শঙ্খলাগা শহর থেকে লংতরাইভ্যালী রিজার্ভ ফরেস্ট
 
গোবিন্দ ধর 

পরিভাষা 

# আর যদি তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করো আমি কোথায় এত বেপরোয়াভাবে বাঁচতে শিখেছি, আমার চামড়া, আমার হাড়, আমার  হৃদয় আমার কর্তৃত্ব।"
ক্যাথরিন ম্যাডসেন

পথ যেখানে শেষ হয়
সেখান থেকেই শুরু হয়
নতুন সূর্যোদয়।
যদি মেঘ এসে ঢেকে দিতে চায় 
মেঘ কেটে কেটে সামনে এগুনোই 
যাপনকাল।

একুশে অক্টোবর ২০২০ এবং বনবাস

সবার আমি ছাত্র সকাল থেকে শিখছি দিবারাত্র। 

১৯ অক্টোবর ২০২০ তারিখ ফাইনেলি সিদ্ধান্ত নিলাম  নতুন স্কুলে যাবো।এর আগে আমার পূর্ব পুরুষ কিংবা আমিও নতুন স্কুলের অস্তিত্ব কোথায় কিংবা ত্রিপুরার কোথায় তাও জানতাম না।

সৌভাগ্য ত্রিপুরার শিক্ষা ব্যবস্থার।যিনি টেন রিলিজ হবেন তার নিকট এখনো কোন ট্রান্সফার অর্ডার আসনি।এমন কি বিদ্যালয় আধিকারিক কুমারঘাট ২০ তারিখ পর্যন্ত এরকম কোন অর্ডারের কপি পাননি।আমাকেও জানাননি আমি ট্রান্সফার। 
কবি বন্ধু সঞ্জীব দে বিগত ৫ই অক্টোবর সাব্রুম সাতচাঁদ দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয় থেকে চুরাইবাড়ি দ্বাদশশ্রেণী বিদ্যালয়ে ট্রন্সফার হয়েছেন। সঞ্জীব নেটটেট ঘাটাঘাটি করছিলো হয়তো।সে তখন আমাকে ম্যাসেজ করে জানায় স্কুলটি কোথায়?আমি বলি কোন স্কুল?সঞ্জীব বলল'ও মা,আপনি জানেন না'?আপনি তো ট্রান্সফার? আমি বললাম না জানি না।তখন সঞ্জীব বললো আচ্ছা পাঠাচ্ছি। পাঠালোও।
আমি নন অফিসিয়াল ভাবে হাতে অর্ডার পেলাম ১৮ তারিখ। সেচ্ছায় কুমারঘাট বিদ্যালয় আধিকারিকদের সাথে যোগাযোগ করি।স্যার বললেন না এমন কিছু জানা নেই। ১৯ অক্টোবর অব্দিও স্যার জানেন না।আমি বললাম স্যার আমার নিকট অর্ডার আছে।আমি যেতে চাই নতুন স্কুলে।স্যার বললেন আমরা তো অর্ডার পাইনি।তাহলে কি করে যাবেন।আমি জোর দিয়েই বলি হ্যাঁ আমার নিকট আছে অর্ডার।আমি রিলিজ চাই।
অগত্যা আমার গো ধরে বলায় অফিস বললেন আপনি এস এম সি মিটিং এর রেজোল্যুশন কপি, চার্জ হ্যাণ্ডওভার কপি এবং অসমাপ্ত কাজের শেষ দেওয়া এডজাস্টমেন্ট কপি জমা দিন।আমি সব ২০ তারিখ ফাইনাল করে জমা দিলাম।
বললাম : রিলিজ অর্ডার দিন।
অফিস ও এস ডি হালামবাবু বললেন আসুন ১টা নাগাদ। 
আমি বিকেল তিনটেয় অফিশে গেলাম।তখনো কোন অর্ডার বের হয়নি রিলিজের।চাপ দিলাম আমি আগামীকাল জয়েন করবো।আমার রিলিজ দিন।তখন বিকেল ৫টা নাগাদ রিলিজ অর্ডার বের করে স্যারের স্বাক্ষর নিলাম।আমার হাতে এলো রিলিজ।
মনে মনে আমি মুক্ত।একটি স্কুলকে ভালোবেসে জীবনের সর্বোত্তম শ্রম মন শক্তি সব প্রাণের থেকে দিলেও যখন স্কুল ও তার আশপাশের সকলকে আপন করেও স্কুলে থাকা যায় না তা অনুভব করতে করতে বাসায় এলাম। এমন স্কুলে আইনের ফাঁক খুঁজে না থাকাই শ্রেয় নানাভাবে অনুভব হলো।
গন্তব্য নতুন স্কুল।

পথে যেতে যেতে 

দীর্ঘ পথের প্রতিটি বালুকণা আমাকে অক্ষরে অক্ষরে ধারন করে নিয়েছিলো বিগত চার বছর। দীর্ঘ পথ।বাড়ি থেকে মেরেকেটে হলেও যাওয়া আসা ১০০ কিমি।যদিও কখনোই ক্রিকেট খেলিনি।কিন্তু এপথ পাড়ি দিতে দিতে মনে হতো আমি শতরান পূর্ণ করি প্রতিদিন। ঝড় জল মাড়িয়েই চড়াই উৎরাই পেরিয়ে যেতে এ পথের জল জলা জংলার খুব আপনজন হয়ে উঠেছিলাম বিগতদিনগুলো।
আজ সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে বহু সময় লাগিয়ে পথ অতিক্রম করেছি।প্রতিটি কংক্রিট আমাকে আজ ছাড়তে চায়নি।এত কঠিন বন্ধুর পথ।কংক্রিট বিছানো।দু'ধারে নানা রকম গাছগাছালি পাকপাকালির কিচিরমিচির। বনফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে যেতে শ্রম হলেও শ্রমিকরা ঠিক গন্তব্যে পৌঁছতেই হয়।এই পথ পাড়ি দিতে দিতে কতজনের রিংটোন বেজে উঠতো।ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতে বলতে যেতাম শীতের কুয়াশা মাড়িয়ে। বর্ষার জলের ঝাঁপটা থেকে নিজেকে রেনকোট পরে বাঁচিয়ে রাখতে রাখতে কথা গল্প পরিকল্পনা আর আগামীর স্বপ্ন দেখতে দেখতে এই পথ বড় চেনাজানা হয়ে গেছিলো।পথ আসলে পথ দেখায়।নতুন সূর্যোদয়ের স্বপ্নবুনে।পথ আমাদের গন্তব্য চেনায়।পথ আঁকাবাঁকা। এবড়োখেবড়ো। 
এই পথ একসময় পাড়ি দেওয়ার সাধ্য ছিলো না লোকজনের। এমন নিষ্ঠুরতার গল্প কত কত জানতে হয়েছিল আমার আসা যাওয়ার পথে।সে গল্প অন্য সময়।
বেশ কতদিন আওয়াজ বেজে ওঠেনি এমন নয়।সাহস হারাইনি।কতদিন এইসব যন্ত্রকে সামনে পাশে রেখে হাতে নিয়ে পাখি আমি পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল সে অবাক করা বাস্তব। কিন্তু সৌভাগ্য কোনোদিন তাক করেনি যন্ত্রটি বুকের দিকে,রক্ষে।সাহস হারাইনি।ঝনঝনানিকে ভয় পাইনি।ঘাবড়ে যাইনি।তারপর গা সওয়া হয়ে গেছিলো বিষয়টি।
শিক্ষককের মর্যদা কমেনি বনেও।শিক্ষক এখনো মানুষের নিকট সম্মানীয়। এ বিষয়টি বুঝা যায়। 
জুমের ছাই মেখে পথ পাড়ি দিতে মজাই লাগতো।গন্ধধানের শোভা ছড়িয়ে পড়তো রাস্তার আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। 
সারা পথ বনফুলে মোড়ানো গভীর জঙ্গল।দু'ধারে সবুজ বনবীথিকা। মন অচেনা শঙ্কায় শংকিত থাকতো।তবুও প্রতিদিন প্রকৃতি পাঠ করতে করতে পথ ফাঁড়ি দিতাম।অজানা শঙ্কা গা ছমছমে রহস্যময়তায় জঙ্গলের মাদকতা কাইরিঙের টান গন্ধধানের সুঘ্রাণ মন্দ লাগেনি চারটি বছর।

দিনপঞ্জিকা:২৩:০৬:২০২৩

এই পথ ধরে প্রতিদিন আসি যাই। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ। আকাশে মেঘ মেঘ।ঝিরিঝিরি দু'এক পশলা বৃষ্টির ঝিলিক ছিলো।
যদিও বর্ষা এখন।আষাঢ়ের দিন।শ্রাবণ ঝরার সময়।কিন্তু সেরকম বর্ষা নেই। দিনের উত্তাপ বেশ।আকাশে সাদা মেঘ পুঞ্জীভূত। এরকম আকাশ সাধারণত শরৎকালের আকাশকে সৌন্দর্যে ভরিয়ে দেয়।অপরূপ আকাশ।অথচ এখন ভরা বাদল থাকার কথা।
আমার স্কুলের পথে এরকম আসছি প্রায় পাঁচ বছর। এ পথ সৌন্দর্যে ভরপুর। এই পথে আনারস, রাভার আর নানা বনজঙ্গল মাড়িয়ে চলতে চলতে মেরুদণ্ড ক্ষয়ে গেছে। তা যাক।তবুও মন নেচে ওঠে।সাইরেন বাজে মনের গোপন বাঁশিতে।
এই পথে গাড়ি নেই। জনপদ লোকারণ্য নয়।মাঝে মাঝে টিলায় টিলায় টং ঘর। আর কারো কারো টিলায় লুঙ্গায় মিলে খাড়াই অঞ্চল ঘষিয়ে পাকা বাড়ি।দ্বিতল বাড়ি।
মাঝে মাঝে জনশূন্য। মাঝে মাঝে রাভার গাছের ছায়ায় গা ছমছমে রহস্যময়তায় মনে হয় আমিই অশরীরী ছায়া। ছায়ায় আশ্রয় নেই। মনে মনে বুকে বল আনি।হয়  আজ নয় আর কখনো নয় এমন পাহাড়ি পথ ধরে আসি যাই। মন কখনো মেঘল তো কখনো ফুরফুরে মেজাজে বাড়ি থেকে ৫০কিলোমিটার দূর এক রিয়াং জনজাতি অধ্যশিত পাড়া। এখানে বৃক্ষরাম চৌধুরী নামে এক সামাজিক আউলবাউল মানুষ বহু আগেই শিক্ষার আলোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পেরে জমি দিয়েছিলেন। উনার স্মরণেই স্কুলটি ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়া নামে।
আমি এই বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়ায় আসি।
এ এক পরম সৌভাগ্য আমার। এখানে আসি বলে অক্সিজেন পাই।সরল মানুষের ভালোবাসা আশীর্বাদ আকুলভাবে পাই।
বারোখানা হাঁড় না হয় এই শরীর থেকে ডিসপ্লেজ হয়ে গেলো। তাতে কি।তবুও তো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এক সহজসুন্দর সরল মানুষের কাছে আসি।আকুপাকু করি কখন পৌঁছাতে পারবো।
যখন ছুটি হয় মনে হয় থেকে যাই।এই সরলতার কাছে।
শহুরে জটিলতায় আর পারি না।
টিলায় টিলায় টং ঘরে কত সহজ সরল মানুষের বসবাস।কত আপন করে কাছে টেনে নেয় তারা।এই সরলতা বেঁচে থাক।
আমার না হয় হাঁড় চলে যায় যাক না।

ভুলুকুমার দেববর্মা আমার বন্ধু ও সহকর্মী 

সহকর্মী ভুলুকুমার দেববর্মার সাথে আমার আজন্ম বন্ধুত্ব অটুট থাকবে।এই বিশ্বাস রাখি। আমি সারাক্ষণ মনে রাখবো আপনার মনন ও সহজ সারল্য। একজন বন্ধু হিসেবে আমি ততোদিন তা-ই খুঁজতাম।
প্রথম দিনই বুঝেছিলাম আপনি অনেক গভীর আত্মমগ্ন এক স্বপ্ন পুরুষ। আপনার মননে লালিত সময়ের সহজাত ঔদার্যবোধ। নমনীয়তা  অথচ ভেঙে না পড়ার সংকল্প। সেদিন শুধু লক্ষ্য করেছিলাম।বলিনি কিছু। কিন্তু বুঝেছিলাম আপনার মধ্যে ঘুমন্ত অতীত। ঘুম ভাঙ্গানো গান আপনার ভেতর সদা জাগ্রত। কর্ম উদ্যোম ও ককবরকভাষী হয়েও বাংলা ভাষাকে আপনি সঠিক রপ্ত করেছেন।
ধীরে ধীরে আমার মনের গভীর স্বপ্নগুলো আপনাকে ট্রান্সফার করে জাগিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি যা চেয়েছিলাম।
আমরা রিয়াং অধ্যষিত একটি অঞ্চলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে শুরু করি। তাঁদের জীবন যাপন তাদের কষ্ট শ্রম জীবনের আনন্দ শ্রম সব-ই কাছ থেকে উপলব্ধি করতে করতে এগুলো লিপিবদ্ধ করতে শুরু করলাম।
আমি পেরেছি আপনাকে স্বপ্ন দেখাতে।আমার বুকের ভেতর থেকে স্বপ্নগুলো আপনার বুকের ভেতর উড়াল দিয়ে বাসা বাঁধতে শুরু করলো।২০২২ সালের অক্টোবর মাসে রূপ পেলো খুমতিয়া লিটল ম্যাগাজিন। রিয়াং ককবরক ও বাংলা ত্রি-ভাষার লিটল ম্যাগাজিন খুমতিয়ার জন্ম হয়।এ বছর নামটি খুমতৈয়া করা হয়।রিয়াং ব্রু ভাষায় খুমতিয়াকে খুমতৈয়া বলে সেজন্য নাম পরিবর্তন করা হলো।ভুলুকুমার দেববর্মা আপাদমস্তক একজন সৎসচ্ছ ও বন্ধুবৎসল মানুষ। তাঁকে কাছে পেয়ে আমার ক্লান্তি হতাশা কঠিন সময় থেকে উত্তরণের প্রেরণা নিতাম।নিজের ক্লান্তি দূর হয়ে যেতে মানুষটি কাছে এলেই। 
কর্ম জীবনে এরকম সৎ সজ্জন কর্মনপুরুষ এবং স্বপ্নকে বুকে পুষতে পারা লোককে সহকর্মী পাওয়া সৌভাগ্যের বিষয়। 
সেই নিরিখে আজ আমার সহকর্মী থেকে বিদায় নেওয়া এক গভীর বেদনার বিষয়। আমি সে ব্যথা বুকে চেপে তাঁকে নিয়ে খুমতৈয়া বিদ্যালয়  পরিদর্শক অফিসে চলে আসার পথে মনুনদীর ব্যারেজে সেলফি ও নানা আঙ্গিকে ফ্রেমবন্দী হই।

KHUMTOIYA:খুমতৈয়া:খুমতিয়া
(মূলত কাউব্রু ভাষার একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রয়াস:ত্রি-ভাষিক সাহিত্য পত্রিকা


আমার সংখ্যা পরিচয়:ত্রিপুরার ভাষা নানা ভাষা


সংখ্যা  -বানান -রিয়াং ভাষা -ককবরক ভাষা
১           এক    কেহা              কাইসা
২           দুই      কেনই            কাইনই
৩           তিন    কেথাম           কাইখাম
৪           চার     কেব্রই            কাইব্রই
৫           পাঁচ     কেবা             কাইবা
৬           ছয়      কেদক            কাইদ
৭           সাত     কেসনি           কাইচনি
৮           আট     কেচাক           কাইচাইক
৯           নয়      কেসকু             কাইচকু
১০         দশ     কেচি                কাইচি


