেক আগেও এখানকার ভূমিতে প্রোথিত নৌকার গ ুইয়ের মতো কিছু একটার ঊর্ধ্বভাগ দেখা যেত ৷ এটাকে ধারনা করা হত চাঁদ সওদাগরের ডুবে যাওয়া নৌকার গলুইয়ের অংশবিশেষ ৷ এই বস্তুটি 1974 সালে এই প্রতিবেদক এবং ত্রিপুরার বিশিষ্ট লোকগবেষক ড. রঞ্জিত দে প্রত্যক্ষ করেছেন ৷ গ্রাম্য ললনারা এখানে  দীর্ঘদিন ধূপ-দীপ জ্বালাতেন ৷ পাশের (বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্গত) গ্রামটির নাম চম্পকনগর ৷ বলা হয়, এখানে চাঁদ সওদাগরের বাড়ি ছিল ৷ আমলিঘাট প্রায় এক দেড় কিলোমিটার ফেনী নদীর উজানের দিকে নদীতে একটি গভীর খাত রয়েছে ৷ এখানে বিশাল এলাকা জুড়ে জলঘূর্ণির সৃষ্টি হয় ৷ জলের এই পাকের মধ্যে কিছু এসে পড়লে কুন্ডলী পাকিয়ে জল তা অনেক দূরে নয়ে ফেলে ৷ এই স্থানটিতে জলের গভীরতাও প্রচুর ৷ পঞ্চাশ-ষাট হাত লম্বা বাঁশ ফেলেও ঠাঁই পাওয়া যায়না ৷ এখানে প্রচুর মাছ পাওয়া যায় বলে মৎস্যশিকারীদের জন্যে লোভনীয় স্থান এটি ৷ এই জায়গাটির নাম ’মেরুকুম’ ৷ সন্নিহিত জনপদের নাম ‘মেরুপাড়া’ ৷ এখানে বিস্তৃত চরভূমি রয়েছে ৷ মেরুকুমের এই চরভূমিতে দাঁড়িয়ে বিকেলবেলার সূর্যাস্তের দৃশ্য অত্যন্ত নয়নমুগ্ধকর ৷ লোকশ্রুতি আছে এখানেই নাকি মনসামঙ্গলখ্যাত বেহুলার বাবা সায়বেনের বাড়ি  ছিল ৷ একসময় এই মেরুকুম পর্যন্ত সমুদ্রের জোয়ারের জল আসত ৷ ফেনী নদীর বাঁকে অবস্থিত এই মেরুকুম-আমলিঘাট-কালিদহ-চম্পকনগর ও তৎসন্নিহিত অঞ্চল নিয়ে সত্যিই মনসামঙ্গলে বর্ণিত কাব্যিক পরিবেশ সৃষ্টি করে ৷

ফেনী নদীর পাড়ের লোকমেলা  :

      ফেনী নদীকে ঘিরে দুই পারের জনগণের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় অনুষ্ঠানও চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই ৷ বিবাহ-অন্নপ্রাশন ইত্যাদি পারিবারিক অনুষ্ঠান ও পুজো -উৎসবের ঘট পূর্ণ করা হয় ফেনী নদীর জলে বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে ৷ ফেনী নদীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান বারুণীমেলা ৷ ফেনী নদীর গতিপথের তিনটি স্থানে জমজমাট মেলা বসে ৷সেগুলো হল, ত্রিপুরার সাব্রুমে ও আমলিঘাটে এবং বাংলাদেশের শুভপুরে ৷ তবে দক্ষিণ ত্রিপুরার মহকুমাশহর সাব্রুমের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ফেনী নদীর বারুণীস্নান ও মেলা খুবই প্রাচীন ও প্রচুর লোকসমাগম হয় এখানে ৷
     প্রতিবছর চৈত্রমাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে হয় বারুণীস্নান ৷ এদিন হিন্দু সনাতন ধর্মাবলম্বী জনগণ নদীর পুণ্যসলিলে স্নানান্তে পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পন করেন ৷ এই উপলক্ষে সাব্রুমের সীমান্ত নদী ফেনীর পাড়ে বসে মেলা ৷ নদীর দুই পাড়ে দুই জনপদ ৷ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাব্রুম আর বাংলাদেশের রামগড় ৷ ত্রিপুরা রাজ্যের ভারতভুক্তির বহু আগে থেকেই ফেনীর দুই পাড়েই এই উপলক্ষ্যে মেলা বসে আসছে ৷ ভারতভুক্তির পর সীমান্তে কড়কড়ির ফলে দুদেশের মানুষের অবাধে আসা-যাওয়ায় প্রতিবন্ধকতা আসে ৷ কিন্তু বারুণীর দিন কিছুক্ষণের জন্যে সব বাধা যেন ছিন্ন হয়ে যায় ৷ দুই পাড় দুই রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হলেও যাঁরা তদানিন্তন পূর্বপাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তু হয়ে ত্রিপুরায় আশ্রয় নিয়েছেন তাঁরা ওপারের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ থেকে বঞ্চিত হন তাঁরা বারুণীর দিন পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাতের কিঞ্চিৎ সুযোগ পান কিছুক্ষণের জন্যে ৷
          ঠিক এভাবেই একাত্তরের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় যাঁরা এদেশে এসে আর ফিরে যাননি, যাঁরা ফিরে গেছেন সবাই এদিন মিলিত হন প্রিয়জনদের সাথে এই বারুণীমেলাতে ৷ এই দিনটিকে কেন্দ্র করে দূরদেশে বিয়ে হওয়া মেয়েরা ফেনী পারের গ্রামে বাপের বাড়িতে ‘নাইঅর’ আসে ৷ বাপের বাড়িতে বেড৷াতে আসে আর সেইসঙ্গে মেলাটাও সেরে নেয় ৷ সারাবছরের ঘরগেরস্থালির টুকটাক উপকরণ এই বারুণীমেলা থেকেই সংগ্রহ করে নেয় ৷ কিছুক্ষণের জন্যে দুপারের মানুষের মিলিত অশ্রুধারা ফেনীর জলে, িশে ভাটির দিকে বয়ে যায় সমুদ্রের সন্ধানে ৷ঐতিহ্যের শেকড়ের খোঁজে ৷ ফেনী নদী এভাবেই এই অঞ্চলের বাঙালিদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বুকে ধরে নীরবে বয়ে যায় ৷

