গোবিন্দ ধর :অগ্নিজলের জীবন্ত দ্রোহব্রীজ

গোবিন্দ বাবু, সাতটি নিবন্ধে যতটুকু পেরেছি, হৃদয় দিয়ে সাজিয়েছি—
তার বেশি আজ আমার সাধ্য ছিল না। সময়ও আমায় তাড়া করেছে, ধৈর্যও কাঁপছিল নিজের সীমায়। এ গুলি দিয়ে বই হবে কি না জানি না।তাই এই সংকলন আপনার হাতে দিলাম আপনি দেখে নেবেন, কোথায় কোন শব্দ হোঁচট খেয়েছে, কোথায় কোন বাক্য একটু আলো চায়, আর কোথায় আবার ছেঁটে দিলেই সুবাস বাড়বে। সংযোজন-বিয়োজন, পরিবর্ধন-পরিবর্তন—সবই আপনার বিচারক্ষেত্রে রাখলাম। আমি প্রথম যে দুটি পাঠিয়েছিলাম,সেগুলি আরো কিছু সংযোজন করেছি। এবার ৭টি এক সাথে দিলাম।আমার পক্ষ থেকে—এটাই একনিষ্ঠ সামান্য চেষ্টা, আর কিছু নয়

কথা পৃষ্ঠা

গোবিন্দ ধর নামের উচ্চারণেই যেন ভেসে ওঠে এক নিরলস পথিকের ছায়া। কথাসাহিত্য, কবিতা, সম্পাদনা কিংবা সংগঠনের অবিরাম চর্চা—সবখানেই তিনি নিজের মতো করে পথ গড়েছেন, ঠিক যেমন নদী নিজের স্রোত খুঁজে নেয়। এই সাত খণ্ডের পুস্তিকা সেই নদীর দীর্ঘ যাত্রাপথের এক বিশ্বস্ত নথি; কখনো সুনীল আলো, কখনো মেঘের গাঢ় ছায়া, আবার কখনো নিঃশব্দ সন্ধ্যার মতো স্নিগ্ধ।
নতুন লিখিয়েদের পাশে দাঁড়াতে তিনি কোনোদিন ক্লান্ত হননি। তাঁর হাতে প্রথম কলম ধরেছে কত তরুণ—তার হিসেব নেই; আবার কতজন ভেঙে পড়া আত্মাকে তিনি ফিরিয়ে এনেছেন লেখার টেবিলে, শুধু একবাক্য উৎসাহ দিয়ে—‘লিখে যাও।’ মানুষের ভিড়ে থেকেও তিনি যেন একা; কিন্তু সেই একাকিত্ব তাঁর কাছে দুর্বলতা নয়, বরং সৃষ্টির শ্বাস। সেই নিঃশব্দতা থেকেই জন্ম নেয় তাঁর প্রতিটি উচ্চারণ, প্রতিটি দৃষ্টি, প্রতিটি কবিতার ভেতরের মৃদু আলো।
পুস্তিকার প্রতিটি খণ্ডে তার যাত্রার আলাদা রং ফুটে উঠেছে। কখনো কাব্যিক, কখনো সংগ্রামী, কখনো ছাত্রদের পথ দেখানো এক গুরু, আবার কখনো জীবনের গভীর দুঃখভারে নীরব হয়ে থাকা এক আত্মা। তবু সবশেষে তিনি যা—এক নিরলস কর্মী, অসম্পূর্ণতার ভেতর থেকে পূর্ণতা খুঁজতে জানেন; যে মানুষ জানেন, থেমে গেলে চলবে না।
এই পুস্তিকা শুধু একজন কবিকে দেখার আয়না নয়—এটি এক মানুষের ভেতরের আলোকে চেনার দরজা। আমি বিশ্বাস করি, যে কেউ এই গ্রন্থ হাতে নিলে মানুষের সম্ভাবনা, পরিশ্রম, মমত্ববোধ আর সৃষ্টির নীরব জেদ—সবই অনুভব করবেন মনের ভেতরে ধীরে ধীরে।
----------------------------------------------------------------------------------------------
🚦১🚦
কবি গোবিন্দ ধর: লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের এক জীবন্ত দ্রোহবীজ
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
প্রথম অধ্যায় : অগ্নিজলের প্রথম অক্ষর:

ত্রিপুরার ধর্মনগরের অফিসটিলা—নামটা ছোট, মানচিত্রে বিন্দুর মতো,
কিন্তু সেই বিন্দুর ভিতরেই জন্ম নিল এক দগ্ধ–সময়ের সন্তান,
এক কিশোর, যার শিরায় শিরায় তখনই জমে উঠছিল ভবিষ্যতের সৃজন–দ্রোহের অগ্নিবীজ।
তার জন্ম ৩০ জুলাই ১৯৭১—দারিদ্রতার রোদপোড়া দুপুরে,
তার নাম—গোবিন্দ ধর। অভাব ছিল তার প্রথম শিক্ষক, আর দুঃসময়ের কালো মাটি— তার প্রথম বিদ্যালয়।
আট ভাইবোনের ভিড়ে এক চিলতে হাসিও যেখানে ভাগ করে নিতে হত,
সেখানে দাঁড়িয়ে বড় হওয়া মানে জীবনকে বাঁশের সাঁকোর মতো ধরে পার হওয়া— এক পা ভুল মানেই গভীর খাদ।
তার পিতা দক্ষিণারঞ্জন ধর—সরকারি চাকুরে, কিন্তু আত্মায় ছিলেন শিল্পের পথিক; নাট্যমঞ্চের আলো-অন্ধকারে ডুবতেন, আর খিদে-ক্লান্ত সন্ধ্যায় বসে বই বাঁধাই করতেন— মলাট লাগানোর সেই শব্দগুলো যেন
গোবিন্দের ছেলেবেলায় ভবিষ্যতের কবিতাকে পাখা পরিয়ে দিত।
মা সুষমারাণী— গোটা সংসারের নিঃশব্দ স্তম্ভ,তার হাতে ভাত কম পড়লেও সন্তানের অভয় কোনদিন কম পড়েনি। তার দৃষ্টির গভীরতায়
গোবিন্দ শিখেছিল অদ্ভুত এক সাহস— যে সাহস কোনো পুঁজি নয়,
একেবারে মাটির গন্ধ থেকে উঠে আসে।
দিনগুলো ছিল কষ্টের, তবু সেগুলোই তাকে গড়ে তুলেছিল আরও কঠিন, আরও ধৈর্যশীল। কখনো দিনমজুরি, কখনো কৃষিকাজের মাটি-ময়লা হাতে মেখে, কখনো ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই সংবাদপত্রের বান্ডিল কাঁধে নিয়ে ছুটতেন  গ্রাহকদের দ্বারে দ্বারে —
সবকিছুতেই ছিল একটিই বিশ্বাস: জীবন যতই কঠিন হোক,
হাল ছাড়া যাবে না।
বাবার হঠাৎ মৃত্যু—যেন এক বজ্রাঘাত, এক নিমিষে পাল্টে দিল সংসারের পথচিত্র। কিশোর গোবিন্দের চোখে তখন অথৈ অন্ধকার,
কিন্তু বুকের ভেতর কেমন যেন উঠতে লাগল আগুনের বিন্দু—
নিজেকে মানুষের মতো মানুষ করে তোলার আগুন।
আর সেই আগুনের ভিতর থেকেই একদিন তিনি বলেছিলেন—
“শরীর তৃপ্তি হোটেল নয়।” 
কথাটি শুনলে মনে হয় সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে চাপা আছে তার সারা জীবনের যাপন, ক্ষুধা–অপমান–অভিজ্ঞতার জ্বালা-ধরা সত্য।
কামনা-অকামনার সব হিসেব মেলাতে মেলাতে যে মানুষ দাঁড়ায় জীবনের সামনে মাথা উঁচু করে— গোবিন্দ ধর সে-ই মানুষ।
অগ্নিজলের প্রথম অক্ষর এভাবেই লেখা হয়েছিল—রক্ত, পরিশ্রম, ক্ষত, আর অদ্ভুত এক আলোর মিশেলে। যে আলো পরের পথগুলোকে
ক্রমশ আরো তীব্র করে তুলবে।

দ্বিতীয় অধ্যায় : শিক্ষা — জীবনের অনির্বাণ স্কুল:

রাতাছড়া উচ্চ বুনিয়াদি বিদ্যালয়—নামটা আজও যেন বাতাসে ভাসে,
যেখানে সকাল মানেই ছিল ধুলো-ভরা মাঠ, আর খাতা-কলমের গন্ধ মিশে যেত মাটির ঘ্রাণে। সেখানেই শুরু গোবিন্দ ধরের প্রথম পাঠ,
যে পাঠের বইতে লেখা ছিল অক্ষর নয়, বেঁচে থাকার মন্ত্র।
১৯৯০ সাল—মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বেরোনোর আগেই বাবা চলে গেলেন চিরতরে। সেই এক মুহূর্তে বদলে গেল এক তরুণের সমস্ত সমীকরণ। আকাশ যেন হঠাৎ ছিঁড়ে পড়ল,কিন্তু তার ভিতরের শিশুটি কাঁদেনি—চুপচাপ তাকিয়ে ছিল দূরের দিকে, যেখানে হয়তো তখনই লেখা হচ্ছিল তার মানুষ হবার’ অধ্যায়।
অটল দরিদ্রতা তখন দরজার বাইরে নয়, ভেতরেই বসে গেছে।
পেটের জ্বালা, সংসারের দায়, ভাইবোনদের মুখে আশার রেখা—
সব মিলিয়ে সে বুঝে গেল, নিয়মিত পড়াশোনার রাস্তাটা হয়তো বন্ধ,
কিন্তু শেখার দরজা কেউ বন্ধ করতে পারে না। কারণ শিক্ষা তো কেবল বিদ্যালয়ের নয়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই নতুন পাঠ।
১৯৯১ সালে—মাত্র আঠারো বছর বয়সে, যুবক গোবিন্দ উঠে দাঁড়ালেন গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে। সেই ছিল জীবনের প্রথম দায়িত্ব, আর প্রথম জনসম্মুখে দাঁড়িয়ে কথা বলার কম্পনময় আনন্দ।
শিশুদের চোখের ভেতর তিনি দেখতেন নিজের অতীত—
অর্ধেক ঘুমে পড়া সকাল, ভাতের অভাবে শুকনো দুপুর,
তবু হাসির ঝলক। শিক্ষকতা তাঁর কাছে চাকরি নয়,
এক নিরন্তর সাধনা— মনের আগুন জ্বালিয়ে রাখার এক প্রার্থনা।
বইয়ের পাতায় যেমন অক্ষর, তেমনই জীবনের পাতায় অভিজ্ঞতা—
দুটো মিলিয়েই তিনি তৈরি করলেন নিজস্ব এক অনির্বাণ স্কুল,
যেখানে শিক্ষক আর ছাত্র দুজনেই শেখে একে অপরের কাছ থেকে।
এই অধ্যায়ে শিক্ষা মানে ডিগ্রি নয়, শিক্ষা মানে মানুষ হয়ে ওঠা।
আর সেই মানুষ হয়ে ওঠার আলোই তাকে নিয়ে গেল পরের অধ্যায়ের দিকে—যেখানে মঞ্চে শুরু হল আরেক পাঠ, জীবনের অভিনয় নামের বাস্তব স্কুলে।