খুমতিয়া প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়

কাউব্রু ভাষায় ত্রিপুরায় প্রথম লিটল ম্যাগাজিন খুমতিয়া।
তিপ্রাসাদের একটি জনপ্রিয় ফুলের নাম খুমতৈয়া । এই ফুল যখনই ফোটে তখন কর্মপিপাসু সব নারী পুরুষের মন নেচে উঠে আনন্দে কর্মে ব্যস্ততা থাকার তাগিদে । অঞ্চল ভেদে এই ফুলটি কোথাও খুমতয়া কোথাওবা খুমতায়া আবার কোথাও  কোথাও খুমতিয়া নামেও পরিচিত। সাধারণত বসন্তের শেষে অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিকে খুমতৈয়া ফুল ফোটে । মাটির নীচে থাকা খুমতৈয়ার বীজ  থেকে প্রথমে বৃন্ত কলি  মাটি ভেদ করে অঙ্কুরিত হয়, এর কয়েকদিন পর পাপরি গুলি খুলে বড় হয়। শেষে ফুলের পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়। ফুলের রং সাদা মাঝে হাল্কা বেগুনী মিশ্ৰিত । ফুল ফোটার পর্বের পরে পত্র বের হয়। প্রথমে স্রোত প্রকাশনার কর্ণধার কবি তথা শিক্ষক গোবিন্দ ধর ও পরে আমি খুমতয়া বিদ্যালয় পরিদর্শকাধীন বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়া এস  বি স্কুলে যোগদান করার পর খুমতৈয়া শব্দ নিয়ে আমরা দুজনার মধ্যে প্রায় আলোচনা হত। সংখ্যায় গরিষ্ঠ স্থানীয় রিয়াংদের কৃষ্টি সংস্কৃতি ও ভাষা ( কাউব্রু) শেখার অধীর আগ্রহ ধীরে ধীরে একটা ত্রিভাষিক ( ককবরক আর কাউব্রু এর পাশাপাশি বাংলা ) লিটল ম্যাগাজিন চালু করার স্বপ্ন জাগ্রত হয় আমাদের মনে । সেই ইচ্ছায় আজ পূরণ হল । প্রকাশ হলো ত্রিভাষিক লিটল ম্যাগাজিন 'খুমতৈয়া' ।

ভুলুকুমার দেববর্মার প্রতিক্রিয়া 

গত ০৮:১১:২০২৩ তারিখের Diriectorate of Elementary Education এর এক মেমো অনুসারে new place of posting পেয়েছেন HM primary ( adhoc basis ) হিসাবে । আগামীকাল অর্থাৎ ১১:১১:২০২৩ তারিখ নতুন কর্মস্থল কুমারঘাট বিদ্যালয় পরিদর্শকাধীন গজেন্দ্র কুমার অমূল্যবালা জে বি স্কুলে জয়েন করবেন।  তাই বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়া এস বি স্কুলে আজ ছিল সতীর্থ গোবিন্দ দা'র শেষ কর্তব্যের দিন। তিনি একেধারে শিক্ষক আর তার পাশাপাশি স্রোত প্রকাশনার কর্ণধার আর কবি ও বাচিক শিল্পীও ।  

২০২০ সালের অক্টোবর মাসের ২০ তারিখে এই বৃক্ষরাম স্কুলে তিনি যোগদান করেন । এর পরের বছর আমি । আমার যোগদানের পর থেকেই দুজনের মধ্যে গড়ে উঠে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব । তারপরেই লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে আলোচনা । যেমন আলোচনা তেমনি লেখালেখিও । শেষে খুমতয়া লিটল ম্যাগাজিনের প্রকাশনা নিয়ে পরিকল্পনা ও পরিশেষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন । এভাবেই দুজনের প্রচেষ্টার ফলে খুমতয়ার প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশ করা সম্ভব হল।
রিয়াংদের  জনজীবন বিষয়ক  ত্রিভাষিক  লিটল ম্যাগাজিন  উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির সময়ে হঠাৎ উনার মত সতীর্থ তথা কবি বাচিক শিল্পী আমার  সান্নিধ্য থেকে  নতুন পোস্টিংএ অন্যত্র চলে যাওয়ায় মনে হল যেন খুমতয়া ফুলের একটা পাপরি ঝরে পরে গেল । কিন্তু এটাও যে কর্মজীবনের এক নিয়ম  মেনে নিতেই হবে । 

আজ  স্কুলে আসার সময়েই munch চকোলেট কিনে নিয়ে আসলেন আমাদের  প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের জন্য । হয়ত শেষের দিন বলে তাদের মিষ্টি মুখ মিষ্টি হাসিতে বিদায় পাবার আশায় । হলোও তাই।  সবাই হাসিখুশিতে ফটো সেসানে সামিল হল । তারপর ঠিক হল আর একদুন ছোট একটা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিদায় সংবর্ধনা জানানো হবে । 
              যাই হোক সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা হলেও আমি সঙ্গ দিলাম 82 mile পর্যন্ত।  মনটাও একেবারেই চাইছিল না স্কুলের সামনেই বিপ্রতীপ পথ ধরি। তারপর মনু মিডিয়াম ইরিগেশন প্রজেক্ট এর উপর দাড়িয়ে একটি সেলফি তুললাম। স্মৃতি হিসাবেই  সংরক্ষিত থাকুক ফেসবুকের টাইমলাইনে । জানি না এরপর আবার কোথায় কবে দেখা হবে কিংবা আর দেখা হবে কিনা।

আমার বক্তব্য 

ভুলুকুমার দেববর্মা আপনি আমার হৃদয়ের কপাট ডিঙিয়ে মনিকোঠায় বন্দী হয়ে গেছেন।বিশ্বাস রাখি আমাদের আগামী জীবনের সম্পূর্ণ সময় দূরে থাকলেও পরস্পরের আকাশ ছুঁয়ে থাকবো।

নেপালটিলা দার্লং বস্তীতে খ্রীষ্টধর্মের চার্চ

নেপালটিলা দার্লং বস্তীতে খ্রীষ্টধর্মের চার্চটি।আমার স্কুলের পথে এমন মনোরম এই দৃশ্য চোখ জুড়ায়।মন আনন্দে নেচে ওঠে।যদিও এ বাড়িটি আমাকে মুগ্ধ করে। কিন্তু ইহজীবনে জানি এমন বাড়ি বানানোর সাধ্য আমার হবে না।আমি কুমারঘাট থেকে বাইক চালিয়ে প্রায় পাঁচ বছর এই পথ ধরে আসি যাই।কি সুন্দর এই উপাসনালয়।মানুষের মনেও যদি এমন সুন্দর মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরে উঠতো তাহলে আমরা আরো সুন্দর পৃথিবীতে বিশ্ব-উষ্ণায়নের থাবা থেকে সমস্ত অন্ধকার দূর করে পরস্পর পরস্পরের নিকট নতজানু হয়ে কাটিয়ে দিতে পারতাম পরের জন্য। নিজের জন্যেও নিজেকেও আরো সুন্দর মূহুর্তের কাছে পৌঁছে দিতে পারতাম।কিন্তু মানুষ উপাসনালয় যত সুন্দর করে তৈরি করেন ততো সুন্দর মনকে করতে পারেন না। সে জন্য মণিপুরে মায়েরা মানুষেরা এবং পৃথিবীর সর্বত্র এত হিংসা বিদ্বেষ আদৌ থাকতো না।
শুধু আশায় আশায় বুক বেঁধে রাখি। একদিন মানুষ আরো মানুষ হবে।ধর্ম নয় জাত নয় মানুষ তখন মানুষ হয়ে উঠবে।মানুষের মানুষ হয়ে ওঠায় উচ্ছ্বসিত হবো মৃত আমি।


হারাধন বৈরাগীর লেখায় ডেম ছড়া

এমন একটা সময় চলছিল, কারোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করত না,আড্ডা দিতে ইচ্ছে করত না, ফোন ধরতেও ইচ্ছে করত না।মনে হত মানুষ থেকে দূরে থাকি।

এমন সময়ে বিগত২৩/০৮/২০২২ মঙ্গলবার-সহসা কবি গোবিন্দ ধরের ফোন ধরলাম। এতদিন সে ফোন করলেও আমি ফোন তুলিনি।ফোন তুলতেই গোবিন্দ মিনমিনে স্বরে বলল,-আগামী শুক্রবার আমার কর্মস্থল বৃক্ষরামপাড়ায় একটা আড্ডা হবে,আসবেন আপনি।আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বললাম-আচ্ছা।তারপর
"সকলে ওদিক থেকে চলে আসবে",বলেই গোবিন্দ ফোন রেখে দিল।আমি ভাবলাম ওদিক থেকে নিশ্চ‌ই কুমারঘাটের কবিরা আসবেন।

২৫/০৮/২২ রাতে গোবিন্দ আবারও টেলিফোন করল, আগামীকাল সাতটায় বৃক্ষরামপাড়া পৌঁছতে হবে।আমি কোনকিছু চিন্তা না করেই বললাম আচ্ছা।পড়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম এত ভোরে মনুমনপুই দিয়ে যাবো নাকি কুমারঘাট হয়ে। মনুমনপুই রোড আমার মুখস্ত,একদা গন্ডাতৈসা চাকরির সুবাদে এই পথে দীর্ঘদিন আসাযাওয়া করেছি।এই পথ খুবই নির্জন,শাখানপাহাড় ভেদ করে চলে গেছে মনু।কিছু স্থানে মনুষ্যবসতি নেই।এখন অনেকদিন হল,এই পথ ব্যবহার করিনি বলে কেনজানি ভয়ভয় করে।

গোবিন্দের কর্মস্থল বৃক্ষরামপাড়া যেতে গেলে আমার অনুমান মতো তিনটি পথ আছে।একটি কুমারঘাট ফটিকরায় কাঞ্চনবাড়ি রাতাছড়া হয়ে,আরেকটি কুমারঘাট বিরাশিমাইল মনুব্যারেজ নেপালটিলা কাঠালছড়া হয়ে,অপরটি মনু জামিরছড়া ধূমাছড়া হয়ে।ভাবলাম মনুমুনপুই হয়ে গেলে মনু থেকে যেতে হবে,আর কুমারঘাট হয়ে গেলে বিরাশিমাইল বা কাঞ্চনবাড়ি ধরে গেলেই হবে। কিন্তু আমার কেনজানি বিরাশিমাইলের পথটি‌ই সহজ মনে হল।এ ছিল আমার অনুমান মাত্র, কেননা কোনো পথেই যাইনি কখনো বৃক্ষরামপাড়া ।মনে মনে ভাবলাম এতো ভোরে মনুমনপুইর নির্জন পথ ছেড়ে কুমারঘাট হয়েই যাবো।

চিন্তায় চিন্তায় ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন র‌ওনা করলাম ভোর ছয়টায়।বৃক্ষরামপাড়া নেপালটিলার ডেমছড়া এডিসি ভিলেজে অবস্থিত।নেপালটিলার রামাঙ্গাকা ডারলং আমার বন্ধু।অনেকবার  বলেছে আমাকে তার বাড়িতে যেতে। গোবিন্দ বলেছিল তাদের সাথে রামাঙ্গাকাও থাকবে।আমি যেন ওকে ফোন করি। আমি ফোন না করলে নাকি রামাঙ্গাকা যাবে না।সে নাকি বলেছে,বন্ধু আসবেন, তিনি আমাকে না বললে আমি এই আড্ডায় আসবো না।রামাঙ্গাকা এরকম‌ই।সে যেমন আবেগপ্রবণ ও অভিমানী, তেমনি বিনয়ী এবং ভদ্র।

২৬/৮/২২,ভোরবেলা ৬টা নাগাদ কাঞ্চনপুর পেঁচারতল সড়ক পথে কাঞ্চনছড়ার একটা নিরিবিলি স্থানে গিয়ে রামাঙ্গাকাকে ফোন করতে‌ই ঘুমজড়ানো চোখে ধরল। বললাম-মর্নিং।এখন কি ঘুমে ছিলেন?বলল,হ্যাঁ।কাল ঘুম হয়নি।আমার জ্ঞাতি মারা গেছে।আমি যেন ঝাঁকুনি খেলাম।।তবে তো রামাঙ্গাকা যেতে পারবে না।প্রোগ্রাম কি তবে ক্যানসেল হবে?কেনজানি সেদিন মনে হয়েছিল রামাঙ্গাকা এই আড্ডার মধ্যমনি।আমি বললাম গোবিন্দের সাথে কি এই নিয়ে কথা হয়েছে?ওর কথা মতো আমি তো র‌ওয়ানা করে ফেলেছি।এখন কি হবে।সে বলল, অসুবিধা নেই।সকাল এগারোটায় শ্মশান শেষ করে আমি আপনাদের সাথে যোগ দেবো।আমি হাঠৎ করে রামাঙ্গাকাকে বললাম। আচ্ছা আমি যদি শ্মশানে আসি,তবে তা কি ভিডিও করতে পারবো?রামাঙ্গাকা বলল, প্রেসিডেন্ট কে জিজ্ঞেস করতে হবে। তিনি পার্মিশন দিলেই সম্ভব। ঠিক আছে ,জিজ্ঞেস করে আমাকে জানাইও,বলে ফোন রেখে দিলাম।তারপর গোবিন্দকে ফোন করলাম।রামাঙ্গাকার কথা বললাম,শ্মশান করে কি আড্ডা করা সম্ভব?গোবিন্দ বলল,প্রোগ্রাম ক্যানসেল হবে না।এটা নির্ধারিত। আপনি আসুন।আমি বললাম,র‌ওয়ানা করেছি কোন দিকে আসবো।মনুমনপুই নাকি কুমারঘাট? গোবিন্দ বলল,কুমারঘাটে আসুন।আমি অপেক্ষা করবো।আমি বললাম একঘন্টা লাগবে।বলল,আসুন। অবশেষে কুমারঘাট-কৈলাশহররোডের ট্রাইজংশনে  এসে গোবিন্দকে ফোন দিতেই সে ছুটে এলো।দুজন ছুটে ছলেছি বাইকে বিরাশীমাইলের দিকে। গোবিন্দ আগে আমি পেছনে।বিরাশীমাইল থেকে মনুব্যারেজের পথে যেতে যেতে গোবিন্দ অষুধ কিনলো ফার্মেসী থেকে।সম্ভবত প্রেসারের টেবলেট।মনুব্যারেজে এসে,ব্যারেজের উপরে উঠলাম কষ্ট করে।ব্যারেজের উপর যথেষ্ট প্রসস্ত পাটাতন। কিন্তু গোবিন্দ অসম্ভব ভয় পায়।ভয়ে ভয়ে দাঁড়ালো। দুজনে ছবি তুললাম।কি যে অপরূপ শোভা নদীর।ব্যারেজের নিচ দিয়ে পাক খেয়ে খেয়ে নামছে নদীর জল।এখানে নদীর গভীরতা বেশ মনে হল।দেওলা ডহর।পিলে চমকায়।উপরের দিকে একপাশে খোলা বিস্তীর্ণ হাওর ,নীচের দিকে খানিকটা বাঁক নেওয়া টিলা ও গুরুগম্ভীর জঙ্গল।মনে হল শিবের আবাসস্থল ।কাছে‌ই তার প্রেয়সী মনু নাম্নী নারী।এই নারী যেন মহাদেবের ধ্যান ভাঙতে নৃত্যরতা।

