সাাহিত্যই তাঁর সমগ্র মনন জুড়েড. দেবব্রত দেবরায়
সাাহিত্যই তাঁর সমগ্র মনন জুড়ে
ড. দেবব্রত দেবরায়
সাহিত্যে সার্বক্ষণিক কর্মী বলে কিছু হয় কিনা জানি না, তবে গোবিন্দ ধরের প্রসঙ্গ এলেই সবাই যেন তাঁকে সাহিত্যের এক নিবেদিত প্রাণ, নিরলস সাহিত্যকর্মী বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন৷ আমরা যদি কবি গোবিন্দ ধরের গত তিরিশ বছরের জীবনকে নিয়ে ভাবি, তাহলে তাঁকে একজন সাহিত্য গবেষক, সাহিত্যের সার্বক্ষণিক কর্মী অথবা সৃজনশীল সাহিত্যের একজন মননশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবেই বিবেচনা করতে পারি৷ সাহিত্যের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা, নিষ্ঠা, কাজের পরিধি এবং উৎকর্ষই তাঁকে ধীরে ধীরে এই উত্তর-পূর্ব ভারতে পরিচিত করে তুলেছে৷ ত্রিপুরার একটি প্রান্তিক গ্রামে আজ থেকে পঞ্চান্ন বছর আগে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন৷ মানুষের প্রতি, সমাজের প্রতি গভীরভাবে দায়বদ্ধ এই সাহিত্য কর্মী ধীরে ধীরে নিরলস সাহিত্য সাধনার মধ্য দিয়ে নিজেকে আজ সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের সাহিত্য আঙিনায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন৷
গোবিন্দ ধর আজ আর ছাত্রদরদি একজন শিক্ষক বা প্রধান শিক্ষক হিসাবেই পরিচিত নন৷ তিনি একইসঙ্গে তাঁর নানাবিধ সৃজনশীল গুণাবলী এবং কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি আজ নানাবিধ অভিধায় ভূষিত হয়েছেন৷ তিনি একদিকে যেমন একজন শিক্ষক বা প্রধান শিক্ষক হিসেবে সমাজের সম্মান অর্জন করে চলেছেন, তেমনি অন্যদিকে একজন কবি, একজন প্রাবন্ধিক, একজন প্রকাশক এবং সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদক ও সাহিত্য সংগঠক হিসেবেও আজ নিজেকে উন্নীত করেছেন উত্তরপূর্ব ভারতে৷ সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা এবং মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাই তাঁকে আজ এই স্তরে উন্নীত করছে৷ আর সেই কারণেই সাহিত্য পাঠক বা ত্রিপুরার একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা আজ গোবিন্দ ধরকে নিয়ে এক ধরনের আত্মগৌরব, এক ধরনের আত্মশ্লাঘা অনুভব করি৷ গত তিরিশ বছর ধরে তিনি সাহিত্যের বিভিন্ন ধারা বিশেষ করে সিরিয়াস গ্রন্থ প্রকাশ করে তিনি আমাদেরকে কৃতজ্ঞতার বুননে আবদ্ধ করেছেন৷ ত্রিপুরার একটি প্রান্তিক জায়গায় বসবাস করেও তিনি বাংলা সাহিত্যের বিকাশ এবং উন্নয়নে একের পর এক মননশীল সিরিয়াস গ্রন্থ প্রকাশ করে যে অবদান রেখে চলেছেন তা এককথায় বিস্ময়কর৷ আজকের দিনে বসে আমরা গোবিন্দ ধরের বহুমাত্রিক সৃজনশীল সাহিত্য কর্মের মূল্যায়ন করতে না পারলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁকে অবশ্যই মূল্যায়ন করবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি৷ শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজসেবা, গ্রন্থ প্রকাশ এবং সর্বোপরি কবিতার জন্য তিনি নিবেদিত প্রাণ একজন সৃজনশীল মানুষ৷ এই সময়ের মধ্যে তিনি নানাবিধ সংস্থা গড়ে তুলেছেন৷ তার মধ্যে অন্যতম হলো স্রোত সাহিত্যপত্র, স্রোত প্রকাশনা, স্রোত সংগ্রহশালা, প্রকাশনা মঞ্চ ইত্যাদি৷
