ত্রিপুরার সাহিত্য নিবিড় পাঠ
ত্রিপুরার সাহিত্য নিবিড় পাঠ
স্রোত প্রকাশনা ও লিটল ম্যাগাজিনের ৩৫ বছর
আগরতলা :১৫ মার্চ, ২০২৬: "যে ভাষায় কথা বলে নদী/
পাখি গান গায় কালস্রোত /লেখা হয় পাতায় পাতায়।"
ত্রিপুরার প্রত্যন্ত গ্রাম রাজধর মানিক্যের স্মৃতিবিজড়িত রাতাছড়া থেকে ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন ও প্রকাশনার জগতে এক উল্লেখযোগ্য নাম "স্রোত "।ইতিমধ্যে তিমিরবরণ চাকমা অনুদিত চাকমা ভাষায় "গীতঞ্জলী" প্রকাশের জন্য ত্রিপুরা সরকারের শ্শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা পুরস্কারসহ শ্যামল ভট্টাচার্যের উপন্যাস "লোদ্রভার কাছাকাছি" পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হয় স্রোত। ২০১৯ সালে প্রাবন্ধিক সেবিকা ধরকৃত "মানবীবিদ্যার আলোকে নারী- এক ভিন্ন মাত্রিক পাঠ" বইটিও ত্রিপুরা সরকারের বাংলা ভাষায় শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা পুরস্কারে ভূষিত হয়।
স্রোত বই ছাপে, শুধু তা নয়, বই ছেপে প্রকাশ করে উত্তর পূর্বাঞ্চলের সাহিত্য সৌন্দর্য- এই অঙ্গীকার নিয়ে। প্রতিবছর নানারকম প্রকাশনা উৎসব, বই উৎসব, লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনসহ নানাবিধ কাজকর্মের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের নিবিড় সান্নিধ্যে সেবা করে আসছে পঁয়ত্রিশ বছর থেকে। এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে সকাল ১১ ঘটিকা থেকে মেলারমাঠস্থিত এগিয়ে চল সংঘে বইবাড়ি ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় পঁয়ত্রিশ বছর উদযাপন উপলক্ষে "ত্রিপুরার সাহিত্য নিবিড় পাঠের" এক উল্লেখযোগ্য আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
উক্ত অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাবন্ধিক অশোকানন্দা রায়বর্ধন, ত্রিপুরা, বিশ্বজিৎ দেব, কবি, ত্রিপুরা,বিমল চক্রবর্তী, কথাসাহিত্যিক, ত্রিপুরা, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, কথাকার,আসাম, পুলিন রায়, কবি,বাংলাদেশ, বিজয় পাল, সাংবাদিক, ত্রিপুরা, প্রাবন্ধিক নিয়তি রায় বর্মণ, প্রাবন্ধিক,ত্রিপুরা। পাশাপাশি ত্রিপুরার সাহিত্য বিষয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন ড.আশীষকুমার বৈদ্য,প্রাবন্ধিক, সনজিৎ বণিক, কবি, আনিলকুমার নাথ, কবি ও প্রাবন্ধিক, ত্রিপুরা, ড.দেবব্রত দেবরায়, প্রাবন্ধিক,পারিজাত দত্ত, ছোট গল্পকার, রীতা ঘোষ, গল্পকার
শুভ্রশংকর দাশ, কবি, সিক্তা চক্রবর্তী, ছোটগল্পকার, হারাধন বৈরাগী,কবি ও আলোচক, দিব্যেন্দু নাথ,কথাকার ও কবি, গোপেশ চক্রবর্তী,কবি, সুমিতা দেব,কথাকার,বিজন বোস, কবি
জহরলাল দাস,প্রাবন্ধিক, রূপন মজুমদার, কবি ও ভুলুকুমার দেববর্মা,কবি।স্রোতের থিমসংগীত পরিবেশন করে সুমিতা দেব ও রাখিরানি দাস।