ব্যারেজ পেরিয়ে‌ই অচেনা পথ।বেশ বড় হাওর।ধানজমি।বা-পাশে বিশাল পাওয়ার হাউস। কিছুদূর এগিয়ে‌ই পেছানো রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম চড়াই উতরাই ভেঙে,দুপাশের সাজানো সবুজ টিলা ছড়া ঘরবাড়ি পেছনে ফেলে।কোথাও যেতে গেলেই আমার বুকটা কুইকুই করে।ওই স্থানের ইতিহাসের সাথে শ্বাস নিতে ইচ্ছে করে।এ আমার প্রাণের সাথে লেপা।মনে মনে ভাবতে লাগলাম,অবিভক্ত উত্তরত্রিপুরার শরীরে  লুকিয়ে আছে ইতিহাসের অনেক রোমহর্ষক কাহিনী ।আমার কেন জানি ইতিহাসের সাথে কাঁদতে ইচ্ছে করে,হাসতে ইচ্ছে করে।মরে যেতে ইচ্ছে করে, বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে , ইচ্ছে করে ধুলো মাখতে।যেতে যেতে ইতিহাস হাতরাতে থাকি।কার্পেট বিছানো পথ।একটা বর্ধিষ্ণু জনপদের মাঝ দিয়ে চড়াই উতরাই বাঁক পেরিয়ে যাচ্ছি।চোখ দিয়ে গিলে চলেছি দুপাশের জঙ্গল , ঘরবাড়ি ও বনপথের সৌন্দর্য।একটা মেদীটিলার উপর এলপ্যাটার্ণ বাজারে আসতেই লেখা দেখলাম নেপালটিলা।জনজাতী গরিষ্ঠ বাজার।মোঙ্গলীয় নরনারীদের ছড়াছড়ি।এল ঘুরে বায়ে কিছু এগোতেই খুব সুন্দর দুটি চার্চ নজড়ে এলো।নেপালটিলা কুকিজাতি গরিষ্ঠ(ডারলং) জনপদ।প্রাচীনকাল থেকেই  রাজন্যত্রিপুরার উত্তরপূর্বাঞ্চলে কুকিজাতির মুক্তাঞ্চল ছিল।এই অঞ্চলের হালাম কুকি ডারলং কল‌ই এরা প্রকারান্তরে দুধর্ষ কুকিজাতীর‌ই বংশধর। অবিভক্ত উত্তরত্রিপুরার শেরমুন দারচ‌ই দেওছড়া দেওরা,চিনিবাগান নেপালটিলা সাইকার জামতুম কুকিছড়া এই সব অঞ্চলে সুদূর অতীত থেকেই তাদের বসবাস।আগে না গেলেও নেপালটিলা যে লংতরাইর পাদদেশে তা  অনুমান করতে পেরেছিলাম।নেপালটিলা পেরিয়ে একটি ফাড়ি পথে গোবিন্দ ছুটে চলল। কিছুদূর যেতেই নজরে এলো কাঁঠালছড়া হলিক্রস এইচ এস স্কুল। খুব সুন্দর স্কুলের রাজকীয় পরিবেশ।স্কুলের চারপাশে বিবিধ গাছগাছালির বাগিচা।হোস্টেল,চার্চ। ছাত্রছাত্রীদের কলরব।মুখরিত পরিবেশ।তারপর একটি টিলার উপর দিয়ে বাঁক নিয়ে জঙ্গলের গভীরের দিকে ছুটে চললাম আমরা।বেশখানিকটাএগোতেই বুঝতে পারলাম রাজকীয় পরিবেশ ছেড়ে ধীরে ধীরে তপোবনে প্রবেশ করছি।আর কয়েকটা বাঁক পেরোতেই নজরে এলো বৃক্ষরামপাড়া প্রাইমারী স্কুল।স্কুল লাগোয়া ছোট্ট একটি বাজার।গোটা কয়েক দোকান ঘর।জাপানজয় রিয়াঙের চাস্টলে নিয়ে গেল গোবিন্দ।জাপান গোবিন্দের বন্ধু।খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে এখানে। জিজ্ঞেস করলাম কারা আসবে এখানে। কোথায় যাবো আমরা। গোবিন্দ বলল তার স্টাফ আসবে।সামনে কালাপাহাড়ের( লংতরাই)কাছে নাকি একটা সুন্দর জায়গা আছে। ওখানেই ওরা নিয়ে যাবে। জিজ্ঞেস করলাম জায়গাটির নাম কী। গোবিন্দ বলল,সে বলতে পারবে না,ওরা জানে।জাপানজয় আমাদের জন্য চা বানাতে বানাতে বলল,হাফংরাজা।নামটা শুনতেই লাফিয়ে উঠলাম।বাঃ হাফংরাজা।নাম শুনেছি।ওখানে নাকি ট্রেকিং করে লংতরাইর উপরে উঠতে হয়।আমি জাপানজয়কে জিজ্ঞেস করলাম,হাফংরাজা নিয়ে কিছু বলো।জাপানজয় আমতা আমতা করে কিছু বলল।তেমন কিছু বুঝলাম না।এইতিমধ্যে গোবিন্দের স্টাফ এসে আমাদের ডেকে নিলো স্কুলের অফিসে।আজ স্কুল সাংগ্রমা পূজার জন্য বন্ধ।তবে শিক্ষক অশিক্ষের ছুটি নেই। তাঁরা খাতায় স‌ই করল।তারপর রুম থেকে বেরিয়ে একে একে আমার সাথে পরিচয় দিল।অবশেষে আমরা বাইকে করে র‌ওয়ানা করলাম  আমাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।যেতে যেতে মনে হল এই স্থানের উত্তরে  অদূরবর্তী রাতাছড়া একটি ইতিহাস জড়িত মায়াজগত। আমার মনে পড়ে গেল পান্নালাল রায়ের লেখা 'রাজমালার ত্রিপুরা' গ্রন্থে পড়া সেই ভাগ্যবিড়ম্ভত রাজা অমরমানিক্যের কথা।১৫৭৭ এ অমরমানিক্য বসেন ত্রিপুরার সিংহাসনে রক্তক্ষয়ের মাধ্যমে সেনাপতি গোপিপ্রসাদের বংশের অবসান করে।প্রথম দিকে উপুর্যপরি যুদ্ধে জয় লাভ করলেও,ভুলুয়া বিজয়ের পর জেষ্ঠপুত্রের অকালমৃত্যু, অসুস্থ মহারাজের আরোগ্যলাভে সোয়াশ শিশুকে বলি প্রদানের গুজব এবং বহিঃশত্রুর আক্রমন ,এইসব নিয়ে ব্যতিব্যস্ত রাজা অমরমানিক্য সুরক্ষার নিমিত্ত উদয়পুর থেকে উত্তরপূর্বে কিছুটা দূরে বর্তমান অমরপুরে রাজধানী স্থানান্তর করেছিলেন।অতপর আরাকানের মগরাজার সাথে টানা যুদ্ধবিগ্রহ ও পরাজয়,কনিষ্ঠপুত্র যুঝারের মৃত্যু,(রবীন্দ্রনাথের মুকুট নাটকে উল্লেখ আছে),আরাকানবাহিনীর ত্রিপুরবাহিনীর পশ্চাদানুসরণ,তারপর আত্মরক্ষার্থে অমরমানিক্যে সপরিবারে বিশ্বস্ত পার্শ্বদবর্গ নিয়ে এক অনির্দিষ্ট পথে রাজধানী ত্যাগ ।তখন চৈত্র শেষ হয়ে এসেছিল।জুমপোড়ানোর কাজ‌ও প্রায় শেষ।জুমে বীজবপনের পালা ।দূরে দূরে টিলায় টংঘর।সপার্ষদরাজা ছুটে চলেছেন পাহাড় টিলা লুঙ্গা মারিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে।রাজা গোমতীর তীর ধরে ডুঙ্গুরের পথে রাইমা-সাইমা-ভ্যালির ধরে উজিয়ে রাইমার উৎসস্থল খুমপুইস্থলে আসলেন।খুমপুইর সুবাস এসে লাগলো রাজার নাকে।।তারপর সন্নিকটস্থ ভগীরথপাড়ায় এসে তাদের পা আর চলে না।রাজধর আহত।রাণীমা অবসন্ন হয়ে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে।রাজার‌ও পা চলছে না।কুমারগণ বসে পড়লেন মাটিতে । আশ্রয় চাইলেন প্রজাদের কাছে।প্রজারা প্রথমে না চিনে ভয়ে জড়সড়।পরে বুঝতে পেরে সপারিষদ রাজাকে আশ্রয় দান করল তারা। পরদিন আবার যাত্রা শুরু। পাহাড়িপথ টিলা লুঙ্গা ছড়া পাহাড় অতিক্রম করে এক নদীর তীরে এলেন তারা।নদীর নাম মনু।মনটা চনমন করে উঠলো।এই নদীতীরেই ছাম্বুলনগরে তাদের পূর্ব পুরুষ রাজা বিমারের পুত্র কুমার শিব আরাধনা করেছিলেন।ছাম্বুলনগরে একদা তাদের রাজ্যপাট‌ও ছিল।মনুর জল স্পর্শ করে প্রণাম করলেন রাজা।তারপর ভাটির দিকে রওনা করলেন কয়েকটি ভেলায় করে ।একটি জায়গায় এসে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা হল। মনুনদীর তীর বরাবর পশ্চিম পারে অপূর্ব কুহকময় পাহাড়ঘেরা উপত্যকা। উপত্যকায় অসংখ্য বন্য মোরগের বাস।টিলার উপরে দূরে দূরে পাহাড়িদের পাড়া।রাজার মনে হল
জায়গাটা পাহাড়ঘেরা হ‌ওয়ায় নিরাপদ।শত্রু এতদূর এসে এখানে আক্রমন করতে পারবে না।থেমে গেলেন রাজা। শলাপরামর্শ হল। এখানেই স্থাপন করলেন অস্থায়ীরাজ্যপাঠ। কিছুদিন যেতে না যেতেই আবারো একটি বিপদের গন্ধ পেলেন রাজা।খবর পেলেন তার বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের পাহাড়ী কুকি সর্দারদের নিয়ে একটি কুকি রাজ্য স্থাপনের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে তার শ্যালক সুদক্ষ সেনাপতি ছত্রাজিৎ।এর প্রমান‌ও পেলেন।এখানে অস্থায়ীরাজ্যপাঠ স্থাপনের পরপর‌ই খাওয়া নেই নাওয়া নেই ছত্রাজিৎ কুকিপাড়ায় ভনভন করে ঘুরছে।রাজা অমরমানিক্য একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন,ভাগ্যের এমন‌ই পরিহাস যে শেষপর্যন্ত নিজের শ্যালক ছত্রাজিৎ‌ও তাকে হঠিয়ে রাজা হতে চায়! রাজা অধর্য্য হয়ে রাণীকে খুলে বললেন সবকথা।রাণীও অধর্য্য হয়ে বললেন ছত্রাজিৎকে প্রাণদণ্ড দাও।ছত্রাজিৎ পাহাড় থেকে দিন কয়েক পড়ে নেমে আসতেই তাকে বন্ধী করলেন রাজা।বিস্মিত ছত্রাজিৎ  মানসিক ভাবে চরম আহত হল।কী তার দোষ।দুঃখে সে বাকহীন।নিজের উপর‌ই চরম অভিমান এলো।কিছুই বলল না সে। অবশেষে একদিন ভোরবেলা ছত্রাজিৎকে  নিয়ে আসা হল মনুনদীর তীরে।স্নান করানো হল।তারপর পিচমোড়া করে বেঁধে ধরলো কয়েকজন।আর চন্তাই মন্ত্রপাঠ করতেই ঝলসে উঠলো ঘাতকের খর্গ।একটি পাখি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে যেন উড়ে গেল মহাশূন্যের দিকে।রাণী কন্নায় ভেঙে পড়লেন।রাজার মনে শান্তি নেই।একে একে সব হারালেন।হারিয়েছেন পুত্রকে,এবার শ্যালকেও।কে জানে কপালে আর কি আছে।রাজার ঘুম হয় না।নিজের ভাগ্যে আর কি আছে ভাবেন বিষণ্ন হৃদয়ে। কয়েকদিন কেটে যায়। একদিন একদল কুকি সর্দার আসে রাজার কাছে।এসে খুঁজে ছত্রাজিৎকে।রাজাকে বলে এবার মহারাজের আদেশ পেলে‌ই উদয়পুর পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে পূর্ব প্রান্তের সকল কুকিসর্দাররা ঝাঁপিয়ে পড়বে।ছত্রাজিত‌ই পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে সকলকে রাজি করিয়েছে।আজ তার অনুরোধেই রাজার কাছে এসেছে তারা।একথা শুনে রাজার মাথায় যেন বজ্রাঘাত হয়।হায় হায় করতে লাগলেন তিনি।নিজের মাথায় নিজে আঘাত করে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন।ছুটে গেলেন রাণীর কাছে।একি করেছেন তিনি।অনেক সন্ধান করেও ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে পেলেন না রাজা। তিনি বিষণ্নতায় ডুবে গেলেন।রাজ্যেও আকাশ থেকে তারা খসে পড়ার মতো অমঙ্গলের চিহ্ন দেখতে পায় প্রজাগণ।আফিং সেবন বাড়িয়ে দিলেন রাজা।আষাড় মাস।নদী জলে ট‌ইটুম্বুর।একদিন  রাজা মনুনদীতে নৌকোয় প্রমোদভ্রমনে গেলেন।আর সেদিন‌ই রাজা নৌকোতেই মহানিদ্রায় ঢলে পড়লেন।।রাজার হাতের কাছে পাওয়া গেল আফিমের কৌটো। অবশেষে রাজার দেহ মনুনদীর তীরে পঞ্চভুতে বিলীন হয়ে গেল।সহমৃতা হলেন রানী অমরাবতীও।তারপর কুমার রাজধরকে রাতাছড়ার জলে নৌকো ভাসিয়ে অভিষিক্ত করা হল ত্রিপুর সিংহাসনে।

কত ঘটণার সাক্ষী এই জনপদ।এই পথেই তো শেরমুন পাহাড় থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিপ্লবী শরদিন্দু দত্ত ১৯৫০এ এই অঞ্চলের কুকিদের দলবদ্ধ করে কমলপুর মুসলিম বিতাড়নের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।ভাগ্যবিরম্বিত শরদিন্দু চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের পর স্ত্রী ও একমাত্র পুত্রকে মুসলীম দাঙ্গাকারীদের হাতে হারিয়েছিল। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের সংস্পর্শে আসা শরদিন্দকে অবশেষে ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিতে শিলংএ আত্মগোপন করতে হয়েছিল । কপালের লিখন,সেখানে‌ই দেখা হয়েছিল শেরমুনের অসম্ভব প্রতাপশালী কুকিসর্দার লাংডিঙ্গার বোন লালরেমির সাথে।প্রথম দেখাতেই সুদর্শন যুবক শরদিন্দুর প্রেমে পড়ে যায় লালরেমি।আর লালরেমি তাকে নিয়ে আসে শেরমুন পাহাড়ে। দুধর্ষ কুকি সর্দার লালডিঙ্গার মন‌ও জয় করে নিয়েছিল শরদিন্দু।আর তিনি নিযুক্ত হন লালডিংগার প্রধান পরামর্শদাতা ।যার পরিচিতি হয় লালডিংগার মন্ত্রী হিসেবে।আর তিনি কুকিদের সংঘটিত করে অভিযান করেছিলেন কমলপুর থেকে মুসলিম বিতাড়নে।সফল‌ও হয়েছিলেন। কিন্তু কমলপুর বিভাগের তৎকালীন কংগ্রেসের বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের চাপে অনিচ্ছা সত্বেও অভিযান অর্ধসমাপ্ত রেখেই ফিরে আসতে হয়েছিল তাকে।ফিরে আসার পথে পরিচয় হয়েছিল সালেমা সংলগ্ন মহারাণীতে সুদক্ষ শিকারী ও গণপরিষদের তৎকালীন নেতা  বারিন্দ্র দেববর্মার সাথে।১৯৫০ এর জুনমাস, একদিন বারীন্দ্র আমন্ত্রণ করে শরদিন্দুকে তার নিজ বাড়ি মহারাণীতে। খাওয়াদাওয়া শেষ হলে রাতে বেড়াতে বেরোলেন শরদিন্দু, মহারাণী থেকে কমলপুর আমবাসারোড ধরে সালেমার দিকে।সহসা বিশ্বাসঘাতক বারীন্দ্র পেছন থেকে গুলি করে শরদিন্দুকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি।নিজের হোলস্টার থেকে রিভলবার বার করার চেষ্টা করেও ব্যার্থ হলেন। আবারো গুলি।তখন ঝাপসা চোখে ভেসে উঠলো শুধু শেরমুন পাহাড়ে অপেক্ষারত তার প্রিয়তমা লালরেমি ও তার প্রাণপ্রিয় কন্যার মুখ।আর একটা পাখি যেন ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়ে গেল শেরমুন পাহাড়ের দিকে।

