কবি গোবিন্দ ধরের 'ধানের পাঁচালী' 
কালের জীবনঘনিষ্ট দলিল || পুলিন রায়

বাঙালির প্রধান খাবার ভাত। ভাত মানেই ধান। জানা কথা, ধান থেকেই ভাত হয়। আর এই ধান যখন কবির অনুধ্যান হয়ে কবিতার পঙক্তিতে পঙক্তিতে উচ্চারিত হয় তখন এই 'ধান' কাব্যিক আবহের মোড়কে এক অন্যমাত্রায় ধরা দেয়৷
 ধান নিয়ে কবি গোবিন্দ ধর বিমূর্ত, দারুণ আকর্ষণীয় এক কাব্যবলয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন তাঁর 'ধানের পাঁচালী' কাব্যের মাধ্যমে। ধান নিয়ে কবির ভাবনা এবং কিছু সোনালী স্মৃতির বর্ণনা আমাদেরকে মুগ্ধ করে। বইয়ের কবিতাগুলোর শিরোনামে চোখ বুলালে খুব সহজেই অনুধাবন করা যাবে কবির কৃতীকে। গ্রন্থের কবিতাগুলো হচ্ছে : ধানের পাঁচালি(১০টি কবিতা), বীজধান, ধানদানা, হৃদয়হাওর জুড়ে গভীর অসুখ, মাটির কবিতা:১, মাটির কবিতা : ২, ডাস্টার, একটি জেদি পথ, অবশেষে, বত্রিশ নম্বর বাড়ি, চলো, হাত ধরো, মূর্তি, দেওনদীসমগ্র, সন্ধ্যাতারা, মৌলভীবাজার, লক ডাউন vs হোমোস্যাপিয়েন্স, মা সমগ্রের কবিতা, স্ক্যান্ডেল, দেশের বাড়ি, ত্রিপুরেশ্বরী এক্সপ্রেস, ভাষা আমার মাটি হয়ে গেলো, অক্ষরাস্ত্র, গোবিন্দ ধর একা অথবা শূন্য(১৮টি কবিতা), চাষা, ধানের পাঁচালি ও বিন্নিধান। 

তিন/চারটি কবিতা বাদে প্রায় সকল কবিতায়ই ধান নিয়ে কবির আবেগঘন উচ্চারণ বা চৈতন্যের অনুরণন টের পাওয়া যায়। যেমন: 'উপদ্রুত বসন্ত দিন নেচে ওঠে/জঙ্গলের ফাঁক গলে উঁকি দেয়/পূর্ণিমা চাঁদ।/ধানের পাতায় লেগে থাকা শীত শিশির/টুপটাপ পতনের শব্দে লেখে প্রজন্মের উঠোন।'(গোবিন্দ ধর একা অথবা শূন্য, চার)।
কী মন্ময় উচ্চারণ! নিখুঁত চিত্রকল্প আর শব্দ বুননের ক্যারিশমেটিক জাদু আমাদের বিমোহিত করে। 

বিন্নিধান কৃষিপ্রধান দেশের গ্রামাঞ্চলে এক অতি আদরনীয় ধান। এই বিন্নিধান নিয়ে কবির ভাবনা আমাদের চমকৃত করে।
'বেড়ে ওঠে সংকট, তাকে কেমোথেরাপি করি।/ সংকট কমে না। লাফিয়ে বাড়ে।/ যত্নআত্তি করার দরকার নেই তবুও বাড়ে।/
/অথচ আগাছা সাফাই করতে করতে মাঠের ধান/ আর প্রকৃত বাড়ে না।/ আগাছা গিলে খায় ধানগাছ।/
আবার রোপণ করি নতুন করে বিন্নিধান।/আবার আগাছায় খেয়ে নেয়।/.../তথাপি আবার আবার রোপণ করি ধানগাছ স্বপ্ন।' (বিন্নিধান)। 
কবি এই কবিতার ছত্রছায়ায় অবসাধারণ মুন্সিয়ানায় সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। আমাদের সমাজবাস্তবতায় এরকম হাজারো আগাছা বা নির্দয় অমানুষ যুগে যুগে কালে কালে ধ্বংসের মাতম করেছে, করছে বা করাচ্ছে।

শব্দবুননের মাধুর্য তৈরি করাই কবির মূল কাজ। এ ক্ষেত্রে গোবিন্দ ধর উতরে গেছেন পুরোপুরি। যেমন-

'বিন্নির বুক থেকে সুঘ্রাণ ছড়িয়ে/ অচিরেই অর্জন সম্ভব/ কেড়ে নেওয়া ভালোবাসা।/ সমূহপতন থেকে সৃজিত হয় উত্থানের চৌকাঠ।/ সিঁড়িগুলো টপকে ওঠো বেদনারচিত পিছল পথ টপকে গেলে/ পুনরায় ভালোবাসা মেয়েটির মতো/ আদর করবে বিলিকাটা সকাল।' কবিতাটি পাঠের পর বিমূর্ত এক কাব্যিকআবহে মনপ্রাণ ঘিরে থাকে, যা বর্ণনারও অতীত।
'দেশের বাড়ি' কবিতাপাঠে মুগ্ধতার পাশাপাশি কবির বেদনাবিধুর মনোজগতের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। পৈতৃকভিটের মায়া, তা ত্যাগ করার বেদনাবোধ এবং সোনালী স্মৃতি ও স্বপ্নভঙ্গের কাতর আর্তি কবিতাটিতে মূর্ত হয়ে ওঠেছে। 
গোটা কবিতাই উল্লেখের লোভ সামলাতে পারিনি।