তৃতীয় অধ্যায় : যাত্রাপালা থেকে শব্দের মঞ্চ

কিশোর বয়সেই যাত্রাগানের জগৎ তাকে টেনেছিল চুম্বকের টানে।
১৯৯০–৯৫ সাল, রাতাছড়া থেকে কলকাতার যাত্রা পালা দেখা–স্থানীয় যাত্রা,দলে অংশগ্রহণ— এই যাপন শেখায় মঞ্চ, সংলাপ, স্বর, অনভিনীত সত্য। এই সময়েই তাঁর লেখার ভিতর জমতে থাকে নাটকীয়তা, হৃদয়ের ভারী তাল, মানুষের অভ্যন্তর-যন্ত্রণা।


চতুর্থ অধ্যায় : ‘স্রোত’— মফস্বলের বুক থেকে উঠে আসা এক বিপ্লব

আগরতলার চকচকে দালান, শহুরে পরিসর আর তথাকথিত সাহিত্য–কেন্দ্রিকতার মাঝেই তখনও গ্রাম–মফস্বলকে ছোট হিসেবেই দেখা হতো। সাহিত্য যেন কেবল শহরেই জন্মায়, শহরেই বড় হয়—এই ধারণাকে ভেঙে দিতে যে এক তরুণ উঠে দাঁড়াবে, তা কেউ ভাবেনি। কিন্তু দুঃসাহস, স্বপ্ন আর আত্মবিশ্বাসের নীল শিখা নিয়ে গোবিন্দ ধর এগিয়ে এসেছিলেন মফস্বলের ধুলো-গন্ধ থেকে।
‘স্রোতস্বিনী’ নামের সেই প্রথম ছাপাটি যেন এক পরীক্ষাগারের মতো ছিল— কোথায় কী ভুল হচ্ছে, কোন অক্ষরে ছেদ পড়ছে, কোন পৃষ্ঠায় আলো ফুটছে— সবই তিনি শিখছিলেন মধ্যরাতের প্রদীপের তলায়। মুদ্রণযন্ত্রের তেল-গন্ধ, হাতে ফিরে আসা প্রুফ, আর শহরের অবহেলা—সব মিলিয়ে গড়ে তুলেছিল তাঁর ভিতরের সাহসী লড়াকুটা।
একদিন ‘স্রোতস্বিনী’ হয়ে গেল কেবল ‘স্রোত’। নাম ছোট হল, স্বপ্ন বড়। লক্ষ্যও আরও স্পষ্ট—প্রতিকুলতার মধ্যেও সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখবে ‘স্রোত’।
নিজের ও কয়েক জন লেখকের লেখা দিয়ে শুরু হওয়া এই ছোট্ট কাগজটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠলো এক আন্দোলন। কেউ টাকা পাঠালেন চেনাজানা ডাকঘরের মানি–অর্ডারে, কেউ বা গল্প দিলেন ভাঙা চিঠির খামে; কেউ প্রথম কবিতা পাঠাল, আর কেউ পাঠাল নিজের দশ বছরের গোপন ডায়েরির পাতাগুলো। তার বিনিময়ে তারা পেলেন এক আশ্রয়—‘স্রোত’ নামের এক অদেখা পরিবার।
২৮ বছরের নিরবচ্ছিন্ন পথচলা—এ পথ কিন্তু সহজ ছিল না। কখনও কাগজের দাম বেড়েছে, কখনও ছাপাখানা বন্ধ হয়েছে, কখনও আবার ভয়ানক আর্থিক চাপ। কিন্তু গোবিন্দ ধর কখনও থেমে যাননি। মফস্বলের সেই নীরব উঠোনেই তিনি গড়ে তুলেছেন এক সাহিত্য–সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান, যার ভিত কেবল মুদ্রিত অক্ষর নয়—মানুষের ওপর মানুষের বিশ্বাস।
আজ ‘স্রোত’ ভেসে গেছে বহু দূর। ত্রিপুরার প্রত্যন্ত পাহাড় চূড়া থেকে শুরু করে আসামের গরম চায়ের দোকান, পশ্চিমবঙ্গের কলেজ–ক্লাব আর পাঠচক্র, বাংলাদেশের সীমান্তপারের প্রবীণ,তরুণ কবিদের মনোলীনে, এমনকি লন্ডনের বাংলা কমিউনিটির বুকের মাঝে—
‘স্রোত’ পৌঁছে দিয়েছে মফস্বলের এক গর্বিত কণ্ঠস্বর।
এটি আর কেবল একটি লিটল ম্যাগাজিন নয়—এ এক চলমান স্বপ্ন,
যেখানে অজস্র অপ্রকাশিত প্রতিভা হাত ধরে উঠে আসে আলোর দিকে,
যেখানে নতুন লেখক তৈরি হন, যেখানে শব্দের ভেতর থেকেই জন্ম নেয় বিপ্লব। গোবিন্দ ধরের পরিচয় সেখানেই— তিনি প্রমাণ করেছেন, বড় শহরের আলোর প্রয়োজন নেই, শব্দের নিজস্ব আলোই যথেষ্ট একটি নদী জন্মানোর জন্য।

পঞ্চম অধ্যায় : উত্তরে একাকী তপস্বীর ধ্যান—লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্র

১৯৯৫ সাল। রাতাছড়া থেকে শুরু, পরে হালাইমুড়া, কৈলাসহর হয়ে ২০০৩ সালে কুমারঘাটে স্থায়ী ভিত্তি। উত্তরপূর্ব লিটল ম্যাগাজিন পুঁথি–পত্র সংরক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র। একাই সংগ্রহ করেছেন ৪০-৫০ হাজার ম্যাগাজিন— দশকের পর দশক ধরে।
প্রায় সবই উত্তর–পূর্ব ভারতের বিস্মৃত পত্রিকা। এ যেন একক মানুষের হাতে গড়া এক মহাকাব্যিক গ্রন্থাগার।
কবি সিদ্ধার্থ রায় তাই লিখেছিলেন—
 “নিঃশব্দে যিনি কালস্রোতের গতি বদলে দেন—তিনিই গোবিন্দ ধর।”
এই কেন্দ্র এখন গবেষণা, দলিল, সংরক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই অবিশ্বাস্য এক সম্পদভাণ্ডার।

ষষ্ঠ অধ্যায় : সৃষ্টিশীলতার প্রজাপতি—কবিতা, গল্প, গবেষণা

গোবিন্দ ধরের লেখা ছড়িয়েছে ভারত, বাংলাদেশ, বিদেশের পত্রিকায়।
তার কবিতায় আছে—
• দ্রোহ • বোধ • শরীরের খোঁজ • মাটির গন্ধ • জীবনযন্ত্রণার নিরাভরণ সৌন্দর্য।
তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ—
জলঘর, সূর্যসেন লেন, মনসুন মাছি, দ্রোহবীজ পুতে রাখি, একা, শ্রীচরণেষু বাবা,দেওনদীসমগ্র,আনোয়ারা নামের মেয়েটি, আষাঢ়ের দিনলিপি।
এছাড়া—গবেষণা, লৌকিক সংস্কৃতি, অভিধান রচনা, শিশু সাহিত্য, যৌথ কাব্য—সব মিলিয়ে তিনি এক বহুমাত্রিক সাহিত্য–ব্যক্তিত্ব।

সপ্তম অধ্যায় : তাঁর কবিতার অন্তর্গত দর্শন

গোবিন্দ ধরের কবিতা পড়লে মনে হয়— একজন মানুষ নিজের যন্ত্রণা, কামনা, ভয়, ভালবাসা, দ্রোহ—সব খুলে রেখেছেন পাঠকের সামনে।

কিছু কবিতা–উদৃতি—
১. “কামনার কালীদহে ডুবে থাকা অনুভূতিই
শব্দ হয়ে জন্ম নেয় আমার কবিতার শরীরে।”

২. “মানুষ দ্রোহে জন্মে, দ্রোহে বেড়ে ওঠে,
তবু ভোর হলে শান্তির রুটির দিকে হাত বাড়ায়।”

৩. “নদীর শরীরের উচাটন বুঝলে তবেই বোঝা যায়
কবি কাকে বলে।”

অষ্টম অধ্যায় : মানুষ গোবিন্দ—সংগ্রাম আর নরম আলো

গোবিন্দ ধর বহু ভাষিক মানুষের মতোই সংবেদনশীল, কিন্তু তাঁর দৃঢ়তার ভিতর লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত কোমলতা।
তরুণ লেখকদের পাশে দাঁড়ানো—হতাশ কবিকে সাহস দেওয়া—নতুন লেখকের বই করে দেওয়া—সবই তাঁর জীবনযাপনের বড় অংশ।
এজন্য তিনি কখনো কখনো “গোষ্ঠীস্বার্থে না চলা” লেখকদের অপছন্দের লক্ষ্যও হয়েছেন। কিন্তু তিনি থমকে যাননি। কারণ তাঁর ভিতর ছিল একটাই আত্মবোধ—
“লেখা যদি মানুষের কাজে না লাগে, তবে সেই লেখা বৃথা।”

নবম অধ্যায় : সম্মাননা—স্বীকৃতির বালুচর

গোবিন্দ ধর পেয়েছেন বহু সাহিত্যসম্মান, সংবর্ধনা, বাংলাদেশ–ভারতের বিভিন্ন সংগঠনের শ্রদ্ধা। তাঁর নাম এখন উত্তর–পূর্ব ভারতের এক উজ্জ্বল সাহিত্যচিহ্ন।

তিনি—• কবি • শিক্ষক • সমালোচক • নাট্যকর্মী • প্রকাশক• গবেষক
• সংগঠক।
এক মানুষ হওয়া সত্ত্বেও এতগুলো ভূমিকায় সম্পূর্ণ। এ যেন এক বহমান স্রোতের জন্ম, যা থামে না, শুকোয় না।
দশম অধ্যায় : স্রোতের ভবিষ্যৎ—এক আলোকিত পথচলা মফস্বলের ছোট উঠোন থেকে ‘স্রোত’-এর জন্ম। আজ এটি বাংলা সাহিত্যে এক দৃঢ় নাম।
“স্রোতের মাঝে যে আলো জ্বলে, তা মফস্বলের প্রদীপ হলেও দীপ্তিতে আকাশ ছুঁতে জানে। এই যাত্রা দীর্ঘ হোক, এই অক্ষর বয়ে যাক অনেক দিন—বহমান, অবিরাম, স্বর্ণরেখায়।”

শেষ অধ্যায় : গোবিন্দ ধর—এক ধারালো সময়চিহ্ন
শেষে ফিরে তাকালে দেখা যায়—গোবিন্দ ধর শুধু একজন লেখক নন,
তিনি এক আন্দোলন, এক দলিল, এক ধারাবাহিকতা, যেখানে সাহিত্য মানে মানুষের শক্তি, মানুষের সত্তা।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—অভাবের ভিতর থেকেও একটি মানুষ কিভাবে নিজেকে, সমাজকে, সাহিত্যের মানকে
বদলে দিতে পারে।
তাঁর কবিতায় যেমন লেখা—
“দ্রোহবীজ পুতে রাখি,
যাতে আগামী দিনের সন্তান
ভয়হীন পৃথিবী পায়।”
এই আশা, এই সাহস—এটাই গোবিন্দ ধরের আসল পরিচয়।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

