শ্রীহট্টীয় বিবাহ ও ধামাইল || গোবিন্দ ধর
শ্রীহট্টীয় বিবাহ ও ধামাইল
গোবিন্দ ধর
শ্রীহট্টীয় বিবাহরীতি বিয়েকে শুধু আনন্দমুখরই করে এমন নয়।বিবাহকে প্রেম প্রকৃতি নদী তৃণলতা সবার সাথে এক অপূর্ব মেলও ঘটায়। বিবাহকে করে মধুর পরস্পরের কাছে দায়িত্বশীল। আর শ্রদ্ধায় অবনত একটি জাতি ঘটনে বিবাহ থেকেই পাঠ শুরু হয়।বিয়ের ফর্দ যোগাড় যন্ত্রর সব খানেই সেরকম আমাদের মননকে লালন করার জন্য আমাদের শ্রীহট্টীয়পুরুষরা বিবাহকে দিয়েছেন বিশেষ গুরুত্ব।তাতে প্রজন্মকে বিয়ের আচরণ থেকেই যাপনের ধারাপাত শিখতে সহায়তা করে।পানের খিলি,মঙ্গলাচরণ,অধিবাস,বিবাহ,বাসীবিয়ে,কালরাত্রি,চতুর্থমাঙ্গলিক অনুষ্ঠান, ফিরাযাত্রা,সব অনুষ্ঠানেরই আছে ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজনীয়তা।
বিয়েরগানগুলোতেও আছে প্রাণ।আছে সামাজিক সম্পর্ক,প্রেম বিরহ,রাগ,পূর্বরাগ, আদর,স্নেহ,পরিচয়ের সুন্দর উদযাপন।বিবাহের
সঙ্গীতগুলো ধামাইল নামে পরিচিত।রাধারমণ দত্তের অপূর্ব সৃষ্টি শ্রীহট্টীয় বিবাহসঙ্গীত।আমাদের মনকে করে বিবাহের আবহের মাঝেও আনন্দ সুখ আর বিদায়ের আনন্দঘন বেদনার মিলনসুর। এই গানগুলো হলো ধামাইলগান। আনন্দময় করে তুলে সমাজের লোকজনদের।সকলেই তখন এর অংশিদার।
শ্রীহট্টীয়দের কাছে বিয়ের গান যেন আনন্দেরই প্রকাশ।রাধারমণ সুর তুলেন সারা বাঙ্গালী হিন্দুদের মননে।যা আজ সবার মনেই এক হিন্দোল জাগিয়ে তুলেন।
রাধারমণ দত্ত, বা, রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ(১৮৩৩ - ১৯১৫) হলেন একজন বাংলা সাহিত্যিক, সাধক কবি, বৈষ্ণব বাউল, ধামালি নৃত্য-এর প্রবর্তক।
সংগীতানুরাগীদের কাছে তিনি রাধারমণ বলেই সমাধিক পরিচিত। বাংলা লোকসংগীতের পুরোধা লোককবি রাধারমণ দত্ত। তাঁর রচিত ধামাইল গানসিলে উত্তর পূর্ব ভারতের বাঙ্গালীদের কাছে পরম আদরের ধন। রাধা রমন নিজের মেধা ও দর্শনকে কাজে লাগিয়ে মানুষের মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। কৃষ্ণ বিরহের আকুতি আর না-পাওয়ার ব্যথা কিংবা সব পেয়েও না-পাওয়ার কষ্ট তাঁকে সাধকে পরিণত করেছে। তিনি দেহতত্ত্ব, ভক্তিমূলক, অনুরাগ, প্রেম, বিরহ,ভজন, ধামাইলসহ(শ্রীহট্টীয় বিয়ের গান) নানা ধরণের কয়েক হাজার গান রচনা করেছেন।
তা থেকে কয়েকটি গান এখানে তুলে দিলাম।
রাধারমণের কয়েকটি জনপ্রিয় গানঃ
প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে
বংশী বাজায় কে রে সখী বংশী বাজায় কে
আমার মাথার বেণী খুইল্যা দিমু তারে আইনা দে
প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে
যে পথ দিয়ে বাজায় বাঁশি সে পথ দিয়ে যায়
সোনার নূপুর পরে পায়ে
আমার নাকের নোলক খুইল্যা দিব সেইনা পথের গায়ে
আমার গলার হার গড়িয়ে দেব সেই না পথের গায়ে
