লিখি মানেই আমি লেখক নয় বরং ক্রমাগত অনুশীলন থেকেই আমি গোবিন্দ ধর হতে পারি

গোবিন্দ ধর 

সাপ ব্যাঙ মান অভিমান প্রেম বিরহ মৃত্যু প্রবলভাবে বিশ্বাস এসব লিখি,লিখেন,লিখেই যাচ্ছেন। তারমানে আপনি আমি আমরা সবাই লেখক? ছাইপাঁশ হাঁস পাশ লিখি তো তার মানে আমরা সবাই লেখক সম্মান পেতেই পারি?
এইসব প্রেম বিরহ বিরুদ্ধ মত মতবাদ গঠন সংগঠন গড়া গড়ে ওঠা এসব লেখে রাখুন।ক্ষতিবৃদ্ধি যায় আসে না।কিন্তু সকল ফেসবুকিরা লেখক নন।আবার ফেসবুকে লেখেন অনেকেই ভালো লেখক। লেখক হয়ে কেউ জন্ম নেন না।লিখতে লিখতে লেখক। লেখা লেখা কলমের হিস পিস নিসপিস থেকেই হয়ে ওঠতে হয়।
লেখার ডিম পেড়েই লেখকের বাচ্চা জন্মে না।আর ফেসবুকের কার্যকর মাধ্যমের অসফলতার সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য অসফলতা হলো লেখকের ডিম তা দেওয়ার আগেই তার হাতে ক্রেস্ট ধরিয়ে দেওয়া।নিজস্ব দেওয়ালে আঙ্গুল টিপে ফেসবুকিয়ে কেউ এক অক্ষর লিখলেই তার ঝুলিতে অমুক শ্রী পুরস্কার ধরিয়ে দেওয়াই আজকাল গড়ে ওঠার অথবা তা পর্বের আগেই তাকে তাতিয়ে দিলাম কাব্যরত্ন পুরস্কার দিয়ে। কত পুরস্কার সম্মান সম্মাননা প্রদান হররোজ প্রতিদিন রোজরোজ রোজকার ঘটনা হরদমই চলছে। কেউ বলেন টিপছে না।আর এক টিপে কেউ কিরাতরত্ন পেয়ে যায় তাতে কার কি।সুতরাং কেউ হল্লা করো না।কেউ কথা বলো না।কেউ সেলোটেপ খুলবে না। মুখ ফস্কে কুকথা সুকথা তেতো কথা বেরিয়ে গেলে কিন্তু ভারতরত্ন আপনি আর পাবেন না।সুতরাং সকলের মুখেই অদৃশ্য সেলোটেপ লাগানো।
সাহিত্যের সব থেকে বড় ক্ষতি হলো মঞ্চ পাগল লোকগুলোর অনুপ্রবেশ। অনুপ্রবেশেও আবার অনুপ্রেরণা যোগিয়ে কেউ কেউ পরবর্তী যুগশ্রেষ্ঠ পুরস্কার নিজ ঝুলিতে বাগিয়ে নিচ্ছেন। আমি আপনাকে চুলকচ্ছি আর আপনি আমায় চুলকনো চলছে হরদম। এসব প্রকৃত সাহিত্যের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।
আমাদের সব ঝুলিতে এখন একটি ক্রেস্ট বাগিয়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। লেখার মান নয়। কে কাকে কত তেল দিলো তাতেই তৈলাক্ত হয়ে ওঠা সম্ভব এমন দিনকাল আসবে সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ থেকে বিনয় মজুমদার কেউ-ই জানতেন না।তা-ই হয়তো বিনয় বলেন আমিই গণিতের শূন্য। তিনি বলেন পনেরো হাজার কবিতা লিখলাম কেন লিখলাম জানি না। তবে বিনয় এও বলেছেন কবিদের লেখকের কিছু দুঃখ থাকা জরুরী। দুঃখ শেষ হয়ে গেলে কবি আর কবি হয়ে ওঠতে পারেন না।লেখক আর লেখক হয়ে ওঠতে পারেন না। সুতরাং প্রেম আসুক।প্রেম থাকুক।প্রেম ভেঙে যাক।বিবাহ নষ্ট কুসুমের মতো হোক।রক্তাক্ত হোক বুকের ভেতর বাম অলিন্দ। বার বার ছ্যাকা লাগুক।লাজুকলতা মুখমণ্ডলকে ভূমণ্ডল নয় মনে করুন নিজের আয়না।একজন লেখক লেখক হয়ে উঠতে হয়।লেখক জন্মের আগেই লেখক নন।লেখকের কিছু দুঃখ থাকবে।হাত বাড়ালে নাড়ু পেয়ে গেলে একজন লেখক লেখক হতে পারেন না।তিনি তখন নাড়ুগোপালই হোন।লেখক হতে তাকে প্রচুর পাঠ করতে হবে। পাঠোভ্যাসই একমাত্র পথ নয়।কিন্তু পাঠের বিকল্প নেই। লেখককে অবশ্য পাঠ করতে হবে।হ্যাঁ অজস্র বই পাঠ করলেই লেখক হয়ে যাবেন এমন নয়।কিন্তু প্রকৃত পাঠক তো হওয়া সম্ভব। সাহিত্য কী খায় না মাথায় দেয় তা অন্তত বুঝা যাবে তখন। যাবে।নইলে পাঠ অভ্যাসহীন একজন লেখক আসলে অপরাধীর সমান।তিনি কিচ্ছু না বুঝেই কিরাতশ্রী পেয়ে নিজের ফেসবুকিওঢাক পিটিয়ে বেহেশতে যাওয়ার পথ ফাঁড়ি দিলাম ভাবছেন।আর কী সাংঘাতিক অহংবোধ তখন চলে আসে সেই গরুমহিষের সিং গজানোকালে যত্রতত্র মাথা ঠেস লাগিয়ে বসার মতোই। কারণ সিং গজাতে পারতো হয়তো।