🚦২🚦
কবি গোবিন্দ ধর: জীবন, সৃষ্টির আলোকপথ ও সংগ্রামের দীর্ঘ প্রবন্ধ
=========================
ত্রিপুরার মফস্বল থেকে এক অনন্ত স্রোত সেই ছোট্ট রাতাছড়া – রাজধর মানিক্যের স্মৃতিবিজড়িত সবুজ মফস্বল, কাঁচা রাস্তার ধুলো আর ভোরের কুয়াশা মেখে, এক তরুণ শিক্ষক হঠাৎ একদিন অনুভব করলেন, পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি দিয়ে আর ধরে রাখা যায় না তাঁর ভেতরের ঢেউ-ওঠা ভাষাকে। নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে যে ছেলে প্রতিদিন দেখত, কীভাবে জল নিজের পথ বানিয়ে নেয় পাথর ঠেলে, সেই ছেলেটিই একদিন কলমের ডগায় তৈরি করল আর-এক নদী—নামের আগে রাখল শুধু একটি শব্দ: “স্রোত”। মফস্বলের বুক থেকে শহরকেন্দ্রিক সাহিত্য-দেবালয়ের দিকে ছুড়ে দেওয়া এই নামটাই হয়ে উঠল তাঁর স্বপ্ন, লড়াই, আর অদম্য দৌড়ের সমার্থক।গোবিন্দ ধরের শৈশব ছিল সাদামাটা, কখনো কখনো নির্মমও—ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট বাবার অল্পবেতনের ঘরে আট ভাইবোনের জন্য অনন্ত টানাপোড়েন, বাংলার খাতা আর ফসলের জমি পাশাপাশি রেখে বড় হয়ে ওঠা, দিনমজুরির মাটি-লেগে-থাকা ক্লান্ত হাতের পাশে কবিতার প্রথম খাতা। পিতার অকাল মৃত্যু যেন এক ঝটকায় তাঁকে কৈশোর থেকে সরিয়ে দিল দায়িত্বের কড়া প্রাঙ্গণে; ঠিক তখনই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরি তাঁর হাতে তুলে দিল একদিকে সংসারের দায়, অন্যদিকে শিশুচোখে পৃথিবীকে নতুন করে দেখার একটি নিয়মিত জানালা। এই জানালার ফাঁক দিয়ে যে আলো ঢুকতে শুরু করল, তারই নাম ধীরে ধীরে হয়ে উঠল—কবিতা, লিটল ম্যাগাজিন, আর মফস্বলের গলা-ছাড়া উচ্চারণ।রাতের স্কুল থেকে ফেরার পথে গ্রাম্য যাত্রাপালার আলো-অন্ধকার তাঁকে টেনে নিল মঞ্চের কাছে। কলকাতার দল, স্থানীয় অভিনেতাদের সংলাপ, ঢোলের তালে মিশে থাকা মানুষের হাসি-কান্না—সব মিলিয়ে গোবিন্দ ধরের ভেতরে জন্ম নিল অন্য এক থিয়েটার, যেখানে চরিত্রেরা কাগজের শরীর পেয়ে ওঠে, আর সব সংলাপ একসময় ক্রমে ভেঙে যায় কবিতার লাইন হয়ে। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫—এই পাঁচ বছরে যাত্রাগান ও অভিনয়ের সঙ্গে তাঁর যে প্রেম, তা পরে তাঁর সম্পাদনা ও সংগঠনদৃষ্টিকে দিয়েছে এক বিশেষ নাটকীয়তা, এক “মঞ্চবোধ”—যার জন্যই হয়তো তাঁর প্রতিটি সাহিত্যকর্মের ভেতরে একটা অদৃশ্য আলো পড়ে থাকে, যেন স্পটলাইট।এই আলোতেই ১৯৯১ সালে তাঁর প্রথম লেখা ছাপা হয়—গ্রাম থেকে ছোট্ট কণ্ঠস্বর উঠে পৌঁছায় অচেনা পাঠকের কাছে। শরীর, দ্রোহ, অভাব, ভালোবাসা আর অসময়ের বৃষ্টি—সব মিলিয়ে তাঁর কবিতার গঠন ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে এক ধরনের স্বীকারোক্তিময় অথচ দৃঢ় উচ্চারণ। যখন তিনি লেখেন, “শরীর তৃপ্তি হোটেল নয়”—তখন শুধু শরীর-রাজনীতির অমানবিকতাকে অস্বীকার করেন না, বরং মানুষের মাংস-মজ্জাকে পুনরায় ফিরিয়ে দেন সম্মান, বেদনা ও স্বপ্নের জায়গায়। তাঁর কবিতায় দ্রোহবীজ মানে হিংস্রতা নয়; বরং জমিনের ভিতরে নীরবে গজিয়ে ওঠা প্রশ্ন, যা কালক্রমে ভেদ করে ওঠে জীবনের কঠিন চামড়া।এই রকম ঠাসবুনোট ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় তাঁর একের পর এক কাব্যগ্রন্থ—“জলঘর”, “সূর্যসেন লেন”, “মনসুন মাছি”, “দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি”, “একা”, “শ্রীচরণেষু বাবা”, “দেওনদীসমগ্র”, “আনোয়ারা নামের মেয়েটি”, “আষাঢ়ের দিনলিপি”—যেন জীবনের বিভিন্ন ঋতুর নাম। কোথাও একা মানুষের অসহায় দাঁড়িয়ে থাকা, কোথাও রক্তমাখা ইতিহাসের গাঢ় ছায়া, কোথাও বা মাটির ভিতর থেকে উঠে আসা নামহীন মানুষের কণ্ঠস্বর। এই সব বই মিলিয়ে গোবিন্দ ধরের কবিতা-জগৎ হয়ে ওঠে এক দীর্ঘ নদীপথ, যার বাঁকে বাঁকে শোনা যায় উত্তর-পূর্ব ভারতের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপদ, সীমানার তারের ওধারের অক্ষর, আর শ্রমজীবী মানুষের ঘামে ভেজা মুখ।কিন্তু গোবিন্দ ধর শুধু নিজের জন্য লেখেননি, হয়তো লিখতেই পারতেন না। তাঁর ভেতরের শিক্ষক তাঁকে বারবার টেনে নিয়েছে তরুণদের দিকে, যারা লেখে, কিন্তু কোথাও ছাপতে পারে না; যাদের কবিতা কাগজে থেকে যায়, মলাট পায় না। এই অনুতপ্ত বাস্তবতা থেকেই ১৯৯৫ সালে তিনি রাতাছড়া থেকে শুরু করেন “স্রোত” নামে একটি ছোট্ট লিটল ম্যাগাজিন—খুব কম পাতা, অল্প কপি, সামান্য অর্থ, কিন্তু অগাধ ভালোবাসা আর অদম্য জেদ নিয়ে। শহরকেন্দ্রিক প্রচারমাধ্যম ও কাগজের আড়ালে দাঁড়িয়ে, যেন তিনি ঘোষণা করলেন—বাংলা সাহিত্যের মানচিত্রে উত্তর-পূর্বও আছে; এই মাটি থেকেও কবিতা উঠে আসে, আর সেগুলোর জন্য আলাদা মঞ্চ দরকার।“স্রোত”–এর প্রথম দিকের সংখ্যাগুলো তাই হয়ে ওঠে প্রান্তিক ও নিরব কণ্ঠের আশ্রয়—শ্রমিক, কৃষিজীবী, সীমান্তবাসী, আদিবাসী জনপদের অভিজ্ঞতা, ভাষা ও স্বপ্ন—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে এক তৃতীয় ভুবন, যা কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যের বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের সত্তা ঘোষণা করে। এই “তৃতীয় ভুবন”-এর দিগন্ত আরও প্রসারিত হয় ২০০১ সালে “মেঘ বৃষ্টি রোদ” সংকলনের মাধ্যমে, যেখানে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চল্লিশজন কবির কবিতা এক সঙ্গে এনে তিনি প্রমাণ করে দেন—এই ভূগোল শুধু সংবাদপত্রের প্রান্তিক খবর নয়, বাংলা কবিতার কেন্দ্রও হতে পারে।স্রোতের যাত্রা শুধু পত্রিকার পাতায় থেমে থাকেনি। ধীরে ধীরে এর হাত ধরে জন্ম নেয় পূর্ণাঙ্গ প্রকাশনা সংস্থা—“স্রোত প্রকাশনা”—যা মফস্বল থেকে শুরু হয়ে একসময় আগরতলা, কলকাতা, আসাম, দিল্লি, বাংলাদেশ, এমনকি লন্ডনের বইমেলাতেও নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। “মাটির ঘর সোনার ঘর”, “শ্যামলিমা”, “শ্যামবিচ্ছেদ”, “নদীর নামে চিরকুট”, “দিলীপকান্তি লস্করের কবিতা”, “মৃত্তিকা ঋণ মেঘমিতাকে”, “দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি”, “একা”, “শ্রীচরণেষু বাবা”, “শ্রেষ্ঠ কবিতা”–সিরিজ, “জন্ম দিও বঙ্গে”, “হিমাদ্রি দেব রচনা সমগ্র”, “ধুলোস্তোত্র”, “বৃষ্টিজল”, “দেও”—এই সব বই “স্রোত”-এর হাত ধরে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, মফস্বলের নাম আর মফস্বলেই আটকে থাকে না।ত্রিপুরা সরকারের শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা পুরস্কার স্রোত অর্জন করে চাকমা ভাষায় অনূদিত গীতাঞ্জলি” এবং নারীবিষয়ক গবেষণাধর্মী বই প্রকাশ করার জন্য। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া উপন্যাস “লোদ্রভার কাছাকাছি”–ও স্রোতের গর্বের প্রকাশনা। পুরস্কারের ঝলক তাঁর চোখে যতটা না আলো, তার চেয়ে বেশি আলো হয়তো তাঁর কাছে সেই মুহূর্ত, যখন প্রান্তিক এক কবি ফোনে বলে—“আমার প্রথম বইটা আপনারা করে দিচ্ছেন, এখন আমি সত্যি মনে করছি, আমি লেখক।”এইভাবে স্রোত হয়ে ওঠে শুধু একটি সংস্থা নয়, একটি ভূগোল, একটি সম্পর্কের নেটওয়ার্ক, একটি সেতু। এই সেতুর উপর দিয়েই ২০১৬ সালে আগরতলায় আয়োজিত হয় আন্তর্জাতিক লিটল ম্যাগাজিন উৎসব, যেখানে একদিকে উপস্থিত তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী, অন্যদিকে কলকাতা ও বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন কর্মীরা; ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কথাসাহিত্য উৎসব, ২০১৮-তে প্রতিষ্ঠিত “ত্রিপুরা লিটল ম্যাগাজিন গিল্ড”, “কুমারঘাট উৎসব”, “বাংলাভাষা” পথপত্রিকা, শিশুদের জন্য “কুসুম”, বই-আলোচনার পত্রিকা “বইবাড়ি”, স্মৃতিকথা ও অনুগল্পসমৃদ্ধ “অন্যপাঠ”—সব মিলিয়ে এক বিশাল সাংস্কৃতিক সমাবেশ, যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন গোবিন্দ ধর, কিন্তু একা নন—অগণিত কবি-লেখক-সম্পাদক-গবেষকের হাত ধরাধরি করে।এই পথচলার মাঝে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “উত্তরপূর্ব লিটল ম্যাগাজিন পুঁথি-পত্র পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র”—প্রথমে রাতাছড়ায়, পরে কৈলাশহর পেরিয়ে কুমারঘাটে স্থায়ী ঘর খুঁজে পায় এই আর্কাইভ। হাজার হাজার লিটল ম্যাগাজিন, পুরোনো পাণ্ডুলিপি, বিরল সংখ্যা—সব মিলিয়ে এটি আজ এক অনন্য গ্রন্থাগার, যেখানে গবেষকরা আসেন উত্তর-পূর্বের বাংলা সাহিত্য ইতিকথা লিখতে। বাউন্ডারি ওয়ালের সিমেন্ট না শুকোতেই ভেতরের তাকগুলোতে বই সাজিয়ে দেন গোবিন্দ ধর; যেন তিনি বলতে চান, দেওয়ালের শক্তি নয়, এই ঘরের প্রকৃত বুনিয়াদ বই আর মানুষের স্মৃতি।এদিকে তাঁর ব্যক্তিজীবনও যেন এক চলমান সাহিত্য পরিবার। স্ত্রী সুমিতা পালধর নিজে প্রকাশক ও কবি, পদ্মশ্রী মজুমদার গল্পকার-ঔপন্যাসিক, পুত্র গৌরব ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় নিবেদিত, কন্যা গৈরিকা কৈশোরেই কবিতা-চর্চায় ডুব দিয়েছে—একেকজন যেন স্রোতের আলাদা আলাদা শাখা, যারা মিলেমিশে গড়ে তুলেছে একটি নদীঘেরা আঙিনা, যেখানে বই মানে শুধু পণ্য নয়, প্রতিদিনের শ্বাস-প্রশ্বাস।আর এই সব কিছুর মধ্যে দাঁড়িয়ে গোবিন্দ ধরের ভাবনা একটাই—সাহিত্য কখনোই নিজের জন্য নয়, কেবল সৌন্দর্যরসের জন্যও শেষ কথা নয়; সাহিত্য যদি মানুষের জীবন, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বাস্তবতার ভেতর ঢুকে আলো না ফেলতে পারে, তবে তার গায়ে যত অলংকারই থাকুক, সে আসলে অন্ধকারে বসে থাকা এক সাজঘরের পুতুল। তাই তিনি বারবার নবীন লেখকদের বলেন, গোষ্ঠীস্বার্থের ধোঁয়া দিয়ে নিজের চোখ ঢেকো না; কারও ধূপে ধুনো হয়ে ওঠার চেয়ে নিজের বিশ্বাসের পাশে দাঁড়ানো অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। এই জেদ তাঁকে অনেক আঘাতও দিয়েছে, কিন্তু আঘাতের দাগগুলোই তো শেষ পর্যন্ত তাঁর কবিতাকে দিয়েছে আরও বেশি মাটি, আরও বেশি রক্তমাংসের সত্যি।তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এইভাবে মফস্বল থেকে শুরু হওয়া এক ক্ষুদ্র লিটল ম্যাগাজিন আজ হয়ে উঠেছে উত্তর-পূর্ব ভারতের বাংলা সাহিত্যচর্চার এক অনিবার্য নাম। “স্রোত” শুধু কাগজের পাতায় ছাপা কয়েকটি উৎসব, বই, সংখ্যা, নথি বা পুরস্কারের তালিকা নয়; স্রোত হচ্ছে এক “মানুষ বিশ্বাস করেছে”—এই সরল বাক্যের ইতিহাস। বিশ্বাস করেছে, মফস্বল থেকেও বিশ্বমঞ্চে পৌঁছনো যায়; দরিদ্রতা থেকেও তৈরি হয় সমৃদ্ধ ভাষা; পরিশ্রমের ভেতর থেকেও ফোটে নন্দনচেতনা।আজ যখন “স্রোত” আটাশ বছরের পথ অতিক্রমের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, তখন মনে হয়, নদীকে বোঝাতে গেলে নদীর নাম বললেই হয় না; তার ধার, গতি, ঢেউ ও তীরের ঘাসের গন্ধও বলতে হয়। গোবিন্দ ধরের “স্রোত” সেই অর্থে এক জীবন্ত নদী—যার জন্ম রাতাছড়ার মাটিতে, যার কৈশোর কুমারঘাটের বইমেলায়, যার যৌবন আন্তর্জাতিক উৎসবের আলোকমালায়, আর যার ভবিষ্যৎ ছুটে চলেছে অনন্তের দিকে, নতুন নতুন লেখক, কবিতা, গ্রন্থ ও স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে।এই স্রোতের জলে ভিজে যে পাঠক একবার মাথা নামায়, সে জানে—বইয়ের মলাট আসলে নদীর তীর; সেখানে নাম লেখা থাকে, কিন্তু ভেতরের জলের শব্দ, ঢেউ, নুড়িপাথরের ঘর্ষণ—সব মিলিয়ে যে সংগীত তৈরি হয়, তার নামই গোবিন্দ ধর, তার অন্য নাম—“স্রোত”।
========================================


