শর্মিলা দত্তের অনুগল্প || গোবিন্দ ধর
শর্মিলা দত্তের অনুগল্প
গোবিন্দ ধর
আসামের অস্থির সময়ের দর্পন অনুগল্প। বলতে গেলে আসামই শুধু অস্থির এমন নয়।গোটা ভারত উপমহাদেশ তমসায় অন্ধকার। পৃথিবী অচল সংকটে সংকটে।এই অস্থিরতায় শর্মিলা দত্ত কবিতার আদলে লিখে ফেলেন সময়ের আত্মকথন। সময় আসে তাঁর গল্পের পরতে পরতে।সে প্রেম দ্রোহ কিংবা মানবিকতা আর আছে উদ্বাস্তু দেশভাগ এনআরসি ক্যাব সকল ভালোবাসায় ও সংকটে শর্মিলার কলম তরবারির মতো সদা খাপখোলা। তিনি বারবার এঁকেছেন ভালোবাসার মুখ।এঁকেছেন যন্ত্রণাকাতর সময়ের সংকট।এই দ্রোহ প্রেম বিরহের গভীর আলিঙ্গন তাঁর গল্প বলার আঙ্গিক চিনিয়ে দিতে পারঙ্গমতাবোধ আমাকে, আমাদেরকে শ্লাঘনীয় করে।
উত্তর পূর্বাঞ্চলে যারা ছোটগল্পের পাশাপাশি অনুগল্প চর্চা করেন তাঁদের মাঝে অভিজিৎ চক্রবর্তী,কান্তারভূষণ নন্দী,আদিমা মজুমদার,মঞ্জুরী হীরামণি, মেঘমালা দে সামন্ত,জাহিদ রুদ্র,সাম্প্রতিক শিখা রায়রাই আসামের অনুগল্পকে নতুন পথ দেখাচ্ছেন। দেবব্রত চৌধুরী,
তপোধীর ভট্টাচার্য, রণবীর পুরকায়স্থ, মিথিলেশ ভট্টাচার্য, অমিতাভ দেবচৌধুরী,স্বপ্না ভট্টাচার্যের অনুগল্প আমরা বিশেষ একটা পাই না।
অস্থির সময়ে ছোটগল্প উপন্যাস পড়ার সময় যখন আমাদের হাতে কমতে থাকে তখনই উত্তর পূর্বাঞ্চলের গল্পের ইতিহাস নতুন করে আবর্তন করতে শুরু করে।অনুগল্প পরমাণু গল্প কিংবা দশ শব্দের গল্প এরকম নানান চর্চা রকম পরীক্ষা নীরিক্ষা আন্দোলন ইত্যাদির পর বেঁচে আছে ক্রমাগত সময়েরই দাবী মেনে অনুগল্প।
আমার হাতে দৌড় সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক মধুমঙ্গল বিশ্বাস শ্রদ্ধেয় মধুদা আসামের শিলচর শহরের একজন মানবীর অনুগল্প নিয়ে একটি লেখা তৈরী করার জন্য বললেন। আমি আমতা আমতা করে নিমরাজী হলাম।কারণ সাহিত্যের নানান বাঁকের আবর্তনের খাদে আমি সত্যি আলোচক হিসেবে নিতান্ত অর্বাচীন।এ দুরূহ কাজ আমার কর্ম নয়।তাও শেষ অবদি কাজটিকে সম্মান জানিয়ে হাত লাগাই।যদিও অনুগল্প চর্চার ইতিহাসে শর্মিলা দত্তকে উন্মোচন আমার সাধ্যের নয়।
আসামে অণুগল্প চর্চায় শর্মিলা দত্তর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আসামে অণুগল্প চর্চার দীর্ঘবিরতিকে তিনি প্রলম্বিত হতে না দিয়ে নিজের লেখা এবং পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে পুনরায় সচল করে তোলেন।তাঁর দুটো অনুগল্প সংকলন অনুগল্প চর্চায় দলিল হিসেবে কাজ করবে।ইতিমধ্যেই প্রকাশিত তাঁর দুটো অণুগল্পের সংকলন:
(১)বৃষ্টিমেয়ের চিরল কথা(২)
একমুঠো।
শর্মিলা দত্তের দশটি অনুগল্প আমার আলোচনার বিষয়।
(১)জলসেঁক
------------
জলসেঁক গল্পে অশ্রুমিতা বিষব্যথা দূর করতে জলসেঁকের প্রয়োজন অনুভব করে।যদিও জলসেঁক অসুখ থেকে নিরাময়ে বিশেষ দরকার নেই ডাক্তারবাবু বলেন।গ্রামীণ রেওয়াজ হলেও বিজ্ঞানের অগ্রগতিসত্বেও জলসেঁক আজও আরোগ্য লাভে অশ্রমিতার কাছে সহজ মাধ্যম।মাঝে মাঝে বিষব্যথায়ও অশ্রুমিতা স্বপ্ন বোনে ও দেখে গল্পের পরতে পরতে এই সুখ আমাদেরকে ভাবায়।
(২)অজয়তীরের একচালি মেঘ
--------------------------------------
অণুগল্প তাহলে কবিতাই।কবিতার চেয়ে কম কিসে।অজয়নদীর তীরের মেয়েদের চোখের জলের বর্ননা গল্পটিকে উৎরে নিয়ে গেছে লালমাটির দেশের মেয়ে কুহেলী।