কিন্তু সিং গজানোর চুলকানো পিরিয়ডেই মহিষশাবক ক্রমাগত যত্রতত্র মাথাকে ঘর্ষণ করতে করতে নিজের মাথাকেই বিষব্যথায় আক্রান্ত করে বসে।ঠিক লেখক কবিদের বেলায়ও হয়তো চর্চায় তিনি তৈরি হতে পারতেন। কিন্তু নানা আন্তজার্তিক সম্মান,অন্তর্জালের নানা টোপ একজন লেখককে লেখক হতে উৎসাহিত করতে গিয়ে প্রকারান্তরে লেখককে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিচ্ছেন। একজন অহংকারী বিষাক্ত কেউকেটা তৈরি করে বসছেন হয়তো গজিয়ে ওঠা অন্তর্জালের সংগঠকও বুঝতে পারছেন না। আবার যিনি নিজ মাথায় ভারতরত্ন তুলে দিলেন তিনিও বুঝলেন না।
আমি কয়েকজন এরকম সাথী তৈরী করতে গিয়ে ললিপপ ধরিয়ে ছিলাম। এখন উনারা একেকজন বাগশ্রী সুরশ্রী ঊনকোটিশ্রী তবলাশ্রী বগলাশ্রী কিরাতশ্রী হয়ে নানা সংগঠনের সলতেয় আরো তৈলাক্ত করতে হিল্লিদিল্লি চরকীর মতো ঘুরপাক খেতে খেতে নানাপোজের ছবি হতে হতে লেখকের ল থেকে শুধু ক-তে কংসরূপে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন হয়ে গেলেন।না আমার সাথী তিনি।না সাহিত্যের সাথী।এখন সেই লেখক শুধু কোথায় তেল ঢাললে তৈলাক্ত হওয়া যায় সেই মগ্নতায় দিনকাল গুজরান করে চলেছেন।এতে আর যাই হোক অসংখ্য শংসাপত্রের আড়ালেই থেকে যাবে লেখকসত্তা সেই বোধ তৈরী হয়নি সেই সকল ল লেখকদের।ল লেখক মানে এডভোকেট নন।ল লেখক মানে ফেসবুকের অসিদ্ধ হিস পিস নিসপিস করা সম্ভাবনাময় একজন লেখক। যিনি হতে পারতেন একজন লেখক। অথচ এখন তিনি তিনি সাহিত্যের কন্ডাকটর হয়ে হররোজ ঘুরঘুর করে চলছেন কোথায় নতুন সংগঠন আছে। তাকে বাগিয়ে আরো একটি সার্টিফিকেট আনতে দরকারে অদরকারে হলেও তেল সরবরাহ করো বাগিয়ে আনো শংসাপত্র। 
এইসব কলপাতাগুলো আসলে কিচ্ছু নয়।কিচ্ছু হয় না  এসব দিয়ে। এগুলো পাওয়ার এত লোভ কেন গড়ে ওঠে জানি না। 
তবে আমি আমার জানা মতো দেখেছি এই শংসাপত্র লেখককে মেরে ফেলে।তার অন্তরে থাকা লেখকডিম তা না পেয়ে মরে যেতে দেখে আমি একা কাঁদি।কিন্তু এই কান্না তো লেখকের নষ্ট ডিমে তা দিতে পারে না।সুতরাং কিরাতশ্রীরা অকালে পচে যান।এতে একজন সাহিত্য শ্রমিক হিসেবে আমি কষ্ট পাই।
আমি বিশ্বাস রাখি একজন লেখক হয়ে উঠতে চর্চার কোন বিকল্প নেই। কেউ জন্মসূত্রে আইনস্টাইন রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দ নন।তাঁদের বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা নিশ্চিত হয়ে উঠতে বইয়ের ভেতর ডুবে থেকেই গড়ে ওঠেন।সকলের ভেতর একজন মানুষ থাকে লেখক থাকে যুদ্ধবাজ থাকে লাদেন থাকে। একজন রবীন্দ্রনাথ থাকেন সকলের ভেতরেই। আমার ভেতরের আমিকে জাগিয়ে তুললেই আমিও জীবনানন্দ হওয়া অসম্ভব নয়।আর অহংকার জাগিয়ে তুললে আমিও রাবণ হতে পারি।সুতরাং প্রতিটি মানুষই হয় রাবণ হতে পারেন নয়তো জীবনানন্দ। 
সাপব্যাঙ লিখবো না জীবনানন্দ হবো সে নিজের নিকটই।প্রকৃত লেখক ডিমের লেখককে পথ দেখাতে পারেন কিন্তু ডিমের লেখক ডিমশ্রীর লোভ সংবরণ করতে না পারলে নষ্টডিম।নয়তো জীবনানন্দ। এই দ্বৈত শূন্য জায়গায়ই একজন ডিমের ভেতর গজিয়ে ওঠা লেখক নষ্ট হয়ে পচে যেতে পারেন আবার জীবনানন্দও হতে পারেন।কেউ কেউ পচে যান। কেউ কেউ বিনয় হয়ে যান।
আমি বিনয় নয় জীবনানন্দ নয় রবীন্দ্রনাথ নয় গোবিন্দ ধর হতে চাই। আমি আমি হতে চাই। কিন্তু আমার ভেতর থেকে আমি তুলে দিয়ে আমিই গোবিন্দ ধর হয়ে উঠতে লিখি।
লিখি ছাইপাঁশ। 
লিখি চাঁদ। 
এসো চাঁদ।
হিমাঙ্কের নিচ থেকে জেগে আসবো
আমিই বিক্রম। 
বিক্রমই গোবিন্দ। 
ক্রমাগত অনুশীলন থেকেই আমার আমিকে 
বাদ দিই।
আমি লিখি 
পচনধরা সময়কে গতিশীল করতে। 
আমি লিখি 
সামনে যে পথ এখনো আঁকা
তা পরিবহনের সুবিধার জন্য। 
আমি লিখি 
তার মানে আমিই ঈশ্বর নয়।
আমি লিখি
কারণ আমি লিখতে চাই।