🚦৩🚦কবি গোবিন্দ ধর : ভাতের লড়াই করতে করতে কবি হয়ে ওঠার দীর্ঘ পথের গল্প

গোবিন্দ ধরের জন্ম হয়েছিল এমন এক সময়, এমন এক পরিবেশে—যেখানে দিনের শুরু মানেই ছিল লড়াই। জীবনের প্রথম পাঠই ছিল বেঁচে থাকা; আর বেঁচে থাকার মানে ছিল ভাতের দুশ্চিন্তা। সমাজের প্রান্তিক এক কোণে দাঁড়িয়ে, জীবনের ক্ষুদ্র সুখগুলোকে দূর থেকে দেখেই বড় হয়েছেন তিনি। কিন্তু বোধহয় সেই দূরত্বই তাঁকে শব্দের আরও কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
দারিদ্র্য মানুষকে দু’ভাবে ভাঙে—এক, তাকে নীরব করে দেয়; দুই, তাকে প্রশ্ন করতে শেখায়। গোবিন্দ দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিয়েছিলেন। সংসারের ভারে নুয়ে পড়া কিশোরটি ঘরে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে কেরোসিন আলোর নিচে খাতায় শব্দ জড়ো করত। তার এই গোপন সাধনার খবর তখন কেউ জানত না।
শব্দ ছিল তার আশ্রয়, তার পালাবার পথ, আবার তার আত্মনিবেদনও।
মফস্বলের সঙ্কুচিত আকাশের নিচে স্বপ্নের বিস্তার
একটি ছোট্ট শহর, যেখানে সাংস্কৃতিক চর্চা থাকে—কিন্তু সুযোগ থাকে না। সেখানে দাঁড়িয়ে কবি হওয়া যেন নদীকে উল্টো স্রোতে চালানো। বই নেই, পাঠক নেই, আলোচনার জন্য মানুষ নেই—তবু গোবিন্দ ধরের স্বপ্ন থেমে থাকেনি।
রাস্তার ধুলো, মানুষের দুঃখ, রাতের নীরবতা, বন্ধুদের কথা—সব মিলিয়ে তিনি নিজের ভেতরে এক আলাদা জগৎ তৈরি করলেন।
সেই জগৎ তাকে লড়াই ভুলতে দেয়নি; বরং লড়াইকে কবিতায় রূপান্তর করার শক্তিটা দিয়েছে।

➡️ভাতের লড়াই—আর শব্দের জয়

জীবনের বড় হিসেবপত্রে যখন সবই ঘাটতি, তখন কলম ধরা যেন অতিরিক্ত বিলাসিতা। কিন্তু গোবিন্দের কাছে কলমই ছিল শক্তির উৎস।
যে মানুষ শৈশব থেকেই অভাব দেখে এসেছে, তাকে আর ভয় দেখায় কে? এই নির্ভীক সত্য থেকেই আসে তার ভাষার দৃঢ়তা।
তিনি লিখেছেন শ্রমিকের ব্যথা, কৃষকের হতাশা, মেয়েদের অসহায়তা, সমাজের অসাম্য, শহরের চঞ্চলতা—সবই। কিন্তু সেই সাথে লিখেছেন প্রেম, দূরত্ব, হারানো মানুষ, জীবনের মৃদু আলোও।
কারণ জীবন যত কঠিনই হোক, কবিতা সবসময়ই একফোঁটা আশার মতো সময়ের হাত ধরে থাকে।

➡️ সৃষ্টি নয়, আত্মমুক্তি

গোবিন্দ ধরের কবিতা লেখা ছিল না শুধু ‘লেখা’—তা ছিল আত্মমুক্তির এক উপায়।
একটি দিন যেভাবে সংসারের দায়িত্বে নিঃশেষ হয়ে যায়,
রাতের লিখতে বসা সেই মানুষটিকে আবার পূর্ণ করে তোলে।
শব্দেরা তাকে বাঁচিয়েছে—
তাকে গড়ে তুলেছে—
তাকে সবার সামনে দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছে।
তিনি জানতেন দারিদ্র্য শরীর ক্লান্ত করে, কিন্তু মনের আলো কেড়ে নিতে পারে না।
এই আলোই থেকে থেকে তাকে পথ দেখিয়েছে।
মফস্বল থেকে “স্রোত”—সাহিত্যের এক নীরব বিপ্লব
গোবিন্দ ধরের হাত ধরে মফস্বল শহরে জন্ম নিয়েছে ‘স্রোত’—একটি ছোট্ট লিটল ম্যাগাজিন, যা আজ প্রায় তিন দশক ধরে প্রবাহিত। এ এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব—শব্দের, মানুষের, বিশ্বাসের।
আগরতলার মতো নগরকেন্দ্রিক সাহিত্যভুবনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ‘স্রোত’ দাঁড়িয়েছে মফস্বলের বুক চিরে।
এ এক স্বপ্ন, যা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়—একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস থেকে জন্ম নেওয়া।
একটা অসম্ভবকে সম্ভব করাই তার কবিতার মতো—ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে, অথচ দৃঢ়ভাবে।

➡️ কবি গোবিন্দ : লড়াই থেকে উঠে আসা আলোর মানুষের প্রতিচ্ছবি

আজ তিনি যে সম্মান, যে স্বীকৃতি পান—সেটা একদিনে আসেনি।
এসেছে যন্ত্রণার কাঁটাবনে হেঁটে হেঁটে।
এসেছে ক্ষুধার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
এসেছে মানুষকে দেখে, তাদের বেদনা বুঝে, আর নিজের বেদনা থেকে বেরিয়ে এসে।
তাই গোবিন্দ ধর শুধু কবি নন—তিনি সংগ্রামের প্রতীক।
তিনি প্রমাণ—যে মানুষ ভাতের লড়াই করতে করতে বড় হয়,
সে-ই সবচেয়ে গভীর কবিতা লিখতে পারে। কারণ কবিতা তখন আর শিল্প থাকে না—তা হয়ে যায় জীবনযুদ্ধের ভাষা।
============================================



