আমার মা||গোবিন্দ ধর
আমার মা
গোবিন্দ ধর
ছোটবেলা
আমার মা
গোবিন্দ ধর
ছোটবেলা
মোষোর পিঠে চড়তে চড়তে চরাতাম মোষ।আমাদের মনুনদী পেরিয়ে আড়াআড়ি বিরাট চরে কখনো কখনো।কখনোবা রাতাছড়া আমাদের বাড়ির উত্তরের বিশাল মাঠে।আমাদের বাড়িকে মাঠ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে ফটিকরায় ধুমাছড়া রাস্তা। এই রাস্তা দিয়ে মোষ নিয়ে মাঝে মাঝে চড়ে চড়ে চলে যেতাম মোষ চরাতে কাঞ্চনবাড়ি তরণীনগর ডালুয়াবন্দে।পিচ রাস্তা থেকে চাইলে আগার পরিমাপ করা যেতে না এই বন্দের।বন্দ মানে বিশাল ধানক্ষেতের মাঠ।একদিকে ধানক্ষেত অন্যদিকে মাঝে মাঝে ফাঁকা জমিন।আল ধরে নাকা দেওয়া মোষের দড়িতে আরো একটি দড়ি বাঁধা অংশ হাতে থাকতো।পিঠে আমি মোষকে জব্দ করতে নিমিষেই পারতাম।নিরীহ মোষ এখন এক একটি সত্যি সাক্ষাৎ অসুর লাগে।আমাদের শেষ মোষটি ছিলো বয়ড়া।বয়ড়া মানে পুরুষ মোষ।আর বৈরী মানে স্ত্রী মোষ।আমি যখন প্রথম প্রথম মোষ চরাতাম তখন বাচ্চাসহ আমাদের মোষ সাকুল্যে ৬টি।একা হাতে সামাল দিতাম।না রকম হের হের তিতি,তিতি এসব ধ্বনিতে মোষগুলো কন্ট্রোল করতে সিদ্ধ ছিলাম।মোষ মালিক হিসেবে বাধ্য ছাত্রের মতো মাঠে চরতো।হাল চাষেও আমি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে মাঠে নিয়ে যাওয়া মোষ কথা শুনতো শিক্ষার্থীর মতো।মোষের লেজে ধরে পিঠে চড়ে মনুর উত্তাল ঢেউ নদী পেরিয়ে মোষ চরাতাম।মোষের বাচ্চা হতো।তারপর একমাস বাচ্চা দুধ খেত।দুধ নিতাম তারপর।মোষের দুধ ঘন আঠালো।গরম করার পর হলদেটে হতো।তার উপর সর বসতো।সে সর একটু বেশী সময় উনুনে রাখলে টানটান হয়ে যেতো।তারপর একটু আঁখের চিনি মিশি তৃপ্তিতে খেতাম।মোষের দুধ থেকে সর হলে কিছু দিন পর পর ঘি নিতেন মা।দৈ বসাতেন।পরদিন তৃপ্তিতে মা পরিবেশন করতেন।খাওয়ার পর মাখন লেগে থাকত।ভালো করে হাত ধুয়েও পরিস্কার করতে কী সাংঘাতিক খাঁটোনি না হতো।তারপরেও মোষ ছিল নিরিহ প্রকৃতির।ধীরে ধীরে ক্রমাগত মাঠ জুড়তে লাগলো পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার গড়তে লাগলো।মাঠের ধানখেতে বাড়িঘর তৈরী হলো।খেত কমলো।আমাদের মোষ গরু পশুপাখি ছাগল হাঁসমুরগী পালনও কমাতে হলো।যদিও গ্রামীণ রীতিনীতিতে অনেক বাড়ি হাঁস পালন করা গেলেও মুরগী পালন নিষিদ্ধ ছিলো।কারণ এটা নিম্নবর্গের মানুষের খাদ্য হিসেবে দেখা হতো এককালে।আর আরো একটি বিষয় মুরগী মানুষের রেচনও খায়।এও এক অলেখা মিথ ছিল মানুষের মনে।যদিও তা টপকে অনেকেই মুরগী পোষতেন।আমাদের বাঠিও মুরগী পোষা হতো।যখন মাঠ কমতে শুরু হলো তখন মোষের সংখ্যাও কমাতে হলো।ফটিকরায় পশুপাখির বাজার আছে।এখনো স্থানীয়রা বাজারটিকে গরুর বাজার বলেন।বার কয়েক বাজারটি স্থান পাল্টিয়েছে কিন্তু বাজার এখনো রমরমা।
আমিও সে বাজারে মোষ বিক্রি করেছি।ছাগল বিক্রি করেছি।হাঁসমুরগি থেকে গুরু বিক্রেতা হিসেবে বার কয়েক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি।বাজারে পাইকার আসতেন।গুরুমহিষ বাজারে তুলার সাথে সাথে পাইকার দাম হাঁকিয়ে সেই যে চলে যেতো আর শেষ সময়ে রাতে আসতো।এদিকে পাইকার যে দাম হাঁকতো আর সারা বাজারে কোন সখের ক্রেতা সে দাম বলতো না।বলতো না অন্যরাও।কারণ পাইকার ইচ্ছে করে বেশী দাম বলে দিত।মালিক ভাবতো আরো বেশী দাম পাবেন।এতে দরদাম চলতো কিন্তু পাইকার আর শেষ বাজারে এসে আবার যে দাম বলতো তাতে গরুমহিষের মালিকের তখন ছানাবড়া চোখ। বহুবার ঠগা খেয়ে পরে বুঝেছি পাইকারের চালাকি।তারপর আর ঠগিনি।
এখন সেদিন আর নেই। মহিষ দেখলে অসুর লাগে।পিঠে চড়ার কথা ভাবলে নিজের পিঠের হাঁড় গুড় মনে হয় ভেঙে চৌচির হয়ে আমিই পড়ে আছি এবড়োখেবড়ো মেঠো পিচ রাস্তায়।
২৫:০৭:২০২১
সকাল:০৭টা
কুমারঘাট।

0 Comments