যদি হার জড়িয়ে পড়ে যায়
প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে
যার বাঁশি এমন, সে বা কেম্ জানিস যদি বল
সখি করিস না তো ছল, আমার মন বড় চঞ্চল
আমার প্রাণ বলে তার বাঁশি জানে আমার চোখে জল
প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে
করলা বাঁশের-ও বাঁশি ছিদ্র গোটা ছয়
বাঁশি কতই কথা কয়
নাম ধরিয়া বাজায় বাঁশি রহনো না যায়
ঘরে রহনো না যায়
প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে
কোন বা ঝাড়ের বাঁশের বাঁশি, ঝাড়ের লাগাল পাই।
জড়ে পেড়ে উগরাইয়া, সায়রে ভাসাই ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে, শুন গো ধনি রাই।
জলে গেলে হবে দেখা, ঠাকুর কানাই ॥
প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে
শ্যামল বরণ রূপে মন নিল হরিয়া
কুক্ষণে গো গিয়াছিলাম জলের লাগিয়া
কারো নিষেধ না মানিয়া সখি গো ।।
আবার আমি জলে যাব ভরা জল ফেলিয়া
জল লইয়া গৃহে আইলাম প্রাণটি বান্ধা থুইয়া
আইলাম শুধু দেহ লইয়া সখি গো ।।
কি বলব সই রূপের কথা শোন মন দিয়া
বিজলি চটকের মতো সে যে রইয়াছে দাঁড়াইয়া
আমার বাঁকা শ্যাম কালিয়া সখি গো ।।
ভাইবে রাধারমণ বলে মনেতে ভাবিয়া
মনে লয় তার সঙ্গে যাইতাম ঘরের বাহির হইয়া
আমি না আসব ফিরিয়া সখি গো ।।
রাধারমণ একজন কৃঞ্চপ্রেমিকও ছিলেন। কৃঞ্চবিরহে তিনি লিখেছেন অসংখ গান। এ সব গানের মধ্যে বিখ্যাত দুটি গান হচ্ছেঃ
কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো আমি বুক চিরিয়া ।
অন্তরে তুষেরই অনল জ্বলে গইয়া গইয়া ।।
ঘর বাঁধলাম প্রাণবন্ধের সনে কত কথা ছিল মনে গো ।
ভাঙ্গিল আদরের জোড়া কোন জন বাদী হইয়া ।।
কার ফলন্ত গাছ উখারিলাম কারে পুত্রশোকে গালি দিলাম গো ।
না জানি কোন অভিশাপে এমন গেল হইয়া ।।
কথা ছিল সঙ্গে নিব সঙ্গে আমায় নাহি নিল গো ।
রাধারমণ ভবে রইল জিতে মরা হইয়া ।।
ভ্রমর কইয়ো গিয়া,
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে,
ভ্রমর কইয়ো গিয়া ।।
ভ্রমর রে, কইয়ো কইয়ো কইয়োরে ভ্রমর,
কৃষ্ণরে বুঝাইয়া মুই রাধা মইরা যাইমু
কৃষ্ণ হারা হইয়ারে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া।।
ভ্রমর রে, আগে যদি জানতামরে ভ্রমর, যাইবারে ছাড়িয়া
মাথার কেশও দুই’ভাগ করি
রাখিতাম বান্দিয়ারে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া।।
ভ্রমর রে, ভাইবে রাধারমন বলে শোনরে কালিয়া
নিব্বা ছিলো মনের আগুন
কে দিলা জ্বালাইয়ারে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া।।
রাধারমন এর গানের নেশা থেকে বের হতে পারছিনা আমি।এ এক কঠিন নেশা।
রাধারমণই এক নেশা।পেয়ে বসলে আর ছাড়ানো কঠিন।
আমি কৃষ্ণ কোথায় পাই গো
আমি বন্ধু কোথায় পাই গো