এরকম আরও কত যে ঘটনার সাক্ষী এই উপত্যকা !এই ঘা শুকাতে না শুকাতেই এই উপত্যকার ধূমাছড়ার উৎসমুখে ১৯৫৩এ জৈষ্ঠ্যমাসে ভেঙে পড়েছিল পাকিস্তানের একটি যাত্রী ও স্বর্ণবোঝাই বিমান।এই স্বর্ণের সিংহভাগ লাভ করেছিল ধূমাছড়ার কার্তিক ত্রিপুরা। দূর্ঘটনা হয়েছিল সন্ধ্যারাতে। বিমানটি যাত্রা করেছিল পাকিস্তানের করাচি থেকে ।যাত্রা করেছিল ঢাকার উদ্দেশে।দিল্লী এসে বিরতি নিয়ে ফের আকাশে উড়েছিল।যাত্রী ছিল পাইলট ও স্ক্রুসহ ছাপ্পান্ন জন।হপাকিস্থান সরকার সেই বিমানে স্বর্ণ থাকার তথ্য গোপন করেছিল।তারপর বিমানটি বিরতি নিতে চাইছিল সিলেট বিমান বন্দরে। কিন্তু ভাগ্যের এমননি পরিহাস,বিমানটি সিলেটের আকাশে আসার আগে‌ই আশিকিমি বেগে সাইক্লোন ধেয়ে এসেছিল।তখন প্রায় সন্ধ্যা নেমে এসেছে,বাতাসের ধাক্কায় বিমান চলে আসে কৈলাসহরের আকাশে।পাইলট চিন্তা করে কৈলাসহর বিমানবন্দরে নামাতে। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় বিমানবন্দরের সিগনাল নিয়ে।মশাল জ্বালিয়ে কেউ বাতাসের কারণে সিগন্যাল দিতে পারছিল না।বিমানটি আকাশে পাক খেলো তিনবার।তারপর আরেক বিপত্তি দেখাগেল তেল শর্টের সিগন্যাল।তারপর পাইলট বিমানটিকে নিয়ে যায় কমলপুর বিমানঘাঁটির দিকে। কিন্তু সেখানেও নামাতে ব্যর্থ হল।তারপর বিমান কোন দিকে গেল পাইলট আর টাহর করতে পারল না।***তারপর লংতরাই নাম্নী কালাপাহাড়ের একটি সুউচ্চ চূড়ায় ধাক্কা,আর চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে গভীর খাদে।বিকট শব্দে কেঁপে উঠে চারপাশের পাহাড়ি জনপদ। পরদিন শেষরাতে ধূমাছড়ার কার্তিক ত্রিপুরা ভোরের আলো ফুটতেই শুটকির খারাংকাঁধে ঝুঁকে ঝুঁকে যখন ধূমাছড়ার উৎসমুখে আসে তার চোখে চারপাশ থেকে আলো ঠিকরে পড়ে।সে খানিকটা ভরকে গিয়ে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করে,দেখতে পায় চারপাশে ছড়ানো ছিটানো মানুষের লাস,এলোমিনিয়ামের চোখধাঁধানো ডানার টুকরো।এথেকেই আলো ঠিকরাচ্ছে।সে ধাতস্ত হয়ে উপরের দিকে তাকায় দেখে একটি উড়না ঝুলছে্যবাশের ডগায়।নীচে থাকায়,নজরে আসে একটি পরীর লাস পড়ে আছে নীচে।সে কাছে যায় ,বুঝতে পারে পরীটি এখনও জীবিত।জল চায় পরী সে তরিঘড়ি ঝর্ণা থেকে জল নিয়ে চোখে মুখে ছিটিয়ে দেয়। পাঁজাকোলা করে এনে একটি পাথরের উপর বসে।আকারে ইঙ্গিতে পরী থাকে কিছু একটা বুঝাতে চায়।কার্তিক বুঝে কিছু একটা মূল্যবান জিনিসের কথা বলছে পরী।তারপর! কার্তিক নাকি ওকে ধর্ষণ করে।আর পরী মিলিয়ে যায় আকাশে!কার্তিক তারপর দেখতে পায় এদিক ওদিকে ছড়ানো ছিটানো সাদাকাপড়ের ছোটছোট পেকেট।পেকেট খুলে দেখতে পায় কার্বন বরণ পাথর।সে একটি পাথর পাথরে ঘষে।আর সোনালী পোকার মত রং বিচ্ছুরিত হয়।কার্তিক তারপর এগুলি খুঁজে খারাঙে ভরতে থাকে।কার্তি রায় দুই বার খারাং এ করে বাড়িতে নিয়ে রেখে তৃতীয়বার যখন আসে খবর ছড়িয়ে পড়ে পাড়া থেকে পাড়ায়।আর চারপাশ থেকে পিপিলীকার মতো আসতে থাকে মানুষ।শুরু স্বর্ণলোভী মানুষের অভিযান।এই অভিযানে সামিল হয়েছিল এমনকি ধূমাছড়া কুমারঘাট ফটিরায়ের বাঙ্গালীরাও।এই সোনার আখ্যান নিয়ে অনেক গল্প।আছে।এর থেকে সোনাকার্তিক ধূমাছড়া জামাই আদর পেতে থাকে।আর কম দামে তার কাছ থেকে লুটতে থাকে সোনা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।আর পাহাড়ে জনজাতি মানুষের বাড়িঘরে সোনা অনুসন্ধানে ছুটতে থাকে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা।এই নিয়ে কত গল্প ! শোনা যায় কারবারি বিপিন নাথের কথা।বাড়ি ধর্মনগর অফিসটিলা।উনি পাহাড় থেকে তিলকার্পাস‌ও মরিচের ব্যবসা করতেন।মরিচ কিনতে ধূমাছড়ার পাহাড়ে গেছেন।কোন এক পাহাড়ি বাড়িতে রান্না হচ্ছে তিনি উনুনের কাছে বসেছেন।নজড়ে পিড়ি তিনটি চারকোনা পাথরের।উনার জুহুরীর নজর। তিনি বললেন আমি তিনটি ইস্টক দেবো তোমাদের।রান্নার সুবিধা হবে।আর এগুলি আমি নিয়ে যাই।সরল পাহাড়ি দিয়ে দেয়। একবার নাকি এক ব্যবসায়ী টংঘরে উঠতে গিয়ে দেখে সিড়ির নীচে একটি পাথর ।বাড়ির লোক ওটিতে পা দিয়ে তারপর সিঁড়িতে চড়ে।ব্যাবসায়ী বুজতে পেরে একটি ইটের বিনিময়ে সেটি নিয়ে যায়।বিমানের ডানা বিক্রি করতো পাহাড়িরা সালেমা বাজারে ।ব্যবসায়ীরা ওজনে ঠকাতো।ধান তিল কার্পাস মরিচ ওজনের সময় একটি গোপন দড়ি টেনে ওজন কমিয়ে দিত। একদিন এক পাহাড়ির বুদ্ধি এল বাঙ্গালী ঠকাবে।সে এলোমিনিয়ামের পাতের ভেতর কিছু সোনাপাথর ঢুকিয়ে দিল।তাপর বাজারে বিক্রি করল।আনন্দে বাঙালি ঠকিয়ে সে বাড়ি ফিরে এলো।সোনাকার্তিকের বাড়িতে ঘনঘন ডাকাত পড়তো।মাটির নীচ থেকে একটি একটি করে সোনাপাথর দিয়ে সে আত্মরক্ষা করত।এমন সেদিন পুলিশ বিএসেফ ও ডাকাতি করতে আসত।এই ভাবে এই সোনা পাঞ্জাবে গিয়ে ছিল।পড়ে পাকিস্তান সরকার নাকি ভারত সরকারের কাছে সোনার জন্য অনেক অনুরোধ করেছিল ফিরিয়ে দিতে।জানা গিয়েছিল সোনার পরিমান।সোনা ছিল নাকি দুইমণ।কিন্তু যেহেতু পাকিস্তান শুরুতে তথ্য গোপন করেছিল তাই এ সোনা তাদের আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।এই কেচ্চা এত‌ই দীর্ঘ বলে শেষ করা যাবে না।

সে যাক অবশেষে সোনাই সোনা কার্তিকের  জীবনে কাল হয়েছিল।সহজ সরল সোনাকার্তিককে লুটে খেয়েছিল এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা।মানুষের জন্য দূর্গাপূজা ও লঙ্গরখানা খুলে ছিল কার্তিক।তারপর, অবশেষে শেষজীবন ভিক্ষান্নে কাটাতে হয়েছিল তাকে।এই সোনা আবার অনেকের ভাগ্য ফিরিয়ে দিয়েছিল।সে আরেক ইতিহাস।

ছাপ্পান্ন জন দুর্ভাগা মানুষের মৃত্যু হয়েছিল সেদিন।গণকবর দেওয়া হয়েছিল ধূমাছড়ার উৎসমুখে।তারপর ! আরও অবিশ্বাস্য ঘটনা,এই বিমানে নাকি ছিল পাকিস্তানের সদ্যবিবাহিত এক সেনা অফিসার।করাচির এক নবোঢ়ানারী,নিজের জীবন বিপন্ন করে করাচী থেকে আগরতলা , আগরতলা থেকে কৈলাসহর, তারপর হাতির পিঠে চড়ে ধুমাছড়া জনপদ!তারপর ধূপদীপ জ্বালিয়ে মৃত সেনানায়ক স্বামীর চিতায় কান্নায় ভেঙে পড়েছিল সারাদিন।আর এই রেওয়াজ চলেছিল দীর্ঘদিন। নির্দিষ্ট দিনে বছরের পর বছর এসে স্বামীর চিতায় প্রার্থনা করত সেই  স্বামীসোহাগিনী অসম্ভব ভালোবাসার বিরহিনী।ধূমাছড়ার মানুষ শ্রদ্ধায় তাকে ডাকত মেম সাহেবা।যখনি আসতো ,হাতির পিঠে চড়ে সেখানে যেত।তার দোচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ত জলের ধারা।এইসব ভাবতে ভাবতে হাঁটছি আর আমার বুকটা দাউদাউ করছিল।পথের ধুলায় গড়াগড়ি দিতে ইচ্ছে করছিল।জঙ্গল স্পর্শ করে প্রণাম করতে  ইচ্ছে করছিল।

ছোট্ট ত্রিপুরার বুকে অসংখ্য ছোটবড় পাহাড় ।জাম্পুইটাং,শাখানটাং,বেলকম,লংতরাই,আঠারোমূড়া,কালাঝারি,বড়মুড়া,দেবতামুড়া এদের মধ্যে অন্যতম।এইসকল পাহাড়ের শরীর থেকে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য ছোটবড় ঝর্ণা,নালা,ছড়া নদী।জল‌ই জীবন।তাই এইসব ঝিরি নালা ছড়া নদীর সান্নিধ্য বা বুকজুড়ে প্রাচীনকাল থেকে গড়ে উঠেছে  অসংখ্য ছোটবড় পাড়া গ্রাম ও জনপদ।নদীকেন্দ্রিক উপত্যকাতে সৃষ্টি হয়েছে প্রাণস্পন্দন ও প্রাণপ্রাচুর্য।নদীগুলি এই পাহাড়শ্রেণীর বুকবরাবর সৃষ্টি করেছে অসংখ্য কুহকময় উপত্যকা।লংতরাই পাহাড়ের পূর্বঢাল বরাবর একটি উল্লেখযোগ্য উপত্যকার নাম লংতরাই ভ্যালি।এই ভ্যালিকে কেন্দ্র করে অধুনা একটি মহকুমা নামাঙ্কিত করা হয়েছে।যার নাম লংতরাই ভ্যালি মহকুমা।যার হেডকুয়ার্টার ছ‌ইলেংটায় অবস্থিত।ডেমছড়া,লংতরাইভ্যালি মহকুমার একটি এডিসি ভিলেজের নাম।আসাম আগরতলা ৮নং জাতীয় সড়কের পশ্চিমে লংতরাই পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত।এর উত্তরে কাঞ্চনবাড়ি ও রাতাছড়া দক্ষিণে মনু ও ধূমাছড়া, পূর্বে কাঠালছড়া ও নেপালটিলা।

অনেক ছোট বড় জর্ণাধারা  লংতরাই পাহাড়ের বুকে তৈরি করেছে এক কুহকময় নিঝুমপুরী।এই ঝর্ণাগুলি পাহাড়ের বিচিত্র প্রজাতি উদ্ভিজকুল লতাগুল্মের বাহারীসাজে গড়ে তুলেছে ইডেনকানন।ঝর্ণাগুলির মিলিত ধারায় সৃষ্টি হয়েছে অনেক গুলি ছড়া।তন্নধ্য জামিরছড়া,  ধূমাছড়া, ডেমছড়া, কাঠালছড়া অন্যতম।এই চারটি ছড়া লংতরাইর পুর্বঢাল থেকে আঁকাবাঁকা সর্পিল পথে  মনু নদীতে পতিত হয়েছে। 

ডেমছড়া-স্থানীয় রিয়াং ভাষায় এমডেক তয়সা, মনুব্লকের অধীন একটি  এ.ডি.সি.  ভিলেজ।এই ভিলেজে বৃক্ষরাম পাড়াসহ মোট সাতটি পাড়া রয়েছে । এগুলি  হল চান্দি পাড়া, মাইচাহা পাড়া, বৃক্ষরাম পাড়া, দিলেন্দ্ররিয়াংপাড়া, গুরুদয়াল পাড়া, ফরেষ্ট কলোনি, ওয়াখারাই পাড়া। বিদ্যালয়ের সংখ্যাও এখানে সাতটি। ডেমছড়া এস বি স্কুল, ওয়াখারাই পাড়া জে বি স্কুল,  ফরেষ্ট কলোনি জে বি স্কুল, বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়া এস বি স্কুল, ফুলকুমার পাড়া জে বি স্কুল, নর্থ রতন এস বি স্কুল।