সবকিছুকেই বিবেচনায় রেখে এটা বলা যায় যে, স্রোত প্রকাশনাই তাঁর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রিয় বিষয়৷ গত তিরিশ বছর ধরে একটু একটু করে স্রোত প্রকাশনাকে তিনি নিবিঢ়ভাবে বিকশিত করেছেন৷ গত তিরিশ বছর ধরে স্রোত প্রকাশনা থেকে কয়েকশত সিরিয়াস মননশীল গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে৷ যে সমস্ত গুণাবলীর মধ্য দিয়ে একদিকে তিনি যেমন সমগ্র উত্তর পূর্ব ভারতজুড়ে পরিচিত হয়েছেন, তেমনি ত্রিপুরার লেখক কবিদেরকেও তিনি বৃহৎ বঙ্গে পরিচিত করিয়েছেন৷ আর এসবের মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে তিনি আমাদের এই ছোট্ট ত্রিপুরাকেও তুলে ধরেছেন বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে৷ স্রোত প্রকাশনার মধ্য দিয়ে তিনি ত্রিপুরায় অনেক কবিকে, লেখক, সাহিত্যিককে বৃহত্তর সারস্বত সমাজে মেলে ধরেছেন৷ ত্রিপুরার অসংখ্য লেখক কবিকে তিনি নানাভাবে সম্মানিত করেছেন৷ এই সমস্ত লেখক কবিরা স্রোত প্রকাশনার কাছে কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছেন৷ ত্রিপুরার এমন অনেক লেখক কবি আছেন যাদের জীবনে প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয় স্রোত প্রকাশনায়৷ পরবর্তীকালে তাঁরা হয়তো লেখালেখির জগতে অনেক সুনাম অর্জন করেছেন কিন্তু তাঁদের শুভারম্ভ কিন্তু হয়েছিল স্রোত প্রকাশনার মধ্যেই৷ সেজন্যই ত্রিপুরার বহু লেখক কবি কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছেন স্রোত প্রকাশনা এবং স্রোত এর কর্ণধার গোবিন্দ ধরের প্রতি৷
পিতা দক্ষিণারঞ্জন ধর এবং মাতা সুষমারাণী ধরের কোল আলো করে গোবিন্দ জন্মেছিলেন ১৯৭১ সালের ৩০ জুলাই ধর্মনগরের অফিসটিলায়৷ তাঁর সম্পাদনায় যেসমস্ত সাহিত্যপত্র এখনো পর্যন্ত সম্পাদিত হয়েছে সেগুলি হলো স্রোত, স্রোত.কম., স্রোত.f, কবিতাঘর, কুসুম, বইবাড়ি, অন্যপাঠ, উৎসব সমাচার, ভাষাচর্চা ইত্যাদি৷ স্রোত সম্পাদক ছাড়াও তিনি ত্রিপুরা রবীন্দ্র পরিষদের আজীবন সদস্য৷
ত্রিপুরার পুঁথি পান্ডুলিপি গবেষণা কেন্দ্রের তিনি সম্পাদক, উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা ও চর্চা কেন্দ্র, বঙ্গীয় সাহিত্য সংসৃকতি সংসদ, প্রকাশনা মঞ্চসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন৷ তিনি প্রকাশনা মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক৷ তাঁর সম্পাদনায় যে সমস্ত কবিতা সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে সেগুলি হলো--- মেঘ বৃষ্টি রোদ, গোপন জোছনা, তামাদি হয়নি যে ভালোবাসা, কখনো পাহাড় কখনো নদী, এই সময়ের বত্রিশজন কবির কবিতা, আঞ্চলিক ভাষার কবিতা, শেকড়ের ধ্বনি, সমকালীন পনেরো জন কবির কবিতা, ত্রিপুরার আবৃত্তির কবিতা, ত্রিপুরার নির্বাচিত কবিদের কবিতা ইত্যাদি৷ তিনটি ছড়ার গ্রন্থও রয়েছে তাঁর সম্পাদনায়৷ যেমন--- থই থই ছড়া, তোমার ঊনিশ, আমার একুশ, এই শতাব্দীর ছড়া ইত্যাদি৷
গোবিন্দ ধরের অনেকগুলো প্রবন্ধ ও গবেষণাগ্রন্থও রয়েছে৷ যেমন--- শ্রীহট্টীয় লৌকিক সংসৃকতি ও শব্দকোষ, আত্মক্ষর, ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিন, ত্রিপুরার সাহিত্যকোষ, ত্রিপুরার লেখক অভিধান, কুমারঘাটের ইতিবৃত্ত ও তথ্যপঞ্জি, মেয়েলি ব্রতকথা, ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিন ও শিশু সাহিত্য, আমার চিঠি, মুখোমুখি বিকাশ সরকার, মুখোমুখি অশোকানন্দ রায়বর্ধন, বইপাড়ার বযবৃক্ষ সবিতেন্দ্রনাথ রায়, অক্ষরাস্ত্র ইত্যাদি৷
গোবিন্দ ধরের সম্পাদনায় ইতিমধ্যেই যে সমস্ত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে সেগুলি হলো--- শতবর্ষের আলোকে সমর সেনের ফিরে দেখা, হিমাদ্রি দেব রচনা সমগ্র, ত্রিপুরার প্রথম কবিতাপত্র জোনাকি সমগ্র, অনন্য অনিল সরকার, জননেতা দশরথ দেব, জীবন ও সংগ্রাম, কথা সাহিত্যিক শ্যামল ভট্টাচার্য, সমকালীন ত্রিপুরার পাঁচজন কবি সাহিত্যিক, পীযূষ রাউত, উজ্জ্বল উদ্ধার, বিকাশজীবনঃ হাজিরা কামলা থেকে লেখা কর্মী, কথাসাহিত্যিক শ্যামল বৈদ্য, বাংলা সাহিত্যের অহংকার কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, সোনাঝুরি খোয়াই হাটের কবিতা, কথা সাহিত্যিক জহর দেবনাথ, কথাসাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায়, ত্রিপুরার ছোট নদনদী, কথাসাহিত্যিক ঝুমুর পান্ডে ইত্যাদি৷