লেখককে লেখক হয়ে ওঠতে গভীরভাবে সমর্পন করতে হবে বিষয়ের গভীর অন্তর্দশনের সাথে। 
একজন লেখক চোর বাটপার ধর্ষক দুশ্চরিত্র সুচরিত্র মানুষ অমানুষ সকলের সাথে চলেই নিজেকে ঋদ্ধ করতে হয়।লেখকের জীবন চারদেওয়ালের এসিরুমই শুধু নয়।লেখক সময় ও সমাজের সাথে মিশবেন।মানুষকে চিনবেন।তখনই তার নিকট দুঃখ আসবে।আনন্দ আসবে।মন ফুরফুরে মেজাজে টগবগ করবে।লেখক দুঃখ থেকে তৈরী হোন।আনন্দে বেঁচে থাকার রসদ নেন।সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রতিটি বিষয়ের সাথে যুক্ত থেকে অথবা না থেকেও অনুভব করবেন বিষয়ের গভীরতা। যে লেখকের বিষয়ের গভীর থেকে অনুভব তুলে আনার দক্ষতা অর্জন হয়ে যায় তিনিই লেখার বিষয় আর খুঁজতে হয় না।লেখার বিষয় তার নিকট এমনিতেই আসে। লেখক বিষয়ের গ্রীণরুমে পৌঁছাতে হবে।তখনই তিনি হয়ে ওঠেন।

২৩:০৯:২০২৩
ভোর:৪টা৪৫মি
কুমারঘাট।

0 Comments