গোবিন্দ ধর এর কবিতা

★দেশের বাড়ি 

দেশের বাড়ি বলতে আমাদের পূর্ব পুরুষের 
একটি বাড়ি ছিলো।
ছিলো পুকুর ভরা মাছ আর দুধেল গাই।
বারো হাল বলদ।

ঠাকুরদা দেবেন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত 
একটি স্কুল মিঞারপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়।

পঞ্চাশের বড় রায়টের সময় সব বদলে গেলো
বাবা চলে এলেন ঠাকুরদার হাত ধরে 
ছেঁড়া মানচিত্র বগলে নিয়ে।

সেই বাড়িতে এখন ক্ষেত, ধানি জমিন।
কিছুটা মনু গিলে খেয়েছে। 

দেশের বাড়ি বলতে আমার নিকট
গোটা বাংলাদেশ সঙ্কীর্ণ গৃহচিহৃ নয়।

১১-০৭-২০২০
বেলা:৪টা ২৫ মি
কুমারঘাট

★জ্বর

লাফিয়ে বাড়ে জ্বর।জ্বরের ঘোর লাগা 
মাঝ রাতে কড়া নেড়ে কেউ ডেকে চলে
ক্রমাগত গোবিন্দ গোবিন্দ। 

সেই ডাকে সাড়া দিয়ে পা চালাই।পা উঠছে
পা নামছে।সে দৌড়ছে।গোবিন্দ দৌড়ছে।

এই দৌড় সীমিত। জানি সীমিত। সীমানা ঝুলে আছে। সামনে কাঁটাতার।
সারা পৃথিবী এত শত শত সীমানায় আলাদা।

আকাশ টুকরো টুকরো রুটি লাগে। 
জল ভাগ হয়ে বিভাজিত অক্সিজেন। 

আমাদের ভূগোল এত রক্তাক্ত আমি
চিৎকার করে উঠি।আমার ঘোর কেটে যায়।

জ্বর নামে না।মাঝরাতে এক অলৌকিক আলো
ঝিলিক দিয়ে যায় গুরু মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে।

জ্বরের ঘোর থেকে লিখি সরল নিয়মে
একটি সবুজ পৃথিবী। 

১২-০৭-২০২০
বেলা:০২টা ৪৫ মি
কুমারঘাট


★একটি বেলুন

একটি বেলুন চুপসে ছিলো 
তার ভেতর প্রণ দিয়ে ছেড়েছি 
আকাশ ঠিকানায়। 
বেলুন উড়ছে। উড়ছে বেলুন।

এই উড়ানের কেচ্ছায় আমি একটি বৃত্ত। 
বেলুন একটি বৃত্ত। 
আর আকাশ অসীমান্তিক যাত্রাপথ।

মাঝে একটি সুতো যা কেটে গেলে

বেলুন আবার চুপসে যাওয়ার কথা।

আমি চাই বেলুন উড়ুক।

অথচ উড়াল থেমে যেতে একটি ফুটোই যথেষ্ট
জড়বেলুন জানে না।

১৪:০৭:২০২০
সকাল:০৬:৪০মি
কুমারঘাট।


★দুঃসময়ের কবিতা

মাথাকে ফুটবল মনে করে
বেশ খেলছো?
হুকোয় তামাক ভরে যেন
ঠাকুরদা টানছো।

এক পিচ্ছিল সময় বয়ে যায়
অবিরত অবিকল।
তিনবেলা ভাত গিলি নিয়মিত
শুয়ে বসে টানি যাঁতাকল। 

নিজের প্রেমকে বারবার লিখি
বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন। 
মানুষ মানুষ নয় কেউ নয়
কারো আপন টাপন।

আমিই একশ =আমিই একশ
বাকি সব পাখি রব।
এ-ই নিয়ম বলে এক অলিখিত 
নিয়মেই চলছি সব।

১৫:০৭:২০২০
বিকেল:০৫:১০মি
কুমারঘাট।


★একটি ত্রিপুরী কবিতা

অপাংশু দেবনাথ আড্ডায় কবিতায়
অপেক্ষার অম্লবালির মতো মুখ করে 
দাঁড়ি গোঁফ রেখে বিনয় মজুমদার।

সঞ্জীব দে ইদানিং ফ্রেঞ্চকাটিং ধর্ম সমাজ এবং...
অভীক তার চুল দাঁড়ি কবিতার মতো জটিল করে
ভোমরা মেঘের ডাঙা আঁকে।