'দেশের বাড়ি বলতে আমাদের পূর্ব পুরুষের 
একটি বাড়ি ছিলো। 
ছিলো পুকুর ভরা মাছ আর দুধেল গাই। 
বারো হাল বলদ।

ঠাকুরদা দেবেন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত 
একটি স্কুল মিঞারপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়।

পঞ্চাশের বড় রায়টের সময় সব বদলে গেলো 
বাবা চলে এলেন ঠাকুরদার হাত ধরে 
ছেঁড়া মানচিত্র বগলে নিয়ে।

সেই বাড়িতে এখন ক্ষেত, ধানি জমিন। 
কিছুটা মনু গিলে খেয়েছে।

দেশের বাড়ি বলতে আমার নিকট 
গোটা বাংলাদেশ সঙ্কীর্ণ গৃহচিহ্ন নয়।'

এরকম অসংখ্য ভালোলাগার পঙক্তি ছড়িয়ে আছে 'ধানের পাঁচালী' কাব্যে।
গোবিন্দ ধরের কীর্তির আরেক অনন্য নজীর এই 'ধানের পাঁচালী'কাব্য। অসাধারণ মুন্সিয়ানায় শব্দবুননের আবেগময় অথচ বাস্তবতাসঞ্জাত কুশলী শব্দবুননে 'ধানের পাঁচালী' গ্রন্থ যেন ধান নিয়ে কালের এক জীবনঘনিষ্ট দলিল। গ্রন্থটির প্রকাশক সুমিতা পাল ধর। প্রকাশিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান 'স্রোত' হালাইমুড়া, কুমারঘাট, ঊনকোটি, ত্রিপুরা থেকে। প্রকাশকাল জানুয়ারি ২০২৬। গ্রন্থটির চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী প্রশান্ত সরকার। এটি উৎসর্গ করা হয়েছে বাংলাদেশের নব্বই দশকের উল্লেখযোগ্য কবি মুজিব ইরমকে।

কবি গোবিন্দ ধর মূলত কবি হলেও তাঁর পরিচিতি অনেক। 'ধানের পাঁচালী' কাব্যের প্রকাশক সুমিতা পাল ধর যথার্থই বলেছেন, ''গোবিন্দ ধরকে কেউ চেনেন চৈতন্য ফকির তো কেউ চেনেন কথাশ্রমিক হিসেবে। কারো কাছে কথাকামলা, আবার কারো কারো কাছে অক্ষরশ্রমিক, এই সব মিলেই একাধারে তিনি কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক এবং ত্রিপুরা সরকারের গজেন্দ্রকুমার অমূল্যবালা নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকও। খুবই সাধারণ একজন মানুষ অথচ তিনিই সবার প্রিয় সদাহাস্যময় গোবিন্দ ধর। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিই অতুলনীয়, অসাধারণ। হোক তা নিজের কবিতা, হোক বই প্রকাশ। প্রকাশনাজগতে তিনি তাঁর দক্ষতায় অন্যদের করেছেন ঋদ্ধ। মানুষের প্রতি, সাহিত্যের প্রতি, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নিত্য নতুন কর্ম, সৃষ্টি পরিকল্পনার জন্য তিনি শুধু আমাদের এই ছোট্ট পার্বতী রাজ্য নয় ভারতবর্ষের নানা রাজ্যসহ, বাংলাদেশ ও লন্ডনেও বাংলাসাহিত্যমহলে তিনি পরিচিত। একইভাবে উত্তরপূর্ব ভারত এবং গোটা বাংলাভূখণ্ডে তিনি লিটলম্যাগাজিন প্রকাশনা আন্দোলনের অন্যতম মুখ।তিনি সম্পাদক, তিনি কথাকার, তিনিই সংগঠক এবং পুথি-পত্র সংরক্ষক এবং সংগ্রাহক''।

 পরিশেষে বলবো গোবিন্দ ধর কবি হিসেবে যেমন পরিচিত, তেমনি একজন স্বনামখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক, সাহিত্য সংগঠক ও প্রকাশক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সাহিত্যচর্চা ও সম্পাদনার মাধ্যমে ত্রিপুরা তথা আগরতলার বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন।
শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। এই আগ্রহ থেকেই তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে সাহিত্য জগতে নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলেন। তাঁর কবিতায় মানুষের জীবন, সমাজবাস্তবতা, প্রকৃতি ও মানবিক অনুভূতির প্রকাশ পাওয়া যায়। সহজ অথচ গভীর ভাষা তাঁর কবিতার একটি বৈশিষ্ট্য।
তিনি ত্রিপুরা থেকে প্রকাশিত সাহিত্যপত্র “স্রোত”-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। এই পত্রিকাটি দীর্ঘদিন ধরে ত্রিপুরা ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বাংলা সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত। পত্রিকাটির মাধ্যমে নবীন ও প্রবীণ লেখকদের লেখা প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং সাহিত্যচর্চার একটি সক্রিয় পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে কবি গোবিন্দ ধর ত্রিপুরার বাংলা সাহিত্য ও লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত। তাঁর জন্য শুভ কামনা রইলো।
৬৪ পৃষ্টার ঝকঝকে ছাপায় 'ধানের পাঁচালী' কাব্যের প্রতিটি কবিতাই মন ছুঁয়ে যায়৷ কবিতাগুলো পাঠান্তে মুগ্ধতার মধুরিমা বয়ে যায় হৃদয়তন্ত্রীতে। বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।

0 Comments