যাত্রাপথের শুরুতে‌ বৃক্ষরামপাড়া থেকে দক্ষিণদিকে কিছুপথ এগিয়ে ডানে মোড় নিয়ে একটি টিলার ঢালু খাদপথে নেমে ফের উঠে গেলাম একটি মেদিটিলার উপরে একটি রিয়াংজনজাতির বাড়িতে।এখানে নজড়ে এলো বেশকয়েকটি ছনবাঁশের ঘর।এর মাঝে একটি আদি টংঘর।টংঘরে ঝুলানো বেশ কয়েকটি বাঁশের তৈরি মোরগ রাখার খাঁচা। সেখানে সবাই বাইক রেখে হাঁটাপথে র‌ওয়ানা করলাম।এই বাড়ি থেকে পশ্চিমদিকে টিলার ঢালবরাবর নেমে গেলাম একটি লুঙ্গায় ,যেখানে পথের বাঁকে বাঁকে ধানজমি,জুম যেন থরে থরে সাজানো।তারপর আমাদের পথ একটি টিলার পেট কেঁটে ভোটাংবনের ভিতর দিয়ে সুরঙ্গের মতো হয়ে গেল।আর আমরা এগিয়ে চললাম সুরঙ্গ পথে। তারপর একটা ছড়া পার হয়ে একটি টিলার পেট ধরে এগিয়ে ফের নেমে গেলাম ছড়াতে। এখানে‌ই দেখা হল জুমধানের বস্তা কাঁধে নিয়ে ছড়া পথে ঝুঁকে ঝুঁকে নেমে আসা পণ্ডিরাম রিয়াঙের সাথে।ধানের বস্তা তার পিঠে যেন পাথরের মতো ঝুলছিল।তাকে দেখতে লাগছিল যেন পাথর মানব। আমার অবাক লাগছিল,পাথরমানবের মতো জীবন নিয়ে এরা এতো সরল হয় কি করে!এই ছড়াপথে‌ই থরে থরে সাজানো উপলখণ্ড মারিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা ল‌ংতরাইর গভীরের দিকে।ছড়ার দুধারে নির্জন ধ্যানগম্ভীর জঙ্গল,জানা অজানা বৃক্ষলতাগুল্ম।রামকলাবাগান,লাইরুপাতার বাগান।যেগুলি পাহাড়িমানুষ থালা হিসাবে ব্যাবহার করে।রামকলার থোর তাদের খুব উপাদেয় খাদ্য। একজায়গায় গিয়ে প্রচুর ঢেকিশাক পেলাম।কবি গোবিন্দ ঢেঁকিশাক কুড়াতে লাগলো মনের আনন্দে।সহসা গোবিন্দের কলিগ পাণ্ডব রিয়াং ধরে ফেললো একটি কাঁকড়া।জানতে পারলাম এই ছড়াগুলি সারাবছর পাহাড়িমানুষের আমিষখাদ্যের যোগান দেয়।কিছুদূর এগিয়ে দেখতে পেলাম একটি মাকাল ফলের গাছ।গাছ থেকে মাকালফল পড়ছে ছড়ার জলে।এটি অখাদ্য।দেখতে লাল টুকটুকে, কিন্তু মানুষ পশুপাখি নাকি কেউ খায় না।এত সুন্দর ফল কেন খায় না জানিনা।ধীরে ধীরে জঙ্গলের গভীর থেকে গভীরে ঢুকছি।কখনো হাঁটুজল,কখনো উরুজল কখনো বা ঘন্টাজল।ছড়ার দুপাশে সেঁতসেঁতে জঙ্গল,দুধারে ছড়ার দেওয়ালে পৃথিবীর আদিমতম মসফার্ণের সমাহার। বুনো গন্ধ মাদকতা ছড়াচ্ছে বাতাসে।ধীরে ধীরে পৃথিবী যেন অন্ধকার হয়ে আসছে।আমরা ঢুকে যাচ্ছি লংতরাই বাবার জটার গভীরে।তারপর ছড়া থেকে উঠে পাহাড়ের খাঁজ ধরে চড়াইউতরাই মারিয়ে কয়েকটি ছোটঝর্ণা পেরিয়ে একটি অপুর্ব ঝর্ণার মুখোমুখি হলাম।বাশের ঝাড়ে ঢাকা সুউচ্চ ঝর্ণাটি প্রথমে নজরে আসেনি। কিন্তু গোবিন্দের কলিগগণ দা দিয়ে বাঁশবেত কেটে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটি ঝর্ণা যেন আমাদের উপহার দিল।ঝর্ণাটির দৈর্ঘ্য কত বুঝার উপায় নেই।সত্যি বলতে কি ত্রিপুরায় পরিচিত যত ঝর্ণা আছে এটির মতো সুউচ্চ ঝর্ণা সেগুলি হবে না। বাঁশবনের ভেতর দিয়ে যতটুকু দেখা গেল ,মনে হল পাহাড়ের চূড়া থেকে এটি নেমে এসেছে। ইচ্ছে থাকলেও এই সময়ের মধ্যে পাহাড়ের উপরে উঠা সম্ভব নয়।তাই এর শেষ দেখা সম্ভব হল না।কুহকময় পরিবেশে মনটা একলহমায় যেন হাওয়া হয়ে গেল। চারদিকে উত্তুঙ্গ লংতরাইকে শিবের জটার মতো মনে হল। চারদিকে শানবাঁধানো বিশাল বিশাল পাথর।পাথরের ফাঁকে ফাঁকে কাকচক্ষুজল কলকল করে নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে।ঝর্ণার জলধারায় পাথরের ফাঁকে ফাঁকে বিচিত্র প্রজাতির মাছ , চিংড়ি ও কাঁকড়া বিচরণ করছে। গোবিন্দের কলিগগণ বাঁশ দিয়ে ফাঁদ তৈরী করে ধরতে লাগল কাঁকড়া চিংড়ি ও লাঠিমাছ।বেশ ধরা পড়ল।তারপর বাঁশের চোঙে রাঁধা হল মাছ ও শুটকি দিয়ে গোদক,মুরগী ও শূকরের মাংস।ভাত।চোঙের রান্না যে এতো সুস্বাদু হতে পারে টের পেলাম এই প্রথম।একটি বিশাল শানবাঁধানো পাথরের উপর বসে আমরা সবাই খেলাম।এই ক্ষণটুকু ভুলবার নয়। একমাত্র ভুক্তভোগী ছাড়া এমন পরিবেশে পিকনিক অনুভব করতে পারবে না। অবশেষে বিকেল গড়িয়ে এল।আমরা ফিরতে যাবো।সহসা একজন বন্দুকধারী দেখা গেল আমাদের একটু উপরে। গোবিন্দের কলিগগণ তাকে সরে যেতে তাদের ভাষায় কি যেন বলল।সাথে সাথে সে জঙ্গলের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।

আমরা ফিরতে লাগলাম ফের সেই জল পথে।বেশ কিছুদূর এগিয়ে আসতেই দেখা হল এক পাহাড়ি রমনীর সাথে।কুন্তিরুং রিয়াং।হাফপ্যান্ট পড়ে একটি শিশু কাঁধে ঝুলিয়ে, আরেকটি শিশু হাতে ধরে জল পথে জুমে যাচ্ছে।এই জঙ্গলপথে একা। তাঁর সাহসকে তারিফ করতেই হল।
ফিরতে ফিরতে মনে হল এই পাহাড় অরণ্যের অন্তরালে জীবন কত আদিমতা নিয়ে আজো জেগে আছে তার মতো।জেগে আছে পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে অরণ্যনারী অরণ্যপুরুষ অরণ্যের মতো।জীবন এখানে কত সহজ সরল তা সমতল থেকে অনুভব করা যায় না।মনে হল এই পাহাড়ে যদি বানপ্রস্থে কাঠাতে পারতাম তবে এই জীবন ধন্য হতো।এই ডেমছড়ার তীরে জঙ্গলের গভীরে স্থায়ী মানুষের ঠিকানা নেই।আছে কেবল জুম জুমঘর অস্থায়ী জীবনের স্পর্শ।মনে হল,আজ‌ই এখানে শেষ আসা।এই জীবনে আর কখনো আসা হবে না এখানে আর।এই বেদনা নিয়েই অবশেষে সকলের কাছে বিদায় নিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হলাম আমি ও গোবিন্দ।

জগরাই রিয়াং জনজাতি অংশের একজন প্রতিনিধি 

আমি ভুলুকুমার দেববর্মা স্কুল শেষে বেরিয়ে পড়ি একটু বিচরাই পাড়ায়।এ পাড়ার হচেন্দ্র আজ স্কুলে যায়নি।আগামীকাল ষান্মাসিক পরীক্ষা। অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের অবগত করাতেই এই ছুটাছুটি। এর মধ্যে পেয়ে যাই হচেন্দ্রের চুচু অর্থাৎ বাবার বাবা ঠাকুরদা জগরাইকে।তিনি খেয়াই অঞ্চল থেকে আজ ৬৫ বছর আগে এই পাড়ায় আসেন।মূলত জুমখেতের টানেই এখানে বসবাস শুরু করেছিলেন।জুম আর তেমন হয় না টিলার উপর। তাই বাঁশবেতের কাজ হাতে নেন।
ডেমছড়া এ ডি সি ভিলেজের অন্তর্গত বিচরাইপাড়ার জগরাই রিয়াং । আমাদের বৃক্ষরাম সিপি এস বি স্কুল থেকে সামান্য দূরে বিচরাইপাড়া।
জগরাইয়ের বয়স চৌরাশি বছর । বৃক্ষরাম সিপি এস বি স্কুলের এবারের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র হচেন্দ্র রিয়াং এর ঠাকুরদা। সুবিন্দ্র রিয়াং ও হারুংপতি রিয়াং এর আদরের সবচেয়ে ছোট সন্তান হচেন্দ্র। হারুপতি ও সুবিন্দ্র ছাড়াও তাঁর নাতি হচেন্দ্রদের নিয়েই সংসার। এ বয়সেও তাঁকে শ্রম করতে হয় কঠোরভাবে।নিয়মিত হাটে যেতে হয় টখু মানে বাংলায় খাঁচা বিক্রি করতে।তবাংগ্লে হলো খাঁচার দরজা।কী নিপুণ হাতে এখনো নিজ হাতে পাহাড় টিলা থেকে মূলীবাঁশ বা ওয়াথুই কেটে এনে তবাংগ্লে তৈরী করেন।মেয়ে মেয়ে জামাই ও নাতি হচেন্দ্রই তাঁর পরিবার।বয়স ৮৪ হলেও এখনো মেডিসিন খেতে হয় না  তেমন অসুখও নেই।জ্বর ছাড়া তেমন বড় অসুখ হয়নি।চোখে একটু কম দেখেন।অথচ তাঁর ছেলে পেট ব্যথায় জিবি হাসপাতালে মারা গেছে দশ বছর হলো।  টিউমার হয়ে মারা গেলেন বিশ বছর হলো নিজের স্ত্রী মারা গেছেন।
             
এখনো কাজ নিয়ে মেতে থাকেন জগরাই।রিয়াং জনজাতি অংশের একজন সহজ সরল মানুষ তিনি।তাঁর কর্মময় জীবন আরো সুন্দর হোক।কিন্তু বয়সজনিত শরীর নুয়ে এসছে পাহাড় যেমন অন্য টিলায় নুয়ে পড়ে তেমনি।

রিয়াং রমণীদের নুকাই বোঝাই বল সংগ্রহ 

লংতরাই পাহাড়ের জনজীবনে প্রতিদিনকার দিন যাপন এমনই।বিশেষত শীত পড়লে নুকাই মানে খারাং বোঝাই লাকড়ি মানে বল সংগ্রহ করতে বনে যান।সংগ্রহ করেন বল এবং বনজ শাক সবজী।

ডেমছড়া আসার পথে নেপালটিলা পেরিয়ে গারো টিলা, মুণ্ডা টিলা পেরিয়ে দীর্ঘ রাবার বাগান।সকালে শুধুই নীরব জনশূন্য গা ছমছম কিচিরমিচির শব্দ শুনতে শুনতে আমি যখন কর্মস্থল বৃক্ষরাম সিপি এস বি স্কুলে আসি পথে তখন রিয়াং জনজাতির মেয়েরা বল সংগ্রহ করতে বেরিয়ে পড়েন।বন থেকে ফেরেন বেলা ২টার দিকে।
রোজদিন তাদের জুমের সাথে সময় কাটে।আমি ঋদ্ধ হই রিয়াং জনজাতির লোকজ সংস্কৃতিকে কাজ থেকে দেখে।অনুভব করি দিনযাপনের সংগ্রাম। 

চাকই একটি রিয়াং রেসিপি

ত্রিপুরায় বাঁশ কচি অবস্থায় নানা উপায়ে খাওয়া যায়।বাঙালিরা কিছুদিন আগেও তেমন সুখকর খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেনি কচিবাঁশকে।যদিও আমরা আমাদের ছোটবেলা থেকেই বাঁশ কড়ুল খেয়ে আসছি।আমরা ডালের সাথে সেদ্ধ যেমন খাই তেমনি গোদক এবং কুচিকুচি করে কেটে সিঁদল দিয়েও খাই।
ত্রিপুরার ঊনিশটি জনজাতিদের মধ্যে রিয়াংজনজাতিদের বিশেষ ধরনের খাবার হলো চাকই।বাঁশ কড়ুলের সাথে ডাল এবং সিঁদল দিয়ে তৈরী এক বিশেষ ধরণের রেসিপিকে চাকই বলে।চাকই রান্না করার আগে স্থানীয় জঙ্গল থেকে কচি মুলিবাঁশ তুলে এনে তা থেকে গজানো নবীন শক্ত বাকল বা পাতা তুলে নিতে হয়।তারপর তা বটি দা দিয়ে কুচিকুচি করে কেটে নিতে হবে।তারপর কড়াইয়ে দিয়ে আগুনের আঁচে বসানো হবে।ভালো করে ধুঁয়ে মুশুরী ডাল পরিমাণ মতো দিয়ে সেদ্ধ করতে হয়।সেদ্ধ হওয়ার সময় কাঁচা মরিচ, আদা দিয়ে তৈরী করা লাগবে।বিশেষ রকমের সুস্বাদু খাবার তৈরীর জন্য হলদে পাতা কুচিকুচি করেও দেওয়া হয়।নামানোর কিছু আগে ভালো করে ধুঁয়ে নেওয়া সিঁদল(ভেজা ভেজা এক বিশেষ ধরণের তৈরী শুকনো মাছ)রেসিপিতে দিয়ে কিছু সময় আরো আগুনের আঁচ লাগানো হয়।এর মধ্যেই এক রকম সুঘ্রাণ কড়াইয়ের ঢাকনা ভেদ করে নাকে এসে লাগবে।বেশ মজাই লাগবে ঘ্রানে।
তারপর নামিয়ে নিন।হয়ে গেলো চাকই।পরিমাণ মতো ভাতের থালায় নিন।আরাম করে গলা অব্দি খেলেও আরো খাওয়ার ইচ্ছে থাকবেই এই রেসিপির ভালো লাগা রান্নার জন্য। 

তলাই

তলাই একটি রিয়াং শব্দ। তলাই মানে শববহনের বাঁশের তৈরী বাহন।রিয়াং সমাজের মানুষের মৃত্যুর পর এই বাহন দিয়ে তাঁকে দাহ করতে বহন করা হয়।চারজন বাঁশের চারটি হাতল কাঁধে করে নিয়ে যেতে তলাইয়ে থাকে।তলাই জড়িয়ে থাকে সাদা কাপড় দিয়ে সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য। পাশাপাশি শুভ্রতাও বুঝানো হয় এই সাদা থানের মাধ্যমে। মৃতদেহ নির্জীব হলেও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা রিয়াং জনজাতির সংস্কৃতি। 
মৃতের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রিয়াং জনজাতিরা সবাই মৃতের বাড়ি যান।প্রত্যেকে হাতে করে সম্মান জানাতে নিয়ে যান দারু।যাদের নিতান্ত দারু বা মদ্য সংগ্রহ সম্ভব নয় তারা সকলেই মৃতের প্রতি সম্মান জানাতে প্রদান করেন টাকা।দাহ করার লাকড়ি ও আনুষাঙ্গিক আসবাব ক্রয় করতে টাকা খরচা করা হয়।সম্মান স্বরূপ ও মৃতদেহ সৎকারে যারা নিয়োজিত থাকবেন তারা যেন জাগতিক বিষয় থেকে নিজেকে এক ঘোর লাগা মতোন করতে সকলেই মদ্যপান করেন।বিশেষ করে মৃতের প্রতি সম্মান জানাতে রিয়াং নারীরা তাঁকে দেখতে যান।হাতে থাকবেই একটি করে দারুর বোতল।
রিয়াংরা মৃতদেহকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে দারু উৎসর্গ করেন।আত্মীয়স্বজনেরা স্মৃতিচারণ করে কান্নাও করতে দেখা যায়।আত্মীয় বিয়োগের এই সময় রিয়াং জনজাতির মধ্যে ঐক্য পরিলক্ষিত হয়।গ্রামের সকলেই তখন মৃতের বাড়ি সমবেত হোন।তাঁর প্রতি স্মৃতিচারণ ও আত্মীয়দের সান্ত্বনা দেন।
রিয়াংদের মধ্যে কেউ কেউ এখন খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত।তাঁদেরকে দাহ করা হয় যা।তাঁদেরকে সমাধীস্থলে শায়িত করা হয়।আর বাকী রিয়াং জনজাতিরা তলাই করে শবদেহ বহন করে হিন্দুদের মতোই দাহ করা হয়।

স্রোত প্রকাশনার হজাগিরি উৎসব:২০২২

বৃক্ষরাম:১৪ই নভেম্বর: শিশু দিবস উপলক্ষে স্রোত প্রকাশনা আয়োজন করেছিল ডেমছড়া এ ডি সি ভিলেজের বৃক্ষরাম সিপি এস বি স্কুলে হজাগিরি উৎসব।উৎসবে উপস্থিত ছিলেন কবি শাশ্বতী দাস, কবি স্নেহান্বিতা দাস, চিত্রশিল্পী গৌরব ধর, স্রোত প্রকাশনার প্রকাশক সুমিতা পাল ধর, স্রোত সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক কবি ও শিক্ষক  গোবিন্দ ধর, স্কুলের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক রাজু দাস, চুক্তিবদ্ধ শিক্ষক পাণ্ডব দেববর্মা,পতিরাম রিয়াং, সহ শিক্ষক ভুলুকুমার দেববর্মা স্কুল কমিটির জাপনজয় রিয়াংসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ।
শিশুদিবস নিয়ে কথা বলেন শাশ্বতী দাস, গোবিন্দ ধর। ককবরকে বলেন শিক্ষক ভুলুকুমার দেববর্মা।স্রোত প্রকাশনার পক্ষে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক রাজু দাস, চুক্তিবদ্ধ শিক্ষক পাণ্ডব দেববর্মা ও পতিরাম রিয়াংকে দক্ষিণারঞ্জন ধর স্মৃতি শিক্ষক সম্মান :২০২২ প্রদান করা হয়।হজাগিরি উৎসবে নৃত্য পরিবেশন করে ডেমছড়া অঞ্চলের রিয়াং জনজাতিরা।বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও হজাগিরি নৃত্যে অংশ গ্রহণ করে। সারাদিন জনজাতি অংশের মানুষের নিকট আজ ছিল উৎসব মুকুর।পরিশেষে স্কুলের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক রাজু দাস ও স্রোত প্রকাশনার সম্পাদক গোবিন্দ ধর সকল ছাত্র ছাত্রী ও এলাকার বাসিন্দাদের ধন্যবাদ ও ফটোসেশানের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয় হয়।