🚦৪🚦কবি গোবিন্দ ধর: শিক্ষকতায় আদর্শ সম্মান

শিক্ষক—শব্দটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে যে মানুষের মুখ মনে ভেসে ওঠে, তিনি সাধারণত নিঃশব্দ, স্নেহমাখা, ধৈর্যের ভিতর দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ। আমাদের সমাজে শিক্ষক হওয়া অন্য সব পেশার মতো নয়; এটি একধরনের গভীর প্রতিশ্রুতি, আত্মদীপ জ্বালিয়ে অন্যের পথ দেখানোর নিরব সন্ন্যাস। এই ‘সন্ন্যাস’-এর সবচেয়ে অনাড়ম্বর কিন্তু সর্বাধিক দৃশ্যমান উদাহরণ হলেন কবি গোবিন্দ ধর—যিনি কবিতার মতোই তাঁর শিক্ষকতাকেও করেছেন মমতা, ন্যায়, সত্য এবং মানবিকতার এক জীবন্ত পাঠশালা।
আজকের সময়ে একজন কবি হওয়া যেমন কঠিন, ভালো শিক্ষক হওয়া তার চেয়ে কঠিনতর। সমাজ ক্রমশ ফলাফল নির্ভর হওয়ায় অনেক শিক্ষকই যেন পাঠ্যবইয়ের প্রহরী হয়ে গেছেন; কিন্তু গোবিন্দ ধর ছিলেন ভিন্ন ধারার। তাঁর কাছে শিক্ষা মানে কেবল সিলেবাস নয়, বরং মানুষের ভিতরে ‘মানুষ’ তৈরির দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তিনি বিশ্বাস করতেন—শিক্ষার প্রথম কাজ হলো মানুষকে মানুষ হতে শেখানো। জ্ঞান দ্বিতীয়, মানবিকতা প্রথম।
আর এই দর্শনই তাঁকে আলাদা করে দেয় অন্যদের থেকে—এমনকি নিজ সমকালীন শিক্ষকদের থেকেও।

➤ শিক্ষকতার শুরু: আদর্শের বীজবপন

যখন তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন, তখন সমাজ ও শিক্ষাজগৎ অনেকটাই ভিন্নরূপে ছিল। তখনও শিক্ষকেরা ছিলেন পরিবারগুলোর অভিভাবকতুল্য। শিক্ষক মানে তখন ভরসা, নৈতিক শক্তি, ভবিষ্যৎ গড়ার প্রথম ইট। গোবিন্দ ধর ঠিক সেই পরিবেশেই তাঁর যাত্রা শুরু করেন—কিন্তু সময়ের সঙ্গে শিক্ষার পরিবেশ যত বদলেছে, তিনি বদলাননি মূল্যবোধের জায়গায়।
তিনি ছাত্রদের কাছে কখনও ছিলেন না কঠোর শাসক; আবার অতিরিক্ত স্নেহে অবসন্ন দুর্বল পথপ্রদর্শকও ছিলেন না। তিনি ছিলেন ভারসাম্যের শিক্ষক—যেখানে প্রয়োজন সেখানে নির্দেশ, যেখানে প্রয়োজন সান্ত্বনা, আর যেখানে প্রয়োজন নিঃশব্দ অপেক্ষা।
এই অপেক্ষাটুকুই আজকাল কমে গেছে। কিন্তু তিনি তখনও ছাত্রদের কথা বোঝার জন্য সময় দিতেন।
অনেক সময়ই তিনি বলতেন—“শিক্ষকতা পেশা নয়; এটি মানুষ গড়ার সাহস।” আর এই সাহসই তাঁকে বারবার আলাদা করেছে।

➤  ক্লাসরুম তাঁর কাছে ছিল কবিতার মঞ্চ

যে ব্যক্তি কবিতা লিখেন, তাঁর দৃষ্টি অসাধারণ রকম সূক্ষ্ম হয়। গোবিন্দধরের ক্ষেত্রেও তাই। তাঁর ক্লাসরুম ছিল সাধারণ চার দেওয়ালের ঘর নয়, বরং ছোট্ট এক ‘জগৎ’।
তিনি ছাত্রদের মুখ দেখে বুঝতে পারতেন কার মন কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, কার মনে ভয়, কার মনে সংশয়, কে পড়ছে কিন্তু বোঝেনি, আর কে বুঝেছে কিন্তু বলতে ভয় পাচ্ছে।
কবির দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে শিখিয়েছিল—মানুষকে বোঝা খাবারের রেসিপি শেখানোর মতো নয়; এখানে প্রয়োজন মন পড়ার ক্ষমতা।
তাঁর অনেক ছাত্রই পরে বলেছে—“স্যার বই শেখাননি, জীবন শেখিয়েছেন।”
সে জীবন কখনও ছিল নৈতিকতার, কখনও আত্মসম্মানের, কখনও সংগ্রামের।
শিক্ষক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—তিনি ছাত্রদের স্বাধীন হতে দিতেন। ভুল করতে দিতেন। কারণ তিনি জানতেন—ভুলই শেখার প্রথম সিঁড়ি; ভয় শেখার সবচেয়ে বড় শত্রু।

➤ মানবতা ছিল তাঁর শিক্ষকতার কেন্দ্রবিন্দু

গোবিন্দধরের শিক্ষা-পদ্ধতি ছিল মানবিকতায় ভরপুর। তিনি বিশ্বাস করতেন—একজন ছাত্র হয়তো অঙ্কে দুর্বল, হয়তো ইতিহাসে দুর্বল, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সে দুর্বল মানুষ। প্রত্যেক ছাত্রের মধ্যে একেকটি ফুল রয়েছে—কখনও ফুটতে দেরি হয়, কিন্তু ফোটে।
আজকের সময়ে যখন অভিভাবকেরা রেজাল্ট না পেলে হতাশ হয়ে পড়েন, তিনি তখন থেকেই বলতেন—
“মানুষকে নম্বর দিয়ে মাপা যায় না; নম্বর দিয়ে ভবিষ্যৎও লেখা যায় না।”
একজন শিক্ষক যদি ছাত্রদের ভেতরের আলোটা রক্ষা করতে পারেন, তবে তারা নিজেরাই পথ খুঁজে নেবে—এই বিশ্বাস তাঁর ভিতরে অটুট ছিল। এমন বিশ্বাস বহু ছাত্রকে জীবন বদলে দিতে সাহায্য করেছে—এটা কোনো অলংকার নয়, বাস্তব।




➤ কঠোরতার আড়ালে ছিল কোমল হৃদয়

শুরুতে অনেক ছাত্রই তাঁকে দেখত শান্ত, কম কথা বলা, নিয়মে স্থির একজন শিক্ষক হিসেবে।
কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁরা বুঝত—তাঁর কঠোরতা আসলে নিয়মের প্রতি, মানুষের প্রতি নয়। তিনি যে নিয়ম মানতেন তা ছিল শিক্ষার সৌন্দর্য বজায় রেখে স্বাধীনতা দেওয়া। তিনি চাইতেন—ছাত্ররা যেন নিজেরাই প্রশ্ন করতে শেখে। যেন কেউ অন্ধ অনুসরণ না করে।
তাই তাঁর ক্লাসে হাত তুলে প্রশ্ন করা ছিল গর্বের বিষয়, অপরাধ নয়।
এই পরিবেশেই অনেক ছাত্র নিজের ভয় কাটিয়েছে।
কঠোরতা আর মমতার এই ভারসাম্যই তাঁকে যুগোপযোগী শিক্ষক করেছে, সময়ের সঙ্গে আরও প্রাসঙ্গিক করেছে।

➤  ছাত্র–শিক্ষকের সম্পর্ক: সম্মান জন্ম নিতো দুই পক্ষ থেকেই

আমরা প্রায়শই ভুলে যাই—একজন শিক্ষক সম্মান পান তখনই, যখন তিনি সম্মান দেন।গোবিন্দধর এ সত্যটি জীবনে প্রয়োগ করেছেন।
তাঁর ছাত্ররা বলত—
“স্যার কখনও আমাদের ছোট করেননি। আমরা ভুল করলে কখনও অপমান করেননি; বরং বলেছেন—‘ভুলের মধ্যেই বুঝতে শেখো।’”
সেই কারণে ছাত্ররা তাঁর প্রতি ভক্তির জায়গায় শ্রদ্ধা রাখত।
ভক্তি মানুষকে ভয়ে রাখে, শ্রদ্ধা রাখে আলোয়। গোবিন্দ ধর আলোই বেছে নিয়েছিলেন।
তাই সময় পেরিয়ে গেলেও ছাত্ররা ফিরে আসে তাঁর কাছে—
কেউ বলে চাকরি পেয়েছে, কেউ বলে সমস্যায় পড়েছে, কেউ বলে জীবনে অনেক ভুল করেছে। আর তিনি শোনেন।
কারণ তাঁর কাছে ছাত্রত্ব কোনো দিনের ব্যাপার নয়; এটি আজীবন সম্পর্ক।



➤ কবিতার আলো শিক্ষার্থীদের মানসগঠনে

শিক্ষক গোবিন্দ ধর একদিকে যেমন বাস্তবমুখী ছিলেন, অন্যদিকে তিনি ছাত্রদের মানসিক জগৎকেও গড়ে তুলতেন। তিনি কবিতা পড়তেন, ছাত্রদের পড়াতেন। কবিতার ভেতর দিয়ে তিনি মানুষকে চেনাতেন।
তিনি বলতেন— “কবিতা মানুষকে নরম করে, নম্র করে; আর নম্রতা সব শিক্ষার প্রথম দরজা।”
আজ যখন বিশ্ব প্রতিনিয়ত কঠোর, প্রতিযোগিতার চাপ তীব্র, তখন গোবিন্দধরের মতো শিক্ষকরা ছাত্রদের মধ্যে নরমতার মূল্যবোধ তৈরি করেছেন—যা আজকের সমাজে বড়ই বিরল।

➤ সৎ পথের সাহস: শিক্ষকের নৈতিক অবস্থান

শিক্ষক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে আশ্চর্য গুণ ছিল—নৈতিক দৃঢ়তা।
তিনি কোনো অনিয়মকে প্রশ্রয় দিতেন না। নিজের অবস্থানকে কখনও সরাতে দেননি। অনেক সময় এতে হয়তো কিছু অসুবিধা হয়েছে তাঁর জন্য, কিছু অপছন্দও জুটেছে, কিন্তু তিনি তার পরোয়া করেননি।
কারণ তাঁর কাছে শিক্ষা মানে ছিল সত্য, সময়োপযোগীতা, এবং সততার অটুট বন্ধন। তাই ছাত্ররা তাঁর কাছ থেকে শিখেছে—
“সঠিক কাজ করতে হলে কখনও কখনও একা থাকাও শেখা দরকার।”
এই শিক্ষা আজকের সময়েও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।

➤ সময় বদলায়, মূল্যবোধ বদলায় না

আজকের দিনে যখন শিক্ষা অনেকটাই প্রতিযোগিতা-নির্ভর, শিক্ষকরা কখনও কখনও বাধ্য হয়ে হয়ে ওঠেন নম্বরদাতা, সেখানে গোবিন্দ ধর ছিলেন সময়ের আগেই সময়ের ঊর্ধ্বে।
তিনি বুঝতেন—শিক্ষার প্রকৃত মূল্য নম্বরে নয়, মানুষের আচরণে।
শিক্ষা তখনই সফল, যখন মানুষ নম্র হয়, যুক্তিবাদী হয়, মানবিক হয়।
এমন শিক্ষক খুব বেশি জন্মায় না।তাঁরা নিজেরাই হয়ে ওঠেন এক একটি যুগ।