বিল্লাল হোসেন গল্পেই বলে দেয় না।
নির্মল দত্ত নির্মল আনন্দে বিগত তিন বছর ধরে
পুঞ্জমেঘ ও শুভকালের বিজ্ঞাপন ক্যাটালগে রাখেন।

আমারই দ্বিতীয় শরীর কখন কি বলে।
তৃতীয় পাণ্ডব উঁকি মেরে চায়।
শ্রীমতি পদ্মশ্রী মজুমদার উপন্যাসে লিখে রাখে
দেওনদীর জল। 

ত্রিপুরার দুই শ্যামল অমল দূরত্বে থাকেন তমালবৃক্ষ জানে।
গণমানুষের কবি দিলীপ দাস বাম দিকে রাজীবও জানে।

সন্ত মিলনকান্তি বন্ধু জ্যোতির্ময়সহ অশোকানন্দে 
সময় ডিঙ্গিয়ে বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে উদিত তপন।

আমাদের জাফর মিছিলে আটকে কখন থেকে ফেঁসে আছে
সে গল্প জানেন জলে ভাসে বনজ মুকুটের কবি আকবর।

অপেক্ষার অম্লবালি থেকে না ছাড়া পত্রকাব্যের পর
অপাংশু দেবনাথ আর অনন্ত সিংহ স্নানঘরের কবিতায় আঁকেন চ্যাপলিনের ম্যাজিক রিয়েলিজম ।
গোবিন্দের পদ্মশ্রী পুরস্কার পাওয়ার পর কেউ কেউ কবিতার ঘাস খান আস্তাবলের মাঠে শাখানটাঙের অবাক বালক অমলকান্তি রোদ্দুর মেখে দেখে এলো নিজেই।

আনস্মার্ট কবিতার বিপক্ষে বিমল চক্রবর্তী গবেষণা করেন আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে
কবিদের মস্তিষ্কে।

গোপেশ যখন থেকে কবি হয়ে গেলো তখনই একটি বৌ এসে
তার সব সময় গিলে নিলো বৃক্ষতলে ছায়াপথ।

পঙ্কজ বণিককে ভারতীয় ট্রেন সাইকোলজিক্যাল ডিস্টার্ব করে বলতে বাধ্য করে পাখি না বৃক্ষ হবো।

আমাদের শুভ্রশংকর কবিতার রাজকুমার
তারাও কৃষ্ণগহ্বর থেকে তুলে আনে বাউল মলিকিউলস।

হারাধনের হৃদয়ে রাইমা আর  লংতরাই থেকে সিকামনুকতাই যেতে যেতে চম্প্রেং বাজায়।
হাসমতি ত্রিপুরা তারও কানে নাকে শোভা পায় খুম্পুই ফুল। 

জেনিস এক প্রিয়তমা নদী পদ্মার ঢেউ।
তার কাছে ইলিস এসে রুপালি পালক ঝরায়।

আমাদের আরোও কবিরা আছেন ভূকম্প প্রবণ
তারা নিজেদের স্বচ্ছ ব্রেনে সাকুল্যে ছ'জন কবি ধরেন।

বাকীরা কবির পোশাকে নাকি তাদের জমিনে হামলে পড়েন
তাই তারা নিজেদের পতাকা নিজেরাই বয়ে নিয়ে যান
কলকাতাগামী ইয়ারে।

আমাদের এমনই নিয়তি
নানান দাঁড়ি গোঁফে কবিতার জমিনে হাঁটি।

০৬-০৩-২০১৯
সকাল:০৭:৩৫মি
কুমারঘাট।


★দেশ 

মানুষের দেশ চাই,তার কি কি লাগে
প্লীজ, কেউ জানান?

দেশ কোথায় ইন্ডিয়া ভারত বাংলাদেশ
কিংবা পাকিস্তান?

কোথাও দেশ নেই?
তাহলে কি কোন দেশ নেই?
বাবার দেশ নেই?
বাবার বাবারও দেশ নেই?

আমার কোন দেশ নেই?

একটি দেশ হতে কি কি চাই?
মানুষ চাই?
ধর্ম চাই?
বিদ্বেষ হিংসা সাম্প্রদায়িকতা?

দেশ বলতে কি মানচিত্র, ভূগোল?
মানুষের মা?আশ্রয়?
দেশ বলতে কাকে বলি?