(৩)আরশি কথা
----------------
আরশিকথা গল্পে ডুংরির বেড়ে ওঠার বর্ননা নিখুঁত ভাবেই গল্পকার এঁকেছেন। যেন কুশিয়ারার জলের মতো বর্ষায় ফুলে ওঠে ফুলির মা।চাঁদ ও মনসার কাজিয়ার ভেতর লুঁকিয়ে থাকে এই সময়ের সমাজ ও সামাজিক গল্প।সব কিছুকে ছাপিয়ে বরাকের বৃটিশ আমলের গড়ে ওঠা চা বাগানের মেয়েদের নানান দূঃখ যন্ত্রণা অল্প কথায় বৃহৎ কথাগুলোরই ইঙ্গিত।
(৪)এডিস ইজিপ্টি
--------------------
কাঁটাতারে যেমন হাত দেওয়া নিষেধ তেমনি সমাধিকারের আন্দোলন ও চিন্তায় চেতনায় নারী পুরুষ সমগোত্রীয় হলেও এডিস ইজিপ্ট মশাটি ডেঙ্গু বিস্তার করতে অনাধিকার চর্চার জায়গায় বসে যেভাবে রোগ বিস্তার করছে উর্জা গভীরভাবে অনুভব করে।এখনো নারী পুরুষ সমাধিকারের স্বপ্নে বিভোর কিন্তু আসলেও কি নারীর পুরুষ সমান?প্রশ্নটি উৎসকে দিলেন গল্পে লেখক।
(৫)আজ কুসুমের বিয়ে
-------------------------------
কুসুমদের অভিজ্ঞতা কম।লজ্জা। পুরুষের ভয়।এসব ডিঙিয়ে চরের কুসুমের আজ বিয়ে।দুধপাতিল গ্রামের মেয়ে কুসুমের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে।নদীর নিকট কুসুম যায়।নৌকায় লেখা থাকতো:সদা সত্য বলিবে।কুসুম সত্য কথা বলতে পারে না।পুরুষের ভয়।নানা কুসংস্কার আর ঠাকুরের ভয়ে কুসুম জড়সড়। পুরুষের ভয়ে সে মুখ খুলে না।সেই কুসুমের বিয়ে।তার তেরো বছর বয়সের বাঁশপাতা মেয়েটি এসব ভাবতে থাকে।কুসুমের নোলক কাঁপে।ছোট পরিসরে কত কথা।এত ব্যাপক বিস্তার কম কথায় বলা কঠিন।
(৬)বাঁক
------
মেয়েরা পন্য সামগ্রিই পুরুষের চোখে। নাভীর আহ্বান আর গেলাসে গেলাসে ঠুকাঠুকি। এই জীবনের পঁচিশ উদযাপনে বিছানায়ও কোন স্রোত অনুভব করেনি তখনই অন্য এক বাঁক।
(৭)আয়,জলঘুম আয়...
--------------------------
রক্ত অনুভব করে নারী ন পুরুষ এরকমই অনুভব সন্ধ্যা তারার।তার শিরার টানের গল্প শুনে শুনে বড় হওয়া।মৃত সন্তান প্রসবের পর নানা সান্ত্বনার পরেও তাকে বলা হয়নি সন্তান নারী না পুরুষ ছিলো।সমাজে মেয়েরা এখনো সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র। যন্তই তো।নাড়ীর টানের গল্পের ভেতর আরো এক গল্প যা পুরুষ সমাজেরই।এ থেকে উত্তরণ কি জানা নেই সন্ধ্যাতার।
(৮)বলিরেখায় বসতি সংকট
----------------------------------
তিনপুরুষ থেকে চা বাগানের শ্রমিক বৈজুনাথ।জমির পাট্টার কাগজ না থাকায় কলের মালিক তা গ্রাস করে নেয় সামন্য কলম লিখে।বৈজুনাথের বলিরেখায় এই গভীর বসতি সংকট অনুভব করেন শর্মিলা দত্ত।
(৯)তোমার মৃত্যুর অপেক্ষা অনন্ত পথরেখায়
----------------------------------------
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে চিরকালই মেয়েদের শরীরই সন্দেহের সম্পদ।এরকম সমাজ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখতে দেখতেই মেয়েরা মৃত্যুর দিকে এগোয়। আর রূপকথার ডানে মেলে অমল ভালোবাসা একদিন আসবে স্বপ্ন দেখে।
(১০)কমলা ডুরে ডুরে ইচ্ছে
--------------------------------------
কমলা ডুরে ডুরে ইচ্ছে গল্পে একজন পাঠকের নিকট প্রশ্নই এটা তুমি 'দেশ' পড়তে ভালোবাসো। তোমার দেশ আজ কোথায়?
"ডুব দ্যায় অসংখ্য কমলা রঙের ডুরে ডুরে ইচ্ছে।
শর্মিলা দত্তের গল্পের মাঝে এই সময়ই গভীর ভাবে বিভিন্ন উপমায় কথনভঙ
0 Comments