ফেনীকেন্দ্রিক সঙ্গীত  :  প্রসঙ্গ মুক্তিযুদ্ধ

         এই ফেনী নদী একটি নবীন রাষ্ট্রের উত্থানের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ৷ একাত্তরের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়  ফেনী নদীর পারেই গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের প্রধান কার্যালয় ৷ হরিনাতে গড়ে ওঠে বেস ক্যাম্প ৷ সেখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিসেনারা ফেনী নদী পেরিয়ে আক্রমন শানিয়েছিল সেদিন বাংলাদেশের করর হাটে, ছাগলনাইয়ায় ৷ ফেনীপারের মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কাহিনি নিয়ে রচিত গ্রাম্য কবিদের কবিতা সুর করে গ্রাম্য হাটে বিক্রি করতেন লোককবিরা ৷ হাটে ফেরি করে বিক্রি করা হয় বলে অধুনালুপ্ত এই কবতাগুলোকে বলাহত ‘হেটো ছড়া’ বা’হেটো কবিতা’ ৷ প্রতিবেদকের কৈশোরে শোনা একটি হেটো ছড়ার বিস্মৃতপ্রায় কয়েক পংক্তি উদ্ধারের প্রয়াস নেওয়া গেল ৷

                  বলি বীরের কথা, শুনেন বার্তা, শুনেন দিয়া মন
                  স্বাধীন বাংলা পাইবার তরে এক হইলো জনগণ
                   হইলো মুক্তি যোদ্ধা ৷
                   হইলো, মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীন যোদ্ধা বাংলার যুবদল
                   জয় বাংলা জয় বাংলা বলি চলিল সকল
                   নিল বন্দুক হাতে, 
                   নিল বন্দুক হাতে হরিনাতে ট্রেনিং দিবার পর 
                   দল বাঁধিয়া পার হইল ফেনী নদীর চর
                   গেল রামগড়েতে ৷
                    গেল রামগড়েতে, তারপরেতে শুভপুরে যায়
                     গ্রেনেড মারি সেইখানেতে ফেনীর পুল উড়ায়…..ইত্যাদি ৷

