আত্মক্ষর:পর্ব-১৩গোবিন্দ ধর
আত্মক্ষর:পর্ব-১৩
গোবিন্দ ধর
গতকাল আষাঢ়ের প্রথমদিন গেলো।সারাদিন টিপটিপ বৃষ্টি এই আসে এই যায়।মন বাউল গান ধরে:
বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর
নদে এলো বাণ।
বৃষ্টির সাথে আমার এমন বনিবনা নেই।নেই ধুধু করা সবুজ কিংবা পাহাড়,পর্বত নদী নালার প্রতিও।এক্ষেত্রে আমি অনেকটা কাঠ বাঙ্গাল।আসলে আমি ছোটবেলা সবুজে লেপ্টে গেছি।ধান চাষ থেকে , লাগানো কাঁটা মাড়াই ঝাড়াই, শুকানো মিলিং সহ সব আমি আনন্দে কিংবা নিরানন্দে করতেই হয়েছে।আষাঢ় মাসের বৃষ্টিতেই আমরা দুমাই ধান কাটতাম।কাঁটা ধান মাড়াইয়ের পর শুকিয়ে নিতে হতো।শুকাতাম।এই বৃষ্টি তো এই রোদ।মেঘেরোদে খেলা চলতো আর আমরাও রোদে দেওয়া ধান বৃষ্টি এলে তুলতাম।এখনোর বৃষ্টিতে বন্যা খুব ককম হয়।তখন মনুর দুকুল ছাপিয়ে জল আসতো আমাদের ঘরের ভেতর।উঠোনে জল।জল থৈ থৈ। মাছ ধরতাম আমরা।বাড়ির উঠোনেই।
শহরের অবাক বালকের প্রকৃতি দেখা আর আমার প্রকৃতি তাই চিরকাল এক নয়।ধান শুকালে ঢেঁকিতে ভানাই সবই করতে হতো।ঢেঁকি ছাটা চালের ভাতের কি স্বাদ তাও মুখে লেগে আছে।
কখনো কখনো টানা ১৪-১৫ দিন বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই।বিরাম নাই।আকাশ কে যেন ছিদ্র করে দিলো মনে হতো।এত জল আকাশে থাকে।ভাবতাম কে নিয়ে ওঠে জল।বহন করে কে।আকাশে কত কত পুকুর নদী নালা সাগরের জল।ভাবতাম আকাশেও সাগর আছে।তাই বুঝি এত বৃষ্টি হয়।সারাদিন রাত বৃষ্টি।টুপটাপ টাপুর টুপুর।তখন কখন আষাঢ়ের প্রথম দিন প্রথম কদম কিছুই জানতাম না।মন খারাপ হতো বৃষ্টি এলে।বৃষ্টির উপর আমার রাগ হতো।আমি মনে মনে বৃষ্টিকে বকতাম।বৃষ্টিকে কোন দুষ্ট ছেলে ভাবতাম।
বাবা কি আর এসব জানতেন।তিনি হুকুম দিতেন মহিষ চরাতে হবে।আমিও বাবার হুকুম অক্ষরে অক্ষরে পালন করতাম।মহিষ চরাতে আষাঢ়ের বৃষ্টি ভেজা বিকেলগুলো মনো কষ্টে কাটতো।অলস বালিকার মতো সূর্য আর নিভতেই চাইতো না।বৃষ্টির দিনগুলো তখন বড় হয়ে সূর্য লটকে থাকে আকাশে মনে হতো।আমার কি রাগ হতো সূর্যের প্রতি।দিনের প্রতি। মনের কষ্টগুলো নিয়ে দিন আরো বড় হতো।বিকেলেও বৃষ্টিভেজা আকাশ থেকে লুকানো সূর্যের আভায় দিন আর শেষ হতো না।সূর্যের উপর রাগ করতাম।সূর্য আমার অভিমান বুঝতো না।মেঘের ফাঁকে হঠাৎ ঝিলিক দিতো আর আমায় মুখ ভেংচে যেন বলতো :
এই ছেলেটা ভেলভেলাটা।
আমার রাগ হতো ছোটবেলার প্রতি।সূর্যের প্রতি।বাবার প্রতি।বড়দার প্রতি।কারো উপর শাসনের অধিকার নেই আমার।তখন মনে হতো কখন বড় হবো।সূর্যের কান ধরে যখন তখন বলতে পারবো এই এখন রাত হও।