স্রোত আয়োজিত বৃক্ষরাম সিপি এস বি স্কুলের হজাগিরি শিল্পীদের আনন্দ ভ্রমণ 

আগরতলা :১৩ই ডিসেম্বর ২০২২ স্রোত প্রকাশনা আয়োজন করেছে বড়মুড়া ইকোপার্ক ভ্রমণ ও সাংস্কৃতিক উৎসব। বৃক্ষরাম সিপি এস বি স্কুলের হজাগিরি শিল্পীদের নিয়ে এই আয়োজন।স্কুলের শিক্ষক পতিরাম রিয়াং,ভুলুকুমার দেববর্মা এবং প্রধান শিক্ষক গোবিন্দ ধরের তত্বাবধানে হজাগিরি শিল্পীদের মধ্যে উপস্থিত থাকার কথা স্বাধীন রিয়াং,রাধিকা রিয়াং,বৈদ্যরাম রিয়াং,ধনঞ্জয় রিয়াং,অভিষেক রিয়াং,হচেন্দ্র রিয়াং,মারিরুঙ রিয়াং,প্রবীনা দেববর্মা,হিমনজয় রিয়াং,মল্লিকা রিয়াং,শালকা রিয়াং,এলিনা রিয়াং,হাসমাইতি রিয়াং,সোনালী রিয়াং ও সোনাতি রিয়াংসহ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়ে এই শিক্ষামূলক ভ্রমণের সাথে থাকবে হজাগিরি নৃত্য এবং সাংস্কৃতিক উৎসব। সকাল সাতটায় বৃক্ষরাম সিপি এস বি স্কুল থেকে বড়মুড়া ইকোপার্ক ভ্রমণের উদ্দেশ্যে চারটি মারতি গাড়ি করে শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করার জন্য যাত্রা শুরু করার করেন। আগরতলা থেকে কবি সুচিত্রা দাস ও কুমারঘাট থেকে কবি শাশ্বতী দাস মহোদয় এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন।খুমতিয়া বিদ্যালয় আধিকারিকও এই শিক্ষামূলক ভ্রমণের সাফল্য কামনা করেছেন।

কুতুইমণিরগ

ছোটবেলা রাতাছড়া স্কুলে যাওয়ার সময় টিলা উঠতে উঠতে পথের দুধারে এই ফুল মনকে ফুরফুরে করে দিতো।কোন ঘ্রাণ নেই। কাঁটাযুক্ত গাছটির সকল কাণ্ড। একই গাছে অসংখ্য লালহলুদসাদাগোলাপি বনফুল ফুটে থাকতো।
বড় হয়ে পাহাড় চড়তে নানা সময় গেছি।ত্রিপুরার পাহাড় জঙ্গলে এই বনফুল ফুটে থাকে অবহেলায় অনাদরে।অথচ সৌন্দর্য বিলায় কিন্তু কোন ঘ্রাণ নেই। এই অসাধারণ ফুলটির প্রকৃত নাম আমার জানা নেই। আমি ততো প্রকৃতি প্রেমিক নই।আমি বিভূতিভূষণের মতো বলতে পারি ফুলটি বনফুল।হারাধন বৈরাগী ফুলটির নাম দিয়েছেন কুতুইমণিরগ।হয়তো এই নামটি রিয়াং শব্দ। রিয়াং ভাষায় বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়ায় ফুলটিকে বলেন কুতুইমণিরগ।
ত্রিপুরার ১৯ টি জনজাতিরা হয়তো ফুলটিকে  আলাদা আলাদা চিহ্নিত করেছেন নাম দিয়েছেন।
হারাধন বৈরাগী শিক্ষক। তিনি তখন জগবন্ধু পাড়ায় বদলি।তাঁর একটি লেখা এরকম ছিলো:"আমার বিবাগী ব্যারাকের চারপাশে শিশ্ দিচ্ছে আমাকে। সাইমার তীর বরাবর তাই আমি উদভ্রান্তের মতো  জগবন্ধুর ঝান্ডিমুন্ডা সন্ধ্যা ভেঙে ভেঙে যাই।'এই বনফুল তাঁর ভাষায়ও 'কুতুইমণিরগ"।
আমিও আরো জানতে চাই ফুলটি নিয়ে। যদি জনজাতিরা এই স্ট্যাটাস পড়েন তো অজানা আরো তথ্য লিপিবদ্ধ করেন কমেন্টবক্সে।আমি সমৃদ্ধ হবো।
ফুলটি আমার নিকট ছোটবেলার ভালো লাগা।বড়বেলায় মাদকতা।আর এখন ডেমছড়ার উজানে বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়ায় আমার প্রেম।পাহাড়ের সরলতার মতো আমার স্কুলের আসপাশের চারদিকে ফুটে থাকা কুতুইমণিরগ। 

কাকলু

কাকলু অনেকটা কুমড়োর মতো দেখতে।জুমের অর্থকরী কৃষিজ ফসল।দেখতে কুমড়োর মতো হলেও চালকুমড়া নয়।নয় কুমড়োও।অথচ তার আবরণে সাদা সাদা পেকে গেলে হয়।হাতে লাগলে সেই সাদা মতো অংশ হাত দিয়ে ককলু স্পর্শ করলে হাতে লাগে।খেতে জুমের বিন্নির ঘ্রাণের মতো রান্নার পর ম ম করে।অনেকটা মৃগনাভি হরিণের মতো ককলু।ককলু জানে না তারও কস্তুরীঘ্রাণ নিয়ে সে রান্নার পরম সুস্বাদু খাবারের জন্য প্রকৃতির উপহার স্বরূপ। সব ককলুতে ঘ্রাণ পাওয়া যায় না।কিন্তু ১০০ টি ককলু পিছু ৭৫% ঘ্রাণ অনিবার্য। এর স্বাদ অনেকটা কুমড়ো মতো হলেও ঘ্রাণ মোহিত করে রসনাকে।
সিঁদল,চিংড়ি কিংবা ইলিশের মাথাসহ মুড়িঘণ্ট বেশ রসিয়ে পাত পুরে খেয়ে ও খাইয়ে তৃপ্তি মিলবে নিশ্চিত। 
লংতরাই পাহাড়ের খাড়াই চড়াই ঘুরে ধুমাছড়ার উৎসস্থল থেকে ডেমছড়া মনু সর্বত্র জনজাতিদের জুমখেতের ককলু চাষ এক অর্থনৈতিক মান বাড়ানোর প্রধান কৃষিজ ফসল।

সংযোজন 

এটা একটা বিরল প্রজাতির জুমের ফসল । বরকদের কেউ বলেন ককলু । কেউ কেউ বলেন খাকলু । দক্ষিণের ত্রিপুরী জনগোষ্ঠীর কেউ কেউ খাকরুম বলেন । বরকদের একটা দফার নামও রয়েছে খাকলু । এই দফার জনগোষ্ঠী ত্রিপুরার টাক্কা তুলস‍্যা এলাকায় বসবাস করেন । এই সব্জির স্বাদ অতুলনীয় । এর একটা প্রজাতি আছে রান্না করলে গোবিন্দভোগ চালের গন্ধ বেরোয় । যে কোনো মাংসের সঙ্গে এই পদটা খুব মানায় । স্বাদ ও বাড়ায় ।

-অশোকানন্দ রায়বর্ধন।

ছবিঋণ:কবি অপাংশু দেবনাথ

অভিশপ্ত বিমান ও তাঁর যাত্রীদের জন্য আমরা মনে মনে শোকাহত

আমরা শুধু সামনের দিকেই এগুতে পারি; আমরা নতুন দরজা খুলতে পারি, নতুন আবিষ্কার করতে পারি – কারণ আমরা কৌতুহলী। আর এই কৌতুহলই আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা!

~ওয়াল্ট ডিজনি

অভিশপ্ত বিমান ১৯৫৩ সালে করাচী থেকে ঢাকা গামী। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুরু হয়।ঝড়ঝাপটা। বিমানটির পাইলট প্রথম ঢাকায় নামতে চান বিমানটি।সঠিক বার্তা পাননি।তারপর চট্টগ্রাম। না নেই নামার নির্দেশ।তারপর কৈলাসহরে নামাতে চান পাইলট বিমানটি।না সিগন্যাল নেই। তারপর সম্ভবত রাডার আর কাজ করেনি।আগরতলার দিকে যাওয়ার সময় লংতরাই পাহাড়ের খাড়াই চড়াই ঘুরে ধুমাছড়ার সেই উৎস ্মুখে বিমানটি ঘনজংগলে ধাক্কা খায়।বিমানে ছিলেন ৫৬ জন স্কুসহ যাত্রী। সবাই সেদিন প্রাণ হারান।ভোর অব্দি একজন বিমান সেবিকা তিরতির প্রাণ নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল আপ্রাণ। স্থানীয় এক শুকনো মাছ বিক্রেতা গভীর জংগল মাড়িয়ে পাহাড়ের ওপারে ব্যবসা করতে যেতেন।হঠাৎ বাঁশের ডগায় ওড়না দেখে লক্ষ্যে পৌঁছে সেই মেয়েটির মাথা কোলে নিয়ে শেষ জল ধুমাছড় থেকে তুলে এনে মুখে দিলে সেও  ঢলে পড়ে।কথিত আছে বিমানে ছিলো প্রায় আশি কেজি স্বর্ণ।বিমানসেবিকা আকারে ইংগিতে বলেছিল। ব্যবসায়ী তখন বিমানের চৌচির হওয়া লাশের মধ্যে সকালের রোদের ঝিলিক অন্বেষণ করে পেয়েছিল স্বর্ণের প্যাকেট।তিনি শুকনো মাছের খারাং ভর্তি করে ধুমাছড়ায় নিয়ে আসার পর আরো অসংখ্য মানুষ সেখান থেকে সোনা সংগ্রহ করে আনেন।পরবর্তী সময় শুকনো মাছ বিক্রেতাকে সবাই সোনা ভাই বলে সম্বোধন করেন। অঞ্চলের চালাক মানুষ কেউ জামাই বলে যত্নআত্তি করে সোনা ভাই এর নানা কৌশলে সব স্বর্ণ হাতিয়ে নেন।পরবর্তী সময় সোনা ভাই ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবনযাপন করেন।
আর বিমানের ৫৬ জন যাত্রীকে গণকবর দেওয়া হয় তৎকালীন সরকারের ব্যবস্থায়।
এই যাত্রীদের মধ্যে ছিলপন একজন সদ্য বিবাহিত আর্মী।তাঁর স্ত্রী দীর্ঘ বছর দুর্ঘটনার দিন এই স্থানে অতি কষ্টে উপস্থিত হতেন।তার ভালোবাসার প্রকাশ করতেন চোখের জলে। তিনি ঐ অঞ্চলে স্টীলের একটি ফলক পোঁতে ছিলেন।তাঁর নামও খোদাই করে রেখেছিলেন।কালক্রমে সে চিহ্ন এখন আর অবশিষ্ট নেই। কিন্তু জনশ্রুতি আছে তাঁর চোখের জলে ভালোবাসার টান।করাচী থেকে তিনি আসতেন।একবার হাতির পিঠে চড়ে অভিশপ্ত সেই জায়গায় পৌঁছে মোম জ্বালিয়ে ছিলেন।তার পরিবারেরও একজন সদস্য একবার এসে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে যান।
আজও সেই অভিশপ্ত বিমানের ইঞ্জিনের ভগ্নাংশ গভীর জংগলে অবহেলায় পড়ে আছে। তার সামান্য নিকটেই ছড়া এত গভীর যে ৫৯ ফুট হবে উপর থেকে।স্থানীয়দের বক্তব্য এই গভীর জলা অংশে বিমানটির যন্ত্রাংশ এখনো আছে। আছে স্বর্ণও।কিন্তু এতটাই গভীর এই অংশ কারো সাহস নেই নেমে পরীক্ষা করে স্বর্ণ উদ্ধার করে নেবে।
আমরা আজ এই অঞ্চলটি পরিদর্শন করতে যাই হারাধন বৈরাগী, আমার কলিগ পাণ্ডব দেববর্মা স্থানীয় কার্তিক দাস,বীরজিৎ দেববর্মা ও বিক্রম তালুকদার। সকলেই খাড়াইচড়াই মাড়িয়ে সেখানে পৌঁছাতে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়ি যেন কখন প্রাণ উড়ে যায় এমন অবস্থা। পাহাড় ধরে আর ফেরার সাহস হয়নি আমাদের। আমরা পরবর্তী সময় আসার সময় ছড়া ধরে ফিরে এলাম। কিন্তু তাতেও আমাদের হাঁকিয়ে উঠতে হয়।
সেই অভিশপ্ত বিমানের চালক বিমানসেবিকা এবং যাত্রীদের জন্য মনে মনে আমরা সকলেই শোকাহত হই।
এই দুঃসাহসিক যাত্রায় আমরা ক্লান্ত। আমরা প্রায় হাঁফাতে হাঁফাতে প্রত্যাবর্তন করি।

বিষন্নতার পাখিটি 

মনের ভেতর অসুখপাখি উড়ছে।
এক সাথে থাকে ঘুমায়।
ক্রমাগত আমাকে খায়।
আমি পাখিটির খাদ্য।
পাখিটি পুষতে চাই না।
পাখিটি আমায় ছাড়ে না।
পাখিটি আরো বাসা বানায়।
পাখিটি ডিম পাড়ে।তা দেয়।
আমি তার শিকার।সে আমাকে খায়।
সে আরো গভীরভাবে আমাকে আঁকড়ে বাঁচতে চায়।
আর আমি বিষন্নতায় ডুবি।বিষন্নতা আমায়
আরো বিষন্ন করে।সে আনন্দিত।তার ঠোঁটে চিলতে রোদ। 

সে আরো ফাঁকফোকর খুঁজে। 
আমি তাকে তাড়াতে চাই।সে আরো যত্নআত্তি করে। 
আমি তাকে বলি কেন সে এত ভালোবাসে?
তার কোন জবাব নেই। সে
আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আদর করে।আমাকে
খায়।আমি পাখিটির খাঁচা খুলে বলি উড়ো।
আমি মুক্ত হবো।সে নতুন বায়না ধরে।
আরো আঁকড়ে ধরে। আমি তার সকল আব্দার 
পুষিয়ে দিই-বলি সন্ধি করি।
সে তার বাসায় ক্রমাগত তা দেয় -নতুন করে
অসংখ্য বাচ্চা আনে
আমাকে গিলে খায়।আমি তার সাথে 
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করি।
সে আসে নতুন আরো ষড়যন্ত্র করে। 
আমি কেবল হেরে যাচ্ছি। আমি আরো তার 
সাড়াশি আক্রমণে-খড়কুটো হই।



করাচী থেকে লংতরাই 

সেই বিমানসেবিকার শেষ নিঃশ্বাস 
এখনো জুমের গাইরিং থেকে ধুঁয়ো ছাড়ে।
তারপর লংতরাই এসে বিলি কাটে মেঘ
হকোতৈইসায় বৃষ্টি নামে তিরতির জল 
ছলছল নামে যেন অকাল প্রয়াণের সময়
টুপ করে শেষ চোখের জল।

অথবা বিবাহের পর দেশ রক্ষক আর্মী ভাইটি
তার প্রেমিকার কথা মনে করে
চোখের জল টুপ করে পড়েছিল
এই উৎস হকোতৈইসায়।