➤ সমাজের প্রতি তার প্রভাব: এক নীরব বিপ্লব

একজন শিক্ষক কেবল ছাত্র নয়, পুরো সমাজকে বদলে দেন—হয় নীরবে, নয় ধীরে। গোবিন্দ ধরও তাই করেছেন।
তাঁর ছাত্ররা পরে যেখানেই গেছে—শিক্ষক, ডাক্তার, সমাজকর্মী, ব্যবসায়ী—তাঁদের কথায়, আচরণে, সিদ্ধান্তে তাঁর শিক্ষা রয়ে গেছে।
সমাজ যখন স্বার্থে ভোগে, প্রতিযোগিতায় বিভ্রান্ত হয়, তখন তাঁর ছাত্ররা শান্ত দৃষ্টিতে মনে করে— “মানুষ হওয়াটাই আসল; বাকি সব তার পরে।”
এটাই একজন মহান শিক্ষকের জয়। তিনি নিজের নাম প্রচার করেন না—মানুষ তাঁকে ছড়িয়ে দেয়। তিনি নিজের অবদান বলেন না—মানুষ তাঁর পথ অনুসরণ করে। গোবিন্দ ধর তেমন একজন।

➤  শিক্ষকতা তাঁর কাছে ছিল কবির মতোই সত্যের অনুশীলন

একজন কবি যেমন শব্দকে বাঁচিয়ে রাখেন, তেমনি একজন শিক্ষক মানুষকে বাঁচিয়ে রাখেন। গোবিন্দধর এই দুই ভূমিকাকে এক করেছেন—
কবিতার আলো আর শিক্ষার আলোকে মিশিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন অসংখ্য ছাত্রের ভিতরকার মানুষটিকে। তাঁর কবিতা যেমন সমাজের সত্য বলে, তাঁর শিক্ষকতাও জীবনের সত্য বলে। শব্দে তিনি যেমন নির্মম বাস্তব আঁকেন, ক্লাসে তিনি তেমনি ছাত্রদের শেখান—
“সত্যের সামনে দাঁড়াতে শেখো।”এটাই তাঁকে যুগের শিক্ষক বানায়।

➤ শেষে: কেন তিনি শিক্ষায় ‘আদর্শ সম্মান’-এর নাম?

কারণ—তিনি ছাত্রকে নম্বর নয়, মানুষ হিসেবে দেখেছেন।তিনি ভয় নয়, প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন। তিনি নিয়ম ও মানবতার সমান ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। তিনি নিজের চরিত্র দিয়ে ছাত্রদের চরিত্র গড়েছেন। তিনি কবিতার কোমলতা দিয়ে যুক্তির কঠোরতা শিখিয়েছেন। তিনি নৈতিকতার জায়গায় কখনও আপস করেননি।
তিনি নিজের শিক্ষা-দর্শন দিয়ে সমাজের ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছেন।
আদর্শ শিক্ষক মানে কী—এ প্রশ্নের উত্তর যদি কোনো মানুষের জীবনে খুঁজতে হয়, তবে গোবিন্দ ধরের জীবনই সেই পাঠ্যবই। তিনি শিক্ষকতাকে করেছেন শ্রোতের মতো— নিঃশব্দে বইছে, কিন্তু আশেপাশের জনপদকে উর্বর করে রেখে যাচ্ছে। এমন মানুষদের সম্মান করা মানে শিক্ষা তথা মানবিকতাকে সম্মান জানানো। গোবিন্দ ধর সেই বিরল মানুষদের একজন—যাঁদের উপস্থিতি সমাজে আশ্বাস, শিক্ষায় আলো, আর মানবতার মধ্যে নীরব কবিতা।
============================================


🚦৫🚦 কবি গোবিন্দ ধর : ত্রিপুরায় লিটল ম্যাগাজিন ও গ্রন্থ আন্দোলনের পথিকৃৎ

ত্রিপুরার সাহিত্য-পরিমণ্ডল কখনোই কলকাতা বা ঢাকার মূলধারার মতো সমৃদ্ধ ছিল না। এখানে কবিতা, গল্প বা সমালোচনার চর্চা চলত নীরবে, গ্রামগঞ্জের আড্ডায়, স্কুলঘরের বেঞ্চে, কিংবা সরকারি দপ্তরের চায়ের টেবিলে। কিন্তু মফস্বলের এই নিভৃত সৃষ্টির মাটিতে যারা আলো জ্বালিয়েছেন—তাঁদের মধ্যে কবি গোবিন্দ ধরের নাম উজ্জ্বল হয়ে উঠে আসে।
তিনি শুধু কবি নন; তিনি লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের এক নীরব স্থপতি, এক গ্রন্থ-সংস্কৃতির জাগরণদূত, যিনি ত্রিপুরার সাহিত্য-পরিবেশকে তার অন্তর্গত অন্ধকার থেকে তুলে এনে নতুন সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যেতে পেরেছেন।

➤  ত্রিপুরার সাহিত্যচর্চার প্রেক্ষাপট:

ত্রিপুরার সংস্কৃতি বহুভাষিক—ত্রিপুরী, কোকবরক, বাংলা, অসমীয়া—সব মিলেমিশে এক অসামান্য সঙ্গতি গড়ে তুলেছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এই ভূমির সাহিত্যচর্চা বহু বছর ধরে কেন্দ্রবিমুখ ছিল।
আগরতলা-নির্ভর কয়েকটি প্রকাশনী ছাড়া ত্রিপুরার অন্য অঞ্চলগুলোতে বই প্রকাশ ছিল প্রায় অনুপস্থিত। একটি গ্রন্থ প্রকাশ করাই ছিল যেন যুদ্ধের মতো কঠিন কাজ প্রকাশকের অভাব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, পাঠকের সংকট, এবং সাহিত্য চর্চার জন্য ধারাবাহিক পরিকাঠামোর অভাব।™এই শূন্যতার মাঝেই কিছু স্বপ্নবান মানুষ দাঁড়িয়ে উঠেছিলেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন—বই প্রকাশ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি এক জাতির চিন্তাশক্তিকে বাঁচিয়ে রাখার অস্ত্র।
এই আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত—গোবিন্দ ধর।

➤ লিটল ম্যাগাজিন : এক বিদ্রোহী ধারার সৃষ্টি:

লিটল ম্যাগাজিন মূলত প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর।
এটি মূলধারার সাহিত্যকে চ্যালেঞ্জ করে, নতুন রুচি তৈরি করে, নতুন লেখক সৃষ্টি করে।
ত্রিপুরায় প্রথম দিকে এই আন্দোলন ছিল বিচ্ছিন্ন। কিছু তরুণ লেখক সামান্য তহবিলে, রাত জেগে, সাইক্লোস্টাইল মেশিনে ম্যাগাজিন ছাপতেন।
কিন্তু ধারাবাহিকতা ছিল না, গুছিয়ে সংগঠিত করার নেতৃত্ব ছিল না।
গোবিন্দ ধরের যাত্রা এখানেই বড় হয়ে ওঠে। তিনি বুঝেছিলেন—লিটল ম্যাগাজিন কেবল একটি বই নয়; এটি একটি চিন্তার আন্দোলন, একটি মানুষ তৈরি করার বিদ্যালয়। তাই তিনি যুক্ত করতে শুরু করেন ছাত্র, কৃষক, শিক্ষক, শিল্পী—সবার হাতের লেখা, সবার ভাবনা। তার ফলে ছোট শহর এবং গ্রামাঞ্চলে লিটল ম্যাগের এক নতুন জোয়ার তৈরি হয়।

➤ ‘স্রোত’ : এক সাহিত্যযাত্রার জাগরণ:

গোবিন্দ ধর যখন ‘স্রোত’ লিটল ম্যাগাজিনটি হাতে নেন, তখন এটি ছিল ছোট্ট গৃহস্থালি চেষ্টার মতো।
কিন্তু তাঁর নেতৃত্বে ‘স্রোত’ হয়ে ওঠে এক সাহিত্য-আন্দোলনের রূপকার।
স্রোতের তিনটি বিশেষ শক্তি ছিল—
১. নতুন লেখকদের স্বীকৃতি দেওয়া,
২. মফস্বলের চিন্তাভাবনাকে কেন্দ্রীয় আলোচনায় আনা,
৩. সাহিত্যকে সমাজের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করা।
ত্রিপুরার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যারা লিখতেন, কিন্তু কোনো আলো পেতেন না—গোবিন্দ ধর তাঁদের হাতে তুলেছিলেন সাহসের কলম।
অনেক তরুণ কবি ও লেখক আজ যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন—তার বড় অংশই স্রোতের পাতায় প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।

➤ গ্রন্থ প্রকাশ : এক অসম যুদ্ধের যোদ্ধা:

গোবিন্দ ধরের সবচেয়ে বড় অবদান তাঁর গ্রন্থ আন্দোলন। তিনি জানতেন—লিটল ম্যাগ জাগরণ যদি বইয়ের জন্ম না দেয়, তবে তা অসম হিসেবে রয়ে যায়। কারণ বই মানেই স্থায়িত্ব। বই মানেই ভাষার স্মৃতি। বই মানেই এক প্রজন্মের ত্যাগ ও পরবর্তী প্রজন্মের আশ্রয়।
ত্রিপুরায় বই প্রকাশ করতে গেলে তখন নানা বাধা—
খরচ, বিতরণ, প্রচার, আগরতলাভিত্তিক প্রকাশনীর অনীহা,মফস্বলের লেখকদের প্রতি বিদ্বেষ, কাগজ-প্রেসের অপ্রাপ্যতা
এই সবকিছুকে অতিক্রম করতে হয় অত্যন্ত কঠোর মনোভাব নিয়ে।
গোবিন্দ ধর সেই পথটিই হাঁটলেন। তিনি নিজে পাণ্ডুলিপি পড়তেন, লিখতেন, সংশোধন করতেন, সুপারিশ করতেন, প্রুফ দেখতেন—
একজন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয় এমন বহুমুখী কাজ। অনেক লেখকের প্রথম বই বেরিয়েছে তাঁর হাতে ধরে।তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাসের ফেরিওয়ালা।
বলতেন—“লেখা কাগজে উঠে আসা মানেই লেখকের আত্মার জন্ম।”
এই দর্শনই ত্রিপুরার সাহিত্যকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে। এখন যাদের বইমেলায় দেখতে পাই—তাদের অনেকেই গোবিন্দধরের কাছে তৈরি।
ত্রিপুরায় বই প্রকাশ করা মানেই আর্থিক ক্ষতি মেনে নেওয়া।
প্রকাশকেরা অনীহা, বইয়ের দোকান সীমিত, পাঠকের সংখ্যা কম—সব মিলিয়ে বই প্রকাশ কার্যত এক রোমাঞ্চকর যুদ্ধ।
কিন্তু গোবিন্দ ধর মনে করতেন—“যে মাটিতে বই নেই, সেই মাটিতে ভবিষ্যৎ নেই।”
তিনি নিজের জীবিকার কষ্টের মধ্যেও বই প্রকাশে হাত লাগান।
নিজের গ্রন্থ ছাড়াও অসংখ্য তরুণ কবির বই তিনি প্রকাশ করেছেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে, নিজের শ্রমে, নিজের উপার্জিত অর্থে। এটি শুধু প্রকাশনা ছিল না—এটি ছিল এক প্রকার মানসিক বিপ্লব, যেখানে তিনি বুঝিয়েছিলেন—“বইই হল সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী স্থায়ী স্মৃতি।”

➤ সংগঠক গোবিন্দ ধর : যুক্ত করা, জাগানো এবং ধারণ করা :

