মাতৃভাষা আমাদের আত্মার অভয়ারণ্যে নির্ঘোষ নিক্কণ কবি তপন বাগচীর মুখোমুখি
সাক্ষাৎ কার
মাতৃভাষা আমাদের আত্মার অভয়ারণ্যে নির্ঘোষ নিক্কণ
কবি তপন বাগচীর মুখোমুখি
প্রশ্ন :
মাতৃভাষা বলতে ঠিক কিরকম মনে হয়?
তপন বাগচী: মায়ের মুখে বুলি শুনে যে ভাষায় সকলে কথা বলতে শেখে, সেটিই তার মাতৃভাষা। ভাষা কেবল মানুষের নয়, পশু-পাখি-জীবজন্তু এমনকি প্রকৃতির সকল বস্তুরই মাতৃভাষা আছে। বিড়ালও কথা বলে, অন্য বিড়ালেরা তা বুঝতে পারে। ওই মিউ-ই তার মাতৃভাষা। পাখির কিচিরমিচির তার মাতৃভাষা। আমরা মানুষেরা তাদের ভাষা বুঝতে পারি না, সেই সীমাবদ্ধতা মানুষের। গাছেরও মাতৃভাষা আছে। আমরা তা বুঝতে পারি না। কিন্তু নদীর কুলকুল শব্দ শুনে আমরা বুঝতে পারি নদীর বয়ে চলাকে। ওটিই তার মাতৃভাষা। আমার মাতৃভাষা বাংলা, ব্রিটিশদের মাতৃভাষা ইংরেজি। মাতৃভাষা বলতে নির্দিষ্ট কোনও ভাষা বোঝায় না। যে মানুষ যে ভাষায় কথা বলতে শেষে, সেটিই তার মাতৃভাষা।
প্রশ্ন :
আপনার মাতৃভাষা নিশ্চয়ই বাংলা ভাষা?
তপন বাগচী: অবশ্যই বাংলা আমার মাতৃভাষা। কেবল মাতৃভাষা নয়, বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে একে আমরা রাষ্ট্রভাষা হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছি।
প্রশ্ন :
একটি দেশ গঠনে ভাষা কতটুকু ভিত হতে পারে?
তপন বাগচী: দেশ গড়তে ভূমি ও মানুষ লাগে। আর ভাষা ছাড়া মানুষ চলতে পারে না। মনের কথা আদানপ্রদানের মাধ্যম হলো ভাষা। ভাষা ছাড়া মানুষ হয় না, দেশও হয় না।
প্রশ্ন :
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। এই দেশ গঠনে বাংলা ভাষা কতটুকু জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল?
তপন বাগচী: একই ভাষার মানুষ, তবু বঙ্গভঙ্গ হলো। ৪৭-এর দেশভাগে একই ভাষার মানুষ দুইভাগ হলো। ৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়ে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছি। পূর্ববঙ্গের সকল বাঙালি তখন একই ভাষাসূত্রে গ্রথিত হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অনেক লড়াই শেষে ৭১ সালে দেশ স্বাধীন হয়। ভাষা-আন্দোলনের মধ্যেই দান বেঁধে ছিল স্বাধীনতা-আন্দোলনের মূল মন্ত্র। আমরা এখন ভাষাভিত্তিক জাতীয়তায় বিশ্বাসী। আমরা এখন ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের অধিবাসী। আমাদের দেশ ও জাতি এক। আমাদের ভাষা বাংলা। আমাদের দেশ বাংলাদেশ। আমরা জাতিতে বাঙালি। এরকম গৌরবের পরিচয় বিশ্বে আর কজন নাগরিক ধারণ করে, আমার তা জানা নেই।
প্রশ্ন :
বাংলা ভাষায় কথা বললে ভিন্ন ভাষীদের নিকট কতটুকু হীনমন্যতায় ভোগেন?