সংগীত পরিবেশন করবেন গীতশ্রী ভৌমিক, কবি ও সংগীত শিল্পী, আবৃত্তি : মনীষা নাথ।
সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সুমনা দাশ পাটারী, কবি।
গত ১৫ মার্চ ২০২৬ এগিয়ে চল সংঘ, মেলারমাঠ আগরতলা ও বইবাড়ি ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায়
ত্রিপুরার সাহিত্য নিবিড় পাঠ স্রোত প্রকাশনা আয়োজিত অনুষ্ঠানটি মূলত ছিলো ত্রিপুরার সাহিত্য নিয়ে আলোচনা। একটা দুটো বই ধরে আলোচনা নয়।তবুও অনেক আলোচক নির্দিষ্ট সময় সীমা পেরিয়ে একটি বই নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা চালিয়ে যাওয়ায় আরো একাধিক বইপত্র নিয়ে আলোচকদের সময় দেওয়া সম্ভব হয়নি।সকলের বই নিয়ে আলোচনাও হয়নি।কিন্তু দু'একজনের আলেচনায় গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিকদের সামগ্রিক সাহিত্য ভাবনা আলোচনায় সামান্য হলেও এসেছে।এদের মধ্যে সাংবাদিক সম্পাদক বিজয় পাল মহোদয়ের আলোচনায় হারাধন বৈরাগী, শ্যামল বৈদ্য,বিকাশ সরকার ও গোবিন্দ ধর সহ বেশ কয়েজন সাহিত্যিকদের বিষয়ে আলোচনা তিনি করেছেন।পাশাপাশি প্রাবন্ধিক ও লোক গবেষক অশোকানন্দ রায়বর্ধনের আলোচনায়ও ব্যক্তি আলোচনা ছিলো না।ছিলো সামগ্রিক ত্রিপুরার সাহিত্যের গতি প্রকৃতি। এতে কবি ও সম্পাদক বিজন বোসের কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি কবি ও কথাসাহিত্যিক হারাধন বৈরাগীর দীর্ঘ সাহিত্য জীবন নিয়ে কথা বলেছেন। পারিজাত দত্ত ও বিশ্বজিৎ দেব মিলনকান্তি দত্তের' তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্গা "নিয়ে অসম্ভব সৃজনশীল আলোচনায় মুগ্ধ করেছেন শ্রুতাদের।পাশাপাশি ত্রিপুরার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন আলোচকবৃন্দ।হারাধন বৈরাগী প্রণব চৌধুরীর উপন্যাস আঁধারের পাণ্ডুলিপি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন।জহরলাল দাস আলোচনা করেেন প্রণব চৌধুরীর ছড়া সংকলন নিয়ে। গোপেশ চক্রবর্তী আলোচনা করেন বিমল চক্রবর্তী সম্পাদিত ত্রিপুরা ১৯৮০ ছোটগল্প সংকলনে জুনের দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে লেখা গল্পগুলোর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। সংকলনটি ত্রিপুরার গল্পবিশ্বে এক মাইল ফলক বলে উল্লেখ করেন আলোচনায়।বিমল চক্রবর্তীর আলোচনায় মন্টু দাসের সাম্প্রতিক নির্বাচিত প্রবন্ধ সংকলন নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন।আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন বিজন বোস।তাঁর আলোচনা ছিলো গোবিন্দ ধর সম্পাদিত ত্রিপুরার উপন্যাস বিষয়ে। খুব গোছানো আলোচনায় উঠে আসে বইটির প্রাসঙ্গিকতা।রূপন মজুমদার আলোচনা করেন বিজন বোসকৃত ইন্দ্রধনু কাব্য সংকলন নিয়ে।