এখানেই অভিশপ্ত বিমানের যাত্রীরা 
শতছিন্ন হয়েছিলো। 
যেন জুমের তিলফুল সাদা শুভ্র সুন্দর 
ফুটে পাহাড়ের খাড়াই চড়াই জুড়ে দীর্ঘশ্বাস হয়ে।

০৭:১১:২০২২
রাত:১১টা৩০মি
কুমারঘাট।

হকোতুইসার উৎসে সেই অভিশপ্ত বিমান দুর্ঘটনার পরিদর্শন অভিযান

হকো মানে ধুঁয়া। তুইসা মানে ছড়া।হকোতুইসা মামে ধুমাছড়া।কথিত আছে লংতরাই পাহাড়ের খাড়াই চড়াই থেকে যে ছড়াটি লকলক করে নামছে তা থেকে ধুঁয়ো বের হয়।এজন্য স্থানীয় জনগন ছড়াটির নাম এমন রেখেছিলেন।আর তার পারিপার্শ্বিক প্রতিবেশকে নিয়েই বিস্তৃর্ণ অঞ্চলের নাম হয় হকোতুইসা বা ধুমাছড়া।
ধুমাছড়ায় এখন মিশ্র জনবসতি।ত্রিপুরী রিয়াং বড়ুয়া থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের নানা পদবীর লোকজন মিলেমিশে বসবাস করেন। 
ধুমাছড়া বাজার এখন স্থানীয় লোকজনের ব্যবসার জন্য একটা আলাদা গরিমা অর্জন করেছে।এখানে বাইরে থেকে কেউ গিয়ে জিনিসপত্র ক্রয় করলে ব্যবসায়ীরা কখনোই ঠগাবেন না।বরং নির্ধারিত মূল্য থেকে সম্ভব হলে কমিয়ে রাখবেন।
সেদিন গত রবিবার আমি আর কবি হারাধন বৈরাগী আমার কলিগ পাণ্ডব দেববর্ সাথে ধুমাছড়ার আরো তিনজন ব্যবসায়ীও ছিলেন।
তারই একঝলক ছবিগুলো।

১০:১১:২০২২
ডেমছড়া।

হকোতুইসা বা ধুমাছড়া

হকো তুইসা বাজার থেকে কয়েক কিমি পেরিয়ে পা হাঁটা পথ ধরে অভিশপ্ত সেই বিমান  করাচী থেকে ১৯৫৩ সালে ঢাকার উদ্যেশে আসার পথে প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়েছিল।তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পায়ে হেঁটে যেতে হয় দীর্ঘ চড়াই খাড়াই এবড়োখেবড়ো পাহাড়ি জঙ্গল। সেই পথের ধারে ১৯২৭ সালে জন্ম নেওয়া একজন জনজাতি মানুষ সদ্য প্রয়াত হন এ বছরেই।তারই স্মৃতিফলক।

০৯:১১:২০২২

কাইরিং

লংতরাই পাহাড়ের পাদদেশে একটি কাইরিং।রিয়াং ভাষায় কাইরিং।ত্রিপুরী গাইরিং শব্দ রিয়াং জনজাতির ভাষায় কাইরিং।
জুম চাষের সময় এই কাইরিং বাঁশ দিয়ে ছনের ছাওয়ায় তৈরী করা হয়।জুম চাষের সময় ক্লান্ত চাষীদের বিশ্রামের জন্য এই কাইরিং।
এক সময় জুম চাষের সময় কাইরিং এ বসবাস করতো রিয়াং যুবক যুবতীরা। 
তারপর প্রেম।রিয়াং যুবক যুবতীর মন জয় করতে জুম চাষে মনোনিবেশ করে।
প্রায় এক বছর চাষ তার মধ্যেই প্রেম। বিয়ের প্রস্তাব। বিবাহ হয়।

বনজঙ্গল জুম চাষের মাধ্যমে ত্রিপুরা থেকে পরিস্কার হচ্ছে ক্রমাগত।তবুও লংতরাই পাহাড়ের খাড়াই চড়াই ঘুরে ধুমাছড়ার সেই উৎসে পৌঁছে দেখি রিয়াং জনজাতিরা সেখানে ককলু, রামাইশ,বেগুন, তিল ও ঝালমরিচ চাষ করেন।বিকেলে ধুমাছড়া বাজারে নিয়ে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। 

ডেমছড়া ধরে আমরা হাঁটতে হাঁটতে গন্তব্য অনাআবিস্কৃত ঝর্ণায়

নান্দীপাঠ

লংতরাইভ্যালী মহকুমার মনু ব্লকের অন্তর্ভুক্ত ডেমছড়া।ধলাই জেলার পশ্চিম উত্তর অংশে ডেমছড়া অবস্থিত। ডেমছড়ার একটি অঞ্চলের নাম বৃক্ষরাম পাড়া।এখান থেকেই গত ২৫ আগষ্টের এক সকালে আমরা বেরিয়েছিলাম অনাবিস্কৃত ডেমছড়ার উৎসের ঝর্ণা দেখবো বলে।স্থানীয়রা ছড়াটির নাম দু'পাট্টা বলেন।

অনাবিস্কৃত ডেমছড়ার উৎস দু'পাট্টা ছড়া

লংতরাই পাহাড়ের খাড়াই চড়াই বেয়ে দীর্ঘ বিশ কিমি ছড়া ধরে হাঁটতে হাঁটতে যে ঝর্ণা তা ডেমছড়ার উৎস।
আমরা এই প্রথমবার এই  ঝর্ণা আমরা আবিস্কার করলাম।স্থানীয় রিয়াং জনজাতিরা দুপাট্টা ছড়া বলেন।ছড়াটার উৎসে দুদিক থেকে দুটি ছড়া এসে ডেমছড়ায় মিশছে।

ডেমছড়ার পথ পরিক্রমণ 

ডেমছড়া ধরে হাঁটতে হাঁটতে গন্তব্য বলতে প্রায় বিশ কিমি দূরে এক অনাআবিস্কৃত ঝর্ণায় পাথরের উপর বসলাম আমরা নয় জন।আমাদের বৃক্ষরাম ডিপি এস বি স্কুলের সহকর্মী পাঁচ জন।ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রাজু দাস,পান্ডব দেববর্মা, পতিরাম রিয়াং,ভুলুকুমার দেববর্মা এবং আমি।স্থানীয় জনজাতির দুজন সজমি রিয়াং ও স্কুল কমিটির সদস্য  শুভরাম রিয়াং এবং রাজুবাবুর বোন জামাই জুটন দেব। আর আমার প্রিয় বন্ধু কবি ও কথাসাহিত্যিক হারাধন বৈরাগী। দীর্ঘ দিন থেকে এরকম এক আড্ডায় যাকে চেয়েছি বহুবার।তিনি কাঞ্চনপুর থেকে সকালে আমাদের আড্ডায় আসলেন।

হারাধন বৈরাগী 

হারাধন বৈরাগী পেশায় শিক্ষক। কবিতা,গল্প ও গদ্যে সাবলীল বিচরণ। 'হাসমতি ত্রিপুরা', 'হৃদি চম্প্রেঙ', 'খুমপুই পাড়ায়'(কাব্যগ্রন্থ)। 'খুমপুই থেকে সিকামনুকতাই'-ত্রিপুরার জনজাতি জীবনের আদি হৃদিমালা;একটি ব্যতিক্রমী গদ্যগ্রন্থ।।'বুরাসা'(গল্পগ্রন্থ),'সমকালীন ত্রিপুরার পনেরোজন কবির কবিতা (যৌথসংকলন),'ব্যাটিং জোন'(অখণ্ড বাংলার নির্বাচিত অণুগল্প সংখ্যা/ যৌথসংকলন ),'নীহারিকা নির্বাচিত ত্রিপুরার তরুণ কবিদের কবিতা'(যৌথসংকলন)।'৫৪জন গল্পকারের ২১৬টি অণুগল্প' (যৌথসংকলন)।'ত্রিপুরার সাহিত্যে নদ-নদী ও গোবিন্দ ধর'(যন্ত্রস্থ),ছায়াতরু(ত্রিপুরার সাম্প্রতিক ছোটগল্প/যৌথসংকলন),'তবু ভালোবেসে যাবো'(একটি প্রেমের গল্প সংকলন /যৌথ)।নিয়মিত লিখে চলেছেন এপার ওপারের সমসাময়িক বিবিধ পত্রসাহিত্য ও লিটলম‍্যাগাজিনে। অসম্ভব জঙ্গলআউলিয়া।ভালোবাসা জঙ্গল,জনজাতি,জুমজীবন-জীবননিকষ।

জার্নি টু গন্তব্য 

তারপর আমরা ধীরে ধীরে গন্তব্যে হাটঁতে হাটঁতে বের হই।
বেলা তখন এগারটা অতিক্রম করেছে। সকালেও কেউ খাইনি।রান্নার আয়োজন করতে শুরু করলাম সকলেই।ভাত বসলো বাঁশের চোঙে। ভাত রান্না শেষ।প্রকৃতি দেখছি আর দেখছি চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। লংতরাই পাহাড়ের জনজীবনের নানা প্রাকৃতিক দৃশ্যে মোহিত।ঝর্ণার জলে বারবার চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ স্নান সারলাম।কেউ কেউ তো লতা বেঁয়ে উপরে উঠলাম।নামলাম।আবার উঠলাম।খাওয়ার আয়োজনের পাশাপাশি প্রকৃতির অপার বিস্ময় এই অঞ্চলে না এলে ইহ জীবনেও দেখার সুযোগ হতোনা। 
এবার ভাতের থালায় কিছু তো চাই। পাহাড়ে সহজ উপায়ে রান্না করতে গোদকের জুড়ি মেলা ভার।যদিও পর্ক,চিকেন ছিলো।তবুও আজকের মেনু গোদক।

গোদক 

গোদক তৈরীর জন্য নানা রকম উপাদান ব্যবহার করতে পারেন।এখানে আমরা চিংড়ি মাছ,কাঁকড়া, লাঠিমাছ,পেঁয়াজ,জুমের খেত থেকে পুক মরিচ সংগ্রহ করে আনলাম।এগুলো প্রকৃতি থেকে আমরা সংগ্রহ করেছি
তাই এতে মিশানো হলো রসুন,নুন,কলাগাছের কচি অংশ, সিঁদল একটি মৃত্তিঙ্গাবাঁশের লম্বা আঁখ ওয়ালা অংশে প্রথম সব পদ ঢুকিয়ে দিয়েছি।তারপর উপরের ফাঁকা অংশ বন্ধ করে দিয়ে আগুনে হালকা আঁচে বসিয়েছি। একটু সময় বাঁশে আগুনের আঁচ লাগানো হয়ে গেলে বাঁশ একটু কালো কালো আকার ধারণ করতেই বুঝতে হবে গোদক রেডি।আগুন থেকে বাঁশ সরিয়ে নিন।তারপর কলা পাতায় সবগুলো ঢেলে নিন।

সুঘ্রাণ ম ম

সুঘ্রাণ ম ম করবে।জুমের খেতের চাল আগে থেকেই ভাত রান্না ছিলো।পরিমান মতো নিন।খেতে শুরু করুন। জিবে রসনায় তৃপ্তির জল আসবে নিশ্চিত। যারা পাশে থাকবে তাদের জিবেও জল টলটল করবে।খিদে না পেলেও চেটেপুটে খাবার ইচ্ছে নিশ্চিত হবেই হবে।জুমের পুক মরিচ ঝালের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।আর তাতে রসনায়ও জল লকলক করে।মনে হবে আপনি অপার আনন্দসাম্রাজ্যে বসবাস করছেন।

লক্ষরাম রিয়াং

জুমের ধান নিয়ে আসছেন রিয়াং পুরুষ। ক্লান্তি নেই শুধু বিজয়ের হাসি।এই পরিশ্রমী মানুষটির নাম লক্ষরাম রিয়াং।জুমে এখন ধান পাকার সময়।লক্ষরাম এরকমই দিনে কয়েকবার ডপমছড়ার জলপথে পায়ে হেঁটে ধান বয়ে আনেন বৃক্ষরাম পাড়ায়।পিচ্ছিল খাড়াই চড়াই এবং অসংখ্য পাথর বয়ে আনা ডেমছড়ার ছড়াজলের আঁকাবাঁকা পথ ধরে নিজেদের পাট্টা পাওয়া বনাঞ্চলের জুম খেত থেকে ফসল ঘরে আনতে হয় লক্ষরাম রিয়াংদের।

জাপানজয় রিয়াং ও তাঁর কেটলি

একটি কেটলি। এটা কোন নির্বাচনী প্রতীক নয়।কিন্তু কেটলিটা বহুদিন ধরে জাপানজয় রিয়াংকে তাঁর পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে আসছে।
জাপনজয় রিয়াং বিগত সরকারের এডিসি প্রশাসনের একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। 
পরিবারের লোকসংখ্যা চারজন।দুই ছেলে। স্ত্রী পুত্র মিলে চারজন মিলে জাপনজয়ের সংসার।দুই ছেলেই বিয়ে থা করে পৃথকভাবে পাশ্ববর্তী ডেমছড়ায় থাকেন।তাঁর স্ত্রী বৃক্ষরাম সিপি এস বি স্কুলের কুক কাম হেল্পার।
জীবন যুদ্ধে জাপনজয় এখন নিয়ম করে ডেমছড়া বাজারে চা-বিক্রেতা। 
আমি ডেমছড়া ভিলেজের বৃক্ষরাম সিপি এস বি স্কুলে জয়েনের পর থেকেই তিনি আমার বন্ধু। 
কতদিন ডেমছড়া তাঁর বাসায় আড্ডায় সময় কাটিয়েছি।থেকে যেতে বলেছেন।এমন কি স্কুলেও তাঁর বাসা থেকে যাতায়াত করার জন্য বলে থাকেন।আমার সে সুযোগ হয়নি।আমিও মাঝ বয়সের সংসার নৌকায় অথৈজলে থৈ থৈ।
সে আর হলো কই।তাই প্রতিদিন নিয়ম করে ৫০ কিমি যাই।৫০ কিমি আসি।এরকমই আমারও জীবন।
একজন শিক্ষককেও এমন পরিস্থিতিতে জীবনকে চালাতে হয় জাপনজয়ের মতোই। তিনি যদিও জীবনের যুদ্ধে স্বাধীন। আমরা শিক্ষকরা পরাধীন। 
আমি যে স্কুলে কর্মরত সেই অঞ্চল রিয়াং জনজাতি অংশের জনবসতি। স্কুলের শিক্ষার্থীরা রিয়াং ভাষায় কথা বলে।আমি বাংলা। এতে ওদের প্রকৃতপক্ষে যতটুকু দান করা প্রয়োজন আমার ততটুকু দিতে হলে ভাষাশিক্ষা প্রয়োজন। যা প্রায় অসম্ভব। অথচ আমাদের দপ্তরের আদেশ পাবলিক ইন্টারেস্টে আমিও জয়েন করতে হলো স্কুলে।কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কে সেই পাবলিক যার ইন্টারেস্ট আমাকেও রিয়াং অধ্যাষিত স্কুলে বাংলা ভাষা যার মাতৃভাষা তাকেই প্রয়োজন হলো।অথচ রিয়াং জনজাতির সেই ডেমছড়ার শূন্য থেকে প্রায় ১২-১৪ বছরের শিশুরা বাংলা ভাষা বলতে ও বুঝতে একদমই অপারগ। আমিও এই দুঃসাধ্য সাধন এ জীবনে অসম্ভব। সুতরাং যাই।আসি।আবার যাই।আবার আসি।আত্মগ্লানি প্রতিদিন চোখে মুখে জুমের বাঁশ পোড়া ছাইয়ের মতোই লেগে থাকে।
লেগে থাকে জাপনজয় রিয়াং এর কেটলির মতো।

সৌন্দর্যের নিকট আদিমানব

এই অনাআবিস্কৃত ঝর্ণা একদিন হতে পারে পর্যটকদের নিকট সৌন্দর্য অবলোকনের ইলিপেন্টপলস।আর লংতরাই জুড়ে পাথরের প্রকৃত ম্যাচুরিটি যখন আসবে তখন ত্রিপুরা হতে পারে অর্থনৈতিক ভাবে এক সমৃদ্ধ রাজ্য।আমাদের পাথর পররাষ্ট্রের রপ্তানি হতে পারবে বিশ্বাস করি। এত পাথর। বড় ছোট মাঝারি। যে দিকে চোখ যায় পাথর আর পাথর।মনে হয় এখানেই থেকে যাই এক গুহামানবের মতো।

বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়া উচ্চ বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের সাহিত্য সভা :প্রাসঙ্গিক কথাচর্চা

বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়া উচ্চ বুনিয়াদি বিদ্যালয়ে প্রতি দ্বিতীয় শনিবার ও চতুর্থ শনিবার সাহিত্য সভা হয়।সাহিত্য সভা রাজ্যের প্রতিটি বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পরিচালনা করার রেওয়াজ  ছিলো দীর্ঘদিনের। কোনো কোনো বিদ্যালয় সেই রেওয়াজ পালন করে আসছেন সুচারু ভাবেই।
আমার পূর্বের স্কুলেও বদলীর আগ মূহুর্ত পর্যন্ত সাহিত্য সভা উৎসবের মেজাজে পরিচালনা করেছি
ত্রিপুরার অনেক কবি সাহিত্যিক তখন উপস্থিত হতেন আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে। এতে সাহিত্য সভায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছিলো।
রাজেন্দ্রনগর নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের সাহিত্য সভার মাধ্যমে সে স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আঁকাআকি ধামাইল নাচ, সংগীত পরিবেশন, কবিতা আবৃত্তি ও কবিতা লেখার উৎসাহ তৈরি হয়েছিল। সাহিত্য সভা থেকে আমার উৎসাহে কিচিরমিচির নামে একটি দেওয়াল পত্রিকা প্রকাশ করা হতো।জানি না বিগত ২০ অক্টোবর ২০২০সালে কোভিড আক্রান্ত গোটা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল তখন জনগণের ইচ্ছে এই অজুহাতে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় থেকে রিয়াং জনজাতি অধ্যশিত ডেমছড়া এডিসি ভিলেজে স্থানান্তরিত করা হয়।একদিকে ত্রিপুরায়ও কোভিড আক্রমণের নতুন নতুন রেকর্ড হচ্ছে পাশাপাশি একমাত্র সন্তানের অসুস্থতা সত্ত্বেও পাবলিক ইন্টারেস্ট দেখিয়ে দপ্তরের আদেশে আমি বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়ায় জয়েন করেছি।কিন্তু অদ্যবধি কে বা কারা সেই জনসাধারণ আমার বদলিতে এতো উৎসাহিত আবিস্কার করতে পারিনি।কিন্তু বাংলাভাষী একজন শিক্ষক হিসেবে রিয়াং জনজাতি অধ্যশিত বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়ার শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষা রিয়াং। শিক্ষার্থীরা বাংলায় তেমন সরগরম নয়।আমি তো রিয়াং ভাষাও বুঝি না।এই অবস্থায় আমার অযোগ্যতা দুর্বলতায় আমি লজ্জিত হয়ে কুঁকড়ে থাকি।আসলেই জীবনের পঞ্চাশে এসে আমার আর নতুন করে ভাষা শিক্ষা হয়ে ওঠেনি।
শুধু তাদের কথোপকথন শুনতে শুনতে অনুমান নির্ভর তাদের জন্য যতটুকু পারি বুঝি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আঁকাআকি, রিয়াং নৃত্য পরিবেশন, কবিতা পাঠের উৎসাহ প্রদান করে যাচ্ছি। এমন সময়ই আগরতলা থেকে ত্রিপুরাভাষী ভুলুকুমার দেববর্মা মহোদয় বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়ায় ট্রান্সফার হয়ে আসেন।
প্রথম দিনই উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম তিনি বাংলা ভাষায় অনেক সাবলীল। আবার নিজস্ব ভাষা ককবরক ভাষায়ও সাবলীল। 
মনের ভেতর সুপ্ত ভাসনা জাগলো ভুলুদাকেও ককবরক সাহিত্য চর্চার পরামর্শ দিতে লাগলাম।একসময় তিনি লেখালেখি করতেন।কিন্তু তেমন উৎসাহ না পেয়ে লেখালেখি স্তিমিত হয়ে যায়। আমাদের নিয়মিত কথা আদান প্রদান হতে হতে এক সময় ভুলুদা আবার লেখতে শুরু করেন।
তারপর ভুলুদার সাথে পরামর্শ চলছিলো এখান থেকে একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করতে হবে। তিনি হবেন সম্পাদক। আমিও সাথে থাকবো।কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনটি হবে ত্রিভাষিক।বাংলা ককবরক রিয়াং ভাষায় সাজানো হবে লিটল ম্যাগাজিনটি।যেই কথা সেই কাজ।লিটল ম্যাগাজিনটির একটি নাম ঠিক হলো।খুমতিয়া।গত ২৬ মে স্টুডেন্ট হেলথ হোম আগরতলা তৃতীয় ত্রিপুরা লিটল ম্যাগাজিন ও গ্রন্থমেলা: ২০২৩ লিটল ম্যাগাজিন খুমতৈয়া বা খুমতিয়ার আত্মপ্রকাশ ঘটে। আমরা দুজনই খুব খুশি হয়েছি। ত্রিপুরা রাজ্যের লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনে রিয়াং জনজাতির ভাষায় প্রথম প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন "খুমতিয়া '।
এই খুশির পাশাপাশি আমরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ তৈরি করতে চেষ্টা করি।
বড়মুড়া ইকোপার্কে বৃক্ষরাম চৌধুরী পাড়ার শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভ্রমনের আনন্দে প্রথমবার হজাগিরি উৎসব :২০২২ আয়োজন করা হয়।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে শেখার আনন্দ পেয়ে বসে।একটু আধটু কবিতা লেখার চেষ্টাও শুরু হয়।
সপ্তম শ্রেণির সানদিনা রিয়াং একটি কবিতা গত সাহিত্য সভায় পাঠও করে।
সাহিত্য সভার বোর্ডে চক দিয়ে লেখা হয় সুন্দর হাতের লেখা আমাদের কলিগ ভালুকুমার দেববর্মা মহোদয়ের।
আদেশ মোতাবেক দ্বিতীয় শনিবার আমরা সাহিত্য সভা পরিচালনা করতে না পারায় তৃতীয় শনিবারে সাহিত্য সভার আয়োজন করা হয়।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহের বাঁধভাঙা উন্মাদনা লক্ষনীয় ছিলো।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সঞ্চালনা করে অদ্যকার সাহিত্য সভা ।
কুমারঘাট থেকে আমি প্রতিদিন সকাল আটটায় ৫০ কিমি অতিক্রম করতে করতে লংতরাই রিজার্ভ ফরেস্টের আকাশের নানা টুকরো টুকরো ছবি মোবাইল বন্দী করে এগিয়ে যাই।
মাথায় কিলবিল করে মেঘমেদুর নানা ঘাতপ্রতিঘাত লড়াই সংগ্রাম আর প্রতিকূল মুহূর্তেও আমি প্রকৃতির নিকট নতজানু হয়ে রিয়াং জনজাতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে  আরো শিক্ষায় আলোকিত হোক এই ব্রতে ব্রতী হয়ে বোধ হয়ে থাকি।
নিজের সন্তানের অসুস্থতার মধ্যে নিজেকে আর কতটুকু সংযুক্ত ও সংযত রাখা সম্ভব জানি না। এ বয়সে রিয়াং শেখাও প্রায় অসম্ভব কারণ আমিও মানসিকভাবে ভেঙে পড়া এক ক্লান্ত নাবিক।
তথাপিও রিয়াং জনজাতির নানা রূপকথা লোককথা শোক শ্রাদ্ধ জন্ম মৃত্যু উৎসব ইতিহাস শব্দার্থগুলো প্রতিদিন একটু একটু করে কালেকশন করতে থাকি।রিয়াং জনজাতির জীবনে জুমচাষের ভূমিকা থেকে স্থানীয় ছড়া টিলা লুঙ্গা চষে বেড়িয়ে তুলে আনি মণিমুক্তা। 
ককবরক ও রিয়াং জনজাতির মিশ্র ভাষা এবং কোথায় দুটো ভাষা পৃথকভাবে গড়ে উঠেছে সেগুলো কাছ থেকে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করেছি।
একদিকে সন্তানের অসুস্থতা অন্যদিকে আত্মবিশ্বাসী মন থেকে রিয়াং জনজাতিকে বুঝতে চেষ্টা হয়তো একদিন নতুন কিছু সৃজন হবে।তখন এই প্রতিকূলতায় দাঁড়িয়েও নানা ঝড়জলের সাথে যুদ্ধ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পেরেছি দাবি করার সাহস হবে।নয়তো কঠোর পরিশ্রম, অসুস্থতা ও বিক্ষিপ্ত মন থেকেও নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পেরেছি দাবি করতে পারবো। অন্যথায় এই জনসাধারণের ইচ্ছের মূল্য কতটুকু দিতে আর পারলাম!যদিও আমি আমরা জানি পাবলিক ইন্টারেস্ট আসলে প্রতিটি দপ্তরের একটি সাংবিধানিক রক্ষা কবচ।তাদের কর্মীদেরকে আইনের পথ রুদ্ধ করে প্রকারান্তরে শাস্তি প্রদান করা। কিন্তু তেত্রিশ বছরের শিক্ষকতায় কোথাও নিয়মানুবর্তিতা থেকে বিচ্যূত হইনি।বরং সম্ভবস্থলে সময় ও আর্থিকভাবেও দপ্তরের আদেশের অপেক্ষা না করেই শিক্ষার্থীদের বিকাশে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি।
হয়তো তারই প্রতিদান হলো জনসাধারণের ইচ্ছের জন্য দূরবর্তী রিয়াং জনজাতি অধ্যশিত পঞ্চাশ কিমি প্লাস পঞ্চাশ কিমি মোট ১০০ কিমি যাতায়াতের কঠোর শাস্তি পেলাম।তাও আমার সন্তান যখন অসুস্থ বিশ্ব যখন করোনা আক্রান্ত। স্কুলে যখন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির আদেশ নেই। আর আমি যে ভাষাই জানি না সে ভাষাভাষী অঞ্চলে বদলির আদেশ পেলাম।আদেশকে শিরোধার্য করে স্থির করেছিলাম দপ্তরের আদেশকে মান্যতা দেওয়া একজন কর্মীর কর্তব্য ও দায়িত্ব। আজও সন্তান অসুস্থ আমার।মন পড়ে থাকে আমার স্কুলের সন্তানদের জন্য। 

শ্রীমতি ত্রিপুরা 

ধান পাকার সময় এসছে।ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে।প্রতিদিনই এই পথ পরিক্রমণ করি।পাহাড়ি পথ।খাড়াই উৎরাই।আর এবড়োখেবড়ো। কখন পথ থেকে বাইক পাহাড়ের খাড়াই বেয়ে লুঙ্গায় লাফিয়ে লাফিয়ে চলে যায় কে জানে।শরীর সায় না দিলেও মন সায় না দিলেও কর্মই তো একজন মানুষকে সামনের দিকে আরো পথ চলতে সাহায্য করে। সুতরাং প্রাণ হাতে চলতে হয় এই রাস্তায়। কিন্তু জুমে যখন ধান সবজির লকলকানি সবুজ আর সবুজ বিস্তীর্ণ ভূমি বরাবর দৃশ্যে আসে তখন আর মনের সমস্ত ক্লান্তি শরীরের ক্লান্তি শুষে নেয় সবুজ।জুমের ধানের ঘ্রাণের আবেশ ছড়ানো টিলা ভূমির হাতছানি মন অজানা আনন্দে মেতে ওঠে। 
আজ তিরিশে জুলাই ২০২২।জীবন তো নানাভাবে দেখে আসা এক বুড়োর দলের একজন আমিও।এ রাজ্যের পাহাড় সমতল আর টিলাভূমির সৌন্দর্য, হিংসা হিংস্রতা যতটুকু জেনেছি বুঝেছি তাতে জীবনের মায়া কখন যে কেটে গেছে। তবুও এই জুমের সবজি লাউ কুমড়ো নানা রকম ধানের মায়ার নিকট অতি তুচ্ছ। 
সুতরাং যদি বেঁচে থাকতেই হয় শ্রীমতি টিলাভূমির সৌন্দর্য সকলেরই অবলোকন দরকার।

জুমধান জুমচাষ 

ত্রিপুরার পাহাড় টিলা এলাকায় প্রচলিত এক ধরনের কৃষিপদ্ধতি। "জুম চাষ" বিশেষ শব্দে "ঝুম চাষ" নামেও পরিচিত। "ঝুম চাষ" এক ধরনের স্থানান্তরিত কৃষিপদ্ধতি। মূলত জঙ্গল কেটে পুড়িয়ে চাষ করা হয়, আবার সেই স্থানে জমির উর্বরতা কমে গেলে এই স্থান হতে কৃষি জমি স্থানান্তরিত করে অন্যত্র আবার কৃষি জমি গড়ে ওঠে। পাহাড়ের গায়ে ঢালু এলাকায় এই চাষ করা হয়।এই পদ্ধতির চাষে বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়। জুম চাষ পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের জীবন জীবিকার প্রধান অবলম্বন। বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ২০০০০ হেক্টর ভূমি এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয়। "ঝুম চাষ" ভারতে পোড়ু, বীরা, পোনম, প্রভৃতি নামেও পরিচিত। চাকমা ও মারমা সমাজের মানুষের মাঝে জুম চাষ বেশ জনপ্রিয়।

চৈত্রে সারা বন রোদে পুড়ে।গাছের পাতা পড়ে বৃক্ষের ন্যাড়া রূপ রুক্ষ আকার ধারণ করে। এই সময় বন কেটে শুকালে পুড়ে ছাই করা হয়।টিলায় টিলায় ছাই আর ছাই।বাঁশপাতা উড়ে উড়ে এসে টুপ করে চোখে মুখে মাথায় পড়তো ছোটবেলা।সে সময় জুমে আগুন লাগাতেন জুমচাষীরা।আমাদের ছোটবেলা এসব সন্ধেবেলা বাড়ির উঠোনে কুপি জ্বালিয়ে পড়তে বসলে আকচার ঘটতোই।আর আমরা মনে মনে এক অজানা আশঙ্কায় রাত কাটাতাম।বাবা মা মাসিদের মুখে জুম পুড়ার ভয়ঙ্কর কথা শুনে বনের পশু পাখির পুড়ে যাওয়ার ঘটনা মনে মনে হৃদয়ে এসে আঘাত দিতো। সেই ট্রেডিশন এখনো আছে। 
সম্প্রতি আমি নিয়তি আমার বর্তমান কর্মস্থলে আসতে যেতে দেখি।চোখে লাগে।কষ্ট পাই।আর ভাবি পাহাড়ের জনজীবনে এখনো জুম চাষের উপর নির্ভরশীল।এতে বন ধ্বংস হয়।পুড়ে ছাই হয় কত পশুপাখি।সাপ।আর বন ধ্বংস মানে আমাদের পরিবেশকে আমরা আরো বিপদের মধ্যে ফেলছি।

বেতিধান,কফপ্রু,কাঞ্চলি,রাংগাদিলং,মাম্মি,খাইয়ানাচন, গারোমালতি,গাদুমা,এগুলো জুমের ধান।খেতেও অপরূপ।রসনা থেকে স্বাদ যেন ছাড়াতেই চায় না।
রিয়াং জনজাতিরা বছরের প্রথম মাস বৈশাখে জংগলের আগাছা ও বড় বড় বৃক্ষ কেটে রূপন করেন জুমের ধান।ন্যাড়া টিলায় কিছুদিন পর বৃষ্টি পড়ে অঙ্কুরোদগম হয় সবুজ ধান।
এখন বর্ষা পুরোদস্তুর। চারদিকে আগাছার পাশাপাশি গাছের চারায় সবুজ পাতা মনোরম পরিবেশ সৃজন করে।
টিলায় টিলায় আগাছা আর সবুজ বন।

তথ্যসূত্র:স্থানীয় মৌখিক আলোচনা এবং গোগল।

১০:১১:২০২৩
রাত:০৮:৫২মি
কুমারঘাট।

0 Comments