তপন বাগচী: মোটেই হীনম্মন্যতা নেই। বরং গৌরব বোধ করি। তবে কাজ চালিয়ে নিতে কেউ দিল্লি গিয়ে হিন্দি বললে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু বাংলাদেশে, ভারতে পশ্চিমবঙ্গে কিংবা ত্রিপুরায় গেলে তো অবশ্যই বাংলঅ বলবো। ভিন্নভাষীরা যদি আমা ভাষা বুঝতে না পারে, তখন ইংরেজি বুঝিয়ে দিতে আমার সমস্যা নেই। কিন্তু মায়ের ভাষায় কথা বলতে কেউ লজ্জা পেলে বুঝতে হবে জাতি হিসেবে তাঁর মানস গঠনের ঘাটতি রয়েছে।
প্রশ্ন :
যদি বাংলা ভাষা লুপ্ত হয় তো আপনার কেমন লাগবে?
তপন বাগচী: বাংলা ভাষা লুপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই। যদি পশ্চিমবঙ্গে কিংবা ত্রিপুরায় বাংলাকে গিলে খায় হিন্দি, তাতেও বাংলা ভাষার বিলুপ্ত হওয়ার শঙ্কা নেই। কারণ ১৮ কোটি বাংলাদেশি বাংলাতেই কথা বলে, জীবনধারণ করে। বাংলাদেশ আছে বলেই বাংলা ভাষা টিকে থাকবে।
প্রশ্ন :
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠিত হলেও ভাষার ভিত্তিতে পুনরায় বাংলাদেশ গঠনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু ছিলো?
তপন বাগচী: দ্বিজাতিতত্ত্ব যে ভুল ছিল, তার প্রমাণ বাঙালির ভাষা-আন্দোলনে, পূর্ববঙ্গেবর স্বাধিকার-আন্দোলন, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। পশ্চিম পাকিস্তানের অপশাসন ও নির্যযাতনের ফলে বাঙালি যুদ্ধে যায়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশ স্বাধী করে। স্বাধঅনতার ৫৩ বছর পরে দেখা যায়, পাকিস্তানকে ছাড়িয় গেলে বাংলাদেশ।
প্রশ্ন :
ভাষার ভিত্তিতে বাংলাদেশ গঠিত। আজকের বাংলাদেশ সুগঠিত ও উন্নয়নশীল।একজন বাংলাভাষী হিসেবে বিষয়টি কেমন লাগছে?
তপন বাগচী: বাংলাকে পেয়েছি জন্মসূত্রে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করেছি লড়াই-সূত্রে। সেই লড়াইয়ের পথ ধরে আমরা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করেছি। বাংলাদেশে উন্নত দেশের দ্বারপ্রান্তে। কেবল বাংলা ভাষায় জানলেই আমরা দেশের সেবা করতে পারি। বাংলাভাষী হিসেবে আমাদের গর্ব এই যে আমরাই আমাদের দেশের নেতৃত্ব দিতে পারি। বিষয়টি গৌরবের!
প্রশ্ন :
বাংলাভাষা মাতৃভাষা। ভাষার জন্য শহীদ বাংলাভাষাই প্রথম। শহীদের আত্মবলিদান বাংলা ভাষাকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মর্যদা।একজন বাংলাভাষী মানুষ হিসেবে বাঙালি জাতি হিসেবে কেমন লাগে আপনার?
তপন বাগচী: ভাষাদিবসকে আমরা শহিদদিবস হিসেবে পালন করে এসেছি। এখন এটি আন্তর্জাকি মাতৃভাষা দিবস। এটি এখন যার যার মায়ের ভাষাকে স্মরণ করা দিবস। এই দিন কেবল বাঙালির নয়। একজন ককবরক ভাষার মানুষের কাছেও এটি মাতৃভাষা দিবস। তার মানে এটি তাঁর মায়ে র ভাষাকে স্মরণ করা দিন। এটি এখন পৃথিবীর সকল ভাষার কাছেই বাংলা ভাষার মাহাত্ম্য পৌঁছে দেওয়ার দিন। বাঙালি হিসেবে এই অর্জনকে আমরা উদযাপন করি। বাঙালির হিসেবে হিসেবে আমরা বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস পাইেএই বাংলা ভাষার জন্য। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, কেবলই অন্তরে উপলব্ধি করার বিষয়।
প্রশ্ন :
সবশেষ ভাষাকে আরো মানুষের ভালোবাসা অর্জনে কি রকম উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন?