বাংলাদেশ থেকে একমাত্র অতিথি কবি পুলিন রায় আলোচনা করেন গোবিন্দ ধরকৃত কাব্য সংকলন ধানের পাঁচালী। তাঁর আলোচনায় উঠে আসে বইটির সময়োপযোগী কাব্য বিশ্লেষণ। আসাম থেকে একমাত্র প্রতিনিধি বিদ্যুৎ চক্রবর্তী আলোচনা করেন স্রোতের ত্রিপুরার উপন্যাস সংখ্যা নিয়ে। সনজিত বণিক আলোচনা করেন গোবিন্দ ধরের তিনটি এক পঙক্তির কাব্য সংকলন দ্রোহ,দ্রোহকাল ও দ্রোহবীজ নিয়ে। তাঁর আলোচনা ছিলো ছিমছাম অথচ এই সময়ের কাব্যভাষা ও গোবিন্দ ধর প্রসঙ্গে। তিনি বলেন ত্রিপুরায় এক পঙক্তির এরকম প্রয়াস প্রথম। নিয়তি রায়বর্মন আলোচনা করেন পীযূষ রাউত উজ্জ্বল উদ্ধার গোবিন্দ ধর সম্পাদিত গ্রন্থটির।তিনি পীযুষ রাউতের জীবন ও সাহিত্যকৃতি নিয়ে কথা বলেন।আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন সিক্তা চক্রবর্তী শ্যামল বৈদ্যের এই সময়ের গল্প সংকলন নিয়ে। তাঁর আলোচনায় শ্যামল বৈদ্যের গল্পের নানা মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা ও গল্পবিশ্বের উন্মোচন করেন।আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন রীতা ঘোষ, দিব্যেন্দু নাথ।ড. আশীষকুমার বৈদ্য আলোচনা করেন বাহির বাংলার বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক রবীন্দ্র গুহের নির্বাচিত উপখ্যান নিয়ে দীর্ঘক্ষণ।মনীষা নাথ অশোকানন্দ রায়বর্ধনের সাব্রুমের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে পান্নালাল রায়ের আলোচনাটি পাঠ করেন।পাশাপাশি তাঁর আবৃত্তি গোবিন্দ ধরের আমি আর কোথাও যাবো না কবিতাটি শ্রোতাদের মন কেড়ে নিয়েছে মন্তমুগ্ধের মতো।অনুষ্ঠানে যে ভাষায় কথা বলে নদী থিমসংটি পরিবেশন করেন কথাকার সুমিতা দেব ও কবি রাখীরাণী দাস। পাশাপাশি প্রায় সকলের আলোচনা ছিলো তাঁদের সেরা নির্যাস।
আলোচনা সাহিত্য নিয়ে একদিবসীয় আলোচনায় সব দিক আলোচিত হওয়া সম্ভব না হলেও স্রোত আয়োজিত ত্রিপুরার সাহিত্য নিবিড় পাঠ আলোচনা অনুষ্ঠানটি সকলের সহযোগিতা ও উপস্থিতি এবং আলোচনায় ছিলো সমৃদ্ধ। সব দিক আলোচিত হয়েছে অনুষ্ঠানে। এটা সম্ভব হয়েছে সকলের সহযোগিতা ও স্রোত প্রকাশনার প্রতি আপনাদের আন্তরিক শুভকামনা ও ভালোবাসার জন্য। আপনাদের সকলের সহযোগিতায় স্রোত এমন উদ্ভাবনের আরো নতুন নতুন নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করবে প্রত্যাশা রাখি।অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কবি সুমনা দাশ পাটারী। সহযোগিতা করেন অমূল্য ভৌমিক ও ভুলুকুমার দেববর্মা মহোদয়।
ত্রিপুরার সাহিত্য ভুবনে এই অনুষ্ঠান এক ব্যতিক্রম ও ত্রিপুরায় শুধু আলোচনার অনুষ্ঠান প্রথমবারের মতো হবে বলে সম্পাদকসহ উপস্থিত সব অতিথিরা জানান। ভবিষ্যতে আরো দীর্ঘ সময় নিয়ে এরকম আলোচনা করার আশা উপস্থিত সবাই। স্রোত প্রকাশক সুমিতা পালধর সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
0 Comments