বল গো সখি কোন দেশেতে যাই
আমি কৃষ্ণ প্রেমের কাঙ্গালিনী
আমি নগরে বেড়াই গো
বল গো সখি কোনবা দেশেতে যাই।
আপন জাইনা প্রাণ বন্ধুরে
হৃদে দিলাম ঠাঁই
আমার ছিল আশা ভালবাসা
আমি কারে বা শুধাই গো
বল গো সখি কোনবা দেশেতে যাই।
সুচিত্র পালংকের মাঝে
শুইয়া নিদ্রা যাই
এগো ঘুমাইলে স্বপন দেখি
আমি শ্যাম লইয়া বেড়াই
বল গো সখি কোনবা দেশেতে যাই।
ভাইবে রাধা রমণ বলে
শুন গো ধ্বনি রাই
এগো এই আদরের কুন মনি
আমি কোথায় গেলে পাই
বল গো সখি কোনবা দেশেতে যাই।
রাধারমন দত্তের কিছু গান
প্রাণ সখিরে
ঐ শোন কদম্বতলে বাঁশি বাজায় কে।
বাঁশি বাজায় কে রে সখি, বাঁশি বাজায় কে ॥
এগো নাম ধরিয়া বাজায় বাঁশি, তারে আনিয়া দে।
অষ্ট আঙ্গুল বাঁশের বাঁশি, মধ্যে মধ্যে ছেদা
নাম ধরিয়া বাজায় বাঁশি, কলঙ্কিনী রাধা ॥
কোন বা ঝাড়ের বাঁশের বাঁশি, ঝাড়ের লাগাল পাই।
জড়ে পেড়ে উগরাইয়া, সায়রে ভাসাই ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে, শুন গো ধনি রাই।
জলে গেলে হবে দেখা, ঠাকুর কানাই ॥ শ্যামল বরণ রূপে মন নিল হরিয়া
কুক্ষণে গো গিয়াছিলাম জলের লাগিয়া
কারো নিষেধ না মানিয়া সখি গো ।।
আবার আমি জলে যাব ভরা জল ফেলিয়া
জল লইয়া গৃহে আইলাম প্রাণটি বান্ধা থুইয়া
আইলাম শুধু দেহ লইয়া সখি গো ।।
কি বলব সই রূপের কথা শোন মন দিয়া
বিজলি চটকের মতো সে যে রইয়াছে দাঁড়াইয়া
আমার বাঁকা শ্যাম কালিয়া সখি গো ।।
ভাইবে রাধারমণ বলে মনেতে ভাবিয়া
মনে লয় তার সঙ্গে যাইতাম ঘরের বাহির হইয়া
আমি না আসব ফিরিয়া সখি গো ।।
আমাদের লোকসংস্কৃতির একটি ভিত আজ শ্রীহট্টীয় ধামাইল।বিবাহের উপাচার।
যদিও ধীরে ধীরে বিয়েতেও আধুনুকতার ছোঁয়া লেগে ধামাইল গানের প্রতি মানুষের মোহ ভেঙ্গে যাচ্ছে তবুও শ্রীহট্টীয় বিবাহ আচারে তার প্রভাব চিরকালীন।
বি:দ্র:
অবিভক্ত উত্তর ত্রিপুরা সহ উত্তর পূর্ব ভারতের বিভিন্ন বাঙ্গালী হিন্দু প্রধান অঞ্চলে রাধারমণের অনেক গান এখনো ধামাইলশিল্পীদের হাতে লেখা গানের খাতা থেকেই বিবাহ অনুষ্টানে গাওয়া হয়।কেউ কেউ বয়স্করা স্মৃতি থেকেও রাধারমণের গান উচ্চারণ করেন।এমন শিল্পীদের দুএকটা খাতা আমার কাছেও আছে।আমার অবিভক্ত উত্তর ত্রিপুরার শ্রীহট্টীয় লৌকিক সংস্কৃতি ও শব্দকোষে এর কিছুটা আমি তুলে ধরবো।আমার শ্রীহট্টীয় লৌকিক সংস্কৃতি ও শব্দকোষ প্রথম খন্ডে আমি ডিটান সহ শব্দকোষ এবং সংস্কৃতি নিয়ে আলেচনা করি।আমার এই কাজের অখন্ড সংস্করণে মেয়েলি বর্তসহ পুজো এবং ধামাইল এবং শ্রীহট্টীয় খেলাও থাকবে।একটা আনন্দ সংবাদ আমার কাছে আমার "শ্রীহট্টীয় লৌকিক সংস্কৃতি ও শব্দকোষ"বইটি ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় রেপারেন্স বই হিসেবে গৃহিতও করেছেন।আমিও আপ্লুত।
২১:০৬:২০১৭
সকাল:৬:১০মি।
কুমারঘাট।
0 Comments