তপন বাগচী: ঢাক ও কলকাতা মিলে আমরা বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনা করেছি। বলতে লজ্জা নেই যে, আমরা এখনো সর্বজনীন ভাষানীতি তৈরি করতে পারিনি। বাংলা একাডেমি সম্প্রতি ভাষানীতি প্রণয়নের উদযোগ নিয়েছি। দুই দেশ মিলে একটি প্রমিত বানানরীতিও দরকার। আর দরকার আঞ্চলিক ভাষার প্রসার ঘটনো। বাংলা একাডেমি থেকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে ‘আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’ প্রকাশিত হয়েছিল। এ্ অভিধানের সময়োপযোগী সংস্কার করা খুবই দরকার। দরকার হলে প্রতি জেলার জন্য আলাদা অভিধান করা জরুরি। বাংলাভাষাকে কেবল মান বাংলায় আটকে রাখলে চলবে না। আঞ্চলিক ভাষাও একটি অঞ্চলের মাতৃভাষা। তাই আঞ্চলিক ভাষার চর্চা এবং আঞ্চলিক ভাষার সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চচার প্রতি জোর দেওয়া প্রয়োজন।
=====
কবি পরিচিতি
কবি ও ফোকলোরবিদ ড. তপন বাগচীর জন্ম ২৩ অক্টোবর ১৯৬৮, মাদারীপুর। পিতা তুষ্টচরণ বাগচী মরমি কবি; মাতা জ্যোতির্ময়ী বাগচী গৃহিণী, স্ত্রী কেয়া বালা অধ্যাপক। বাংলা একাডেমির ফোকলোর, জাদুঘর ও মহাফেজখানা বিভাগের পরিচালকের দায়িত্বে আছেন। রচিত ৮৭খানা গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে কবিতা, ছড়া, গান, প্রবন্ধ প্রভৃতি। উল্লেখযোগ্য কবিতাগ্রন্থ: কেতকীর প্রতি পক্ষপাত, শ্মশানেই শুনি শঙ্খধ্বনি, সকল নদীর নাম গঙ্গা ছিল, অন্তহীন ক্ষতের গভীরে, চিরবিরহের মোহ, আমার ভেতর বসত করে, কলঙ্ক অলঙ্কার হইলো প্রভৃতি। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০২৩) ছাড়াও তিনি লাভ করেছেন বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব সাহিত্য পুরস্কার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার, স্টান্ডার্ড চার্টার্ড দ্য ডেইলি স্টার সেলিব্রেটিং লাইফ লিরিক অ্যাওয়ার্ড (৪বার), চুরুলিয়া নজরুল পদক, অগ্রণী ব্যাংক বাংলাদেশ শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, সুভাষ মুখোপাধ্যায় পদক, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন পদক, নতুন গতি সাহিত্য পুরস্কার, মহাদিগন্ত সাহিত্য পুরস্কার, এম নূরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার, জেমকন সাহিত্য পুরস্কার, সাংস্কৃতিক খবর সম্মাননা প্রভৃতি। ঢাকার ‘দৃষ্টি’, নদিয়ার ‘কথাকৃতি’, আন্দামানের ‘বাকপ্রতিমা’ ও খুলনার ‘রিভিউ’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা বেরিয়েছে তাঁর ওপর। তাঁকে নিয়ে বই লিখেছেন ড. তরুণ মুখোপাধ্যায়, শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ, নরেশ মণ্ডল, ড. আখতারুজ্জাহান, ড. অনুপম হীরা মণ্ডল, মনীষা কর বাগচী, হরিদাস ঠাকুর, মুর্শিদা আহমেদ প্রমুখ।
0 Comments