গোবিন্দধর শুধু লেখক নন; তিনি একজন সক্রিয় সংগঠক। ত্রিপুরার বিভিন্ন অঞ্চলে সাহিত্যআসরের আয়োজন, পাঠসভা, গ্রন্থমেলা—সব ক্ষেত্রেই তাঁর উপস্থিতি ছিল শক্তিশালী।
তিনি জানতেন—সাহিত্য চর্চা যদি শুধু বইয়ের পাতায় থাকে, তবে তা প্রাণহীন হয়ে পড়ে। তাই তিনি সাহিত্যকে নিয়ে গেছেন মানুষের কাছে।
অনেক মানুষ বলেন—গোবিন্দ ধর এসে না দাঁড়ালে ত্রিপুরায় এই পরিমাণ লিটল ম্যাগাজিন টিকত না, বই প্রকাশের ধারাও গড়ে উঠত না।
তিনি ছিলেন—বন্ধু, পরামর্শদাতা, আর্থিক সহায়তা, সম্পাদক, সমালোচক—সবকিছু।





🚦৬🚦  কবি গোবিন্দ ধর : নিরন্তর কর্মসাধনে এক গৃহী, অথচ একাকিত্বের সাধক

ত্রিপুরার মাটি শান্ত।
এখানকার বাতাসে মিশে থাকে পাহাড়ের গন্ধ, ছোট ছোট নদীর ধুলোমাখা সুর, আর মানুষের নীরব কথোপকথন।
এই ভূমিতে জন্ম নিয়েছে অনেক কবি, কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন যাঁরা নিজের জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশকে সাহিত্যসাধনার সঙ্গে বেঁধে রাখতে পেরেছেন—সেই বিরল কয়েকজনের একজন হচ্ছেন কবি গোবিন্দ ধর।
তিনি এমন একজন মানুষ—
যিনি সংসারের মধ্যেও নিজের বিশুদ্ধ একাকিত্বকে অটুট রেখেছেন;
যিনি দায়িত্বের পাহাড় বয়ে নিয়ে যান, অথচ ভিতরে ভিতরে ধ্যানের মতো শুদ্ধ নীরবতা রক্ষা করেন; যিনি কাজ করেন দিনের আলোতে, কিন্তু কবি হন রাতের একান্ত গভীরে। নিজের মতো করে তিনি গড়েছেন এক দ্বৈত সৌন্দর্য— গৃহস্থ জীবনের আঙিনায় বসেই এক সাধকের মতো নিজের অন্তর্জগৎকে পরিশীলিত করা।
এই প্রবন্ধ সেই মানুষটির জীবন, দর্শন এবং কর্মসাধনার পথযাত্রার এক বিস্তৃত ব্যাখ্যা।

➤  গৃহস্থের দৈনন্দিনতায় লুকানো এক সন্ন্যাসীর বীজ

গোবিন্দধর কোনো দূর পাহাড়ে আশ্রম খুঁজে নেননি।
তাঁর আশ্রম—তাঁর ঘর। তাঁর সাধনাস্থল—দৈনন্দিন জীবনের ভিড়, সংসারের হাঁসফাঁস, এবং দায়িত্বের চাকার শব্দ। >এই ভেতর থেকেই তিনি শিখেছেন নিজেকে গড়ে নিতে।
এমন মানুষ খুব কম পাওয়া যায়—>যারা গৃহের ভেতর থেকে নিজের অন্তর্জীবনের আলো খুঁজে নিতে জানেন।
>সংসারের দায়িত্ব তাঁকে কখনো ভারী করে দেয়নি; বরং জ্ঞান দিয়েছে সহিষ্ণুতার, সংযমের, আর বিবেচনার। তিনি যেন ঠিক জানতেন—
মানুষ যদি নিজ ঘরের ভেতরেই নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পারে,
তবে বাইরের শূন্যতা তাকে আর ব্যথা দিতে পারে না।
এই কারণে তাঁকে বলা যায়— 
“সংসারের মধ্যে থেকেও আত্মার সাধক।”

 ➤ নীরব কর্মীর মতো তাঁর যাত্রা

গোবিন্দধরকে চিনলে বোঝা যায়—তিনি কোনোদিন নিজের কৃতিত্বকে বড় করে বলেননি। তিনি কাজ করেন, একটি বীজ গেঁথে দেন মাটিতে, তারপর একদিন চুপ করে দেখেন সেই বীজ গাছ হয়ে উঠছে।
ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনে তাঁর অবদান অনেকেই জানেন,
কিন্তু তাঁর শ্রমের গভীরতা শুধুই তাঁকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তারাই বোঝেন।
>লেখা সংগ্রহ, সম্পাদনা, প্রকাশকের সাথে যোগাযোগ, সংগ্রামের টাকাপয়সা জোগাড়, বই মেলায় দাঁড়িয়ে পাঠকের হাতে বই তুলে দেওয়া সবই তিনি করেছেন নিজের হাতেই, নিজের সময়েই, কোনো দল বা প্রতিষ্ঠান ছাড়াই।
>তিনি সত্যিই সেই ধরণের মানুষ—যারা কর্মের মধ্যে বাঁচেন, আর নিজের সকালের আলোকে নিজের সন্ধ্যার মতো ধ্যানমগ্ন করে তোলেন।

➤ একাকিত্ব : তাঁর শক্তি, তাঁর শরণ, তাঁর সৃষ্টি

একাকিত্ব মানুষের জন্য অনেক সময় বিষ। কিন্তু কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই একাকিত্বই পরিণত হয় ঔষধে। [গোবিন্দধর সেই বিরলদের একজন। তিনি কখনও একাকিত্বকে ভয় পাননি; বরং গ্রহণ করেছেন তা নিশ্চিত আলোর মতো। যখন বাড়িতে আড্ডা চলে, যখন পরিবারে কোলাহল, তখনও তাঁর মনে একটি নিভৃত কক্ষ থাকে— যেখানে তিনি নিজের সঙ্গে কথা বলেন। এই নীরবতা তাঁকে কবি করেছে।
এই একাকিত্বই তাঁকে করেছে স্রষ্টা—সংযমের, সত্যের, এবং মানবিক বোধের স্রষ্টা।
তাঁর কবিতায় যে গভীর নরম বেদনা, যে মানুষের প্রতি মমতা—
সেটি এসেছে এই একান্ততাকে ধারণ করার ক্ষমতা থেকে।
একাকিত্ব তাঁর কাছে পালানোর পথ নয়, বরং উন্নতির সিঁড়ি,
এক আত্ম-চিন্তার দরজা, যেখানে শব্দের জন্ম হয়, তিনি হয়ে ওঠেন একজন সত্যিকারের কবি।
➤যুগান্তকারী সাহিত্যকর্মী : প্রকাশনা, সম্পাদনা ও সংগঠন

গোবিন্দধরের সাহিত্যযাত্রা শুধু লেখায় আটকে থাকেনি।
তিনি বুঝেছিলেনলেখার আলো মানুষের কাছে পৌঁছানোই প্রকৃত কাজ।এ কারণেই তিনি লিটল ম্যাগাজিন ও গ্রন্থ প্রকাশনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। প্রকাশনা জগতে যেখানে অর্থের অভাব স্বাভাবিক,
সেখানে তিনি তাঁর শ্রমকে মূলধন করে তুলেছিলেন।
তিনি ছিলেন— একাই একটি প্রতিষ্ঠান, একাই একটি আন্দোলনের চালিকাশক্তি।
তাঁর সম্পাদিত ম্যাগাজিনগুলো শুধুই পাণ্ডুলিপির সমাহার নয়—
এগুলো ছিল নতুন চিন্তার জন্মভূমি। তাঁর ছোঁয়ায় অনেক তরুণ লেখক প্রথমবারের মতো কলমের গন্ধ পেয়েছেন, সমাজের চিত্র বিশ্লেষণ করেছেন, আর সাহসী হয়ে উঠেছেন নিজেদের ভাষায়।

➤ সম্পর্ক, মানুষ এবং তাঁর নিরন্তর মানবিকতা

গোবিন্দধরের ব্যক্তিগত জীবনও তাঁর সৃষ্টিশীলতার মতোই সরল ও গভীর।তিনি সহজ মানুষ, কম কথা বলেন, বেশি শোনেন।
কিন্তু তাঁর চাহনিতে থাকে এক অভ্যন্তরীণ উষ্ণতা— যা মানুষকে টানে, শান্ত করে, সাহস দেয়। যেখানে অনেক কবি আলাপচারিতায় কঠিন হয়ে উঠেন, গোবিন্দধর সেখানে মানুষের দুর্ভোগ, ক্লান্তি ও ছোট ছোট সুখের প্রতি কতটা সংবেদনশীল— তা কথোপকথনে ধরা পড়ে।
>এই কারণেই তিনি সমাজ, সাহিত্য এবং মানসিকতার তিনটি স্তরে মানুষের পাশে দাঁড়ান। মানুষের ভাঙা আত্মবিশ্বাস, তার কষ্ট, তার যন্ত্রনা সবের রঙ তিনি শব্দ দিয়ে আঁকেন।


---➤তাঁর লেখায়—সাধনার পরিপূর্ণ প্রতিফলন

গোবিন্দধরের লেখা এমন—যেখানে সাধারণ শব্দও একটি ভূমিকা রাখে;
যেখানে পাহাড়ি গ্রাম বা মফস্বলের অচেনা অলিগলি হঠাৎ করে কবিতার আলোয় ঝলমলিয়ে ওঠে; যেখানে প্রতিবাদ আছে, কিন্তু তা শোরগোল নয়— তা মাটির নরম হৃদস্পন্দন।

তিনি যখন লেখেন—বুঝতে হয় তিনি নিজের জীবন থেকে লিখছেন।
পরিবারের মাঝে বসে একাকিত্বের অভ্যন্তরীণ আলো, সংগ্রামের বিষণ্নতা, তরুণদের জন্য উদ্বেগ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভসবই তাঁর শব্দের ভিতরে পাথরের মতো স্থির হয়ে থাকে।

➤ গৃহে থেকেও মননে এক সন্ন্যাসী : তাঁর দর্শনের মর্ম

গোবিন্দধর এই সত্য জানেন—যে মানুষ নিজের অন্তরকে জিততে পারে না, সে বাইরের পৃথিবীকে কখনও আয়ত্ত করতে পারে না।
তাই তিনি নিজেকে প্রতিদিন পরিশীলিত করেন—>অল্প শব্দে, অল্প দাবিতে, অল্প তর্কে। তিনি মানুষের দিকে তাকিয়ে শিখেছেন—সমতা, সহিষ্ণুতা আর ধৈর্য।
তিনি মনে করেন— সাহিত্য হলো মানুষের আত্মার আয়না,আর সেই আয়না পরিষ্কার রাখতে হলে সংসারের ভিড়েও নিজেকে শোনার ক্ষমতা থাকতে হয়।

{➤ উপসংহার : এক নীরব আলোর মানুষ

শেষ পর্যন্ত গোবিন্দধর এমন একজন মানুষ হয়ে উঠেছেন—যাঁকে দেখে মনে হয় তিনি খুব সাধারণ, কিন্তু তাঁর নীরবতার ভিতর লুকিয়ে আছে অসাধারণ এক শক্তি। [তিনি পরিবারে থেকেও নিজেকে হারান না,
তিনি কাজের ভিড়ে থেকেও নিজের একাকিত্বকে বাঁচিয়ে রাখেন,
তিনি সাহিত্যকে ভালবাসেন, কিন্তু সাহিত্যকেই জীবন বানিয়ে ফেলেন, জীবনকেই করেন তাঁর সাহিত্য।
এ কারণেই তিনি নিরন্তর কর্মসাধনে গৃহী, অন্তর্জগতে একাকিত্বের সাধক, আর মানুষের চোখে— এক অমোঘ, নীরব, সত্যিকার পথপ্রদর্শক।

