ত্রিপুরা বাংলাদেশ বইমেলা :২০২৩ || সুমন মুস্তাফিজ
ত্রিপুরা বাংলাদেশ বইমেলা :২০২৩
সুমন মুস্তাফিজ
স্রোত সাহিত্য পত্রিকা ও প্রকাশনা আয়োজিত ত্রিপুরা। বাংলাদেশ বইমেলা ত্রিপুরা'র আগরতলা প্রেসক্লাবে নৃপেন চক্রবর্তী হলে গত ০৭ অক্টোবর সকাল ১০ টা থেকে শুরু হয় স্রোত সাহিত্য উৎসব এর সাহিত্য আলোচনা, সেমিনার এবং বিকালের সেশনে ত্রিপুরা, আসাম এবং বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত কবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠ ও স্রোত সাহিত্য সম্মাননা প্রদান। এই পর্বের আয়োজনে সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদী,সাথে আমাকেও আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথি হিসেবে স্টেজে আসন গ্রহণ, কথা বলা ও কবিতা পড়ার পাশাপাশি স্রোত সাহিত্য সম্মাননা প্রদানের জন্য আয়োজক কমিটি'র প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।কত গুণীজনদের মাঝে খুব নার্ভাস লাগলেও কথা বলা এবং কবিতা পড়ার সময় আমার প্রতি সকলের মনযোগ করতালি আমাকে বিমুগ্ধ করেছে। স্টেজ থেকে নেমে আসার পর অনেকে নিজে থেকে এসে পরিচিত হয়েছেন এবং কয়েকজন বুকে বুক মিলিয়েছেন, প্রাণে প্রাণ মেলানোর এক অদৃশ্য টান অনুভব করেছি।
গত ৩ দিনে সকলের আন্তরিকতা, আতিথেয়তা, বিনয় হৃদয় স্পর্শ করেছে।মনে হয়েছে আমরা একই কাব্যগ্রন্থের এক একটি পাতা। এটা খুবই স্বাভাবিক যেহেতু সকলেই কবিতা, কথা সাহিত্য, গান,নাট্যকলা সর্বোপরি সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের মানুষ সেহেতু আমাদের চেতনাগত মেলবন্ধন রয়েছে।কাউকেই দুরের মনে হয়নি,মনে হয়েছে সবাই আমরা গতজনমের অতি পরিচিত, আত্মার আত্মীয়।
এই কবিতা, গান ভালোবেসে কত প্রাপ্তি'র সম্ভাবনা দুরে ঠেলে দিয়েছি, কষ্টে থেকেছি কিন্তু খুব বেশি আপসোস করিনি কখনো।মাঝে মাঝে কঠিন জীবন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, পুঁজিবাদি এবং ভোগতান্ত্রিক আগ্রাসন ও অস্থিতিশীল নীতিহীন রাজনৈতিক বেড়াজালে আটকে যায় জীবন ও চারপাশ।যখন দেখি বৈষয়িক লোভে সস্থায় বিক্রি হয়ে যাচ্ছে শৈল্পিক চেতনা এবং নৈতিক মূল্যবোধ খুব আশাহত হয়ে উঠি, ভেঙে পড়ি, ঠিক তখনই আবার বুকভরে শ্বাস নেই, যখন আমার কোনো সতীর্থ রাতজেগে কোনো কবিতা লিখে পড়ে শোনানোর আগ্রহে ব্যাকুল থাকে , গলা ছেড়ে গান গেয়ে ভুলে যায় সকল বিষাদ তখন আমরা ডানা ভাঙ্গা পাখির মতো উড়তে শিখে যাই সুদিনের প্রত্যাশায়। সুদিন আসবেই, সেই আদিযুগ থেকে শুরু করে পৃথিবীর সব মানুষ কবিতা, গান, সুর সঙ্গীত, চিত্রকলা গত প্রায় দেড় শতকের চলচ্চিত্র যাত্রা, সৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অন্যায় অবিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামী বিপ্লবীদের জীবনের বদৌলতে পেয়েছে এই আধুনিক ও মানবিক পৃথিবী। কিছু জড়ো বুদ্ধির অসাড় মস্তিষ্কের মানুষ আমাদের এই মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলার পক্ষে মননশীল চর্চাকে সাম্প্রদায়িক তকমা লাগিয়ে এবং পুঁজিবাদী বিশ্ব সম্প্রদায় ভোগ বিলাসিতা এবং যৌনতাকে জীবনের মুখ্য বিষয় বানিয়ে পিছিয়ে দিচ্ছে অনাগত প্রজন্মের নৈতিক ও মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলার অগ্রযাত্রাকে।এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম গুলো যদি লেখা পড়ার পাশাপাশি শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি’র সংস্পর্শে না থেকে শুধু ডলার পাউন্ড আর ভোগতান্ত্রিক হয়ে ওঠে তাহলে আমরা যে শৈল্পিক ও মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি তা থেকে যাবে অধরা।আত্নকেন্দ্রীক ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি সমকালীন ও পরবর্তী প্রজন্ম গুলো একে অন্যের প্রতি হয়ে উঠবে অসহনশীল হিংসাত্মক মনোভাবাপন্ন তখন " মানুষ মানুষের জন্য "ভূপেন হাজারিকার কালজয়ী গানটি অর্থহীন হয়ে পড়বে, বিবর্ণ হয়ে যাবে নজরুলের " গাহি সাম্যের গান মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান"।
একমাত্র সাংস্কৃতিক বিপ্লবই পারে এই ঘোর অমানিশা আধার কাটিয়ে আমাদের আলোর পথযাত্রি করতে। তাই আসুন এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, জ্ঞান বিজ্ঞান আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এর পাশাপাশি আমাদের সমকালীন ও পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের সন্তানদের শিল্প -সংস্কৃতি চর্চায় উদ্ভুদ্ধ করি, আমার বিশ্বাস এই পৃথিবীর অনাগত সময় শুদ্ধতায় ভরে উঠবে, মানুষ হয়ে উঠবে মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন। জীবন খুবই ছোট আমরা কেউ বেঁচে থাকব না,কিন্তু এই অনুপম চেতনা ও মানবিক বোধ বেঁচে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।।
সবশেষে ত্রিপুরা বাংলাদেশ বইমেলা ২০২৩ ও স্রোত সাহিত্য উৎসবকে কেন্দ্র করে আগত সকলের প্রতি শ্রদ্ধা ও অনি:শেষ ভালোবাসা। আবার আমরা মিলিত হবো কবিতায়, গানে ও নিগূঢ় তাত্ত্বিক আলোচনায়।শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি দেবব্রত দেব,কথা সাহিত্যিক ত্রিপুরা, স্বপন নন্দী,চিত্রশিল্পী,ত্রিপুরা। বিশেষ কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা গোবিন্দ ধর,বিমল চক্রবর্তী, অমলেন্দু চক্রবর্তী,সুচিত্রা দাস,অপাংশু দেবনাথ, ড.অপর্ণা গাঙ্গুলি, বিজন বোস, মিতা দাস পুরকায়স্থ, অনিকেত মৃণাল কান্তি,শাশ্বতী দাস, সঞ্চিতা রাহা,সংহিতা চৌধুরী,কল্যানী ভট্টাচার্য, সহ সকল অগ্রজ,অনুজ এবং সতীর্থদের।
সুমন মুস্তাফিজ। সংস্কৃতি কর্মী,বাংলাদেশ
০৮/১০/২০২৩
0 Comments