ফেনীর মাছ  : সংস্কৃতি ও জীবন

নদী যেমন জীবনকে ধরে রাখে তেমনি নদীর বুকের সম্পদও জীবনের রসদ যোগায় ৷ নদীর মাছ বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ৷ পূর্ববাংলার মানুষ অর্থাৎ বাঙালদের যেমন ইলিশ মাছ বিশেষ প্রতীক আর পশ্চিমবাংলার মানুষদের কাছে গলদা চিংড়ি সাংস্কৃতিক প্রতীক ৷ মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গলের খেলার দিন তা বিশেষভাবে প্রকট হয়ে ওঠে ৷ ফেনী নদী একসময় দুই সংস্কৃতিকেই বহন নেজের বুকে ৷ ইলিশ মাছ আর গলদা চিংড়ি এখানে প্রচুর পাওয়া যেত ৷ এভাবে সংস্কৃতির সমন্বয়ের ধারা রক্ষার ক্ষেত্রে নদীর ভূমিকা ফেনী নদীছাড়া আর দেখা যায়না ৷
        এভাবেই দীর্ঘ শতাব্দী ধরে বয়ে চলা ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারা বহন করে একদিন প্রাণোচ্ছল ছিল ফেনী নদী ৷ কিন্তু কালের বিবর্তনে  আজ সেই ইতিহাস স্তিমিত  ৷ একদিন ফেনী নদীর জলে পুষ্ট তীরভূমির জমি থেকে ফসল উঠলে চাষার ঘরে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যেত ৷ নবান্নের উৎসবে মেতে উঠত জনপদ ৷ বেচা-কেনার তুমুল ধুম পড়ে যেত  দুপারের গঞ্জের হাটগুলোতে ৷ নৌকো বাঁধা থাকত সারি সারি নদীতীরের বাজারের ঘাটগুলোতে ৷ একদিনের সেই রূপসী, জলচঞ্চলা ফেনী নদী আজ নিঃস্ব,  রিক্ত ৷ তার সমস্ত অতীত গৌরব হারিয়ে আজ উদার আকাশের নীচে শীর্ণ শরীর বিছিয়ে অত্যন্ত ক্ষীণধারায় বয়ে চলেছে ইতিহাসের মূক সাক্ষী হয়ে ৷ অকাল বার্ধক্য গ্রাস করেছে তাকে ৷ সভ্যতার নামে মানুষের নির্বিচার
 অত্যাচার, প্রকৃতির উপর আগ্রাসন আজ ফেনী নদীকে তার ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব সম্পর্কে  হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ৷  শুরুতে যে প্রবাদের উল্লেখ করেছিলাম তারই যেন বিপরীত প্রভাব পড়েছে ফেনী নদীর উপর ৷ ভাগের মা যেমন গঙ্গা পায়না তমনি ভাগের গঙ্গাও যেন কদর পায়না ৷ সীমান্ত নদী হওয়ার ফলে এই নদীকে দুপারের জনগণ যথেচ্ছ ব্যবহার করছে ৷ কোনো পরিকল্পনা নেই ফেনী নদীকে নিয়ে ৷ এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই এই উপমহাদেশের মানচিত্র থেকে ফেনী নদী মুছে যাবে ৷ এখনও সময় আছে ৷ যদি যথাযথপরিকল্পনার মাধ্যমে  নদীর  নাব্যতা ফিরিয়ে আনা যায় তাহলে ফেনী আবার জেগে উঠবে ৷নিজের বুক পেতে দেবে দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্প্রীতি সমন্বয়ের লক্ষ্যে ৷ রূপায়িত হবে আগামী ইতিহাস ৷ তার জন্যেই ফেনী ‘নদীর জলে থাকি রে কান পেতে/কাঁপে রে প্রাণ পাতার মর্মরেতে ৷ 
                          —-—————--——--0———————

——---------------------------------------------------------------------------------------------


সহায়ক গ্রন্থ ও অন্যান্য তথ্যপঞ্জী

1.শ্রীরাজমালা (ধন্যমাণিক্য খন্ড) —শুক্রেশ্বর ও বাণেশ্বর

2.রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস—কৈলাসচন্দ্র সিংহ

3.রাজরত্নাকরম— অজ্ঞাত

4.ত্রিপুরার ইতিহাস—ড.জগদীশ গণচৌধুরী

5.চট্টগ্রামের ইতিহাস—আহমদ শরীফ

6.নোয়াখালির মাটি ও মানুষ—ড. দীনেশচন্দ্র সিংহ

7.রাজন্যশাসিত ত্রিপুরা ও চট্টগ্রাম—ড. রঞ্জিত দে

8.গাজিনামা—শেখ মনুহর গাজি

9.আরণ্য জনপদে—আবদুস সাত্তার

10.ত্রিপুরার লোকসমাজ ও সংস্কৃতি—অশোকানন্দ রায়বর্ধন

11.ত্রিপুরার মগজাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি—অশোকানন্দ রায়বর্ধন

12.চট্টগ্রামের ইতিহাস—উইকিপিডিয়া

13.নোয়াখালি জেলা—উইকিপিডিয়া

14.মীরসরাই উপজেলার পটভূমি—চট্টগ্রাম জেলা

To be presented by :
           ASOKANANDA RAYBARDHAN 
         SABROOM NAGAR PANCHAYET
        PO: SABROOM, SOUTH TRIPURA
                     PIN: 799145
               MOBILE NO: 9612515586
       EMAIL ID:hiasokananda@gmail.com