================================================
🚦৭🚦  কবি গোবিন্দ ধর :নতুন লিখিয়েদের তুলে আনতে নিজেকে করেছেন উৎসর্গ

কবি গোবিন্দ ধর ত্রিপুরার সাহিত্যজগতে যে ভূমিকা রেখে চলেছেন, তা কেবল একজন কবি হিসেবে নয়—বরং মানবিকতার এক বিরল যোদ্ধা হিসেবে। তিনি যেন এক অন্তহীন পথিক, যার একমাত্র লক্ষ্য—নতুন লিখিয়েদের হাত ধরে পথ দেখানো, তাদের অন্তরের দ্বিধা ভেঙে লেখার প্রতি সাহস জাগানো। এমন অনেকেই আছেন যারা নিজের কৃতিত্ব, নিজের প্রতিষ্ঠার আলোর পাশে অন্য কাউকে দাঁড়াতে দেন না; কিন্তু গোবিন্দ ধর সম্পূর্ণ উল্টো পথের মানুষ। তাঁর সত্তা যেন নির্মল বাতাস—যার ঘ্রাণে ভিজে পড়ে নবীন প্রতিভার অঙ্কুর।

ত্রিপুরার সাহিত্য-চর্চার ভুবন নানা ওঠাপড়ার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে। গ্রাম-শহর মফস্বলে ছড়িয়ে থাকা তরুণদের অধিকাংশই একসময় জানত না কোথায় যাবে, কার কাছে পাণ্ডুলিপি দেখাবে, কীভাবে প্রকাশনার পথে পা বাড়াবে। সেই অনিশ্চয়তার ভিতর গোবিন্দ ধর দাঁড়িয়ে ছিলেন এক নীরব দিশারি হয়ে। কেউ প্রথম কবিতা নিয়ে গেলেই তিনি মন দিয়ে পড়তেন। ভুল থাকলে বলতেন, “এই শব্দটা তোমার কবিতাকে দুর্বল করছে”—কিন্তু বলতেন চোখে মায়া নিয়ে, যেন শিক্ষক নয়—অভিভাবক। আবার কারো লেখায় সম্ভাবনা দেখলে তাঁর মুখে যে উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠত—সেই হাসি এক তরুণের জীবন বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত।

বছরের পর বছর ধরে তিনি নিজের ঘরটিকে করে তুলেছেন সাহিত্যপ্রেমীদের ছোট্ট পাঠশালা। বই, পাণ্ডুলিপি, খসড়া, নোট—সব মিলেমিশে কাগজের গন্ধে ভরা একটি স্নিগ্ধ অস্থায়ী অফিস যেন। দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরেও তিনি তরুণদের লেখা পড়তে বসতেন। কেউ দরজায় কড়া নাড়লেই বলতেন—“এসো, বসো। কী লিখেছ?”
কথাগুলো বড় সাধারণ, কিন্তু এদের ভিতরে ছিল অগাধ উৎসাহ। কারণ তিনি জানতেন—নতুনরা কখনোই শুরুতেই পূর্ণতা পায় না। তাদের বাড়তে দেয়ার জন্য প্রয়োজন একটুখানি আলিঙ্গন, একটুকু স্বীকৃতি, এবং বিপুল ধৈর্য। এই ধৈর্যই তাঁর হাতিয়ার।

অনেকে একথা বলেন—গোবিন্দ ধরের না থাকলে ত্রিপুরার সাহিত্য-পরিস্থিতি একই রকম থাকত না। কারণ তিনি কেবল নতুনের লেখাকে জায়গা দেননি, তাদের আত্মবিশ্বাসকেও লেখার টেবিলে বসতে শিখিয়েছেন। বহু তরুণ কবি-গল্পকার—যারা আজ নিজের নামেই বই প্রকাশ করছে, রাজ্য-দেশের নানা সাহিত্য মঞ্চে যাচ্ছে—তাদের প্রথম পদযাত্রার পেছনে ছিলেন গোবিন্দধরের নিঃশব্দ উপস্থিতি।

তিনি কারো বই বের করার জন্য মাঝেমধ্যে নিজের সময় ত্যাগ করেছেন, কখনো কখনো নিজের অর্থও। তরুণ লেখকের একটা বই যাতে পৃথিবীর আলো দেখে—এটাকে তিনি নিজের কর্তব্য মনে করেছেন। তাঁর আচরণ কখনো বাণিজ্যিক হয়নি, কখনো সম্মান-স্বীকৃতি নিয়ে লড়াই করেননি। তিনি বারবার বলতেন, “বই বেরোনো মানে একটা মানুষের আত্মাকে জন্ম দেয়া। সেই জন্মযন্ত্রণায় পাশে দাড়াতে পারি এটাই আমার আনন্দ।”

গোবিন্দধরের সম্পাদনা-দর্শনও ছিল একান্ত স্বতন্ত্র। তিনি লেখকের ভাষা-স্বাধীনতাকে মর্যাদা দিতেন, চাপিয়ে দিতেন না নিজের ভাবনা। তিনি বলতেন—“লেখা যদি নিজের ভাষা না খুঁজে পায়, তবে তা কারুরই হয় না।”
যে সম্পাদকের হাতে একটি লেখা পৌঁছালে লেখক ভয় পায়—গোবিন্দধর তাঁর ঠিক বিপরীত। তাঁর সংশোধন কখনো কঠোর রূপ নেয়নি; বরং ছিল নির্দেশের মতো, পথের মতো, আলোর মতো।

লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনে তিনি যে ভূমিকা রেখেছেন, তাও নবীনদের প্রতি তাঁর মমতারই প্রকাশ। “স্রোত”, “গান্ধার”, “অভিমুখ”—এইসব ছোট কাগজের পাতায় তিনি বারবার নতুন কণ্ঠকে জায়গা দিয়েছেন। কখনো কোনো পাণ্ডুলিপি দুর্বল মনে হলেও তিনি তুলে নিতেন—কারণ তিনি চাইতেন নতুনেরা প্রথম আলোর স্বাদ পাক। কেউ প্রথমদিকে ভালো না লিখলেও তিনি বলতেন—“চেষ্টা করতে থাকো। ধারাবাহিকতা তোমাকে নিয়ে যাবে।” এই ধারাবাহিকতার মূল্য তিনি নিজেও নিজের জীবনে রক্ষা করে চলেছেন। বছর কেটে যাচ্ছে, কিন্তু তাঁর কর্মনিষ্ঠা বদলায়নি। বয়স, শারীরিক সীমাবদ্ধতা, পারিবারিক দায়িত্ব—কিছুই তাঁর পথ আটকাতে পারেনি।

সংসারের মানুষ হয়েও তিনি নিজেকে দিয়েছেন সাহিত্যে নিবেদন করে। কিন্তু তা কোনো বিচ্ছিন্নতার সাধনা নয়, বরং কর্মময় একাকিত্বের সাধনা। তিনি নিজের ভেতরের ঘরে শান্ত হয়ে বসে জমিয়ে রেখেছেন নতুনদের জন্য অজস্র শুভেচ্ছা, অগুনতি উদ্যম। মানুষের ভিড়ে থেকেও তাঁর ভেতরকার নীরবতায় তিনি তৈরি করেন ভবিষ্যৎ সাহিত্যিকদের জন্য আলোর টুকরো।

ত্রিপুরার বহু জেলা শহর, মফস্বল, গ্রামীণ পরিসর—সব জায়গায় তাঁর ভক্তি এবং সম্মান ছড়িয়ে আছে। কেউ তাঁর কাছে প্রথম বইয়ের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে, কেউ তাঁর দেওয়া সাহসের কথা স্মরণ করে, আবার কেউ বলে—“স্যারের বিশ্বাসই আমাকে লেখক বানিয়েছে।”
এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য—তিনি বহু মানুষের ভিতরে লেখকের জন্ম দিয়েছেন, অথচ নিজের নামকেই সবচেয়ে কম গুরুত্ব দিয়েছেন।

আজও তিনি সমান তালে লিখে চলেছেন, পড়ছেন, অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন। বয়স থামাতে পারেনি তাঁর কর্মকে। কলম আজও তাঁর নিত্যসঙ্গী, আর হাতে ধরা পাণ্ডুলিপিই তাঁর আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু।

নতুন লিখিয়েদের তুলে আনতে যে মানুষটি নিজের জীবন, সময়, প্রতিভা, উৎসর্গ এবং মমতা সবটাই বিলিয়ে দিয়েছেন—তাকে কেবল সম্পাদক বলা যায় না, পথিক বলা যায় না, শিক্ষক বলা যায় না; তাঁকে বলা যায় এক নিভৃত সৃজনধর্মী আলোকবাহক—যাঁর আলোয় পথ খুঁজে পেয়েছে অসংখ্য নবীন মন।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
উপসংহার

একজন মানুষের জীবনকে সাতটি খণ্ডে ধরা যায় না—তবু এই পুস্তিকার প্রতিটি পাতায় গোবিন্দ ধরের যে মুখচ্ছবি ফুটে উঠেছে, তা আমাদের সময়ের জন্য এক মূল্যবান দলিল। তিনি কেবল কবি নন, কেবল সম্পাদক নন, কেবল সংগঠকও নন—তিনি এক ধারাবাহিক সাধনা। শব্দের প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাস, নতুনদের প্রতি তাঁর অনড় দায়বদ্ধতা, সংগ্রামের ভিতর থেকেও হাসিমুখে পথ চলার ক্ষমতা—এসব মিলেই তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ হয়।
আজকের সময়ে, যখন মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে খুব সহজেই, তখন গোবিন্দ ধরের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিঃশব্দ কাজই সবচেয়ে বড় উচ্চারণ। তিনি জানেন, প্রতিভা জন্মায় একা, কিন্তু বেড়ে ওঠে সকলে মিলে। তাই তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে আছে নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্য জায়গা করে দেওয়ার উদারতা।
এই প্রবন্ধগুচ্ছ তাঁর সমস্ত যাত্রার সংক্ষিপ্ত পুঞ্জীভবন—হৃদয়ের ভেতর জমে থাকা স্বপ্ন, ব্যর্থতা, অবিরাম আলো আর গভীর একাকিত্বের গন্ধ মিশে আছে এতে। পাঠক যখন এই গ্রন্থ হাতে নেবে, কেবল একজন মানুষের জীবনকথা নয়—দেখবে এক গোপন মশাল, যা এখনো জ্বলছে, এখনো পথ দেখাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত বলতে হয়—গোবিন্দ ধর কোনো সমাপ্তি নন; তিনি এক চলমান ধারা। এই পুস্তিকা সেই ধারার প্রথম নথি মাত্র। আগামী দিনগুলিতে তিনি আরও কত সৃষ্টি, কত তরুণ কবিকে বয়ে নিয়ে যাবেন—তাও এই লেখাগুলির ভেতরে ভবিষ্যতের মতো ঝলসে উঠেছে।

0 Comments