ছোটবেলাটা গরু আর মহিষের পিছু কাটিয়ে,সবুজ ধানের শিষে বৃষ্টির ফোটা লেগে টলমল নুয়িয়ে পড়া কিংবা শীতের শিশির লাগা ধানের পাতা ছুঁয়িয়ে বিন্দুবিন্দু জল তেমন আকৃষ্ট করতে পারেনি।এখনো নয়।প্রকৃতি ছিলো আমার উঠবোস।আমার সারাগায় কাদা আর জল সারাদিন লেগে থাকা সময় পেরিয়ে কখন যে মনুর জলে গলে গেলো ছোটবেলা বুঝতেই পারিনি।টানা বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছে থামে না। বৃষ্টি এলেই আঁৎকে উঠি।এই বুঝি বাবা এসে বলবেন মহিষটা মাঠে নিয়ে যা।বৃষ্টি এলে বাবার সর্তক চোখ এড়িয়ে থাকার কি মরিয়া চেষ্টা।কিন্তু ব্যর্থ হতাম।বাবা দরজার আড়াল থেকে কান ধরে টেনে আনতেন, মহিষ চরাতে এই বৃষ্টিতে মাঠে পাঠাতেন।মনো ক্ষুন্ন হলেও বাবার আদেশ চিরকাল আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতাম।বাবা যা বলতেন ভয়ে হোক আর আনন্দে হোক একদিনও না বলতাম না।না শুনে বড় হওয়া বালক আমি নই।আমি সব কাজ তাই হবেই ভাবি।হবে না ভাবতে পারি না।আমার মনে হয় পারবো।আমিই পারবো।।প্রকৃতি আমায় হাতছানি দেয় না তেমন।মহিষ চরানো, দোয়ানো,স্নান করানো এসব প্রতিদিন করতে করতে বড় হওয়ার পাঠ নিলাম।
ছোটবেলা পাহাড়ে কাঠ কাটতে প্রায় প্রতিদিন যেতে হতো। জ্বালানির লাকড়ি আনতে পাহাড়ে যেতো হতো।কাঠ আনা দিনগুলোও আমার নিরানন্দের মন খারাপের আরো একটি পার্ট।এ পর্ব পরেই বলবো।সবুজ লটকে থাকা সময় পেরিয়ে আমি বড় হলাম।সবুজ আর সবুজ পাহাড়।আকাশে মেঘের মাঝে নানা রকম আঁকিবুঁকি। এই হাতি তো এই ঘোড়া।গাছগাছালি।
রাজা মন্ত্রি এসব আমি আকাশের মেঘে আঁকা দেখতাম।রাতে বই হাতে কখন যে ঘুমপরি দুচোখ মুদে দিতেন আমি নিজেও জানতাম না।আজোও আমি আমার ঘুমপরি কখন চোখ বুজিয়ে দেন টের পাই না।সারাদিনের ক্লান্তি দুচোখ জুড়ে আসতো।এমন সময় বাবা তাঁর জালিবেতের লাঠি নিয়ে ঘুম তাড়াতে দিতেন। প্রায়দিন দুচার ঘা হজম করতেই হতো।ঘুমচোখ থেকে প্রকৃতির দেবী তার নোলক পরা অপরূপ মুখখানা টুপ করে লুঁকিয়ে নিতেন ।আমি তখন তাঁকে আর আজো খুঁজে পাই না।আমি চাইলেই সুন্দর উবে যায়।আমি চাইলেই অপ্সরা অপ্সরী পালায়।আমি চাইলেই সকালের সূর্য দেখি কি তেজ নিয়ে লাপিয়ে লাপিয়ে আমাদের বাড়ির উপর দিয়ে লাল চোখ করে চেয়ে থাকতে।এসব আমায় টানে না।এসব আমার ভালো লাগতো না।এসব আমার আরো মন কষ্টের কারণ ছিলো।সকাল হলেই মনে হতো আজও আমাকে মহিষ নিয়ে রাখাল বালক হতে হবে।আজও আমি হাল চাষে যাওয়া বড়দাকে চা নিয়ে দিতে হবে।চা দিয়ে আসতে আসতে সকালের ভাত নিয়ে যেতে হবে।সকালের জলখাবার খাইয়ে আসতে আসতে দেখা গেলো স্কুলের সময় কখন পেরিয়ে গেছে।আমি তখন মহিষ রাখাল।আমি তখন স্কুলে না যেতে পারা বালক।চেয়ে থাকতাম স্কুলে যাওয়া শিশুর দিকে।ওরা ছাতা মাথায় বৃষ্টিতে না ভিজেই স্কুলে যেত।আর আমি মহিষ চরাতে মাঠে যাই বিড়িপাতায় তৈরী বাঁশ ও বেতের ছাতা মাথায়।না বললে বড়দার হাতে মার খেতে হতো।কতদিন হালের পাচুন আমার পিঠে সপাং সপাং পড়ছে বড়দা ভুলে গেলেও আমি ভুলিনি।
১৬:০৬:২০১৭
সকাল:০৭:১৫মি।
কুমারঘাট।
0 Comments