গোবিন্দ ধর তাঁর সাহিত্য জীবনে ত্রিপুরার সাহিত্য, উত্তর পূর্ব ভারতের সাহিত্যকে যেমন নিরন্তরভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করে চলেছেন তেমনি ত্রিপুরাসহ উত্তর পূর্ব ভারতের লেখক কবিকে নিয়েও তিনি কলম ধরেছেন বার বার৷ তাঁর স্রোত প্রকাশনা থেকে অসংখ্য ভালো ভালো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে৷ যে গ্রন্থগুলি একদিকে যেমন ত্রিপুরাকে সম্মানিত করেছে, তেমনি এই গ্রন্থাবলী নানাভাবে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির আকর গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আছে৷ যে গ্রন্থাবলী এখনো পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে আছে৷ গ্রন্থগুলি হলো--- তিমিরবরণ চাকমা অনুদিত চাকমা ভাষায় গীতাঞ্জলি, ড. সেবিকা ধরের মানবী বিদ্যার আলোকে নারী, শ্যামল ভট্টাচার্য প্রণীত উপন্যাস লোদ্রভার কাছাকাছি ইত্যাদি৷ এই গ্রন্থগুলি ত্রিপুরা সরকার কর্তৃক পুরসৃকত হয়েছে৷ গত তিন দশকে স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রায় দুশো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে৷ স্রোত প্রকাশনা থেকে বহু আলোচিত গ্রন্থগুলি হলো--- অমিতাভ দেব চৌধুরীর মাটির ঘর, সোনার ঘর, শ্যামলিমা, নির্বাচিত কবিতা, অভিজিৎ চক্রবর্তী নদীর নামে চিরকুট, দিলীপ কান্তি লস্করের কবিতা, মৃত্তিকা দাসের ভুবন পাহাড়ের মেয়ে, অপাংশু দেবনাথের মৃত্তিকা ঋণ মেঘমিতাকে, গোবিন্দ ধরের দ্রোহবীজ পুতে রাখি একা, শ্রীচরণেষু বাবা, বিশ্বজিৎ দত্তের শ্রেষ্ঠ কবিতা, মিলনকান্তি দত্তের শ্রেষ্ঠ কবিতা, বিকাশ সরকারের শ্রেষ্ঠ কবিতা, নির্মলেন্দু গুণ এর জন্ম দিও বঙ্গে, গোবিন্দ ধরের হিমাদ্রি দেব রচনা সংগ্রহ, হারাধন বৈরাগীর হাাসমতি ত্রিপুরা, দিলীপ দাসের ধুলোস্তর, হিমাদ্রি দেবের বৃষ্টিজল ইত্যাদি৷
গোবিন্দ ধর একজন সংস্কৃতিমনস্ক সাহিত্য কর্মী৷ তাঁর অন্তরে একটা সহজ সরল কোমল মন আমি লক্ষ্য করেছি--- অনুক্ষণ৷ সবসময় তাঁর মধ্যে একটা নতুন কিছু কাজ করার উদ্যম আমরা লক্ষ্য করেছি৷ নানারকম প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়েও গত তিন দশকে তিনি যেভাবে সাহিত্যের জগতে একের পর এক কাজ করে চলেছেন তা নজিরবিহীন৷ তাঁকে নানাভাবে অপমান অপদস্থ করার কম চেষ্টা হয়নি৷ কিন্তু সমস্ত প্রতিকূলতাকে অগ্রাহ্য করে তিনি এগিয়ে চলেছেন তাঁর স্থির লক্ষ্যে৷ গোবিন্দ ধরের বয়স মাত্র পঞ্চান্ন বছর হলো৷ এখনো তাঁর জীবনের দীর্ঘসময় পড়ে আছে৷ আমরা আশা করবো বাকি জীবনেও তিনি মানুষের পাশে থেকে সাহিত্যসেবায় আরও মনোনিবেশ করে আমাদের ত্রিপুরাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেবেন৷ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেভাবে ত্রিপুরায় আসার বারো বছর আগে ত্রিপুরার কাহিনি অবলম্বন করে ‘রাজর্ষি’ উপন্যাস লিখে ত্রিপুরাকে বিশ্ব সাহিত্যের অঙ্গনে পৌঁছে দিয়েছিলেন এটা আমাদের কাছে প্রেরণা৷ আমি গোবিন্দ ধরের সুস্বাস্থ্য কামনা করছি৷ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তিনি সুস্থ থেকে শিল্প সাহিত্য এবং সমাজের জন্য আরো কাজ করে এগিয়ে চলুন৷
0 Comments