প্লীজ বলুন কেউ:দেশ দেখবো।

৩১:০৭:২০১৮
সকাল:০৮:২০মি
কুমারঘাট।


★অসুখ বিসুখ

আমি ও আমরা এত গন্ডিতে একা
তার চেয়ে হতে প্রিয় সময়ের সাথে দেখা।
এতে যাবেই জানি অসুখ ও বিসুখ
ভালোবাসা পাখিই আনে নিশ্চিত শান্তি- সুখ।

আমার অসুখ জানি নেবে না কেউ
প্রতিদিন বাতাসে ছড়াও তবু এত ওম?
কে কার নেবে বলো শুধুই শরীর
মনের ভেতরে সখি নিহিত প্রেম।

একটু একটু করে বয়স একা
ভালোবাসা যায় যায় অচিন পাখি।
সারাক্ষণ মনে রাখি তোমার ছবি
কাজে অকাজে নিজেকেই বাজি রাখি।

০১:০৮:২০১৮
ভোর:০৫:২৫মি
কুমারঘাট।

★মাটির নিকট ভূমিষ্ট লেখাগুলো 


চরিত্র শব্দের ভেতর শুধু তুলসীপাতা থাকে এমন নয়।
আপেক্ষিক তত্ত্বের নিহিত শক্তির নিকট
মানুষের তৈরী কিছু মনুবাদ অথবা আরো পিচ্ছিল সরীসৃপ কিছু মতবাদ ছাড়া আর কি।
তাতেই লাফালাফি শেয়ালের টগবগে কৌতূহল।
সকল যন্ত্রণা কিছু আবেগ থেকে উৎলে উঠে
মিশে যায় তরঙ্গে। 
তরঙ্গ মিলে যায় অসীমান্তে।
সীমান্ত অতিক্রম করে এক-একটি ধাপ নামলে উঠলে
পা পিছলে না পড়া হাতির পায়ের সংখ্যা শূন্য। 
এমন মাটির নিকট ভূমিষ্ট লেখাগুলো 
জীবনচক্রের সংকট মোচন কিংবা রাগ মোচনের অন্তিমকালেও
উঠে যেতে পারে পরিকার জল।
জলের আপাত এই নিম্নগতিই চমকে উঠে বিদ্যুৎ 
চলকে উঠে বিশল্যকরণী। 
লাগাতর ভুল বলতে বলতে
ভুল শব্দের প্রতিশব্দ হয়তো শুদ্ধতর হয়ে যায় গড্ডালিকায়।
মাটির নিকট নিজস্ব ভুল রেখে 
ভূমিষ্ট পতাকা বুকে রাখি।
বুকের কার্ণিশে সামান্য চড়ুই
অবিরত কোশল কিচিরমিচির শব্দ চরিত্রপুরাণ লেখে।
কারো চরিত্রই তুলসীপাতা নয়।
সুচতুর সকল শব্দের মতো এটাও
আপেক্ষিক এক সমীকরণ মাত্র। 
তথাপি অদূরেই সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বুড়োটা বুড়োরা 
লেখে জেলাসি উপাখ্যান।
বুড়োদের রতিবেগ যদিও ভীমরতি বলে মাফ শব্দ আরোপ করা আছে
তাও বুড়োশালিকের ঘাঢ় থেকে একদিন 
উত্তোরীয় কেড়ে নিতে
আসছে নতুন ধারাপাত। 


০২:১১:২০২০
রাত:০৮টা ৫০মি
কুমারঘাট।


★মাটির কবিতা

মাটির গন্ধ মেখে কতদিন কেটেছে
সে সব মনু জানে
আর রাতাছড়ার ধানিজমি।
#
এখন শহুরে আমি।
ধানগাছ দেখতে যাই অবসর সময়।
#
আর মনুর জল ছোঁয়ে গতদিন দেখিনি।
তবু ছোটবেলা সারাক্ষন ঘুরেফিরে আসে।
আর মাটির গন্ধ বহুদূর থেকে আসে।
#
মাটিশূণ্য আমাদের পা পড়ে লাল গালিচায়।


★মাটির কবিতা -২


প্রতিদিনই মনে হয় মাটির নিকট হাঁটু পেতে দেবো।
লিখবো মাটির ভাষায় লাঙলের কথা।
ধান চারার জন্মদিন। 
লিখবো চাষার বুকের স্বপ্ন। চা বাগানের মেয়ে
রাইধনী উরাং কেমন খিলখিল হাসতে হাসতে, পাতা তুলে।
কেমন করে হাসতে হাসতে শ্রমিক শিল্পীর হাতে
ভাঙে ইট।গড়ে উঠে ইমারত। 

মাটির কবিতা হয়ে উঠে না।মাটি হয়ে যায় সব কবিতা।
হাসির গভীরে লুকানো ক্ষত পড়তে পারি না,পারি না সময়ের যন্ত্রণা পড়তেও।
তাও মাটির নিকট বসি বারবার। নতজানু থাকি।
মাটির বুকেই লাগিয়ে দিই চা পাতার সবুজ,স্বপ্ন।

মাটির নিকট ঋণ রেখে একদিন শেষমেশ, এসো
প্রজন্মকে পথ বাৎলে দেবো।

১৬:০৩:২০২১
রাত:০৮টা
কুমারঘাট।


★হৃদয়হাওর জুড়ে গভীর অসুখ 

হৃদয়হাওর জুড়ে গভীর অসুখকৃষি লাফিয়ে
ধানচারার মতো আকাশ ছুঁতে চায়। 
অসুখের গাছ অনেক বড় হয়ে গেলো অজান্তে।
ডালমূল শাখা তার ছড়িয়েছে মাটি ও আকাশতারায়।

কতটুকু গভীরে গেলে অসুখ ডানা মেলে
পাঠ নেই ডানায় লেগে থাকা মারণঅসুখ রেখেছি যত্নে।
ডানায় ঝাপটে অসুখহরিয়াল উড়ছে আকাশে
তার কামগন্ধ ঘ্রান এসে লাগেনি,সময় ক্রান্তিলগ্নে। 

প্রতিদিন শরীরের আড়মোড়া ভেঙে গেলে 
তোমাকেই কাছেপিঠে রেখেছি,মুখে চুপ।
হৃদয়হাওর থেকে কিচিরমিচির শব্দ করে 
একটি বিকেল গড়িয়ে পড়ে মরুমায়া রূপ।

চোখের গভীর থেকে ভালোবাসা গলে পড়ে
অসুখ হেসে বলে এসব মিছে অভিনয়।
শরীরে লেগেছে গ্রহণ ভুলের দাপট
আমিই ভূমিষ্ট নতজানু সবিনয়।

২২:০৬:২০২১
সকাল:০৬:৪৭মি
কুমারঘাট।


★ডাস্টার

আগাছাগুলো পরিস্কার করে দিতে হয়
যেমনটি ব্ল্যাকবোর্ড থেকে আঁকিবুঁকি 
রেখা মুছে দিতে হয় চকচকে রাখতে।

এরকমই কিছু ভুল কিছু স্বপ্ন মুছে দিতে 
একটি ডাস্টার জরুরি।

পেছন পেছন আসা বিষপিঁপড়ে 
মাঝে মাঝে কামড়ে দিলে পিষে ফেলা জরুরি।

জরুরি ধান খেত থেকে আগাছা উপড়ে ফেলা। 
কাটাকাটি করে অঙ্ক করতে নেই 
মুছে নিলে ঝাঁ চকচকে একটি ব্ল্যাকবোর্ড
পুনরায় শুরু করতে যথেষ্ট। 

দিন শুরুর আগে হোমওয়ার্ক সেরে নিলে
নির্ভুল গন্তব্যে পৌঁছা যায়।এক্ষেত্রে ভুলগুলো 
মুছে দিতে একটি ডাস্টার জরুরি। 

২৮:০৬:২০২১
রাত:১০:২৪মি
কুমারঘাট।

★সেলাই

কখন মুখ ফিরিয়েছে অসুখ জানে না।
চোরাস্রোত ঢুকে সন্তানের মুখের মতো
তচনচ হয়ে আছে বিশল্যকরণী লতা। 

মা কেমন সেলাই জানতেন রূপকথা
রিপু দিতে দিতে কেটে গেল জীবন।
কাঁথাশিল্পের ঘরদোয়ার নিপুণ কৌশলে 
মায়ের যত্নে টগবগিয়ে প্রাণ পেতো।

আধখানা সময়ে জল,অতল থৈথৈ
আনবাড়ি যায় সুখ আনবে বলে।

বিষন্ন বিকেলের রোদ অকূলে ডুবে যায়।

১০:০৯:২০২১
সময়:সকাল-১০:৫০মি।
বৃক্ষরাম সিপি